কলেজ রোডের জার্নাল-২২ ॥ মামুন মুস্তাফা



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া রিকশা ভাড়া ছিল ৮ টাকা। বলছি নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের কথা। মালিবাগ চৌধুরীপাড়া আমার বড়খালার বাসা। আমার মামা-খালাদের মাঝে তিনিই সবার বড়। ১৯৪৮ সালে অর্থাৎ ’৪৭-এর দেশভাগের এক বছর পর বড়খালার বিয়ে হয়। তখন আমার মায়ের বয়স মাত্র দুই বছর। গত শতকের পাঁচের দশকের শুরুতেই বড়খালা তখনকার প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। থাকতেন মতিঝিল এজিবি কলোনিতে। আমার বড়খালু চাকরি করতেন এজি অফিসে। বড়খালার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। সবাই উচ্চ শিক্ষিত। বড় দুই মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়ো কেমেস্ট্রি ও ফার্মাসিতে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। খালার বড়মেয়ে ঢাকাতেই থাকে। ছোটমেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে। আর ছেলে মঞ্চ ও টেলিভিশনের প্রখ্যাত অভিনেতা জহির উদ্দিন পিয়ার। পরে চলচ্চিত্রও করেছে বেশকিছু। তবে সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চনাটক যারা দর্শকপ্রিয় করে তুলতে সমর্থ হন, সেই রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরিদী, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবর্ণা মুস্তাফা, শিমুল ইউসুফ- এদেরই সতীর্থ ছিলেন আমার এই ভাই জহির উদ্দিন পিয়ার। পরবর্তীতে এই তারকাই বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাপ্তাহিক, ধারাবাহিক এবং মাসিক নাটকগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে বড়খালার পরিবারের সঙ্গে ক্রমশ আমি ঘনিষ্ঠ হই। ছাত্র আন্দোলনে বিপর্যস্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, সাময়িক ছুটি কিংবা নিজের অসুস্থতা- সবকিছুতেই আশ্রয়স্থল বড়খালার বাসা। পিয়ার ভাই ছিলেন অনেকটা ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। কিন্তু আমার সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রীতি, আমাকে তার কাছে নিয়ে যায়। আর ভাবী তো তুলনাহীন। সবার প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য, যত্নে এক অনন্য উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে কয়েকটি বড় বড় অসুস্থতার ভেতরে আমি পড়েছি, তার মধ্যে ‘হাম’ ছিল অন্যতম। সেই দুঃসহ মাত্রাতিরিক্ত জ্বর, কিছুই খেতে না পারা, সেই সময় ভাইয়া ও ভাবী রাত জেগে আমার মাথায় পানি ঢালা, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, খাওয়ানো- সবকিছুই করেছেন নিজের ভাই ও ভাবীর মতো। কথা হচ্ছে, বাবা-মায়ের আমি একমাত্র পুত্র সন্তান। পিয়ার ভাইও তাই। এ জন্যেই কি আমরা এক হয়েছি? বড়খালা তার শেষ জীবনে এসে বলতেন ‘বাপ আমার পিয়ারের কেউ নেই, তুই ওর পাশে থাকিস’। কিন্তু ওই জগতস্রষ্টাই জানেন, কে কার পাশে থাকবে। আজ আমিও তো একা, সম্পূর্ণ নিঃস্ব। আমার পাশে কে আছে? ঘুরেফিরে যাদেরকে দেখি- ওই পিয়ার ভাই এবং ভাবীকেই তো এই রূঢ় বাস্তবতায় একান্ত আপনজন মনে হয়। কোনো স্বার্থপরতায় লেখা নেই আমাদের এই সম্পর্ক। মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত কবরস্থানে বড়খালাকে যখন নামিয়ে দিচ্ছি গাঢ় অন্ধকার মাটির বিছানায়, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল। মনে পড়ছে খালার টেলিফোনে ভেসে আসা কণ্ঠ, আমাকে কতবার বলেছেন, ‘ও বাপ, তুই আয় আমাকে নিয়ে যা। তোর বাসায় যাব’। আমি অসহায়, পারিনি। তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল না কোথাও নিয়ে যাবার। সেই দুঃখবোধ বয়ে বেড়াই নিরন্তন। আজ তিনিও কি জেনে গেছেন, তার ছোট বোন, আমার মা তারই জগতে। ‘এ বিশ্ব লয়ে হে বিরাট শিশু খেলিছ আপন মনে’।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর আমরা তিন বন্ধু মিলে বড়খালার মালীবাগের দোতলা বাসার নিচতলার একটি কামরা নিয়ে থাকতে লাগলাম। তখন থেকে এই সম্পর্ক যেন আরও গাঢ় হলো। ভাবীর যে কোনো সফরসঙ্গী হয়ে উঠলাম আমি। আমারও যে কোনো দাবি/আবদার ভাবী উপেক্ষা করতে পারতো না। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে তো তাদের কাকা বলতে আমাকেই জানে। আমার সন্তানরাও আজ কাকা-কাকী বলতে পিয়ার ভাই ও ভাবীকেই বোঝে। ভাইয়ার মেয়ে পুষ্পার জন্মক্ষণে আমিই তো ছিলাম হাসপাতালে। পুষ্পা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করার পথে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে সে বিবিএ শেষ করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করছে। ছেলে দীপ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ট্রিপল ই’-এর প্রভাষক। এখন সেও সপরিবারে সুইডেনে পিএইচডি করার জন্য।

বলতে হয়, আমার বালক/কিশোর বয়সে সেই সত্তরের দশকের শেষে কিংবা আশির দশকে টেলিভিশনে পিয়ার ভাইয়ের নাটক দেখে আমি নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম বেশি। আর তাই তো নারীবর্জিত নাটক লিখে বন্ধুরা মিলে মঞ্চস্থ করতাম প্রায়শই। টিভিতে দেখা ভাইয়ার ‘সার্কাস দেখুন’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘এখানে নোঙর’, ‘চাঁদ বেনে’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘কালপুরুষ’, ‘সেই এক গায়েন’, ‘শেষ বসন্তের নিশিথ রাত্রি’, ‘বাউণ্ডলের আত্মকাহিনী’, ‘মীথ’, ‘তিনি আসবেন’ আরও অনেক নাটকসহ ধারাবাহিক নাটক ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’ কিংবা ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ নাটকগুলো দর্শকহৃদয়ে আজও দেদীপ্যমান। অথচ বর্তমানে শত শত স্যাটিলাইট চ্যানেলের দৌরাত্মের মাঝে আমাদের বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেসব স্বর্নালী নাটকগুলোর মতো নাটক তো আর হতে দেখি না। পিয়ার ভাইয়েরই পৌঢ় বয়সে নাটক ‘আকাশ ভরা মেঘ’ দেখে জন্ম নিয়েছে আমার কবিতাগ্রন্থ আদর্শলিপি : পুনর্লিখন। সেখানে একজন পুঁজিপতির চরিত্রে জহির উদ্দিন পিয়ারের অভিনয়। তার ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন লিটু আনাম। পিতার অর্থ বৈভব ছেলের ভাল লাগে না। পিতার উপার্জনের ক্ষেত্রটিকে ঘৃণা করতে থাকে পুত্র। ক্রমশ সে বিপথগামী হতে থাকে। পিতা বিষয়টি বুঝতে পেরে ছেলেকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “(হুবহু সংলাপ মনে নেই) আয় আমরা আবার আদর্শলিপি পড়ি। নিজেদের জীবনকে নতুন করে শুরু করি”। অর্থাৎ আদর্শলিপি পাঠের ভেতর দিয়ে এর যথার্থ উপলব্ধি, মূল্যবোধ সৃষ্টি, নীতিবোধ জাগ্রত করার কথা বলা হচ্ছে। আদর্শলিপির যথার্থ শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিশুর ইতিবাচক মানসগঠন তৈরির যে প্রেক্ষাপট তাকে ধরা হয়েছে ‘আকাশ ভরা মেঘ’ নাটকের উক্ত সংলাপের ভেতর। আর এই বিষয়টিকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে আমার তৃতীয় কাব্য আদর্শলিপি : পুনর্লিখন যা ২০০৭ সালে ইমন প্রকাশনী থেকে বের হয়।

ষাটোর্ধ্ব বয়সে ভাইয়া অভিনয়কে বিদায় জানিয়েছেন। এখন ধর্ম পালনেই বেশি ব্যস্ত। ভাবীও আজ শাশুড়ী। এ বাড়িতে বউ হয়ে এসে শ্বশুর-শাশুড়ী এবং তাদের স্বজনদের সেবায় সে নিজেকে উজার করে দিয়েছে নিঃসংকোচে। আজও সে একইরকম ভাবে আন্তরিক। অথচ মাত্র পঞ্চাশ পেরুনো জীবনে নানা ধরনের অসবর্ণ শারীরিক অসুস্থতায় আজ সে অনেকটাই ঘরবন্দি। জীবনের জোয়ারভাটায় কার পথ কোথায় গিয়ে মেশে, কে বলতে পারে? একুশ শতকের এই রুঠাফাটা রাজধানীর ধুলোওড়া মহাসড়কে আমার পথ এসে মিশে গেছে ৩৫/২ মালীবাগ চৌধুরীপাড়ার গলিতে। যেখানে কেটেছে আমার তারুণ্যভরা যৌবনের প্রধমার্ধ। বেজেছিল আমারই বিয়ের সানাই। যাকে অমরত্ব দেন জহির উদ্দিন পিয়ার ও দিলারা জহির, শুধুই আমার বড় ভাই ও ভাবী।