কলেজ রোডের জার্নাল-২৩ ॥ মামুন মুস্তাফা



সেদিন ছিল ২২ এপ্রিল। ২০০২ সাল। ৩৫/২ মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে যে সানাই বেজেছিল তার মধুরেণু সমীপন ঘটে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে এসে। সেই সন্ধ্যায় হাসিখেলার মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে গেল, যার নিবিড় বন্ধন ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সহমর্মিতায় গাঁথা রইলো প্রায় কুড়িটি বছরের যুগল জীবনে এসেও। লোক-ভাষায়- চাপা গায়ের রঙ, শ্যামবর্ণ মুখের আদলে টানা টানা দুই চোখ, সরু দুই ঠোঁটের ব্যঞ্জনা, গাঢ় তনুশ্রীতে যে পৃথিবী হারায়; তার মায়ায় গভীরতা থাকে, ভালবাসা জাগে; তাই বুঝি নিবিড় দাম্পত্য আরও ঘন হয়। পিতা বলেছিলেন, মেয়েটির মুখমণ্ডলে কোনো খুঁত নেই। আমার বড় ভাই (বড় খালার সন্তান) অভিনেতার জহির উদ্দিন পিয়ারের স্ত্রী, ভাবী বলেছিলেন, আমাদের ছেলের তুলনায় মেয়ে অনেক সুন্দর। কিন্তু তার মনের সৌন্দর্য ধীরে ধীরে আরও নিবিড় ভাবে প্রকাশ পেলে অন্য এক আত্মীয় আমার বাবাকে বললেন, আমরা গর্বিত, যে, আমাদের পরিবারে রত্নার মতো বউ আছে। সত্যি কি সে আমাদের সংসারে ‘রত্ন’ হয়ে উঠেছিল?

ধীরে ধীরে সে প্রকাশ উন্মোচিত হলো। পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় দায়িত্ব অনেক। কিন্তু একজন লেখকের উদাসীনতাকে সযত্নে পাশ কাটিয়ে সেই দায়িত্বটুকু কাঁধে তুলে নিয়েছিল মেয়েটি। যখন সে ব্যাংকে চাকরি করতো, তখন সে নিজের ‍উপার্জিত অর্থ থেকে শ্বশুর-শাশুড়িকে পাঠাতো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। উৎসব-পার্বণে তো কথাই নেই। দূরে থেকেও তাঁদের সেবাযত্নের ত্রুটি নিয়ে শঙ্কিত থাকতো। পরবর্তীতে নিজের দুই সন্তানের কারণে চাকরিটা ছেড়ে দিতেও একটুও কুণ্ঠিত হয়নি। ফাতেমা নামের যে মেয়েটি এতদিন আমার পুত্রদ্বয়কে দেখাশোনা করতো, তারও মঙ্গল কামনায় ওকে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। মেয়েটির ভবিষ্যত চিন্তায় ব্যাংকে ফাতেমার নামে ডিপোজিট করা, তাকে পড়ালেখা করানো, সময়ে-অসময়ে ফাতেমার মাকে যথাসাধ্য সাহায্য করা ছিল ওর চরিত্রগুণের অন্তর্গত। ফাতেমা এখন আর আমাদের বাসায় নেই, তথাপি তার সঙ্গে যোগাযোগ আজও রয়ে গেছে। এমনকি, এখনও তার প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আমার স্ত্রী কুণ্ঠিত নন।

আমার মায়ের মৃত্যুর এক বছর পূর্বে তাঁর অসুস্থতায় যশোর হাসপাতালে প্রায় একমাস মাকে নিয়ে রত্না থেকে এসেছে। ঢাকা শহরে তখন আমার বড় ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী, টেস্ট পরীক্ষা সামনে। ছেলেকে স্কুলের কাছে তার এক বন্ধুর বাড়িতে রেখে তার একমাস যশোর হাসপাতালে কাটানো, মাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসা পর্যন্ত তার সেবা- ওর এই আত্মত্যাগের কাছে আমি ঋণী। ঋণী আমার দাম্পত্য খেলাতেও। সংসার-বাজার, ছেলেদের প্রয়োজনীয়তা, সামাজিকতা- সবকিছু থেকে সে আমাকে মুক্তি দিয়েছে। মামুন মুস্তাফার প্রকৃত সত্তা প্রকাশে সহায়ক হয়ে ওঠে ‘রত্না’ নামের এই মেয়েটি। এক সন্ধ্যায় যাকে দেখেছিলাম শ্যামলীর এক ঝলমলে আলোময় ঘরে। আমারই বড়চাচার ছেলের বউয়ের বান্ধবী সে। মা বলতেন, ‘তুমি আমার কবি-ছেলে, তোমার বউ তুমিই দেখে নাও’। মায়ের কথা মতো দেখে নিলাম। তাঁদের জানাতেই বাবা এলেন ঢাকায়। আত্মীয়জনদের আব্বা বললেন, ‘তোমরা এমন কোনো কথা বলবে না, যাতে বিয়ে ভেঙে যায়। ছেলে পছন্দ করেছে, সে যেন বলতে না পারে, আব্বা বিয়েটা দিল না’। সন্তানের প্রতি এই গূঢ় উপলব্ধি থেকে আমিও তো অনেক কিছু শিখেছি বাবা। আজ তারা কেউ-ই নেই। কিন্তু আমার স্ত্রী ‘রত্না’ আজও শ্বশুর-শাশুড়ির কথা গর্বভরে স্মরণ করে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি-ই কি ভুলতে চাই! চাই-ই তো- ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’। অথচ বাবা-মায়ের স্মৃতি সন্তান ভুলতে পারে না কখনো।

আমার বাবা-মায়ের অকস্মাৎ চলে যাওয়ায় প্রথম সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছি তো ওই রত্না নামের মেয়েটির কাছে। আজও সে আমার নির্ভরতার প্রতীক। ঠিক বুঝতে পারি, কৈশোর বয়সের উচ্ছ্বলতা নিয়ে আজও সে দাম্পত্য খেলায় মেতেছে। রন্ধনবিলাসী মন নিত্যনতুন রেসিপি তৈরিতে মগ্ন। খাওয়াতে প্রচুর ভালোবাসে, অথচ রসনাবিলাস নেই মোটে আমার। এই দুঃখ বয়ে নিয়ে আজও সে হেঁসেলে আগুন জ্বালে। কর্মক্ষেত্রেও একজন ব্যাংকার হিশেবে রত্না নজর কেড়েছিল কর্তৃপক্ষের। ফলে চক্ষুশূল হয়ে ওঠে কোনো কোনো সহকর্মীর।

সেই শৈশব থেকেই এই মহানগরে তার জীবনযুদ্ধ- কেউ কান পেতে শুনেছে কী? এখন সে গল্প পেছনে ফেলে বর্তমান তার সামনে এসে দাঁড়ায়। সহকর্মীদের দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে ওঠা, ওর সঙ্গে অসহযোগিতা, অন্যদিকে আমার ছেলেদের দেখে রাখতো যে মেয়েটি, সাত বছরের মায়া কাটিয়ে ফাতেমার চলে যাওয়া- সবকিছু যেন একস্রোতে এসে মিলে গেল। অবশেষে নিজের স্কুল পড়ুয়া দুই ছেলেকে দেখাশোনার জন্যে রত্নাকে ব্যাংকের চাকরিটা ছাড়তে হয়। পাড়া-পড়শী, আত্মীয়স্বজন সবাই বলছে ‘কেন? কেন?’ কিন্তু ওর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের কাছে সন্তানদের ভবিষ্যত, সংসারকে রক্ষাই বড় হয়ে দেখা দেয়। আর এই সিদ্ধান্ত নিতে তাকে এগিয়ে দেয় বর্তমান সময়ে পেশাগত ক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিবেশ।

মানুষে মানুষে ঈর্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যায় নন-কোঅপারেশন মনটকে বিষিয়ে দেয়। ‘পৃথিবীটা বিষের পাত্র যেন’- তখন অসহ্য মনে হয় পার্থিব জীবন, এই মহানগর। ছোট মফস্বলের জীবনে তবু শ্বাস নেয়া যায়। মানুষ শুনতে পায় মানুষের কান্না, আনন্দ, ভাগাভাগি করার ফুরসৎ মেলে। অথচ ওর ছেলেবেলার মহানগর এতো কঠিন ছিল নাতো। যতদূর চোখ যায় খোলা আকাশের বিশালতাকে শরীরে ধারণ করা যেত, বিশুদ্ধ বাতাসে ভেসে আসতো হাওয়া পরীর গান। তবু সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে নতুন জীবন শুরু করতে চায় রত্না। পেরেছেও। ধর্মের প্রতি অনুরাগ, সৃষ্টিকর্তাকে ভয়, ধর্মীয় অনুশাসন তাকে নতুন জীবনের পথ দেখায়। আজ সে ধর্মগ্রন্থ শেখা ও শেখানোর ক্ষেত্রে নিজেকে সমর্পণ করেছে। নিজের ছেলেদেরকে নীতিশিক্ষায় বড় করে তুলছে। আমার এক সাবেক সহকর্মী, বন্ধু, গল্প লেখক সজল বিশ্বাস ওকে দেখে বলেছিলেন, ‘ভাবী হচ্ছেন ধর্মীয় অনুশাসনের ভেতরেই প্রগতিশীলতার প্রতীক’। কথাটার যথার্থতা আছে। ইসলাম যে গোঁড়ামি নয়, অন্ধ নয়; সে যে বিজ্ঞান ও প্রগতিশীলতার বাহক। আমার পিতা এবং স্ত্রী দুজনেই বিষয়টি অনুধাবন করেছেন।

অথচ এই মানুষদের আমি কী দিতে পেরেছি? জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসিতায় ভরা বর্তমান নাগরিক জীবনে অর্থবিত্তহীন এই আমি কোন সুখটুকু আমার স্ত্রীর আঁচলে আমি বেঁধে দিতে পেরেছি? রাজধানী নামের এই মহানগর আসলেই কী মধ্যবিত্তের? ভ্রমণবিলাসিতা নেই, আত্মীয়তা-সামাজিকতা নেই বললেই চলে। ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখি বাড়িভাড়া, প্রতিদিনের আনাজপাতির ঝাঁজে দুর্বিষহ জীবন। আবার অনেক ইচ্ছার মৃত্যু ঘটে শুধু পরিবহন খরচ চিন্তা করেই। তবু একটু জীবিকার সন্ধানে এই মহানগরের জীবন মেনে নিয়ে ধুঁকছে মধ্যবিত্তের সংসার। শূন্যতায় ঘেরা আমার এই ভুবন তবু সে মেখে নিয়েছে সারা দেহে। আমার পিতৃতুল্য জাতীয় অধ্যাপক প্রয়াত আনিসুজ্জামান তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে বলেছিলেন যে, তিনি আমাকে যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু আমি তার সামান্যই কাজে লাগাতে পেরেছি।

আনিসুজ্জামান স্যারের মতো করেই বলতে হয়, আমার স্ত্রীর সংসারের প্রতি আত্মত্যাগের কারণে আমি মামুন মুস্তাফা হয়ে উঠেছি। কিন্তু কতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছি? ওর ভাষায়- আমার কম্পিউটার ওর সতীন। অথচ ওই সতীনের সঙ্গে সহবাসেও মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে। জানি ওর আত্মত্যাগের বিপরীতে আমার ক্লান্তি কাম্য নয়। ওর সম্মানার্থেই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। আমি শুধু ২০১০ সালে প্রকাশিত আমার পঞ্চম কাব্য পিপাসার জলসত্র রত্নাকে উৎসর্গ করে বলেছিলাম- “একান্ত আপন যে জন, বন্ধু তুমি বধূ তুমি”। আর আজ কবিগুরুর ভাষায় বলি- ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ- সুরের বাঁধনে’।