কলেজ রোডের জার্নাল-২৪॥ মামুন মুস্তাফা



স্বল্প আয়ের চাকরি। দুজনের সংসার। তবু স্বস্তি ছিল। একে অপরের কাছে আসার সুখটান ছিল। আর তখনই লকলকিয়ে উঠলো আমার কাব্যজগত। ১৯৯৮-এ প্রথম কবিতাগ্রন্থ সাবিত্রীর জানালা খোলা এবং ২০০১-এ দ্বিতীয় কাব্য কুহকের প্রত্নলিপি প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতি আমার কবিতার বই প্রকাশের ক্ষেত্রে। ২০০২ সালে বিয়ের আগে পর্যন্ত জীবনকে সুস্থিরতা দানে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি। সেসব রেখাপাত করেছে কুহকের প্রত্নলিপি কাব্যে। এরপর পেশাগত ক্ষেত্রে আহামরি কিছু না ঘটলেও, জীবনচাকা গড়িয়ে চলেছে তার স্বভাবজাত ভঙিমায়। তাই দীর্ঘ বিরতি শেষে ২০০৭ ও ২০০৮, পর পর দু’বছরে আমার দুটি কাব্য আদর্শলিপি : পুনর্লিখন এবং এ আলোআঁধার আমার- আলোর মুখ দেখলো।

আদর্শলিপি : পুনর্লিখন কবিতাগ্রন্থের সৃষ্টির প্রয়াস ব্যাখ্যা করেছি ইতিপূর্বে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটক ‘আকাশ ভরা মেঘ’-এ একজন পুঁজিপতি পিতা অবলোকন করেন তার একমাত্র ছেলের বিপথগামিতা। পিতার অর্থবৈভব ছেলের ভাল লাগে না। পিতার উপার্জনের ক্ষেত্রটিকে ঘৃণা করতে থাকে পুত্র। ক্রমশ সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। পিতা বিষয়টি বুঝতে পেরে ছেলেকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। পিতা বলেন, ‘(হুবহু সংলাপ মনে নেই) আয় আমরা আবার আদর্শলিপি পড়ি। নিজেদের জীবনকে নতুন করে শুরু করি’। অর্থাৎ আদর্শলিপি পাঠের ভেতর দিয়ে এর যথার্থ উপলব্ধি, মূল্যবোধ সৃষ্টি, নীতিবোধ জাগ্রত করার কথা বলা হচ্ছে। আদর্শলিপির যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিশুর ইতিবাচক মানসগঠন তৈরির যে প্রেক্ষাপট, তাকে ধরা হয়েছে ‘আকাশ ভরা মেঘ’ নাটকের উক্ত সংলাপের ভেতর দিয়ে। আর এই বিষয়টিকে ধারণ করে গড়ে ওঠে আমার তৃতীয় কাব্য আদর্শলিপি : পুনর্লিখন যা ২০০৭ সালে ইমন প্রকাশনী থেকে বের হয়। আদর্শলিপি : পুনর্লিখন উৎসর্গ করি আমার প্রাণের মানুষ, প্রিয় কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিককে।

অন্যদিকে এ আলোআঁধার আমার- কাব্যের মূল বৈশিষ্ট্য মানুষের পার্থিব ও জৈবিক সংসারবৃত্তের কথকতা। এর কবিতাগুলোর ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ পাবেন পাঠক। কিন্তু এই পার্থিব ও জৈবিক সংসারবৃত্তের ইতিবৃত্ত এবং তার সারবত্তা খুঁজে দেখার প্রয়াস ছিল। এ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় জীবনবোধের নান্দনিকতা ভিন্ন মাত্রিক দ্যোতনা পেয়েছে। বস্তুজগতের যাপিত জীবনের দৃশ্যমান আলো-অন্ধকার ব্যক্তিক জীবনবোধে ঝড় তোলে, তারই কিছু সাক্ষর এ কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বস্তুত পার্থিব ঘরসংসারে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশার বন্ধুর পথে চলতে গিয়ে মানুষের গন্তব্যও কখনো কখনো অস্থির হয়ে ওঠে। তাতে কখনো উপলব্ধি এসে মেশে, কখনো বিভ্রম। সেই প্রাতঃস্বিকতায় জগতসংসারের সব প্রাসঙ্গিক ভাবনাগুলো একসুরে গেঁথে তোলার প্রচেষ্টা ছিল। এই কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলো মানবিক ও মানবিক পরিবেশ থেকে উত্থিত, হৃদয়জাত। কিন্তু এ মনোবীজ ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তা পৃথিবীর সর্বত্র বিরাজমান। সেই সামগ্রিকতাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছি মাত্র। সবথেকে বড় কথা এ কাব্যের কবিতাগুলোতে ইমেজের ব্যবহার সমালোচকদের দৃষ্টি কেড়েছিল। এ আলোআঁধার আমার কাব্যটির উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছিল :

শিহাব সরকার, নাসির আহমেদ, সৈয়দ হায়দার
যাঁদের স্নেহঋণ আমার সাহিত্যবাসের পাথেয়

আমার কবিতাবাসে বাংলাদেশের বিশিষ্ট উক্ত তিন কবির ভূমিকা নেহায়েৎ কম নয়। ২০০২ থেকে ২০০৭- এই সময়পর্বে দেদারছে লিখে চলেছি কবিতা ও কবিতাবিষয়ক গদ্য। আর কবিতা পড়তে গিয়েই উক্ত তিন কবির কবিতায় আলাদা মেজাজ ও কাব্যরীতি খুঁজে পেলাম। বরাবরই আমাদের মিডিয়া ‘তেলো মাথায় তেল’ দিয়ে গেছে। ফলে এঁদেরকে নিয়ে উচ্চবাচ্য খুব একটা দেখা যায় না। শিহাব সরকার-আবিদ আজাদ যুগল কবিনাম আমাদের স্বাধীনতাউত্তরকালে বাংলাদেশের কবিতায় উচ্চারিত হতো তাঁদের কবিতার চমৎকারিত্বের জন্যে। কবিতা নিয়ে গদ্য লিখতে গিয়ে আমিও তা উপেক্ষা করতে পারিনি।

১৯৭২-এ তৎকালীন ‘দৈনিক বাংলা’র সাময়িকীতে ‘সাবিত্রী বোসের রুমাল’ কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে কবি শিহাব সরকার তাঁর কবিপ্রতিভার অমিত সম্ভাবনা জানান দেন। তাঁর সেই প্রথম কবিতার প্রকাশের মুহূর্তেই পাঠক-সমালোচক আবিষ্কার করেন বাংলাদেশের কবিতার এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। শিহাব সরকারের প্রথম দিকের কবিতায় নারী, প্রেম, স্বপ্নবিলাস স্থান করে নিলেও, ধীরে ধীরে তাঁর কবিতা গভীরাশ্রয়ী ভাষাভঙ্গি, বিষয়বৈচিত্র্যে বহুমুখীন এবং ইঙ্গিতময় হয়ে ওঠে। সুতরাং কালপরিক্রমায় কবিতার সচেতন পাঠক বাংলাদেশের কবিতায় খুঁজে পান শিহাব সরকারের মৌলিক কণ্ঠস্বর।

তখন বিভিন্ন দৈনিক ও সাহিত্য ম্যাগাজিনে এ ভাবেই লিখতে থাকি শিহাব সরকারের কবিতা নিয়ে। নজর কাড়ে শিহাব সরকারের। কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিকের কাছ থেকে আমার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে একদিন কল করেন আমাকে। এরপর মোহাম্মদপুরে ইকবাল রোডে তাঁদেরই আরেক বন্ধু কবি সৈয়দ হায়দারের বাসায় শিহাব ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। পরবর্তীতে এই সাক্ষাৎই রূপ নেয় আজন্ম শ্রদ্ধা ও ভালবাসায়। এবং আমার কবিতাও যে তাঁকে ছুঁয়ে যেতে পেরেছে এও আমার অনেক বড় প্রাপ্তি। সবে মাত্র আমার চারটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। তখনই শিহাব ভাই আমার কবিতা নিয়ে দীর্ঘ এক কলাম লিখলেন অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘আমার দেশ’ কবিতার সম্পাদকীয় পাতায় ‘তারুণ্যদীপ্ত কবিতা’ শিরোনামে।

২০০৮ সালের ২৭ মার্চের ওই লেখায় তিনি বলেছিলেন, ‘কবিতার নামে অপ্রয়োজনীয় হৈ-হট্টগোল এবং নগ্ন আত্মপ্রচারের বিভিন্ন কায়দাবাজির আত্মঘাতী পথ ছেড়ে বাংলাদেশের একদল কবিতাগ্রস্ত তরুণ সব দশকে কাব্য চর্চা করে আসছেন। মামুন মুস্তাফাকে এদের অন্যতম পুরোধা কবি হিসেবে আমি মানি নির্দ্বিধায়। …এ যুগের যে কোনো সময়সচেতন এবং সতত সৃজনশীল কবির মতো মামুনের মেজাজ এবং বাকভঙ্গি প্রতীকী। বেশকিছু কবিতায় তিনি বিশুদ্ধ সিম্বলিস্ট এবং অনায়াসে ঢুকে পড়েন পরাবাস্তবতার ভুবনে। …’

আমাকে নিয়ে কবি শিহাব সরকারের এই লেখা প্রকাশের পর প্রয়াত শ্রদ্ধেয় কবি সমুদ্র গুপ্ত আমাকে বলেছিলেন, ‘বুঝেছিস মামুন, শিহাব লিখেছে। তার মানে তোর সম্ভাবনাকে সে দেখতে পেয়েছে। শিহাবের কথাকে আমরা মূল্য দেই। সুতরাং শিহাবের কথার যথার্থতা তোকে প্রমাণ করতে হবে। মনে রাখিস আমার এ কথা’। আজ সমুদ্র দা’ও নেই। কিন্তু তাঁর ওই কথা আজও আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আমাকে নিয়ে শিহাব ভাইয়ের ওই মূল্যায়নের মর্যাদা আমি আদৌ রাখতে পেরেছি কিনা জানি না। তবে আজও শিহাব ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রীতির বন্ধন অটুট রয়ে গেছে। আমার সম্পাদিত ছোটকাগজ লেখমালা’র জন্যে যখনই লেখা চেয়েছি তিনি না করেননি। আমার পেশাগত ক্ষেত্র দৈনিক বাংলাদেশের খবরের জন্য তিনি লেখা দিয়েছেন অবলীলায়। লেখমালা’র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি হয়ে উপস্থিত হয়েছেন আমার প্রতি তাঁর ভালবাসার টানে। কবি শিহাব সরকারের কাছে মামুন মুস্তাফা স্নেহঋণে বাঁধা। অদৃশ্য এই ঋণ কখনো শোধ হবার নয়।

মৃদুভাষী, স্বল্পভাষী, স্পষ্টবাদী, শান্ত স্বভাব ও কোমল হৃদয়ের এই মানুষটি সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তান পূর্বাকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ। অকস্মাৎ সন্তানের এই চিরবিদায় একজন পিতার জন্যে অবর্ণনীয় কষ্টের, যা অপূরণীয়। আমরা আমাদের সন্তানের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারি। আর শিহাব ভাই, আপনার জন্যে কোনো ভাষা জানা নেই, শুধু আমার কফিনকাব্য থেকে উৎসর্গ করি :

জীবন এক নওলকিশোর, থুত্তুরে বুড়ো। কখনো বা মধ্যদিনের জ্বালানি। সন্তাপে সন্তাপে জেগে ওঠে দ্রৌপদীর গান, ক্রোধ আর বিপ্লবের ঝাণ্ডা ওড়ে, অথচ বিদ্রাহ করতে শেখেনি। জীবন জ্যোৎস্নার ভেতরে হাঁটে, ছায়ার দীর্ঘ সারি, নেমে যায় প্রান্তরের হাটে। প্রতারণা নয়, আপন আত্মাকে দীপ্র দহনে খুন করে, ক্রমশ ঢালে মরণের বিষ, জ্যোৎস্নার প্রতিবিম্ব সেই মাটির ঢিবিতে- শ্মশানের ক্বাসিদায় ভৌতিক ছায়া, সে যে জীবনেরই ওপর। …জীবন নেমে যায়, বেঁকে যায়…তখন বায়ুহীন বাঁশির ভেতরে জাতিস্মর কথা কয়…