কলেজ রোডের জার্নাল-২৫ ॥ মামুন মুস্তাফা




বলছিলাম কবি শিহাব সরকার, নাসির আহমেদ ও সৈয়দ হায়দারের সঙ্গে সম্পর্কের কথা। লেখলেখির সূত্র ধরে এই তিন শ্রদ্ধাভাজন কবির সঙ্গে যে স্নেহ আর শ্রদ্ধার বন্ধন তৈরি হয়েছিল তা আজও অম্লান। যদিও নাসির ভাইয়ের সঙ্গে এখন আর সে-ভাবে কথা হয়ে ওঠে না। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকীর্তি আমার মনোযোগ কাড়ে। কবি নাসির আহমেদ যখন দৈনিক জনকণ্ঠের সাহিত্যপাতা দেখতেন, তখন তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি আমার কবিতাকে ভালবেসেই সহৃদয়তার সঙ্গে ছেপেছেন জনকণ্ঠের সাময়িকীতে। অনেক গদ্যও তিনি ছেপেছেন। অনেক সময় আমার লেখার নেতিবাচক সমালোচনাও করেছেন একজন নবীন লেখককে ইতিবাচক অর্থেই গড়ে তুলতে। তাঁর শিক্ষকসুলভ আচরণ আজ আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। গোষ্ঠীপ্রীতির বলয়ের বাইরে আমার মনে হয়, আমাদের দৈনিকের সাহিত্যপাতার সার্থক সাহিত্য সম্পাদক হিশেবে সর্বশেষ নামটি উচ্চারিত হবে কবি নাসির আহমেদের।

একথা মানতে হবে যে, সমসাময়িক বাংলা কবিতাকে আধুনিক বিষয়বস্তু এবং কাব্যভাষার ক্ষেত্রে নিরন্তর নতুনত্বের অন্বেষণের ভেতরে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন কবি নাসির আহমেদ। নাসির ভাই ছন্দ সচেতনতা, বাক-পরিমিতিবোধ এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটান তাঁর কবিতায়। মঙ্গল-চেতনাদীপ্ত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এই কবি বিশ্বকে, মাতৃভূমিকে আর ব্যক্তিমানুষকে বিবর্ণতার ক্রমশ অতলতার হাত থেকে বাঁচাতে সদা প্রস্তুত থাকেন। আর তাই কবি নাসির আহমেদ নাগরিক বিষনখে ক্ষতবিক্ষত জনমানুষের জন্যে মানবিক ও মাননিক মনোচিকীর্ষার কবিতা লেখেন। এক্ষেত্রে তার ‘বৃক্ষমঙ্গল’ কাব্যের কথা বলতে হয়। এই কাব্যের অন্তর্গত কবিতাগুলো পরিবেশ ও প্রতিবেশ চেতনায় জারিত এক নতুন বলয়ের মুখোমুখি করে আমাদের। স্বদেশ, সমাজ ও ইতিহাস চেতনায় ভাস্বর এর কবিতাগুলো। অথচ আমার দুর্ভাগ্য নাসির ভাইয়ের ক্রমশ পদায়ন তাঁর নিকট থেকে আমাকে দূরবর্তী করে তোলে। সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিউজ সেকশনের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আছেন। এ খবরে মনটা বিষাদে ভরে যায়। প্রার্থনা করি তার দ্রুত সুস্থতার। নাসির ভাই ফিরে আসুন আমাদের মাঝে, কবিতার জন্যেই তাকে আরোগ্য লাভ করতে হবে। এই বিশ্বাস রাখি।

কিন্তু কবি সৈয়দ হায়দার? শাদা মনের নির্লোভ, নিরঅহংকার মানুষটি আমাকে একুট বেশিই প্রীতির বন্ধনে বেঁধে ফেলেছিলেন। হতে পারে, তিনি আমার পিতার ছাত্র ছিলেন বলে শিক্ষকের সন্তানকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। আমৃত্যু তিনি আমার কবিতার মুগ্ধ পাঠক হয়ে থেকেছেন। এটি ছিল আমার জন্যে এক পরম পাওয়া। অথচ কাউকে কিছু না জানিয়ে অকস্মাৎ তার প্রস্থান আমি মেনে নিতে পারিনি। এমন তো হবার কথা ছিল না। বহুবার তাঁর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের বাসায় আমি গিয়েছি। আবুবকর সিদ্দিক, শিহাব সরকার আর আমি বেশ কয়েকবার তাঁর বাসায় অড্ডা জমিয়েছি। সেসব আজ স্মৃতি।

মৃত্যুই সত্য। তবে এভাবে কেন? কাউকে কিছু না জানিয়ে, না জানতে দিয়ে আপনি চলে যাবেন? অথচ আপনি ভাল করেই জানতেন আপনার স্নেহ, মমতা আমার আরও অনেক দিন প্রয়োজন ছিল।

২০০১ সালে আমাদের প্রথম পরিচয়। ২০০১-এ পুঠিয়া সাহিত্য পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে কবি সৈয়দ হায়দার, আবুবকর সিদ্দিক, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, প্রাবন্ধিক রফিকুল্লাহ খান এবং আমি ঢাকা থেকে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম রাজশাহীর পুঠিয়ায়। যাত্রাপথে পাশাপাশি আসনে বসে নানাবিধ আলাপচারিতায় আমাদের সম্পর্কটিকে বেঁধেছিলাম হৃদয়ের বন্ধনে। সেই থেকে শুরু। কবির মোহাম্মদপুরের বাসায় কতবার গিয়েছি আমি। অথচ তিনি একটুও জানতে দেননি যে তিনি দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত। পাছে তাঁর স্বজনেরা, এই আমরা তাঁকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করি। হাসপাতালের রোগশয্যা থেকেও তো তিনি আমাদের জানতে দেননি। জানি না কী তাঁর এত অভিমান? যে কারণে এত নীরবতা?

আজ পরিচিত জনরা বলেন, তিনি এত প্রাণখোলা মানুষ, এত কৌতুকপ্রিয় মানুষ, এত সহজ ও সাধারণ মানুষ আমাদের মাঝ থেকে এভাবে চলে যাবে আমরা বুঝতেই পারিনি। কত বড় কবি ছিলেন সৈয়দ হায়দার? সে প্রশ্ন পেছনে ফেলে আজ একটি কথাই গুঞ্জরিত, এক মহান মনের মানুষ নিভৃতে চলে গেছেন আমাদের সাহিত্যের ভুবন থেকে। কবি হিসেবে এটাই তো তাঁর সব থেকে বড় পুরস্কার।

কবি সৈয়দ হায়দার একুশের বইমেলায় বাংলা একাডেমীতে আসতেন না খুব একটা। তাঁকে ডেকেও আনা যেত না। অথচ সেই তিনি কেবল ভালবাসার টানে আমার তৃতীয় কবিতার বই আদর্শলিপি : পুনর্লিখন-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে চলে এসেছিলেন সবার আগে। সেবারই প্রথম আমার সহধর্মিনীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ওই একটিবেলার পরিচয়ে আমার স্ত্রীও কবির ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন, ধন্য হয়েছেন। আমরা যখন কবির মৃত্যুসংবাদ জানতে পারি, তখন তিনি সকল মায়া ছিন্ন করে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরে শায়িত। আমার ভেতরে ভাঙচূর হচ্ছে, বুকে ব্যথা অনুভব করছি, আর আমার স্ত্রী আঁচলে মুখ ঢাকছেন। একেই বুঝি নিয়তি বলে?

২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে পুঠিয়া সাহিত্য পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলাম শ্রদ্ধেয় রফিকউল্লাহ খান, কবি সৈয়দ হায়দার ও আমি। ঐ অনুষ্ঠানে আমি বিশ্ব কবিতা, বাংলা কবিতা ও বাংলাদেশের কবিতা এবং সৎ ও মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি বিষয়ে যে বক্তব্য রেখেছিলাম, তার ভূয়ষী প্রশংসা প্রায়ই করতেন তিনি। এমনকি যত্রতত্র যে কোনো সাহিত্যের আড্ডায় ঐ প্রসঙ্গের তিনি অবতারণা করতেন অকুণ্ঠ চিত্তে। এই সহৃদয়বান মানুষটির প্রয়াণে আমি আমার সাহিত্যাবাসের একজন শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারিয়েছি।

এক সময় আমার কর্মস্থল ছিল কবি সৈয়দ হায়দারের বাসার কাছে মোহাম্মদপুরে। জেলে সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা কতকগুলো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সচিবালয় কোস্টাল ফিশারফোক কমিউনিটি নেটওয়ার্কে (কফকন) কাজ করতাম। আমার চতুর্থ কবিতার বই এ আলোআঁধার আমার (২০০৮) শিহাব সরকার, নাসির আহমেদের সঙ্গে কবিকেও উৎসর্গ করি, সেই বইটি তাঁকে দিতে আমার অফিস শেষে তাঁর বাসায় যাই। বইটি হাতে নিয়ে কবির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমাকে রীতিমত লজ্জিত ও বিব্রত করে তোলে। আমি ভাবতে থাকি আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষের বিনয় লোক দেখানো। কিন্তু কবি সৈয়দ হায়দার? মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার কখনো লোক দেখানো ছিল না। আর তাই তাঁকে ‘মাটি ও মানুষের’ কবি বললে বোধহয় বেশি বলা হবে না।

আমার কোনো লেখা যখনই তিনি কাগজে পড়তেন, খুব উৎফুল্ল হতেন। ফোনের আলাপচারিতায় তিনি প্রায়ই বলতেন ‘খুব তো লিখছো কবি’। উত্তরে যদি বলতাম ‘আপনাদের মতো কিছু হয় না তো’। কবি বলতেন ‘আরে আমি আবার লেখক নাকি। তোমরা হলে প্রকৃত লেখক। আমি তো তোমাদের সঙ্গে তাল দিয়ে যাচ্ছি মাত্র, তোমাদের অনেক পড়াশোনা’। আমি জানি এটিও ছিল একজন খাঁটি মানুষের সহৃদয়তা। কবি সৈয়দ হায়দার বাংলাদেশ বেতারে সাপ্তাহিক একটি সাহিত্য অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। যেখানে আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলোর সাপ্তাহিক সাহিত্যপাতার লেখাগুলো নিয়ে একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়া চলতো। আমার কোনো লেখা প্রকাশ হলেই কবি তা নিয়ে ঐ অনুষ্ঠানে আলোচনা করতেন। তিনি আমাকে জানাতেনও সে কথা। একজন লেখক হিশেবে বলবো, কবি সৈয়দ হায়দার শুধু একজন বড় মনের মানুষই ছিলেন না, আমার একজন ভক্ত-অনুরাগী পাঠকও ছিলেন।

তবে এখন আমার নিজের ভেতরে একটি অপরাধ বোধ কাজ করে। বরাবরই অনুশোচনায় ভুগি যে, কবির জীবদ্দশায় অন্তত তাঁর তিনটি বই নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল। নেহাই, গাছপালা ও আগদুয়ারী কাব্যতিনটি আলোচনার ইচ্ছে ছিল অনেক। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কসূত্র নির্ণয় করতে গিয়ে সৈয়দ হায়দার মানবমনের ব্যক্তিচরিতার্থতা উন্মোচন করেছেন নেহাই কবিতাগ্রন্থে। আর গাছপালা’য় এসে দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মনুষ্যজগতের শুশ্রুষার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে আগদুয়ারী কাব্যটিতে ব্যক্তিমানুষের মনোজলোকে যাপিত জীবনের চাওয়া-পাওয়ার চরিতার্থ-অচিতার্থতা দানা বাঁধতে দেখি। এ হলো মোটা দাগে এই তিনটি কাব্যের সারনির্যাস। কিন্তু তাঁর প্রস্থানে এ নিয়ে আমি আর কোনো কথা বলবো না। কবি আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনি যা দেখতে পারবেন না, তা লিখে কী লাভ?

আপনার সমসাময়িক কত কবি-লেখক বই পাঠিয়ে, ফোন দিয়ে তাঁদের সম্পর্কে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কাউকে কাউকে নিয়ে লিখেছি, আবার বিবিধ কারণে অনেককে নিয়ে লেখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আপনি নিজের সম্পর্কে এতটাই নিরুত্তাপ ও নিরুৎসাহী ছিলেন যে, কখনো মুখ ফুটে কাউকে এক কলম লিখতে অনুরোধ করেননি। সে জন্যে কী আমিও নিশ্চুপ ছিলাম? আমার এই ক্ষমাহীন অপরাধ আমি নিজেই ক্ষমা করতে পারছি না যেন।

‘আমি বারবার প্রেমকে একঘ’রে করতে চেয়েছি/কিন্তু প্রেম জনপ্রিয় নেতার মতো মালা পরতে অভ্যস্ত/এখন প্রেমকে বিশ্বাস হয় না। …একার প্রেমের দিন শেষ/প্রেমের কাছে মন গচ্ছিত রাখা যায় না’ (গদ্য প্রেম/নেহাই)। তথাকথিত আধুনিক পৃথিবীর ‘গদ্য প্রেম’ দেখে আপনি যেমন হতচকিত, যার কাছে নিজের মনটাকেও গচ্ছিত রাখা সম্ভব হয়নি। ঠিক তেমনি আপনার প্রস্থানে আমিও আর প্রেম যেন খুঁজে পাই না। আপনার সমুদ্রের মতো বিশাল মনের কাছে আমার ক্ষুদ্র প্রেম বাঁধা পরেছিল। আপনার ঐ বিরাট মনের কাছে আমার মতন আরও কতজন বাঁধা?

শুধু এটুকু বলতে পারি, এত মহান, উদার মনের মানুষ ও কবি সৈয়দ হায়দার এখন নেই। এ সত্য এই মনও মেনে নিতে পারে না যেন। এ কথা ভাবতেই আমি ম্রিয়মান হয়ে যাই। এই নিরঅহংকার মানুষটি সকল প্রকার লোভ-লালসার উর্ধ্বে থেকে সারাজীবন সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। আর তাঁর গাছপালা আজও আমাদের নিরাময় করে তোলে। বিশ্ব-প্রকৃতির বর্তমান তালমাতাল অবস্থার ভিতরে তাঁর ঐ কাব্য বিপর্যস্ত সামাজিক, প্রাকৃতিক, মানবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশেও এই জগত-মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে যাবে আরও কিছুকাল।