কলেজ রোডের জার্নাল-২৬ ॥ মামুন মুস্তাফা




আজীবন আমি অন্তর্মুখীন, ঘরকুনো মানুষ। হতে পারে সেই ছেলেবেলা থেকে বাবা-মায়ের অনুশাসন ছিল সন্ধ্যার আগেই বাসায় ঢুকতে হবে, ওই তাগিদ আজও রয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও সন্ধ্যার আগে বাসায় ঢুকতে হয়েছে আমাকে। ফলে অফিস-বাসা, বাসা-অফিস এবং দারাপুত্রপরিবার ও বইপাঠের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছি আজও। বন্ধু-আড্ডা, সাহিত্য-আড্ডা কখনোই হয়ে ওঠেনি সে-রকম ভাবে। তাই আজও অনেকে কবি মামুন মুস্তাফার নাম জানলেও চাক্ষুষ তাকে চেনেন না। এমনও সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি। আবার অনেক প্রথিতযশা কবি-লেখকদের সঙ্গে আজও আমার সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনি। দু’একবার দেখা হলেও নিবিড় পরিচয় ঘটেনি। কেননা আমার ভেতরে একটি দ্বিধা কাজ করে, তিনি যদি বিরক্ত হন, বিব্রত বোধ করেন। এইসব সাতপাঁচ ভেবে আমি আজও আনেকের কাছেই অচেনা-অজানা। শুধু নিজের সাহিত্যচর্চা, পঠন-পাঠনে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছি।

তবে এখান থেকে অনেকটাই আমাকে টেনে বের করেছেন কবিবন্ধু ওবায়েদ আকাশ। তার সঙ্গেও পরিচয় পরমপ্রিয় ব্যক্তিত্ব কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিকের সৌজন্যে। তারও আগে লোক-সম্পাদক অনিকেত শামীমের শাহবাগের আজিজ মার্কেটের কার্যালয়ে একদিন দরজায় ঢুঁ দিলেন ওবায়েদ আকাশ। অনিকেত শামীমের সঙ্গে দু’চারটা হাস্যরসমূলক কথা বলে বিদায় নিলেন। তখন শামীম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, একে চেনেন। স্বভাবতই উত্তর ছিল ‘না’। সেই প্রথম অনিকেত শামীম আমায় চেনালেন ওবায়েদ আকাশকে।

যা হোক, ওবায়েদ ‘শালুক’ নামে একটি ছোটকাগজ করে এবং বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কাগজ দৈনিক সংবাদের সাহিত্যপাতা দেখছে তা জানতাম। কিন্তু নিজ থেকে পরিচয় করে নেওয়াটা স্বভাববিরুদ্ধ বলেই পরিচয় হয়নি। অথচ প্রথম সাক্ষাতের পরেই ওবায়েদ আমাকে কাছে টেনে নিলেন। নিজের করে নেওয়ার এই সহজতা ওবায়েদের অন্যতম চারিত্রিক গুণ। আমি তাকে সমাদর করি। সবচেয়ে বড় কথা, ওবায়েদের সাহিত্যপ্রীতি, একনিষ্ঠতা এবং এক্ষেত্রে উদ্দামতা তাকে আজ বিশ্ব পরিসরে পরিচিতি এনে দিয়েছে। এটা বন্ধু হিশেবে আমার গর্বের।

গত শতকের নয়ের দশকের কবি হিশেবে আমরা দুজনেই পরিচিতি পেলেও, ওবায়েদ আকাশ সেই সময়ে তার সংবাদের সাহিত্যপাতায় এবং তার সম্পাদিত ছোটকাগজ শালুকের প্রায় প্রতিটি সংখ্যায় আমার গদ্য ও কবিতা ছাপিয়ে আমাকে জনসমক্ষে বের করে আনেন। ওই সময়টাতে প্রায়ই তার সঙ্গে শাহবাগের মোড়ে, আজিজ মার্কেটে আমার আড্ডা চলতো। আমার সময়ের অনেক কবি লেখকদের সঙ্গে ওবায়েদের মাধ্যমেই পরিচয় হয়। যাদের মধ্যে সরকার আমিন, মুজিব ইরম, কুমার চক্রবর্তী, কবির হুমায়ুন, শাহনাজ মুন্নী, সাদ কামালীও রয়েছেন। বড় কথা এই, আমার সাহিত্যবাসে বন্ধু হিশেবে ওবায়েদই প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীতে আমাদের এই বন্ধুত্ব পারিবারিক বন্ধুত্বে রূপ নেয়। ও যেমন আমার বাসায় এসেছে, তেমনি আমিও ওর বাসায় বহুবার পাত পেতেছি। রাজবাড়িতে ওবায়েদ যখন বিয়ে করে, তখন সে আমাকে ফোন দিয়ে সুসংবাদটি জানিয়ে বলে, ভাবীকে বলো। তারপর ঢাকায় বউ নিয়ে এলে আমরা ওর বাসায় গেলাম শুভেচ্ছা জানাতে। যদিও আমার তুলনায় ওবায়েদ আমার বাসায় এসেছে খুব কম। সে আক্ষেপ আমার স্ত্রী আজও ওবায়েদের সঙ্গে দেখা হলে বলে।

বন্ধু ওবায়েদের সৌজন্যেই আমার প্রথম পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি সফর। আমরা চার জন- ওবায়েদ আকাশ, মনিরুজ্জামান মিন্টু, সোহেল মাজহার এবং আমি কবি গৌতম গুহ রায়ের আমন্ত্রণে তার সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘দ্যোতনা’র অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ২০১১ সালের আগস্টে জলপাইগুড়ি যাই। সে-সময় শুধু ‘দ্যোতনা’ নয়, আমরা কোচবিহারে সঞ্জয় সাহার ‘তিতির’ লিটল ম্যাগের অনুষ্ঠানেও অতিথি হয়েছিলাম। ওই সময় আমার চার জন বেশ ঘোরাঘুরিও করি। যদিও বর্ষা ছিল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে বন্যাও দেখা দিল। ওদের ট্রেন সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেল। তবু আমরা কোচবিহার দিয়ে ভুটান সীমান্তে ফুন্টসিলংয়ে গেলাম। শিলিগুড়িতে কাটালাম কয়েকদিন। তারপর আমি আর সোহেল মাজহার চলে গেলাম দার্জিলিং। বর্ষার দার্জিলিং আমাকে অভিভূত করে। বর্ষার হিম শীতল আবহাওয়া সেখানে শীতের আমেজ তৈরি করে। পথের পাশে পাশে কিশোরী-তরুণীরা স্ট্রীট ফুড নিয়ে বসেছে। সে খাদ্যও ছিল মজাদার। আমরা তেনজং শেরপার মনুমেন্ট ও যাদুঘর, বৌদ্ধ প্যাগোডা, চা বাগান ইত্যাদি দেখে তবেই শিলিগুড়িতে ফিরে আসি। এখানে থাকা ও আমাদের দেখভালের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ‘দ্যোতনা’ সম্পাদক, কবি গৌতম গুহ রায়।

মজার বিষয়, শিলিগুড়িতে কবি মনিরুজ্জামান মিন্টুর পাসপোর্ট হারিয়ে গেল। এখন ফিরবো কি করে? ঢাকায় কাস্টমস-এ ওবায়েদ আকাশের পরিচিত একজনকে ফোন দেয়া হলো। ওদিকে গৌতম দা তার পরিচিতদের বিষয়টি অবহিত করে। এ ভাবেই চ্যাংড়াবান্ধা সীমানা কিছু অর্থের বিনিময়ে আমরা পার হলাম। চেকিংয়ে মিন্টুর ল্যাগেজ আমরাই বহন করলাম। মিন্টু রায় বাহাদুরের মতো সসম্মানে সীমানা পেরিয়ে এলো। এ এক অভিনব অভিজ্ঞতা। আমার সেই প্রথম পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণে বড় আবিষ্কার তিন পরমপ্রিয় বন্ধু, ভাই- গৌতম গুহ রায়, শৌভিক দে সরকার ও মারুফ হোসেন। সে প্রসঙ্গে পরে বলা যাবে।

শুধু বলতে চাই, বন্ধু ওবায়েদ আকাশ পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যাঙ্গনে কবি মামুন মুস্তাফার নামটিও প্রচার করে এলেন। বন্ধুর হাত ধরে ওপার বাংলায় মামুন মুস্তাফা দাঁড়িয়েছে। নতুবা আমার ঘরকুনো স্বভাব ওপারে নাম লেখাতো হয়তো, কিন্তু অনেক পরে। ওবায়েদ আকাশ কত বড় কবি? এ প্রশ্ন ব্যতিরেকে বলবো, ওবায়েদ আমার বন্ধু। তার কবিতা প্রসঙ্গে বলবো, নব্বই দশকের কবিরা আধুনিক উত্তর সময়ের কবিতা নির্মাণে এগিয়ে আসলেন। এ সময়ের কবিরা বাংলাদেশের কবিতার প্রকার-প্রকরণে চালালেন প্রবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরা চাইলেন বাংলা কবিতায় নতুনত্ব আনতে। যে কজন কবির কবিতায় দেখা গেল নতুন কণ্ঠস্বর, নতুন প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য এবং চিন্তার স্বাতন্ত্রিকতা, তাঁদেরই একজন কবি ওবায়েদ আকাশ। পর্যায়ক্রমে তিনি তাঁর উত্তরোত্তর কাব্যযাত্রায় নিরলস ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন আধুনিক উত্তর সময়ের কবিতা নির্মাণে।

ওবায়েদ আকাশের কবিতায় এই বাংলার জলহাওয়া, মাটি-গন্ধ-ফুল, প্রকৃতির এক ছায়াঘন পরিবেশের দেখা মেলে। অথচ সেই সহজ ও সরল বাংলার শ্যামলিমার ভেতরেই প্রবল হয়ে ওঠে আধুনিক যান্ত্রিক সমাজ ও মানুষের সংকটময় যাপিত জীবন। সুতরাং নির্জলা সত্য হয়ে ধরা দেয় আবহমান সবুজ বাংলার মাটিগন্ধময় নিসর্গ বর্ণনার মধ্য দিয়ে আধুনিকোত্তর মানুষের বিচিত্র ও জটিলতম মানস সাম্রাজ্য। ওবায়েদ আকাশের কবিতা পড়তে পড়তে পজেটিভ-নেগেটিভ- দু’ধারারই অ্যাটিচিউডের মুখোমুখি হতে হয়। বোঝাপড়া করে নিতে হয় অন্তর্লীন আতঙ্ককর সত্যের দৃশ্যময়তার সঙ্গে। তবে কলা আর কৈবল্য নিয়ে অহেতুক কিচ্ছা করেননি কবি। কিংবা উপমাই কবিতা, তা ভেবে কবিতার ঘরগেরস্থালি অলঙ্কারে জবরজং করেননি তিনি। বরং ওবায়েদ আরো দূর অগ্রসর হয়ে কবিতার শরীরে ইন্দ্রিয়-অনুভূতিকে জাগ্রত করেছেন। সর্বোপরি চিন্তনের বহুমাত্রিকতা, ভাষার কারুকাজ এবং নিজস্ব শৈলীর অন্তর্জালে যে কবিতাগুলো তিনি নির্মাণ করেন, সেগুলো কবির নিরন্তর চর্চা ও অনুধ্যানের পরিচয় বহন করে।

আমার সৌভাগ্য যে, ২০১৮ সালে প্রকাশিত আমার দশম কবিতাগ্রন্থ ‘কফিনকাব্য’ বন্ধু ওবায়েদকে উৎসর্গ করতে পেরেছি। বন্ধু ওবায়েদ আকাশ আজ ও আগামীর কবি হিশেবে আদৃত হোক, এটাই কামনা।