কলেজ রোডের জার্নাল-২৭ ॥ মামুন মুস্তাফা




২০১১-এর আগস্ট। কবি হিশেবে প্রথম সীমানা পেরুনো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের উত্তরের জেলা জলপাইগুড়ির জেলা শহর। বন্ধু, কবি ওবায়েদ আকাশের হাত ধরেই সেখানে দাঁড়িয়েছি। তারপর কেটে গেছে দশটি বছর। অবশ্য এর অনেক আগেই সমীরণ মজুমদারের ‘অমৃতলোক’ এবং এন জুলফিকার সম্পাদিত ‘দীপন’-এ আমার কবিতা প্রকাশ পায়। কিন্তু বৃহদার্থে কবি মামুন মুস্তাফার পরদেশে আত্মপ্রকাশ ২০১১ সনে।

মূলত জলপাইগুড়ি থেকে প্রকাশিত গৌতম গুহ রায়ের ‘দ্যোতনা’কে কেন্দ্র করে সেখানে গমন। এরপর ইতিহাস। সে ইতিহাস ভাই, বন্ধু, আত্মার আত্মীয়-প্রীতির বন্ধন। জলপাইগুড়ির ডুয়ার্স, আলিপুরদুয়ারের আঁকবাঁকা বনপথ পেরুনো, গরুমারা উদ্যান, পাহাড়ি ঝরনা, চা বাগান, মুণ্ডা রমণীর জীবনযুদ্ধ- সবকিছুর সাক্ষী করে তুলেছে গৌতম গুহ রায়, শৌভিক দে সরকার। একটি অমোঘ নিয়তি বেঁধে দিল জীবন ওই দুটো মানবের সঙ্গে। আরও একজন মারুফ হোসেন।

কবি শৌভিক দে সরকার, অনুজ বন্ধু, প্রিয় সখা। একজন সুদর্শন, ইংরেজিতে ‘সফিস্টিকেটেড পারসন’। ও থাকে আলিপুরদুয়ারে। আলিপুরদুয়ার মমতা ব্যানার্জির কল্যাণে এখন পশ্চিমবঙ্গের স্বতন্ত্র জেলা। আগে জলপাইগুড়ির অন্তর্গত ছিল। শৌভিকের বাড়ি আলিপুরদুয়ারে আমি অতিথি হয়েছি একরাত। ওর বাবা-মার স্নেহ, বউয়ের অতিথিপরায়নতা ভুলি কি করে। আসবার সময় ওর বউ বলেছিল, ‘দাদা, তুমি কিন্তু আবার এসো’। সেই প্রীতির কণ্ঠ আজও স্মরণ করি। যাব নিশ্চয়ই করোনামুক্ত একটি দিনে আমাদের মধুময় কবিতার জলসাঘরে।

শৌভিক নব্বইয়ের দশকেরই কবি। আমার সহযাত্রী। শৌভিকের কবিতায় ঘোরলাগা যাদুমন্ত্র আছে যা আমাদের মনোজগতের ডালপালায় আলোড়ন তোলে। সেই যাদুগ্রস্ততা না উত্তরাধুনিক না পরাবাস্তব- যেন এ দুয়ের মিশেলে ভুবনবিশ্বের মোহাচ্ছন্ন ঘোর টেনে আনে মানবসত্তাকে। আর এখন এসব ছাড়িয়ে একজন আন্তর্জাতিক মানের অনুবাদক হয়ে উঠেছে কবি শৌভিক দে সরকার। তার সাদাত হাসান মান্টোর ‘শ্যাম চাচাকে লেখা চিঠি’র অনুবাদের সঙ্গে আমিও হয়ে উঠেছি মুখবন্ধের বিষয়। এর অনুবাদ প্রসঙ্গে নানা কথা হয়েছে আমাদের মধ্যে। তারই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সে মুখবন্ধ লিখতে গিয়ে। এ যে আমার জন্যে পরম পাওয়া। বন্ধুর এ ভালোবাসা আমি ধারণ করি অকুণ্ঠচিত্তে। আমার এ বন্ধু এখন একের পর এক অনুবাদ করে চলেছে- খুলিও কোর্তাসারের কবিতা, রবের্তো বোলানিওর কবিতা, রুদ্রামূর্তি চেরানের কবিতাসহ স্পেনের গ্রামীণ মহিলাদের ওপর নির্মিত ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার একটি নাটক ‘বেরনার্দা আলবার বাড়ি’, আরও অনেক কিছু।

বাংলা ভাষায় অনুবাদ সাহিত্য বেশ পিছিয়ে আছে বলে প্রায়শই শোনা যায়। বিশেষত বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে তো বটেই। সেখানে ওপারে আমার বন্ধু শৌভিকের এমন নিরলস অনুবাদকর্ম আমাকে গর্বের সুউচ্চ মিনারে দাঁড় করায়। ঢাকাতে শৌভিক আমার বাসায় একবারই এসেছিল। ২০১৯-এর নভেম্বরে। বন্ধু, কবি ওবায়েদ আকাশের ছোটকাগজ শালুকের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে। শালুক তাকে সম্মানিত করেছিল। ওই সময় শৌভিক কয়েকটা দিন আমার ছোট্ট কুটিরে বন্ধুবাৎসল্যে উৎসবে মেতেছিল। আমরা স্মরণ করি আমাদের প্রীতির বন্ধন। যে বন্ধন গাঢ় হলো ‘ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র’ কবিতাগ্রন্থের মধ্য দিয়ে।

‘ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র’ আমাদের দুজনের যৌথ কাব্য। যা আমাদেরই অনুজ কবি অরুনাভ রাহারায় ২০১৭ সালে প্রকাশ করে তাঁর উত্তর শিলালিপি থেকে। এই তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কবি অরুনাভও ঢাকায় আমার বাসায় এসেছে। ওর বাড়িও বন্ধু শৌভিকের আলিপুরদুয়ারে। কাজ করে কলকাতায়। লেখালেখির সঙ্গে একটি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতায় আমি ওর আতিথেয়তা গ্রহণ করেছি। যা হোক, আমাদের পূর্বসূরি বাংলাদেশের কবি আবুবকর সিদ্দিক ও পশ্চিমবঙ্গের কবি সদ্য প্রয়াত অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁদের বন্ধুত্বকে দৃঢ় ভিত্তি দিতে কলকাতার দে’জ পাবলিশিং থেকে ১৯৯১ সালে প্রকাশ করেছিলেন কাব্য ‘নিজস্ব এই মাতৃভাষায়’। অগ্রজদের এই চির অম্লান বন্ধুত্ব আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। আমরা এগিয়ে যাই তেমনি একটি কার্যসিদ্ধির জন্য। আমাদের বন্ধুত্বকে স্বীকার করে বিনি সুতোর মালায় গেঁথে দিয়েছেন ওই অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। ‘ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র’-এর মুখবন্ধ তিনি লিখেছেন বিনা বাক্য ব্যয়ে অনুজদের এই প্রীতির বন্ধনকে স্বীকৃতি দিয়েই। সেখানে তিনি বলেছেন, “দুই কবিবন্ধুর দুয়েকটি প্রকীর্ণ উচ্চারণ থেকে এখানে যে কোলাজ আভাসিত হলো, তা শুধু এঁদের গূঢ়ার্থবাহী কবিতার সমাদরের উদ্দেশে সাদর আমন্ত্রণ। মামুন মুস্তাফা ও শৌভিক দে সরকার প্রকৃত প্রস্তাবে, লিখে চলেছেন ভবিষ্যতের কবিতা যাকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্যে আমাদের নিবিড় অভিনিবেশে প্রস্তুত হতে হবে যে। দুজনকে আমি নন্দিত করি’।

আমাদের কবিতা পাহাড়চূড়া স্পর্শের সাহস রেখেছে বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর এই ভাষ্যের কারণে। ‘জাতকের চিঠি’ আর ‘ডুয়ার্স মনোলগ’ নিয়ে গড়া ‘ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র’ কাব্যটি আমাদের বন্ধনকে যুগ যুগ ধরে জিইয়ে রাখবে। যুগ-যুগান্তরে ‘বন্ধু রহো রহো সাথে’।

এর অপর প্রান্তে কলকাতার অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার মারুফ হোসেন কি করে সখা হয়? প্রশ্নই বটে। কিন্তু সে তো সাহিত্যেরই সমঝদার নিঃসন্দেহে। সেই ২০১১ সাল। জলপাইগুড়িতে গৌতম গুহ রায়ের ‘দ্যোতনা’র অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। বেশ কয়েকটা দিন আমাদের সঙ্গে রাতযাপন, দিবাভিসার, গল্পগাথায় মন কাড়ানিয়া সুজন। গৌতম বা শৌভিকের মতো তাঁর সঙ্গে আমার খুব একটা দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। তবু মনের অজান্তে কীভাবে সে যেন ঠাঁই করে নেয়। গৌতম, শৌভিক কিংবা ওবায়েদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মারুফের প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসেই। কদাচিৎ কথা হয় তাঁর সঙ্গে ওয়াটসঅ্যাপে।

মারুফ শান্ত স্বভাবের, ধীর-স্থির। অথচ চৌকস, বিদগ্ধ সাহিত্যজন। বহুবার সে বাংলাদেশে এসেছে। বলা যায় সময়-সুযোগ হলেই পূর্ববঙ্গে পা রাখে সে। বিশেষত কবি ওবায়েদ আকাশ ও মনিরুজ্জামান মিন্টুর প্রগাঢ় সান্নিধ্য তাকে টেনে আনে বাংলাদেশে। আমার প্রতিদিনের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়-কর্ম মারুফকে সময় দিতে পারে না খুব একটা। ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হই তখন। কদাচিৎ ছুটে যাওয়া শাহবাগে, আর সেলফোনে ওর কণ্ঠসুধা নিয়ে ওর সান্নিধ্য আমাকে শান্ত রাখে।

তবে ২০১৯-এর নভেম্বরে বন্ধু ওবায়েদের ‘শালুক’ ছোটকাগজের কুড়ি বছর পূর্তিতে মারুফ এলে, তখন ওকে আমার বাসায় একবার আমন্ত্রণ জানাতে পেরেছি। শালুকের ওই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আমাদের বন্ধুত্ব উদযাপন করা সম্ভব হয়েছিল কয়েকটা দিন। ও বছরেরই ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা বইমেলায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য ঘটেছিল। তখন কাছ থেকে দেখেছি কলকাতার স্বনামখ্যাত প্রকাশনী বন্ধু মারুফের ‘অভিযান’-এর জৌলুস। তাকে কেন্দ্র করে তরুণ কবি-লেখকদের প্রসারিত আড্ডা। ভালো লাগে অভিযানের বেছে বেছে বই প্রকাশ যা আদৃত হয় চিরায়ত হিশেবে।

বন্ধু হিশেবে মারুফ তার অভিযান থেকে আমারও একটি কবিতার বই করেছিল ২০১৪ সালে ‘এ আলোআঁধার আমার’। মূলত ওটি ছিল বাংলাদেশে ২০০৮ সালে প্রকাশিত আমার চতুর্থ কাব্য। এটি কলকাতা সংস্করণ হিশেবে ২০১৪ সালে মারুফের অভিযান থেকে বের হয়। কলকাতা সংস্করণে বইটি উৎসর্গ করি আমার এই তিন প্রিয়জনকে :

গৌতম গুহ রায়
শৌভিক দে সরকার
মারুফ হোসেন

আয়নায় বন্ধুর মুখ

বন্ধুত্বের এই নিদর্শন অমলিন, চিরায়ত। তাকে সঙ্গী করেই আমাদের পথ চলা। শৌভিক দে সরকার, মারুফ হোসেন- ওপারে আমার সুহৃদ, সব অন্ধকার মুছে দিয়ে একদিন জীবনের খেয়াঘাটে মিলবে এসে আমাদের মন পবনের নাও। ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়/ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়’। করোনামুক্ত কোনো এক আশাজাগানিয়া দিবসে হৃদয়ে হৃদয় ছোঁব বন্ধু, প্রত্যাশা রাখি।