কলেজ রোডের জার্নাল- ২৮॥ মামুন মুস্তাফা



২০১১, ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৯ মোট চারবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফরে গিয়েছি। কিন্ত্র প্রতিবারই জলপাইগুড়ি ছিল আমার প্রবেশদ্বার। প্রস্থানের সীমানাও এটি। কিন্তু কেন? উত্তর একটাই- ওখানে যে গৌতম গুহ রায় থাকে। সবাই বলতে পারেন, থাকলোই বা? কিন্তু সে যে আমার বড়দা, আত্মার আত্মীয়। কীভাবে সম্পর্কের সুতোয় গাঁথা হলো দুই জীবন, দুটো পরিবার।সেও এক দীর্ঘ সময়।

২০১১-তে প্রথম দেখা। পরিচয়, ভালো লাগা। উপরন্তু অভিভাবকসুলভ আচরণে পশ্চিমবঙ্গের কোথায় যাব, যাব না; কিংবা কীভাবে যাব, কারা কারা অপরিচিত জায়গায় সাহায্য করবে- তার সবকিছুর নিপুণ তদারকি আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। পরবর্তীতে দেখলাম বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির যে কেউ জলপাইগুড়িতে গেলে, গৌতমের সান্নিধ্য, আতিথেয়তা এবং সহজ ও সুগম যাতায়াতে তাঁর সহযোগিতা বা আনুকূল্য পায়নি, এমনটি ঘটেনি। এপারের মানুষের জন্যে ওপারের গৌতম গুহ রায় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

২০১৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু, অধ্যাপক শহীদ ইকবালের ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ আয়োজিত চিহ্নমেলায় ভারত থেকে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে আমার যোগাযোগে অংশগ্রহণ করেন আমার দুই সুহ্দ গৌতম গুহ রায় ও শৌভিক দে সরকার। সেবারই প্রথম মেলা শেষে গৌতমদা ঢাকায় আমার আতিথেয়তা গ্রহণ করে। আমার স্ত্রীর অতিথিপরায়নতা বরাবরই আদরণীয়। তাঁর আতিথ্যে ও আমার বালক পুত্রদ্বয়ের উদ্দীপনামূলক সঙ্গ গৌতমদাকে মায়ায় জড়িয়ে নেয়। তাই হয়তো বিদায়ের ক্ষণে আমার স্ত্রীকে নিজের বোন বলে স্বীকৃতি দিয়ে যেতে বাধ্য হন। এরপর দুই পরিবারের গল্প জমে উঠতে থাকে।

আমি যতবারই জলপাইগুড়ি গিয়েছি, সীমানাচৌকি পেরুলেই ডলার এক্সচেঞ্জের দোকানমালিক বিভাষদাকে গৌতমদার সব নছিয়ত পূর্বেই করা থাকে। সে মোতাবেক বিভাষদার লোকজনও সমস্ত কার্যক্রম সমাধা করে ট্যাক্সি ডেকে জলপাইগুড়ির মোহান্তপাড়ায় আমাকে পৌঁছে দেয়। গৌতমদা হয়তো তখন অফিসে। পিয়ালী বৌদি ঘর গোছগাছ করে আমার প্রয়োজনীয় সব উপকরণ হাতের নাগালে পৌঁছে দিয়েছেন। মেয়ে পূজা কাকু কাকু বলে দৌড়ে এসে আমার শুশ্রুষায় ব্যস্ত। তখন মনে হয়- ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী/এ কোন সোনার গাঁয়’। অফিস শেষে গৌতমদা ফিরল ঠিকই পর্যাপ্ত টাকা ভরা একটি মোবাইল সিম হাতে নিয়ে। বাংলাদেশে ফেরা অব্দি ওই সিম আমার সঙ্গে, যেখানে নতুন করে আমাকে আর টাকা ভরতে হয় না। সেই তো আমার বড়দা। জীবনে কে দেখেছে এমন আপন ভাই। আমার মাকে ‘মা’ সম্বোধনে আশ্বস্ত করতো পরদেশে আমার বিষয়ে।

অন্যদিকে যতবারই ঢাকায় এসেছে গৌতমদা, সীমানা পেরুনোর আগেই বলছে ‘আসছি’। আমি ভোর বেলায় গাবতলী মাজার রোডে গিয়ে দাদাকে নিয়ে আসি। আর তার বোন, আমার স্ত্রী রত্না তার দাদার ভালোলাগা সকালের নাস্তাগুলো সাজিয়ে নিয়ে বসে থাকে। ঢাকার অনেক কবি-লেখক কখনো পরোক্ষে কখনো সরাসরি উষ্মা প্রকাশ করে থাকেন যে, কেন গৌতমদা প্রতিবারই আমার বাড়িতে উঠবে? গৌতমদার একটিই কথা, ‘ঢাকায় আগে আমার বোনের বাড়িতে আমাকে উঠতে হবে’। এই প্রীতির বন্ধন কত গাঢ় তা টের পাই, যখন আমার স্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি, রক্তশূন্যতা, গালের ভেতরে ঘায়ের মতো, কোনো স্বাদ নেই। মূল অসুখ ধরা সম্ভব হচ্ছে না; সেই তখন গৌতমদার ফোন : ‘তুমি যদি নাও আসতে পারো অন্তত বর্ডার পর্যন্ত এসো, আমি ওখান থেকে বোনকে নিয়ে আসি, এখানে চিকিৎসা করাই’। এই উদ্বিগ্নতা একজন ভাইয়েরই থাকে বোনের জন্যে।

কিন্তু এই মানুষটাকে আমি দেখেছি কী ভয়ানক মেধাবী। যেমন কবিতা, তেমনি তাঁর গদ্য। আবার রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টও সমানভাবে। বামঘরানার এই সাহিত্যিক সমাজকর্মীও বটে। আর্তমানবতার সেবায় তাঁর দিনরাত ছুটে চলা অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবার তাগিদে। সে কথা তিনি বলেছেনও, আমার পেশাগত ক্ষেত্র দৈনিক বাংলাদেশের খবরের সাহিত্যপাতার জন্য নেওয়া এক সাক্ষাতকারে, ‘আমার লেখালেখি বিপন্ন মানুষের পাশে থাকার জন্যে।’ গৌতম গুহ রায় সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘দ্যোতনা’ও চল্লিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে মানবতার কথাই বলে চলেছে। বাংলাদেশ থেকে আমি ও কবি ওবায়েদ আকাশ ধ্রবপদ প্রকাশনী থেকে তাঁর একটি কবিতার সংকলন বের করে দেই ‘রেখা তামাঙের ঝর্ণা ও অন্যান্য কবিতা’। বইটি গৌতমদা আমাকে ও ওবায়েদকে উৎসর্গ করে। বইটির ফ্ল্যাপ আমি লিখে দিয়েছিলাম।

কবি গৌতম গুহ রায়ের কবিতার ভেতরে যতই প্রবেশ করা যায়, ততই পাঠক দেখবেন ‘ইতিহাস ও বিশ্ব রাজনীতি’ মুখ্য হয়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তি, পুঁজিবাদী ভূ-রাজনীতি, সাধারণ মানুষের পরাভব- এসব দহন তিনি সহ্য করে এগিয়ে যান মানবসভ্যতার সাহিত্যসৃষ্টির উৎসমুখে। ফলে গৌতমের কবিতায় স্বকাল ও সমকালীন সমাজের ছায়া প্রলম্বিত হয়েছে। সুতরাং সমাজ বিনির্মাণের প্রয়াসে তিনি হয়ে ওঠেন বিপ্লবী, যা তাঁর পরোক্ষে রাজনীতিতে সম্পৃক্তি, পেশাগত দায়িত্ব এবং সমাজসেবার মধ্য দিয়ে সেই উপলব্ধির বিকাশ লক্ষ করা যায়। ভারতবিভক্তির সাম্প্রদায়িক নখরেই নির্মমভাবে ঘটে যায় বাংলা ভাগের বিয়োগান্তক ঘটনা। আর এর ফলে লুকায়িত বঞ্চিত পশ্চাৎপদ কৃষিনির্ভর, নদীনালা-খালবিল, জলাশয়, মফস্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী গৌতমের লেখার আধার হিশেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আর গৌতমের কবিতায় এ-বিষয়গুলো পরোক্ষ ছদ্মাবরণে রূপক আকারে ধরা পড়েছে।

কবি গৌতম গুহ রায় স্বভাব ও শৈলীগত দিক থেকে আত্মমুখী ও ব্যক্তিত্বনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও মূলত সমাজবাদী কবি। একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ সমাজবাদী হবেন এটাই স্বাভাবিক। আর তাই আবহমান বাঙালির জীবনচরিত ও প্রকৃতি থেকে তাঁর কাব্য-উপকরণ সংগৃহীত হয়েছে, যা প্রতীকী ও ব্যঞ্জনাধর্মী। সবচেয়ে বড় কথা এ সবের ভেতর দিয়ে ১৯৪৭-এর দেশভাগের যন্ত্রণা, ছিন্নমূলের খোঁজ ও আর্তি গৌতমের কবিতার অন্যতম বিষয়বস্তু বলে নির্ণিত হয়েছে। কেননা তাঁর পূর্বপুরুষের আদিভিটা এই বাংলাদেশের বিক্রমপুরের মালখানগরে। তাই বুঝি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে জন্ম এবং সেখানকার অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও কবি গৌতম গুহ রায় চেতনায় বাঙালিত্বকে ধারণ করেন।

এই সম্পূর্ণ বাঙালিয়ানা মানুষটির বাড়ি জলপাইগুড়ির মোহান্তপাড়া শেষ বারের মতো গেলাম ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর বোন, মানে আমার স্ত্রীকে নিয়ে। তাঁর বোন যাবে বলে চ্যাংড়াবান্ধা সীমানায় আগে থেকেই অপেক্ষা করছে জলপাইগুড়ি থেকে গৌতমদার পাঠানো ট্যাক্সি। আমরা যাব বলে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গৌতমদা ও তার পরিবার আমাদের সঙ্গে দার্জিলিং গেল। আমাকে গৌতমদা বললেন, ‘মামুন, তুমি যা অর্থ এনেছো, তা দিয়ে রত্না (আমার স্ত্রী) যা যা করতে ও কিনতে চায়, তাই করো। এখানের বেরানোর জন্য তোমার চিন্তা করতে হবে না।’ এই আচরণ প্রকৃত অর্থে একজন বড়দা’র পক্ষেই সম্ভব। জীবনের বাকিটুকু পথ এভাবেই পাড়ি দিতে পারি যেন। আমার বাবা-মা দুজনেই যখন ইহধাম ত্যাগ করলেন, সেই তখনও গৌতমদা ও বৌদির কি উদ্বিগ্নতা- আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের, কথা বলার জন্যে। তখন এই করোনাকাল। সেলফোনে দাদার কণ্ঠ, ‘সীমানা খোলা থাকলে আমি চলে আসতাম ভাই’। এই তো আমার আত্মা, যাকে আমি খুঁজে মরি। হৃদয়ের টান- সুখদুঃখ, হাসিকান্না, এভাবেই জমা হয় আমাদের জীবন চলার পথে।

সেই কনকনে ঠাণ্ডা, দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দার্জিলিংয়ে, আমরা ঘুরলাম হৃদয়ে হৃদয় বেঁধে যৌথ পরিবারের বাসিন্দা হয়ে। বৌদি, গৌতমদার মেয়ে পূজা আমার স্ত্রীর প্রতিনিয়ত সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করে চলেছে। টাইগার হিল, তেনজং শেরপার পার্ক ও মনুমেন্ট, স্ট্রিট ফুড, গৌতমদার নানা জাতের চায়ের স্বাদ, টুকটাক কেনাকাটা- আমাদের ভ্রমণবিলাসী মন উড়তে থাকে দূর থেকে কাঞ্চনজংঘার আলোর বিভায়। সেখান থেকে ফিরে মেয়ে পূজাকে নিয়ে তিন দিনের জন্য কলকাতায় যাত্রা। সারারাত ট্রেন জার্নি। সকালে শিয়ালদহ স্টেশনে অপেক্ষা করছে তরুণ অনুজ কবি অরুনাভ রাহারায়। খুব কর্মনিষ্ঠ ছেলে। আমাদের কাব্যসাহিত্যে এক সম্ভাবনাময় কবি। এই অল্প বয়সে তাঁর ‘উত্তর শিলালিপি’ প্রকাশনা জগতে সাক্ষর রেখেছে। আগেই বলেছি অরুনাভ ওর উত্তর শিলালিপি থেকে আমার আর শৌভিকের যৌথ কাব্য ‘ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র’ প্রকাশ করেছে।

ওই সকালে পূজার সঙ্গে আমার স্ত্রী রত্না চলে গেল সেলিমপুরে ঢাকুরিয়া ওর বাসায়। আমি অরুনাভর সঙ্গে ওর চিলেকোঠায় সেলিমপুরের পাশে যাদবপুরে চলে এলাম। তারপর প্রতিদিন পূজা, রত্না আর আমার নিউমার্কেট, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস আর শেষ বিকালে সল্ট লেকে কলকাতা বইমেলায় ঢুঁ মারা। সেখানে বন্ধু মারুফ হোসেন, কোচবিহার থেকে আসা তিতির ছোটকাগজের সম্পাদক বন্ধু সঞ্জয় সাহা, কবি অলোক বিশ্বাস, কবি সুবোধ সরকার নানা জনের সঙ্গে কথা-আড্ডা নতুন সৃষ্টির দ্বার উন্মোচন করে চলে। আহা, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না’। অবশেষে পূজাকে রেখেই এক সন্ধ্যায় আবার চেপে বসলাম ট্রেনে, গন্তব্য সেই জলপাইগুড়ি মোহান্তপাড়া।

এবার ফেরার পালা। গৌতমদার ঠিক করে দেওয়া ট্যাক্সি করে বৌদি ও তাঁর এক প্রতিবেশী বান্ধবী চ্যাড়াবান্ধা সীমানা পর্যন্ত এলেন রত্নাকে বিদায় দিতে। তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে সূর্য। শীতার্ত বিকেল আমাদের সকলের তনুতে বিষণ্নতা গেঁথে দিয়েছে। শরীরের স্পর্শগুলো কেমন আলগা হচ্ছে। আমার সহজ-সরল ভাই-বন্ধু কবি গৌতম গুহ রায় তখনও অফিসে নিরিবিলি আঁচড় কাটছে জীবনের। ব্যাংকের হিশেব মিলে যাচ্ছে। জীবনের খেরো খাতায় আমাদের হিশেবটুকু শুধু এলোমেলো। নরোম স্বরে সেলফোনের ওপারে গৌতমদার কণ্ঠ ‘আবার দেখা হবে’। মনে মনে বলি ‘হয়তো’। সীমানা চৌকি পেরিয়ে যাচ্ছি, পিয়ালী বৌদি হাত ধরে কাঁপা স্বরে বলেন, ‘মামুন ভাই’; আমি অনুচ্চারিত হাজারো কথার চোখে চেয়ে ফিরে আসি বুড়িমারী। রত্নার আঁচলে চোখ জ্বালা করা জল। ছায়া তবে দীর্ঘ হলো। রেডক্লিফ রেখা মেলে ধরে চিরকালের আত্মহনন। আমি শুধু আত্মার দীপ্র দহনে বলি :
ধসে পড়া রাজবাড়ির খুব কাছে মোহান্তপাড়া-
এইমাত্র বৃষ্টি শেষে এখনও সেই পায়ের চিহ্ন স্পষ্ট।
ওই বাড়ির চৌকাঠে কার নিঃশ্বাস জাগে? ঠিক ওখানে
নামে দুপুরের ভালবাসা;- বুঝি এ আমারই জন্মশহর।
খুলে যায় অজস্র মুখোশের ভীড়ে দরজা সকল। কী
মনোরম ভোর আনে জলপাইবন। আহ্ কী বৃষ্টিপতন।
মনের মাঝে ঝরাপাতার ওড়াউড়ি, তিস্তার ক্রন্দন ডাকে
জলের ডহর। অথচ ওই বাড়ির সহজ দরজা থেকে
নেমে গেছে যে সড়ক- সেখানেই জলপাইগুড়ি আর তার
দ্যোতনার ছড়, ওখানেই বাঁধা আমার ক্রান্তিকাল মনোজগত,
একখণ্ড অখণ্ড স্মৃতিতর্পণ-

গৌতম গুহ রায়, ভাল আছো?