কলেজ রোডের জার্নাল- ২৯॥ মামুন মুস্তাফা





বন্ধুত্ব কেমন হওয়া উচিত? বন্ধুত্বের সংজ্ঞা কি? ‘বন্ধু’ কি শুধু মুখের ডাক, নাকি হৃদয় মথিত এক তোলপাড় আলোড়ন? বন্ধুকে কি তবে ‘হোরেশিও’র মতো হতে হবে? হোরেশিও। জগতবিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের যুবরাজ হ্যামলেটের বন্ধু ছিল হোরেশিও। শান্ত, ধীর-স্থির স্বভাবের হোরেশিও মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত প্রিন্স হ্যামলেটকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে গেছে; ভালোবেসেছে, আগলে রেখেছে। অনেক সমূহ বিপদ থেকে উদ্ধারও করেছে। পরাস্ত যুবরাজ অন্তিম সময়ে দাঁড়িয়ে বন্ধু হোরেশিওকে বলে গেছে বিপর্যস্ত জীবনের ধারাপাত, যেন সে পৃথিবীর মানুষকে তা জানিয়ে দেয়। বন্ধু হোরেশিও যুবরাজ হ্যামলেটের শেষযাত্রায় তার কপালে শেষ চুম্বনের সাক্ষর রেখেছিল। আর হোরেশিও ছিল বলেই পৃথিবী জেনেছে হ্যামলেটের করুণ পরিণতি, অদ্বিতীয় নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়র রচনা করেছিলেন তাঁর সাড়া জাগানো ট্র্যাজিক ড্রামা ‘হ্যামলেট’। আমার জীবনের পাতায় লেখা আজ সেই ‘হোরেশিও’র মতো আমার বন্ধুর কথা বলবো।

২০০৭-৮ হবে। এক পড়ন্ত বিকালে প্রথিতযশা কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিক রাজশাহী থেকে আমাকে ফোন দিলেন, ‘চাচু, তোমার সঙ্গে কথা বলবে শহীদ ইকবাল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক, আমার ছাত্র। ও একটি লিটল ম্যাগাজিন ‘চিহ্ন’ সম্পাদনা করে।’ সেই প্রথম আলাপ। ওই সময়ে ‘কালি ও কলম’-এ প্রকাশিত আমার বিভিন্ন সাহিত্যবিষয়ক গদ্য শহীদ ইকবালের নজরে আসে। তিনি চাচ্ছেন তাঁর ‘চিহ্ন’-তে আমি লিখি। তখন থেকে ‘চিহ্ন’র লেখক হয়ে উঠতে থাকলাম। এরও দুই বছর পরে ২০০৯ সালের একুশের বইমেলায় শহীদ ইকবলের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। ওইদিন সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমীর সামনের সড়কের মাঝ বরারবর আইল্যান্ডে বসে আমরা নিজেরা আমাদের চিন্তা মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করি। সেদিন একজন বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ নানা আলাপচারিতায় মামুন মুস্তাফার অন্দর-বাহির বুঝে নেবার চেষ্টা করলেন। ২০০৯ সালে বলাকা প্রকাশন থেকে আমার প্রথম গদ্যগ্রন্থ এই বদ্বীপের কবিতাকৃতি প্রকাশ পায়। বইটির ফ্ল্যাপে ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দু’চার কথা লিখে দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে বাঁধলেন শহীদ ইকবাল। আর এ বইটি উৎসর্গ করেছিলাম আমার আরেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি পিতৃতূল্য জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারকে।

এভাবেই ধীরে ধীরে শহীদ ইকবালের সঙ্গে গড়ে উঠতে থাকে সখ্য। চলছে ফোনালাপ, ইমেল চালাচালি। অতঃপর ২০১১। ডিসেম্বরে তাঁর সম্পাদিত ‘চিহ্ন’-এর যুগপূর্তি উৎসব। আমাকে বারবার ফোন দিচ্ছেন, চিহ্নকর্মীরা ফোন দিচ্ছে- আমাকে আসতেই হবে। ২০১১-এর আগস্টে পশ্চিমবঙ্গে গেলাম সাহিত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে। ডিসেম্বরে দু’দিনব্যাপী চিহ্ন প্রোগ্রাম। মনের মধ্যে এক ধরনের অনুরণন খেলা করছে। সারা জীবন ঘরমুখো মানুষ। যোগাযোগ নেই সাহিত্য-সংস্কৃতির লোকজনের সঙ্গে। দু’দিনব্যাপী ওই মেলায় সারা বাংলাদেশ থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রায় দুই/তিন শ’ জন আসবেন। তাঁদের সঙ্গে এই অন্তরালের মানুষ কীভাবে নিজেকে মেলাবে? নানা দ্বিধা-সংকোচের মাঝেই অফিস থেকে ৪ দিনের ছুটি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিসর্গের কাছে চলে এলাম। মূলত শহীদ ইকবালের আহ্বান উপেক্ষা করার সাধ্য হয়নি। শহীদুল্লাহ কলাভবনে রিকশা থেকে নামতেই প্রথমে আমার সময়ের কবি শামীম নওরোজ আমাকে প্রীতির বন্ধনে জড়িয়ে নিলেন। দু’দিনব্যাপী এই মেলায় এত লোকের আয়োজন ছিল প্রীতিমুগ্ধ। কিন্তু তখনও আমার জানা ছিল না আমার জন্যে অপেক্ষা করছে এক অন্যরকম বিস্ময়। দুই দিনের অনুষ্ঠানের শেষ দিনের শেষ পর্বটি ছিল সাহিত্য জগতের মোট ৯ জনকে ‘চিহ্নসম্মাননা’ প্রদান। ছোটকাগজ সম্পাদনায় সাত বিভাগ থেকে ৭ জন সম্পাদকসহ সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় দুজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সৃজনশীল শাখায় সম্মাননা দেওয়া হয় কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারকে এবং মননশীল শাখায় আমাকে। এর মাধ্যমে শহীদ ইকবাল আমাকে প্রীতির নিগূঢ় বন্ধনে আরও বেশি করে বেঁধে নিলেন।

এর পরের বছর ‘চিহ্ন’ সম্পর্কে ভবিষ্যত পরিকল্পনাবিষয়ক সভায় আবারও আমার আমন্ত্রণ। ওখানে আরও ছিলেন বিশিষ্ট লেখক হোসেনউদ্দীন হোসেন। আমাদেরকে চিহ্নর পরামর্শক, উপদেষ্টা যাই বলি না কেন, করে নেওয়া হলো। আর তখন থেকে ‘চিহ্ন’র সঙ্গে যুক্ত হলাম আরও নিবিড় ভাবে। এরপর মাঝেমধ্যেই শহীদ ইকবালের আহ্বানে চিহ্ন’র বিভিন্ন সভায়, আবার কখনো অফিসের কাজে রাজশাহী গমন আমার প্রায়শই ঘটে। রাজশাহীর প্রমত্ত পদ্মা এখন নেই। তবু সেই পদ্মায় নৌ-ভ্রমণ, জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় বালুময় পদ্মার চরে মুখোমুখি দুজন, পদ্মার পাড় ধরে হেঁটে হেঁটে শহরে ফেরা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি ঘেরা আলোআঁধারিতে সবুজ ঘাসের লনে আমরা দুজন আবিষ্কার করি আমাদের অতীত, পরিবার, পড়াশোনা, লেখালেখি, বর্তমান সাহিত্যজগৎ। দেখি, দুজনেরই একই সময়ে এসএসসি, একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা- আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে, শহীদ ইকবাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। মনের কোথাও যেন মিল খুঁজে পেলাম। শহীদ ইকবাল, আমারই মতো, হৈ-হুল্লোড়ে নেই। তাঁর চরিত্রে কোনো স্বার্থপরতা নেই, ভাওতাবাজি নেই; আছে সাহিত্যের জন্য একনিষ্ঠ প্রেম। এরপরই এক দুপুরে অফিসে বসে পেলাম শহীদ ইকবালের বন্ধুত্বপূর্ণ ইমেল। লিখলেন, ‘আমার মনে হয়, এখন থেকে আমাদের ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে আসা উচিত।’ পাল্টা মেলে লিখলাম, ‘আমিও তো তাই ভাবছিলাম।’ সেই থেকে শুরু দুই বন্ধুর পথ চলা।

শহীদ ইকবাল শুধুই কি অধ্যাপক, কিংবা ‘চিহ্ন’ সম্পাদক। তা তো নয়। তিনি গত শতকের নয়ের দশকের বুদ্ধিদীপ্ত প্রাবন্ধিক, গদ্য লেখক এবং নিরীক্ষাপ্রবণ কথাশিল্পী। মানবজীবনের উত্থানপতন নিরূপিত হয় সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের নানা স্তরে। আর এর ভেতর দিয়েই মানুষ তার কর্তৃত্ব বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তিগত কিংবা সামষ্টিক সংগ্রাম অব্যাহত রেখে চলে। আর এসব ব্যাপৃত হতে থাকে ব্যক্তিপর্যায় থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেও। ফলে একনায়কতন্ত্র কর্তৃত্ববাদ, পুঁজিবাদী মানসিকতা ইত্যাদি সমীকৃত হতে দেখি ইকবালের প্রবন্ধসমূহে। তার সাহিত্যনির্ভর নিবন্ধগুলোও সৃষ্টি হয়েছে ওইসব সাহিত্যশিল্পীদের মনস্তাত্ত্বিক চেতনার ধার ঘেঁষে। মানবজীবনের উত্থানপতন নিরূপিত হয় সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের নানা স্তরে। দৈনিকের সম্পাদকীয় পাতাগুলোতেও তাঁকে কলাম লিখতে দেখি এসবকে পুঁজি করে সমাজরাষ্ট্রের নানা অনুষঙ্গে। ঘুমিয়েপড়া জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে তুলতে সেসব আমাদের মননবোধে আলোড়ন তোলে।

আবার একজন গদ্যকার কখনোই কথাসাহিত্যকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন না। আর তাই শহীদ ইকবালের হাতে বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস নতুন পথের দিশা খুঁজে পায়। ভাষার চাতুর্য ও বর্ণনায় যাপিত জীবনের নিরেট কাঠিন্য ইকবালের কথাসাহিত্যকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্যতা। বলাই হয়ে থাকে, ‘প্রমিত আঞ্চলিক শিক্ষিত ভাষার ধারক’ শহীদ ইকবাল। ওই যে ‘আঞ্চলিকতা’ এবং ‘শিক্ষিত’- এ দুইয়ের মধ্যে ইকবাল মূলত সমাজের দুটি স্তরের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন। ব্রাত্যজন এবং মধ্যবিত্ত। সমাজ ও রাষ্ট্রের নিগূঢ় প্রেষণে মধ্যবিত্তও কখনো কখনো ঠাঁই নেয় ব্রাত্যজনে, আবার ব্রাত্যজনও জীবনচাকার রথে চড়ে উঠে আসে মধ্যবিত্তের কাতারে। এসবই ঘটে যাপিত জীবনের টানাপোড়েনে। শহীদ ইকবালের কথাসাহিত্যে আমরা উল্লিখিত বিষয়ের সত্যতা টের পাই।

প্রাবন্ধিক ও কথাশিল্পী- এই দুয়ের মাঝে ছোটকাগজ ‘চিহ্ন’র সম্পাদক শহীদ ইকবাল অন্যন্য হয়ে ধরা দিয়েছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। ২০১১ থেকে শুরু করে প্রতি তিন বছর পর পর বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে দুই দিনব্যাপী ‘চিহ্ন মেলা’ উদযাপন, ‘চিহ্ন পুরস্কার’ প্রদান কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে। চিহ্ন সম্পাদনার ক্ষেত্রে শহীদ ইকবালের স্বতঃস্ফূর্ত মেধার স্ফূরণ আমরা লক্ষ করি বিষয়-বিষয়ীর নির্বাচন, চিন্তা ও মননে পরিবর্তনের বাঁক প্রতিটি ‘চিহ্ন’র অবয়বে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই বিচিত্র রসবোধে উজ্জীবীত ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ মূলত ব্যক্তিমানুষের হরেক চাওয়ার অন্যতম মুক্তি। কার্যত কি প্রবন্ধে, কি কথাসাহিত্যে; এমনকি চিহ্ন সম্পাদনার ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহারে অনন্য, ব্যতিক্রমধর্মী, অনিন্দ্য সৃষ্টির নন্দনতাত্ত্বিক সাহিত্যশিল্পী শহীদ ইকবাল। লেখমালা তার প্রথম বর্ষপূতিতে যাত্রা শুরু করা ‘লেখমালা সম্মাননা’ দিতে গিয়ে ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ সম্পাদনার জন্য শহীদ ইকবালকে সম্মাননা জানাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করে।

বাংলা ছবির মহানায়ক খ্যাত উত্তমকুমারের একটি চলচ্চিত্র ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’- আমাকে আমার বন্ধু ‘শহীদ ইকবাল’-এর মুখশ্রী মনে করিয়ে দেয়। তাঁর হাতটি ধরতে পেরেছি বলেই হয়তো আমার সাহিত্যাবাসের পথ মসৃণ হয়ে উঠেছে। সেই ষোড়শ শতকের হোরেশিও আজ একুশ শতকে এসে ধরা দিয়েছে আমার জীবনে। তাই বোধহয় বেহুলাবাংলা থেকে প্রকাশিত আমার কবিতার সংকলন দশ দশমী’র উৎসর্গপত্রে লিখতে পেরেছি-

শহীদ ইকবাল
হোরেশিওর মতো বন্ধু আমার

আর এ বছর আমার সম্পাদিত ছোটকাগজ লেখমালা আমার এই অকৃত্রিম সখার ৫০ পূর্তিতে বের করেছে ‘ক্রোড়পত্র : শহীদ ইকবাল’। বহুমাত্রিক চেতনায় ভাস্বর আমার এই বন্ধুর আগামী দিন হোক তাৎপর্যময়।