কলেজ রোডের জার্নাল-৩১॥ মামুন মুস্তাফা




মফস্বল শহর বাগেরহাটের শ্যামল জলকাদা অঙ্গে মেখে যে ছেলেটি একদিন ঢাকা নামক রাজধানীর এই মহানগরীতে উঠে এলো একরাশ রঙিন স্বপ্ন চোখে নিয়ে, তার পেছনে ছিল সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের বিস্তৃত উদার সাংস্কৃতিক আবহ। সঙ্গে ছিল একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের আজন্ম লালিত মূল্যবোধ। একেই সঙ্গী করে বিগত বত্রিশটি বছর কেটে গেছে আমার সাহিত্যসুধা সঞ্চয়নে। বালক ‘বেন্টিঙ্ক’ হয়ে উঠেছে ক্রমশ ‘মামুন মুস্তাফা’। তবু কলেজ রোডের ওই পথ মুছে যায়নি তার স্মৃতিসত্তা থেকে। তেমনি মুছে যায়নি বালক বয়সের পাঠাভ্যাস। আজকের প্রজন্মের বইপাঠের হীনমন্যতা ভাবিয়ে তোলে ভবিষ্যত প্রজন্মের মূল্যবোধ প্রসঙ্গে। শুধু কি শ্রেণিপাঠ্য সব দিতে পারে, সব পূর্ণ করতে পারে মানুষের মানসচরিত্র গঠনে? আবার সাহিত্যবিষয়ক বই পাঠই কেবল নয়, আমরা আমাদের বালক বয়সে প্রতিদিনের সংবাদপত্রের জন্যও অপেক্ষা করতাম ব্যাকুল হৃদয়ে। আজকের সন্তান খবরের কাগজের প্রথম পাতাটিতেও চোখ রাখে না ঠিকমতো। ইন্টারনেট, গুগল সব সংবাদ যথার্থ ভাবে তুলে দিচ্ছে কি তাদের সামনে? এক ক্লিকে বিশ্ব হাতের মুঠোয়, কিন্তু জ্ঞানের পরিধি কি বাড়ছে?

অথচ আজও দৈনিকের পাতার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা ভূ-রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের বোধ ও চেতনার জগতটিকে ষাট ও সত্তর দশকের মতো শাণিত না করলেও একটা ন্যূনতম ধারণার জন্ম দেয়। সেটুকুও গ্রহণ করতে চায় না যেন আজকের সন্তান। আমার সেই বালক বয়সে সুদূর মহাকুমা শহর বাগেরহাটে প্রতিদিনের সংবাদপত্র পৌঁছতো সন্ধ্যানাগাদ। আমরা চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতাম। দুজন মানুষ- মকবুল ও মারুফ ছিলেন সংবাদপত্র বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেবার দূত। আমাদের কাছে তাঁরা পিতৃতূল্য, ‘কাকু’ সম্বোধনে নানা আবদার ঝরে পড়তো তাঁদের কাছে। মকবুল কাকুর একটি বাইসাইকেল ছিল। তাতে চড়ে তিনি আসতেন। অন্যদিকে পদযুগলে ভর করে মারুফ কাকু আসতেন অনেক সময় মকবুল কাকুরও আগে। সে-সময় এতসব দৈনিক ছিল না। আমাদের বাগেরহাটে ঘরে ঘরে যে দৈনিকগুলোর আধিক্য ছিল, তা হচ্ছে- ইত্তেফাক, সংবাদ ও দৈনিক বাংলা। তখন সংবাদের সাহিত্যপাতা আমাদের প্রধান আকর্ষণ। প্রথিতযশা লেখকদের লেখার সমাহার ঘটতো সেখানে। এখনও আনন্দভরে স্মরণ করি সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃৎকলমের টানে’ গদ্যটি। আবার এই সংবাদের পাতায় প্রকাশিত ‘গাছপাথর’ নামের আড়ালে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কলাম ‘সময় বহিয়া যায়’ নিয়ে আব্বা ও তাঁর সহকর্মীদের নানা বিশ্লেষণ, কর্থাবার্তা। তখন সব হয়তো বুঝি নি। কিন্তু তাঁদের আলোচনাই উদ্বুদ্ধ করেছে ‘সময় বহিয়া যায়’ পড়ার জন্যে।

সময় সত্যিই বয়ে গেছে। আজ আর তেমন করে দৈনিকের কলামগুলো বোধের জগতে নাড়া দেয় না। এখনকার অধিকাংশ কলাম লেখক কলাম নয় প্রবন্ধ লিখছেন। তদুপরি দ্বিধাবিভক্ত সমাজ ও ব্যক্তি। দলকানা, গোষ্ঠীপ্রীতি সত্য উচ্চারণে যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমার বালক বয়সের সংবাদপত্রের ঘ্রাণ আজও আমি অনুভব করি। প্রসঙ্গত বলতে হয়, আমাদের বাড়িতেই ছিল ’৪৭ উত্তর তৎকালীন বাংলাদেশের সাহিত্য ক্ষেত্রের পথিকৃৎ কবিতা পত্রিকা ‘সমকাল’-এর বিশেষ সংখ্যা। ওটি বহুবার পড়ার ফলে সে সময়েই আমাদের কবি-লেখকদের নাম এবং তাঁদের সম্পর্কে একটা নিজস্ব ভুবন আমার নিজের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল। আর আমার পিতার কাছ থেকেই বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’, ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’, ‘প্রগতি’র মতো বিশুদ্ধ সাহিত্যকাগজের কথা জেনেছি, যা ধারণ করেছিল আমাদের বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিকে, সাহিত্যের সৃজনশীলতাকে উপস্থিত করেছিল আধুনিক সাহিত্যদরবারে।

আমার সেই বালকবেলার কল্পনায় ওই সমস্ত কাগজের প্রতিচ্ছবি মনের মধ্যে এঁকে ফেলেছিলাম। আর প্রতি বৃহস্পতিবারের সংবাদে’র সাহিত্যপাতায় যশস্বী কবি-লেখকদের লেখা দেখে ও পড়ে নিজেই সংবাদে’র সাহিত্যপাতায় লেখার বাসনা মনের মাঝে পুষে রাখতাম। সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃৎকলমের টানে’, সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের ‘অলস দিনের হাওয়া’ কিংবা অনেক পরে এসে হাসনাত আব্দুল হাইয়ের ‘সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব’র পাশাপাশি সাহিত্যপাতার বিষয় না হয়েও বেশকিছু উপ-সম্পাদকীয় আমাদের সমাজব্যবস্থায় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবাদের পাতায় স্থান পায়, যার ভাষাগত প্রকরণ, গদ্য নির্মাণ শৈলী সাহিত্যেরই মৌল অংশে পরিণত হয়েছিল। সেরকম একটি গাছপাথর লিখিত ‘সময় বহিয়া যায়’, জহুর হোসেন চৌধুরীর ‘জহুর-ই-এলাহি’ এবং আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’, যা আমাদের মননশীল ও সৃজনশীল সাহিত্যকৃতির ধারাকে অক্ষুন্ন রেখেছিল লেখকদের সাহিত্যের প্রতি সৎ কমিটমেন্টের কারণে। আর এভাবেই সেই বালক বয়সেই আমার কিংবা আমাদের মনের মধ্যে সৎ জীবনযাপনের, কমিটমেন্টের চেতনা জাগ্রত করে দিয়েছিল ওই সমাজব্যবস্থা। যেখানে সংবাদপত্রের ভূমিকা অগ্রগণ্য।

আজকে একুশ শতকে এসে বিজ্ঞানের অভূত সাফল্য আমাদের সমাজ ও জাতীয় জীবনে প্রভূত উন্নয়ন ঘটালেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক ধরনের স্ট্যান্টবাজির মানসিকতা এনে দিয়েছে। সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বের জায়গা থেকে সরে এসে আমরা মননশীল ও সৃজনশীলতার চর্চা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছি। তবে কী উৎকৃষ্ট লেখাটি লিখিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বর্তমান কাগজগুলো? আসলে স্বজনপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতি এত বেশি নগ্ন আকার ধারণ করেছে যে, সাহিত্যের প্রতি ন্যূনতম কমিটমেন্ট এবং সৃজনশীলতাকে আমরা খুইয়ে বসে আছি। অথচ এই বিষয়টি সেই সত্তর ও আশির দশকের অন্যান্য কাগজগুলোতেও কমবেশি পরিলক্ষিত হতো। ওই সময়পর্বে সরকারি মালিকানায় থেকেও দৈনিক বাংলা’র মতো কাগজেও বেশকিছু মননশীল লেখা চোখে পড়তো। যা আমাদের সমাজজীবন তো বটেই জাতীয় জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শ্লেষ-বিদ্রুপের মাধ্যমে পাঠকের মননে সাড়া ফেলেছিল। পাঠকের স্মরণের জন্য বলা যেতে পারে ফয়েজ আহমদের ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ এবং হেদায়েত হোসাইন মোরশেদের ‘আরেক জার্নাল-১’-এর কথা। এটি পরে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রিপোর্টারের নোটবুকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

তখন সংবাদে’র সাহিত্য সম্পাদনায় এসেছিলেন বিশিষ্ট কবি আবদুল গনি হাজারী, আবুল হাসনাতের মতো বিদগ্ধ সাহিত্যজন। তাছাড়া সংবাদের সাহিত্যপাতাকে সাহিত্য রসপিপাসু পাঠকের প্রিয় করে তুলতে স্বাধীনতার আগে থেকেই খ্যাতিমান সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্ত এবং বিশিষ্ট কথাশিল্পী শহীদুল্লাহ কায়সারের ভূমিকাও অস্বীকারের উপায় নেই। অন্যদিকে দৈনিক বাংলা’র সাহিত্যপাতার কর্ণধার ছিলেন আরেক প্রখ্যাত কবি আহসান হাবীব। আর তাই সরকারি মালিকানাধীনে থেকেও দৈনিক বাংলা’র মতো কাগজও একটি মানসম্মত ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এসব বিদগ্ধ সম্পাদকগণ প্রতিশ্রুতিশীল নবীন কবি-লেখক সৃষ্টির ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাঁদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সৃষ্ট মানুষের ইতিবাচক বোধের জগৎ জাগ্রত করা লেখাসমূহ সে-সময় রাষ্ট্রকে সবল করেছিল, দুর্নীতি বাসা বাঁধে নি। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে স্থিরতা ছিল।

আমি যখন স্কুলের শেষ পর্যায়ে কিংবা কলেজে পড়ছি, সেই তখন মকবুল কাকু শালতলার মোড়ে নিজেই দিলেন সংবাদপত্রের একটি স্টল। ওই সময় প্রায় প্রতিদিনই আমি তাঁর দোকানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে নানা ধরনের সংবাদপত্র পড়ে আসতাম। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, সাহিত্যবিষয়ক, বিনোদন জগত কোনো কিছু বাদ যেত না। সেই সত্তর ও আশির দশকে ইত্তেফাক, সংবাদ ও দৈনিক বাংলা মানুষের ঘরে ঘরে ঠাঁই করে নিলেও মহিলাদের কাছে ইত্তেফাকের কদর ছিল মূলত এর নানা জাতের বিজ্ঞাপনের কারণে। এর মধ্যে পৃষ্ঠাজুড়ে ঢাকাই ছবির বিজ্ঞাপন অন্যতম। তখন রবিবারে নতুন ছবি মুক্তি পেত। আর তখনও বাগেরহাটের একমাত্র ছবিঘর ‘টাউন হল’ই আমাদের ভরসা। আমার মায়ের বিনোদন বলতে তখন ছিল কেবল টাউন হলে ছবি দেখা। প্রায়শই আমি মায়ের সঙ্গী হতাম। সেই সূত্রে বাংলাদেশের বেশকিছু ক্লাসিক ছবির মুগ্ধ দর্শক আমি আজও। বিশেষত আমাদের চলচ্চিত্রের নায়করাজ খ্যাত রাজ্জাক, কবরী ও ববিতার শিল্পগুণ সমৃদ্ধ অভিনয় তাঁদের প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করে এখনও। এর বাইরেও আজিম, সুজাতা, সুচন্দা, গোলাম মোস্তফা, আনোয়ার হোসেন, খলিল, রওশন জামিল, রোজী সামাদ, রাজু আহমেদ, খান জয়নুল প্রমুখজন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। শালতলায় মকবুল কাকুর সংবাদপত্রের দোকানে বসে এই বিনোদন জগতের নানা খবর আমি তখন জানার চেষ্টা করেছি। এ ভাবেই বিশ্ব চলচ্চিত্র সম্পর্কেও নিজের ভেতরে একটা বোধ তৈরি করতে সক্ষম হই। আমাদের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ খান আতাউর রহমান একবার বলেছিলেন, ‘আগে আমরা যারা ছবি বানাতাম তারা শুধু বাংলা সাহিত্য নয় বিশ্ব সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখতাম। আর এখন যারা ছবি বানায় তারা বিশ্ব সাহিত্য তো দূরের কথা বাংলা সাহিত্যই জানে না’। আজ আমাদের চলচ্চিত্রের দৈন্যদশা দেখে খান আতার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

সংবাদপত্র, সাহিত্য, চলচ্চিত্র- এ সবই সুস্থির, ইতিবাচক সমাজ গঠনের অনুষঙ্গ। আমরা কি সে-সব ভুলতে বসেছি। আমার ছেলেবেলার সেই কাঁচা অবুঝ সবুজ অনুভূতিগুলো ফিরিয়ে দেবে না কেউ- ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম/সে এখন ঘোমটা পড়া কাজল বধূ দূরের কোনো গাঁয়’।