কলেজ রোডের জার্নাল ৩২ ॥ মামুন মুস্তাফা



ছেলেবেলায় বাগেরহাট টাউন হলে মায়ের সঙ্গে যেসব ছবি দেখতাম, তার কোনো কোনোটির সংলাপ অভিনয় করে আমিও আওড়াতাম। মনে পড়ে নায়করাজ অভিনীত ‘সেতু’ ছবিতে রাজ্জাকের মুখের সংলাপ- “হ্যাঁ আমি সই দেব কিন্তু তার আগে যে আমার বাবার সই নিয়েছিল তার সই নিয়ে এসো” কিংবা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিতে নায়িকা গোলাপীর বিয়ে ভেঙে দিতে চুরি করে নিয়ে যাওয়া সাইকেল ফেরত দিতে এসে নায়ক ফারুক যখন গোলাপী তথা ববিতার উদ্দেশে বলেন- ‘একটা কথা ক’ গোলাপী, একটা কথা ক’; বিভিন্ন ছবির এ জাতীয় অনেক সংলাপ আমাকে আলোড়িত করেছিল সেই বালকবেলায়।

বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের সময়ের ভারতীয় বাংলা ছবির তথা উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক কালজয়ী ছবির গল্প শুনে তখন ভাবতাম আমাদের দেশে এমন ছবি হয় না কেন? পরবর্তীতে বাংলাদেশের ষাট-সত্তর দশকের জহির রায়হান, সুভাষ দত্ত, নারায়ন ঘোষ মিতা, খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন, আব্দুল জব্বার খাঁ, কামাল আহমেদ, নজরুল ইসলাম, বাবুল চৌধুরী, কাজী জহিরের মতো পরিচালকদের ছবিগুলো দেখে মনে হলো তৎকালীন ভারতীয় বাংলা ছবির সঙ্গে পাল্লা দেবার সক্ষমতা ছিল আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রেরও। এরও কারণ বোধহয়, ওই সময়ে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র কিংবা আমাদের সাহিত্যিকদের দিয়ে ছবির কাহিনি রচনা একটি অন্যতম কারণ। যেখানে সৈয়দ শামসুল হকের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। ভারতেও তখন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, নিমাই ভট্টাচার্য, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় প্রমুখের কাহিনি নিয়ে ছবি তৈরি হতো। আমার ভেতরের এই যে সুস্থ সাহিত্য-সংস্কৃতির মানস গঠন, সে তো ওই বালক বয়সে আমার পরিবারের কাছ থেকেই অর্জন। আর তাই বোধহয় দুই বাংলারই এখনকার বাংলা ছবি আমাকে টানে না। কাহিনি, সাজসজ্জায় আধুনিক, উত্তরাধুনিক যতই হোক না কেন, বাঙালি মন-মানসিকতা, রুচি, সংস্কৃতি সেখানে অনুপস্থিত। কালেভদ্রে হাতে গোনা দু’একটি ছবি ভিন্ন রুচিবোধের পরিচয় দিচ্ছে।

এসব কারণেই বাংলাদেশের স্বর্ণযুগের ছায়াছবি এবং সে-সময়ের অভিনেতা-অভিনেত্রীগণ আজও দর্শকের হৃদয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাসীন। হাজার বছরেও দেশীয় চলচ্চিত্রে একজন রাজাধিরাজ রাজ্জাক আসবেন কিনা জানি না। অথবা কবরী ও ববিতার মতো শিল্পবোধ সমৃদ্ধ অভিনেত্রীর দেখা কবে মিলবে, কে বলতে পারে? ১৯৯১-৯২ সালে রাজ্জাক যখন তাঁর ‘প্রফেসর’ ছবি বানাচ্ছেন তখন একবার নয়া পল্টনে রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন্সে প্রিয় নায়কের সঙ্গে সাক্ষাতে গিয়েছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে তাঁকে পেয়েও গেলাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমি। একজন শিক্ষার্থীর এই আবেগকে তিনি গুরুত্ব দিলেন। কথা হলো বেশ কিছুক্ষণ। ছেলেবেলা থেকে চলচ্চিত্র এবং নায়করাজকে ভালোবাসার কারণে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্যই আমার জানা ছিল। তাঁর অনেক অসমাপ্ত ছবি এবং যেসব ছবির প্রিন্ট দুর্লভ, এখনকার দর্শক যা জানেন না, মূলত সেই ছবিগুলো সম্পর্কে আমার জিজ্ঞাসা ছিল রাজ্জাকের কাছে। তিনিও আমার এ বিষয়ে রাখা ধারণা ও প্রশ্ন শুনে হতবাক হয়েছিলেন। ওই একটিবারের আলাপ এবং এই দেখাসাক্ষাত পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রতি আমার অনুরাগ আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে তাঁর মৃত্যুর পরে বেশকিছু কাগজে আমাদের নায়করাজকে নিয়ে লিখি কয়েকটি গদ্য- ‘প্রসঙ্গ যখন নায়করাজ’, ‘ইতিহাসের পাতায় নায়করাজ’, ‘রুপালি জগতের রাজা’ ইত্যাদি।

আমি এসব লেখায় বলেছিলাম যে, নায়করাজের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছবি অসমাপ্ত আছে। যেমন- অমানুষ, মুসাফির, সন্ধিবিচ্ছেদ, ফুলমতি, সাত বান্ধবী, আমার তুমি, স্বর্গ ইত্যাদি। তাঁর প্রয়াণে তাঁকে সম্মান জানিয়ে এসব ছবির ওপর ভিত্তি করে একটি ডকুমেন্টারিও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবিরও দেখা মেলে না। যেমন- রাজ্জাক-কবরী অভিনীত নিশি হল ভোর, খেলাঘর, যাহা বলিব সত্য বলিব, দুই পর্ব, ত্রিরত্ন, কমল রাণীর দীঘি, উপহার, অনুরোধ। এছাড়াও রয়েছে- জীবনতৃষ্ণা, শপথ নিলাম, কাপুরুষ, বাজীমাত, ভাইবোন, সমর্পণ ইত্যাদি। আজকের প্রজন্মের জন্যে এসব ছবির প্রয়োজনা প্রতিষ্ঠান/পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই দুর্লভ ছবিগুলোর নতুন প্রিন্ট করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন ভাবে বেসরকারি টেলিভিশন ‘চ্যানেল আই’ রাজ্জাক-কবরীর ময়নামতি ছবির নতুন প্রিন্ট করে দর্শকদের উপহার দিয়েছে। একে সাধুবাদ জানাই। এখানে আমি একটি তথ্যের সংশোধন করতে চাই। প্রায়শই শোনা যায় অনেকেই বলে থাকেন, রাজ্জাক-কবরীর প্রথম ছবি হিশেবে সুভাষ দত্তের আবির্ভাব ছবির নাম। তথ্যটি ঠিক নয়। ১৯৬৮ সালে রাজ্জাক-কবরীর দুটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল- বাঁশরী ও আবির্ভাব। এর মধ্যে আব্দুল জব্বার খাঁ পরিচালিত বাঁশরী ছবিতে তাঁরা প্রথম চুক্তিবদ্ধ হন, কিন্তু আগে মুক্তি পায় আবির্ভাব ছবিটি। তবে রাজ্জাক-কবরীর প্রথম ছবি ছিল ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জিকু আলম পরিচালিত নিশি হল ভোর। আমার মনে হয় এসব বিষয়ে তথ্য দিতে গেলে ভালো করে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

১৯৬৪-এর দাঙ্গা, পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশান্তর হওয়া, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর কষ্টকর প্রথম জীবন- আমরা বহুবার শুনেছি নায়ক রাজ্জাকের মুখ থেকে। সে প্রসঙ্গ না টেনে বলা যায় কেন তিনি সবার নায়ক? তাঁর মৃত্যুতে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় বলা হয়েছে নায়ক রাজ্জাকের কিছু ছবি হয়ে উঠেছিল ক্ল্যাসিক। হ্যাঁ, তিনি ক্ল্যাসিক কিছু চরিত্র সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন আগুন নিয়ে খেলা, জীবন থেকে নেয়া, দর্পচূর্ণ, টাকা আনা পাই, মানুষের মন, রংবাজ, অতিথি, আলোর মিছিল, বাঁদী থেকে বেগম, কি যে করি, অনন্ত প্রেম, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, চন্দ্রনাথ, শুভদা, কালো গোলাপ, যোগাযোগ, বাবা কেন চাকর প্রভৃতি ছবির মাধ্যমে।

‘টাকা আনা পাই’ ছবিতে দরিদ্র নিচু ঘরের সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষায় বড় হয়ে ওঠা এবং পিতৃঋণ শোধ করার ভেতর দিয়ে বড় লোকের জামাই হওয়ার বাস্তবতাকে তিনি তুলে ধরেন অন্যরকম অভিনয় দক্ষতায়। আবার স্বাধীন বাংলাদেশে ‘রংবাজ’ ছবির মাধ্যমে রাজ্জাক আমাদের চলচ্চিত্রে প্রথম অ্যান্টি হিরোর সার্থক রূপায়ন দর্শকদের উপহার দেন। ‘অশিক্ষিত’র পাহারাদর, ‘কি যে করি’ ছবির ঢাকাইয়া যুবক মিথ্যা খুনি আসামীর চরিত্র বাংলার সাধারণ দর্শকদের মন থেকে মুছে ফেলা সহজ হবে না। তেমনি ‘বাঁদী থেকে বেগম’-এর নবাব নওশের নায়করাজের অনবদ্য সৃষ্টি। অন্যদিকে শরৎ কাহিনির সার্থক রূপায়ন ‘চন্দ্রনাথ’ ও ‘শুভদা’ আটপৌরে বাঙালি সমাজের একজন হিশেবে গ্রহণ করে অভিনেতা রাজ্জাককে। আবার ‘কালো গোলাপ’ ছবিটি হয়ে উঠেছে পঙ্গু স্বামী আর তার স্ত্রীর ফেলে আসা অতীত জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে সন্দেহ-ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক। রাজ্জাক-ববিতার অভিনয়গুণে সমৃদ্ধ এই ছবি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনন্য সৃষ্টি। নায়ক রাজ্জাক এভাবেই তাঁর অভিনয় প্রতিভার স্ফূরণ ঘটান স্বমহিমায়। অর্জন করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। আর ‘যোগাযোগ’ ও ‘বাবা কেন চাকর’ ছবি দুটি তাঁর পরিণত বয়সের একজন পিতার জীবনযুদ্ধের আর্তনাদ- বাঙালি দর্শকদের হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে। এই চির সবুজ নায়কের ৭৬টি বসন্ত খুব বেশি নয় আমাদের কাছে। কিন্তু তাঁর রুপালী পর্দার ঐতিহ্যমণ্ডিত জীবন আজ বাংলাদেশের গর্ব। আমরা অহঙ্কারী হয়ে উঠি নায়করাজ রাজ্জাক এই নামটি উচ্চারণে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেতা আলমগীর তাঁর ‘মহানায়িকা দর্শন’ নামক এক লেখায় বলেছেন, বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা খ্যাত পশ্চিমবঙ্গের টালিগঞ্জের সুচিত্রা সেন আলমগীরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে জানতে চেয়েছিলেন ‘রাজ্জাক-কবরী’ কেমন আছে। আবার মহানায়ক উত্তমকুমার তাঁর একমাত্র ছেলের বিয়েতে রাজ্জাককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। উপরন্তু জাতিসংঘের ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিশেবে নায়ক রাজ্জাক দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। ১৯৮৬ সালে ভয়েস অব আমেরিকা থেকে তাঁর সাক্ষাৎকারসহ তাঁকে কাভার স্টোরি করে এক সুভেন্যুর বের হয়। এ সবই প্রমাণ করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাজার বিশ্বব্যাপী সমাদৃত খুব একটা না হলেও একজন অভিনেতা রাজ্জাক তাঁর ব্যক্তিগত অভিনয়-প্রতিভা গুণে বিশ্বব্যাপী সম্মনিত হয়েছেন নানাভাবে। পাশাপাশি সম্মানিত করেছেন বাংলাদেশকে। এ সমস্ত কিছুর জ্বলন্ত উদাহরণ তাঁর দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রতি অনুরাগ, ভালোবাসা। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে কলকাতার প্রখ্যাত পরিচালক ও বিশিষ্ট অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়ের স্বামী তরুণ মজুমদার সস্ত্রীক ছুটে এলেন ঢাকায় নায়করাজকে নিয়ে ছবি করবেন বলে। ছবির নাম ‘রূপসী’, নায়িকা সন্ধ্যা রায় ও ছবির স্ক্রিপ্ট সঙ্গে। সবকিছু শুনে আমাদের নায়করাজ বললেন, “দাদা, সব ঠিক আছে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন আমার দেশ। তার চলচ্চিত্রকে দাঁড় করাতে হবে। এখন আমি যদি কলকাতায় গিয়ে ছবি করি, তবে আমার দেশের ছবির কি হবে? আমাকে মাফ করবেন।” নায়করাজের প্রয়াণে তরুণ মজুমদারও হাহাকার করে উঠেছিলেন। আমাদের চলচ্চিত্রের জন্যে এই ত্যাগ স্বীকার ক’জন অভিনেতা-অভিনেত্রী দেখাতে পেরেছেন? এখানেই তিনি অনন্য।

তাঁর সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি ছিলেন আবালবৃদ্ধবনিতার নায়ক। অন্যদিকে এদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান আরো বিশদ আকারে বলেন, ‘বোদ্ধা থেকে নিরক্ষর পর্যন্ত’ সকলের নায়ক ছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রের এই প্রবাদপ্রতিম মানুষটি। কেন তিনি জনমানুষের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন? বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বরাবরই লাউড অ্যাক্টিংয়ে অভ্যস্ত। অনেকটা যাত্রাধর্মী। যে কারণে উচ্চশিক্ষিত বোদ্ধামহলের কাছে আমাদের চলচ্চিত্র খুব একটা আবেদন জাগাতে পারেনি। যেমনটি পেরেছিল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তথা কলকাতার বাংলা কিংবা মুম্বাইয়ের হিন্দি ছবি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নায়করাজ এদেশের প্রচলিত লাউড অ্যাক্টিংয়ের সঙ্গে আন্ডার অ্যাক্টিংয়ের একটা যোগসূত্র স্থাপন করলেন। নির্মাণ করলেন অভিনয়ে স্বকীয়তা। পৌঁছে গেলেন জনমানুষের হৃদয়ে। আর তাই উপরে উল্লিখিত প্রথিতযশা সঙ্গীতজ্ঞ মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের উক্তিটির যথার্থতা প্রমাণিত হয়।

রাজ্জাকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অধ্যায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে যাঁদের হাত ধরে আমাদের দেশের শিশু চলচ্চিত্র দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বল এক নাম নায়করাজ রাজ্জাক। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের হৃদয়। আর এ জন্যেই তিনি গণমানুষের নায়ক হতে পেরেছিলেন। আমরা তাঁকে নির্ণয় করি স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংগ্রামের সাক্ষী হিশেবে। একজন কালোত্তীর্ণ অভিনেতা তিনি।