কলেজ রোডের জার্নাল-৩৩ ॥ মামুন মুস্তাফা





কিছু কিছু শব্দ, বাক্য, কথা পাঠকের কাছে চর্বিত চর্বন মনে হতে পারে। তবু লেখার প্রয়োজনে সে-সবের পুনর্পাঠ দরকারি হয়ে ওঠে। আর সে জন্যেই এ কথাগুলো আবারও বলছি। কবিতা-প্রবন্ধ লিখি। খুব অন্তর্মুখীন, লাজুক প্রকৃতির মানুষ হিশেবে বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের অনেকেরই হয়তো আমার নামের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও সরাসরি দেখাসাক্ষাৎ ঘটেনি। খুব ব্যক্তি পর্যায়ে দু’একজন ব্যতিক্রম। আমার সময়কালের কবি-লেখকদের মধ্যে শহীদ ইকবাল, ওবায়েদ আকাশ, অনিকেত শামীম, বায়তুল্লাহ্ কাদেরী, মাহবুব কবির, আহমেদ স্বপন মাহমুদ, মুজিব ইরম, মোস্তাক আহমেদ দীন, শামীম রেজা প্রমুখজনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গাঢ়, দৃঢ় এবং প্রীতির।

কিন্তু ছেলেবেলা থেকে সাহিত্য রচনার প্রেক্ষাপট তৈরিতে পারিবারিক সাংস্কৃতিক আবহের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধু বাংলা ভাষার অন্যতম পুরোধা কবি আবুবকর সিদ্দিকের সাহচর্য প্রণিধানযোগ্য। পাশাপাশি তাঁরই কারণে আল মুজাহিদী, নাসির আহমেদ, শিহাব সরকার, সৈয়দ হায়দার, গোলাম কিবরিয়া পিনু, ফারুক মাহমুদের সঙ্গ আমার সাহিত্যাবাসের পথকে মসৃণ করে তোলে। এক্ষেত্রে আরও তিন জনের নাম করতে হয়- মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনিসুজ্জামান ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এই মনীষীদের প্রত্যক্ষ উপদেশ, পরামর্শ মামুন মুস্তাফার ভেতরের কবিসত্তা নির্ণয়ে ভূমিকা রেখেছে নিঃসন্দেহে।

আর অন্তরালের প্রেক্ষাপট এই যে, এঁদেরই সংস্পর্শে থেকে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’, বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ‘পূর্বমেঘ’, রফিক আজাদের নেতৃত্বে প্রকাশিত ‘স্বাক্ষর’, সিকদার আমিনুল হকের সম্পাদনায় ‘সাম্প্রতিক’, ফারুক সিদ্দিকীর ‘বিপ্রতীক’-এর পাশাপাশি হালের অনিকেত শামীমের ‘লোক’, ওবায়েদ আকাশের ‘শালুক’ এবং শহীদ ইকবাল সম্পাদিত ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজগুলো আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে জীবনানন্দ দাশের মতো সৎ ও মহৎ কবিতার সৃষ্টির (ও আলোচনার) দিকে অগ্রসর হতে। এ কাজটি করতে গিয়েই নিজের অজান্তে কখন যে তাগিদ অনুভব করি লিটল ম্যাগাজিন হিশেবে লেখমালা প্রকাশের তা বলতে পারবো না।

তবে ছোটকাগজ সম্পাদনার জন্য ওবায়েদ আকাশ আমাকে বহুবার তাগাদা দিয়েছেন। উৎসাহ এবং নির্ভয় দিয়েছেন। বলা যায় তাঁর প্রেরণা এবং বন্ধু শহীদ ইকবালের ছোটকাগজ সম্পাদনার ক্ষেত্রে একাগ্রতা, নতুন লেখক সৃষ্টির আগ্রহ ও একনিষ্ঠতা শেষ পর্যায়ে আমাকে লেখমালা লিটল ম্যাগ সম্পাদনায় টেনে এনেছে। আমি জানি আমার সীমাবদ্ধতা। লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ এবং পুঁজির দুর্বলতা। তা সত্ত্বেও এই কঠিন কাজে ব্রতী হই শুধু নবীন লেখকদের প্রাধান্য দেব- এই চিন্তা থেকে। লেখমালা এখন পর্যন্ত সেই কাজটি করে চলেছে নির্মোহ ভাবে। তবে বন্ধুপ্রীতি থাকলেও লেখার মানের ক্ষেত্রে ছাড় নেই। লেখমালা তার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলেছিল, “এ ধরনের সাহিত্যকাগজের সম্পাদকই যখন প্রকাশক তখন এর জন্যে কোন অর্থলগ্নীকারির খোঁজ লেখমালা করবে না। মূলধন-আশ্রয় থেকে বঞ্চিত এই নিঃস্ব সামাজিক সম্পদটি তার পাঠকের কাছে বেঁচে থাকুক কেবলি সাহিত্যকৃতির জন্যে।”

লেখমালা ২০১৫ থেকে যাত্রা শুরু করে, আর এখন পর্যন্ত এর ১২টি সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু লেখমালা কখনো কোন কর্পোরেট পুঁজির দ্বারস্থ হয়নি বিজ্ঞাপনের জন্যে। এক্ষেত্রে একটি নাম স্মরণযোগ্য, তিনি অমূল্য কুমার ঘোষ। শাহবাগের কাঁটাবনে অবস্থিত মুক্তি মানবী প্রেসের কর্ণধার। লেখমালা বর্তমানে এখান থেকেই অঙ্গসজ্জা নিয়ে প্রকাশিত হয়। অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে লেখমালা’র বছরে একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়, মূলত ফেব্রুয়ারি মাসের একুশের বইমেলাকে উপলক্ষ করে। এই অমূল্য দাদাকে বছরজুড়ে অল্প অল্প অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে লেখমালা’র খরচ মিটিয়ে থাকি। অমূল্যদাও আমাকে বলেছেন, “মামুন ভাই, আপনি বিজ্ঞাপনের কাছে যাবেন না। আমি তো আপনাকে সহযোগিতা করছি।” সত্যিই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মীবান্ধব। এখান থেকেই প্রকাশ পায় আরেকটি ছোটকাগজ ‘পোস্টকার্ড’। এরকম সহযোগিতা তিনি এদেরকেও করে থাকেন। কখনো তিনি ফোন দিয়ে বিলের জন্যে তাগাদা দেন না। এই বিরাট হৃদয়প্রাণ মানুষটির উদারতা, মহানুভব সহযোগিতার কথা লেখমালা সবসময়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে।

অর্থের অপ্রতুলতা ও মনের ভেতরের এক অজানা শঙ্কা ও ভীতি কাটানোর জন্যে ২০১৫ ও ২০১৬, এই দুই বছর মাত্র চার পৃষ্ঠার ডিমাই সাইজের ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশ হয়। তবে এ দু’বছরেও ‘লেখমালা সম্পাদনা পরিষদ’ মোট বারো পৃষ্ঠার দুটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছিল। ২০১৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সংখ্যাটি ছিল প্রথিতযশা কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিকের ৮০ বছর পূর্তিতে ‘আবুবকর সিদ্দিক সংখ্যা’। এ সংখ্যায় লিখেছিলেন কামাল লোহানী, নির্মলেন্দু গুণ, শিহাব সরকার, জাকির তালুকদার, গোলাম কিবরিয়া পিনু, শহীদ ইকবাল, বীরেন মুখার্জী, পিয়াস মজিদ প্রমুখ। তবে বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘সহকর্মীর চোখে’ বিষয়ভিত্তিক রচনা আমার পিতা মুহম্মদ গোলাম রসূলের ‘কাছে থেকে দেখা’ লেখাটি। এছাড়াও আবুবকর সিদ্দিককে লিখিত বিষ্ণু দে, সিকান্দার আবু জাফর, সরোজ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখের লেখা চিঠি, আবুবকর সিদ্দিকের আমার নেওয়া সাক্ষাৎকার এবং লেখমালা’র এই সংখ্যার জন্যে আবুবকর সিদ্দিক লিখেছিলেন একেবারেই নতুন ৪টি কবিতা- এ সবই লেখমালা’র নিজস্ব সম্পদ হিশেবে বিবেচিত হবে। আইয়ুব আল আমিনের পেন্সিল স্কেচ আবুবকর সিদ্দিকের ছবি দিয়ে এ সংখ্যার প্রচ্ছদ নান্দনিক হয়ে উঠেছিল। বলা আবশ্যক, শিল্পী আইয়ুব আল আমিনের করা নামলিপি নিয়েই লেখমালা’র সূচনা। এই শিল্পী এখন পর্যন্ত লেখমালা’র জন্যে প্রয়োজনীয় কার্যাবলী নিঃস্বার্থ ভাবে সম্পাদন করে চলেছেন। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

অন্যদিকে ২০১৬ সালের উদ্বোধনী সংখ্যা অর্থাৎ দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি-ই বিশেষ সংখ্যা হিশেবে ১২ পৃষ্ঠার কলেবরে বের হয়। লেখমালা’র ওই সংখ্যা ছিল সমসাময়িক কবিদের লেখা গল্প নিয়ে ‘কবিদের গল্প সংখ্যা’। গত শতকের নয়ের দশকের কবি এবং একুশ শতকের কয়েকজন কবির লেখা গল্প দিয়ে সাজানো এই সংখ্যা। এর মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে অবস্থানরত কবি অনিন্দিতা গুপ্ত রায়ের গল্প ঠাঁই করে নিয়েছে। লেখক-সূচিতে রয়েছেন- অনিন্দিতা গুপ্ত রায়, আহমেদ স্বপন মাহমুদ, ওবায়েদ আকাশ, গালিব রহমান, চরু হক, জাহিদ সোহাগ, তুষার প্রসূন, দীনা আফরোজ, পিয়াস মজিদ, বীরেন মুখার্জী, মামুন মুস্তাফা, মাসুদার রহমান এবং শিবলী মোকতাদির। এই সংখ্যার প্রচ্ছদ হয়েছিল লেখকদের নিজ হাতে লেখা তাঁদের নাম দিয়ে। বিষয়টিকে অনেকেই অভিনব, নতুনত্ব এবং আকর্ষণীয় হয়েছে বলেই মন্তব্য করেছিলেন সে-সময়।

২০১৫ ও ২০১৬, এই দুই বছর ত্রৈমাসিকভিত্তিতে লেখমালা’র ৮টি সংখ্যা প্রকাশের পর ২০১৭ সাল থেকে লেখমালা বছরে একটি সংখ্যা বই আকারে বের হয়ে আসছে। পুঁজির সাহসিকতা দেখালেও কলেবর বড়জোর ৫/৬ ফর্মার বেশি নয়। লেখমালা পারবে কি এ ধারা অব্যাহত রাখতে? এ প্রশ্ন আগামীর হাতে।