কলেজ রোডের জার্নাল-৩৪ ॥ মামুন মুস্তাফা




যদিও আগামী বলবে লেখমালা’র ভূত-ভবিষ্যৎ। তথাপি এ কথা বলতেই হবে যে, লেখমালা’র দুই সহযোগী সম্পাদক তুষার প্রসূন ও সজল বিশ্বাস না থাকলে আমার একার পক্ষে লেখমালা’কে আজকের পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো না। সময় কিছু কিছু ব্যক্তিকে কাছে এনে দেয়, যাদের সাহচর্য জীবনকে করে তোলে সহজ। সুগম হয় পথ চলা। তাই বোধহয় মানুষ বলে থাকে, ‘সময় বলে দেবে সবকিছু’। জীবনের কোন পর্যায়ে এসে কি প্রয়োজন, কী ঘটবে তা ভবিতব্যই জানে। তাই তো প্রবাদ বাক্য- ‘মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক’।

লেখমালার যাত্রা শুরুতে অনুজ কবি তুষার প্রসূনকে পাশে পেলাম নির্ভরতার প্রতীক হিশেবে। ২০১৪ সালের মধ্য-সময়ে (ঠিক তারিখটি মনে নেই) কনকর্ড টাওয়ারে একদিন কবি তুষার প্রসূনের সঙ্গে ভাবনাগুলো মেলে ধরি। অর্থের সীমাবদ্ধতা, বিজ্ঞাপনের দুরূহতা কিংবা আমাদের পক্ষে কারো দ্বারস্থ হওয়া, তাকে বিরক্ত করা রুচিবিরুদ্ধ- এসব কিছু মেনে নিয়েই সীমিত অর্থে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে লেখমালা প্রকাশে তুষার তার সহৃদয়তার হাতটি এগিয়ে দিলেন। তুষার তখন একটি প্রকাশনীর প্রকাশনা দপ্তরে ব্যবস্থাপক হিশেবে কাজ করছেন। ফলে প্রেস, গ্রাফিক্স সবই তার নাগালের মধ্যে। তাঁর এই জানাটুকু কাজে লাগান লেখমালা প্রকাশের প্রথম পর্যায়ে। আমি শুধু লেখমালা’র সংখ্যাভিত্তিক পাণ্ডুলিপি ইমেল করি তুষারকে। আর তুষার সেসব গুছিয়ে গ্রাফিক্স-মেকআপ দিয়ে ছাপানো-বাঁধাই সবই করে পাঠান। এপিঠ-ওপিঠ ধরে মাত্র চার পাতার শীর্ণকায় লেখমালা প্রকাশ করতে তখন লেগেছিল মাত্র দুই হাজার টাকা। তবে এরই ভেতর মোট ১২ পাতার দুটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। ওই সংখ্যা দুটো করতে তখন সম্ভবত পাঁচ/ছয় হাজার টাকা লেগেছিল। তুষার প্রথম দিনের আলাপচারিতায় বলেছিলেন, “মামুন ভাই, পত্রিকা করলে, না খেয়ে থাকবেন, তবু সংখ্যা মিস দেয়া যাবে না। বিষয়টা মাথায় রাখবেন।” ওর কথা আজও আমি স্মরণ করি। সীমিত আয়ের এই নিম্নবিত্ত সংসারে আমার দুই পুত্র সন্তানের অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা অধরাই থেকে যায়। স্ত্রীর গোপন বাসনাগুলো আলোর মুখ দেখে না কখনো। তবু কবি হতে আসা এক অভাজনের আকাঙ্ক্ষা লেখমালা প্রতি বছর পাঠকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে- একি দুরাচার, না দুরাশা; তার বিচারও আগামীর হাতে থাকলো।

কিন্তু ওই নিম্নবিত্তের সংসারেই তো এখনও কবি হিশেবে টিকে আছেন কবি তুষার প্রসূন। মতদ্বৈততার কারণে চাকরি ছেড়ে দিলেন তুষার। আর কোন চাকরিতে মন বসাতে পারলেন না। সীমিত অর্থে গড়ে তুললেন প্রকাশনী ‘অনুভব’। আজ দুই/তিন বছর ধরে ‘অনুভব’কে প্রকাশনীতে দাঁড় করিয়েছেন তিনি। কিন্তু করোনাও সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু সংসারের সবার সহমর্মিতা তুষারকে সংস্কৃতির পথে হাঁটতে সাহায্য করছে। তাঁর সম্ভাবনাময় কবিসত্তা আমাদের সাহিত্যের জন্যে প্রয়োজন।

তুষার প্রসূন আমাদের একুশ শতকের কবি। বেরিয়েছে তাঁর দুই দুটি কাব্য। কারো কারো আলোচনায় ঠাঁই করে নিয়েছে তাঁর কবিতা স্বমহিমায়, যোগ্যতাবলে। একুশ শতকের শূন্য দশকের কবিদের যদিও রয়েছে প্রচ্ছন্ন যুগসৃষ্টির অন্বেষাকাঙ্ক্ষা, কিন্তু তাঁরা কতটুকু উতরে যেতে পেরেছেন তা বিবেচ্য বিষয়। আর তাই পরিবর্তন প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে প্রচলিত ভাবনার সঙ্গে নতুন চিন্তার সংঘাত এঁদের কবিতায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই দ্বন্দ্ব মূলত কবির দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং সামষ্টিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে স্পষ্ট হতে দেখি। সাম্প্রতিক কবিদের কবিতার নিবিড় পাঠে এই সত্য নিদারুণ ভাবে উঠে আসে। তুষারের কবিতাও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। কবির মনোজলোকে কামনাবাসনার জটিল আবর্ত পরিগ্রহ হতে দেখি তুষারের কবিতায়। পার্থিব জীবনের সব সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতাকে পিছে ফেলে তুষার এগিয়ে যাবেন কবি হয়েই সাহিত্য-সংস্কৃতির পথে, এই আমার কামনা।

অন্যদিকে লেখমালা’র আরেক সহযোগী সম্পাদক সজল বিশ্বাস ছিলেন মূলত একটি এনজিওতে আমার সহকর্মী। দুর্দান্ত মেধা ও মননের অধিকারী এই মানুষটিও পরাস্ত জীবন-জীবিকা ও সংসারযুদ্ধে। সজল বিশ্বাস অসম্ভব শক্তিমান ছোটগল্পের লেখক। প্রথম জীবনে দু’একটি ছোটগল্প বিভিন্ন ছোটকাগজে প্রকাশিত হলেও জীবনবাস্তবতায় হার মানতে হয়েছে সংস্কৃতির সেবক হিশেবে। সজল বিশ্বাসকে আমি জাগাতে চেয়েছিলাম। শক্তিমান এই গল্পকার বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করুক, আমাদের ছোটগল্প জীবন ফিরে পাক, সেই স্বপ্ন থেকেই এই নিভৃতচারী মানুষকে আবারও টেনে আনি সাহিত্যের পথে, লেখমালা’র সহযোগী করে। সজল বিশ্বাস আর তুষার প্রসূন প্রতিটি সংখ্যার আগেই তাদের বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ, লেখক-সূচি নির্ধারণ এবং অনেক ক্ষেত্রে লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেখা সংগ্রহে আমাকে সাহায্য করে চলেছেন। কিন্তু সজল বিশ্বাস পুনরায় জীবন-জীবিকার তাগিদে একটি এনজিওতে চাকরি নিয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়াতে অবস্থান করছেন। ফলে তাঁকে তাগাদা দিয়েও লেখানো সম্ভব হয় না। লেখক সজল বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটেছে বলেই তাঁর ধারণা। অথচ লেখমালা’রই তিনটি সংখ্যাতে তিনি লিখেছিলেন গল্প- ‘দূরায়ত পারাবত’, ‘কাঁসার থালা’ এবং ‘আবু তালেবের তুলি’। এর বাইরেও তাঁর একটি গল্প শহীদ ইকবাল সম্পাদিত ‘চিহ্ন’ লিটল ম্যাগাজিনেও ছাপা হয়েছিল।

এই গল্পগুলো হয়ে উঠেছিল মনুষ্য জীবনের দর্শন। ‘দূরায়ত পারাবত’-এ ঘুণেধরা মার্ক্সবাদের চিত্র। ‘কাঁসার থালা’ ছিল আমারই আদর্শলিপি : পুনর্লিখন কাব্যের ‘থ’ নামক কবিতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। অসম্ভব শক্তিধর কলম না হলে এভাবে গল্প লেখা সম্ভব নয়। আর ‘আবু তালেবের তুলি’ গল্পে বর্তমান প্রযুক্তির কাছে পরাজিত ব্যানার, পোস্টার, সাইনবোর্ড লেখা সেই চিত্রকরদের জীবনট্র্যাজেডি। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এমন শক্তিমান গল্পলেখক থেকে বঞ্চিত হলো, এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। আমাদের অদ্বিতীয় কথাকার, কবি আবুবকর সিদ্দিক লেখমালা’য় সজল বিশ্বাসের গল্প পড়ে বলেছিলেন, ‘একজন প্রকৃত গল্পলেখকের সন্ধান পেলাম’। আমার ব্যর্থতা সজল বিশ্বাসকে গল্প লেখক হিশেবে আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে ধরে রাখতে পারলাম না। কিন্তু তিনি আজও লেখমালা’র একজন হিতাকাঙ্ক্ষী। আর কিছু না হোক, লেখমালা’র প্রতিটি অনুষ্ঠানে এর সহযোগী সম্পাদক হিশেবে আর্থিক অনুদান দিয়ে চলেছেন।

লেখমালা এ-বছর যে প্রকাশনার পথে যাত্রা করলো, তাও এর সহযোগী সম্পাদক কবি তুষার প্রসূনের সম্পূর্ণ আনুকূল্যে। তাঁর পরামর্শ, প্রত্যক্ষ দেখভালে বেরিয়েছি পাঁচ কবির পাঁচটি এক ফর্মার অনুকাব্য। লেখমালা প্রকাশনার হাতেখড়ি হিশেবে। লেখমালা যে, প্রতি ২ বছর পর পর সাহিত্যের তিনটি শাখায় সম্মাননা জানিয়ে আসছে, তারও সমান ভাগীদার তুষার প্রসূন ও সজল বিশ্বাস। অনুষ্ঠান আয়োজন, ব্যানার, আমন্ত্রণপত্র, অতিথি যোগাযোগ, আপ্যায়ন- সব ক্ষেত্রেই এই দু’জন সহযোগী না থাকলে লেখমালা’কে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ। সবথেকে বড় বিষয়, আমার যোগযোগের ক্ষেত্র সব শাখাতেই সীমিত। সেখানে তুষার প্রসূন লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে শুরু করে এর বিপণনেও সাহায্য করে চলেছেন। সজল বিশ্বাসও এ কাজটি প্রথম দিকে করেছিলেন বিধায় তার নিজ শহর পাবনার বিভিন্ন স্থানে লেখমালা পরিচিত নাম।

লেখমালা কতদিন চলবে? উত্তর এর পুঁজির সরবরাহ যতদিন আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে। ঠিক ততদিনই স্বর্ণাক্ষরে এর সহযোগী সম্পাদক হিশেবে দুটি নাম জ্বলজ্বল করবে সন্ধ্যাকাশে শুকতারার মতো- তুষার প্রসূন ও সজল বিশ্বাস। আমার এই দুই প্রিয় বান্ধবকে তাদের মঙ্গলময় জীবন কামনা ছাড়া আর কিছুই দেবার নেই। কৃতজ্ঞতা তুষার প্রসূন, সজল বিশ্বাস।