কলেজ রোডের জার্নাল-৩৫ ॥ মামুন মুস্তাফা



এ কথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি আজ, যে, পেশা আমার কি হবে জানা ছিল না; কিন্তু কবি আমাকে হতে হবে, সেই স্বপ্নকাজল ছিল আমার দুই চোখে। দক্ষিণের জেলা শহর বাগেরহাটের লোনা বাতাস আর লোনা জলের হাহাকার ছিল আমার শরীরে। দড়াটানার শান্ত ঢেউ মনের গহীনে। সারি সারি নারকেল, সুপারি আর তাল গাছের নিচের দুরন্ত বিকেল আমার পায়ে পায়ে ফেরে। সেই মুখরতাগুলো উঠে এলো আমার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলে বসে যে কবিতা লিখছি- তা কি কবিতা? নিজেকে গড়ে নিতে বিভিন্ন সাহিত্য আসরে যাচ্ছি, মুখর সাহিত্য সংগঠন করছি, প্রতিটি একুশের বইমেলায় প্রিয় কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় ও সংস্পর্শে আসছি। এ-সময়েই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরদার ফজলুর করিম আমার ভেতরের লেখক সত্ত্বাকে পূর্ণতা দিচ্ছেন। আর এ ভাবেই গত শতকের মধ্য নয়ের দশকে জাতীয় কাগজগুলোতে নিয়মিত ভাবে একটি কবিনাম উঠে এলো ‘মামুন মুস্তাফা’। ওই নয়ের দশকের শেষে প্রকাশ পায় প্রথম কাব্য ‘সাবিত্রীর জানালা খোলা’।

এরপর কুহকের প্রত্নলিপি, এ আলোআঁধার আমার, আদর্শলিপি পুনর্লিখন- আমার এ কবিতার বইগুলোর কথা আগেই আলোচিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ের কয়েকটি বইয়ের প্রসঙ্গ অবধারিত ভাবে বলা উচিত বলে মনে করি। কীভাবে লিখলাম শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি! জীবনের এক গার্হস্থ্য সময়ের টান। সংসারের ক্ষুণ্নিবৃত্তিতে পথ চলি আমরা সবাই। চলছি স্ত্রী ও আমি। তখন তিনি দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, পরবর্তীতে তিনটি শাখার ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি কোস্টাল ফিশারফোক কমিউনিটি (কফকন) নামক এনজিওতে কাজ করি। আমার প্রথম সন্তান ওয়াসিল বিল্লাহর জন্ম। তাকে দেখাশোনার জন্যে আমার শালিকা রীতা চলে এলো আমার বাসায়। আমার ছোট ছেলে আরিজ বিল্লাহ হওয়া পর্যন্ত প্রায় ৪/৫ বছর রীতা আমাদের কাছেই ছিল। বিএ পাশ করেছে সে। এরপর আমরাই তাকে বিয়ে দিলাম। তখন তার স্বামীও ব্র্যাক ব্যাংকের অফিসার। ওরা বাসা নিল মোহাম্মদপুরে। এখনও সেখানেই থাকে।

কিন্তু ওই যে চার/পাঁচ বছর আমাদের যৌথ জীবনযাত্রা, তার চলচ্ছবি আমার কাব্য শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি। কাব্যের তিনটি ভাগ- আদি পর্ব, মধ্য পর্ব ও অন্ত্য পর্ব, এর ভেতরে সংসারজীবনের উত্থানপতন বর্ণিত হয়েছে ইংরেজি রোমান্টিক যুগের পার্সি বিশী শেলী’র ‘স্কাইলার্ক’ কাব্যের অনুসরণে। ঘোর লাগা সময়, ঘুনে খাওয়া সমাজ বাস্তবতার পাশাপাশি পরিবার, যৌথ জীবনের টানাপোড়েন আর বিচ্ছেদের সুন্দরতম বলিরেখায় এ কাব্যের কবিতা-নির্মাণ। শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি মূলত পার্থিব সংসারযাত্রায় একজন ব্যক্তিমানুষের মনোজলোকে ঘটে যাওয়া আর্থ-সামাজিক বিবর্তনগুলোর সারনির্যাস। এর কবিতাগুলোয় সংকেত ও চিত্রকল্পের আড়ালে উঁকি দেয় পারিপার্শ্বিকতা, যেখানে নিজস্ব বোধ ও অনুভূতির সঙ্গে মিলেমিশে গড়ে ওঠে সমাজনির্ণিত পরিবেশ ও প্রতিবেশের সামষ্টিক সংকট। আর তখনই মানবমনের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও অসহায় রক্তক্ষরণের দলিল হয়ে ওঠে এর কবিতাগুলো। দীর্ঘ সংসারযাত্রা আশা-স্বপ্নভঙ্গের ছাইভস্ম, তার ভেতরের যে অনুরণন, পরবর্তীতে ব্যক্তির অন্তিম মনোজলোকে ঘটে এক অদ্ভুত দার্শনিকতার মেরুকরণ। জীবনের জটিল বিন্যাসে জর্জরিত ব্যক্তিসত্তার ক্লেশ-নৈরাশ্য ও এক ধরনের দার্শনিক অন্তর্মুখীনতা আমার শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি কাব্যের মূল সুর।

অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের কিছু কালজয়ী গল্প-উপন্যাসের নারী চরিত্রের কাঁটাছেড়া আমার শিখাসীমন্তিনী কাব্য। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা থেকে আবুল বাশারের ফুলবউ পর্যন্ত যে কয়টি নারী চরিত্র এ কাব্যে বর্ণিত হয়েছে, তাদের মধ্যে মানবমনের জাগরণ আমি দেখতে পেয়েছি। যেখানে তারা সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। আদিকাল হতে এই পৃথিবীতে দুহিতা, দয়িতা আর জননী রূপে নারীর আত্মপ্রকাশ। জগতসংসারের আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, আশা-নিরাশার দোলাচলে ঐ ত্রিবেণী সঙ্গমে নারী কখনো প্রেমাসক্ত, স্নেহপরায়ন আবার কখনো রুদ্র, বিপ্লবী, ভয়ংকরী। তবুও সংসারযাত্রার বন্ধুর পথে নারীই হয়ে ওঠে ‘সর্বংসহা’। বাংলা কথাসাহিত্যের এমন কিছু কালজয়ী নারী চরিত্রের ভেতরবাহির শিখাসীমন্তিনী কাব্যের পঙক্তিমালায় ঠাঁই করে নিয়েছে। বলা যায় শিখাসীমন্তিনী নারীর সৃষ্টিশীলতার বহুমাত্রিকতাকে ওইসব নারী চরিত্রগুলোর স্রষ্টাদের চিন্তাজগতের সঙ্গে আমার কবিসত্তার সমীকরণ ঘটেছে।

আর একাত্তরের এলিজি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বর্ণনা করছে সত্যভাষণের অগ্নিকুণ্ডলীর মধ্যদিয়ে। একাত্তরের এলিজি প্রথমা প্রকাশিত ‘একাত্তরের চিঠি’ অবলম্বনে রচিত শোকগাথা। যুদ্ধদিনের ভয়ংকর বন্ধুর পথযাত্রা আর পেছনে ফেলে আসা আত্মীয়স্বজনের জন্য হাহাকার- এসব কিছুর এক নির্ভেজাল দিনলিপি কবিতার দ্রাঘিমায় মর্মমূলে আঘাত হানে একাত্তরের এলিজি। আমার সময়ের উল্লেখযোগ্য কবি মাহবুব কবির একাত্তরের এলিজি সম্পর্কে বলেন, “সেই রক্তাক্ত সময়ে রণাঙ্গন থেকে লিখিত অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধার চিঠিতে নিহিত জীবনবৈচিত্র্য, তার সংঘর্ষ ও গতি, প্রত্যাশা ও অচরিতার্থতা, সংক্ষোভ ও যন্ত্রণা এবং সর্বোপরি তার সীমাবদ্ধতা বা সম্ভাবনার সমন্বিত পরিচর্যায় উদ্বেলিত মামুন মুস্তাফার সপ্তম কবিতাগ্রন্থ একাত্তরের এলিজি। … কবির সময়কালের একজন হিসেবে বলবো এটি আমাদের জন্য একদিকে আনন্দের, অন্যদিকে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের এক অনস্বীকার্য ইতিহাস।” জীবনভর লিখতে চেয়েছিলাম কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমানের ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাগ্রন্থের মতো একটি স্বদেশবন্দনামূলক কাব্য। অবশেষে ‘একাত্তরের চিঠি’র মধ্য দিয়ে ৪০টি চিঠির কাব্যিক রূপ আমার একাত্তরের এলিজি।

সবশেষে যে কাব্যের কথা বলবো, সেটি হচ্ছে কফিনকাব্য। মৃত্যুদর্শনমূলক এ কাব্যে মৃত্যুকে নতুন ভাবে দেখা অথবা চেনা। কসাই, খুনি থেকে শুরু করে বিচারক, নর্তকী, ঢুলি, মাঝি, মুচি, গোরখোদক, জ্যোতিষ- সমাজের এমন সব নানা শেণি-পেশার মানুষের চোখে মৃত্যুকে চেখে নিতে চেয়েছি ভাবদর্শনের অন্য লোকে। ‘কসাইয়ের চাপাতির নিচে মাংসের দলা’ অথবা ‘জুতা সেলাইয়ের ভেতরে জেগে থাকে অনুকাব্য’ কিংবা ‘জল্লাদের দড়ির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল কেউ কেউ’- এমন সব বাক্যের তোড়ে মৃত্যু সমীচীন হয়ে ধরা দিয়েছে আমার মনোজলোকে। আমার বন্ধু প্রাবন্ধিক শহীদ ইকবাল আমার এসব কাব্যের সমালোচনায় যথার্থই বলেছেন :

“মামুন মুস্তাফা নিজেকে মেলে ধরেছেন অতঃপর শিখাসীমন্তিনী থেকে অন্য এক লয়ে। সেটি তিনি খুঁজে নিয়েছেন, আলাদা রঙে। পঠনের ধারাবিবরণীতে আমি মনে করি এটি দ্বিতীয়পাঠ। বিষয় : গোলাপ সুন্দরী বা সাহেব বিবি গোলাম ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অনিন্দ্য পাঠ-সংবেদ। নির্ভার হয়ে এসব কাব্যে ফুটে উঠেছে কুসুমকান্তি লোভনরূপ। ফুটন্ত গোলাপকুসুম যেন। বেশ আনন্দদায়ক। পুনঃপাঠ এতো নিবিড় ও নিমগ্নপ্রবণ হতে পারে, এই কবিতাগুলোই তার প্রমাণ। ঠিক সেইটিই পৌঁছেছে একাত্তরের এলিজিতে। এই দুটি কাব্য কবিকে অন্য উচ্চতা দিয়েছে। তুলনীয় না করেও বলা চলে, এ এক অন্যেতর উচ্চাভিলাসী অভীপ্সা- যা আমাদের বৃত্তকে বিস্তৃত করে, মুক্ত-নিসর্গের হাওয়া টেনে নেয় ভেতরে আর গড়ে দেয় সর্বার্থদ্যোতক রসনিষ্পত্তির অকুণ্ঠ-চাল। স্বতঃস্ফূর্ততার কথা কবিতায় আছে কিন্তু তার ভেতরে যে দুর্মর মননের টান সেটি অপ্রকাশ্য নয়। নানান রঙে অর্থাৎ ইতিহাস, নৃ-জীবন, স্মৃতি-শ্রুতি পূর্ণ প্রশ্বাসে প্রতিধ্বনিত। এটি শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ির ভেতরে নির্বাধ হয়ে ধরা পড়েছে। …একটা চরম নিরীক্ষার শাসন এতে ঘনীভূত, কোনোরকমের পুনরাবৃত্তিক কণ্ঠ যেন চেপে না বসে সে সামর্থ্যটি দেখানো, ঋজু প্যাসেজের মনোলগিক কানেক্টিং প্রণালী, শব্দকে তাবৎ ঐতিহ্য ও অনানুষ্ঠানিকতার ভেতর পুরে দেওয়ার যোগ্যতর অটুট প্রচেষ্টা- ইত্যাকার অভিমুখে কবির কাব্যপ্রবাহ সমস্ত প্রতিরোধ ছাপিয়ে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলে। ফলত, এটি একটি স্পেলও বটে। সে স্পেলটি যে শেষ হয়ে গেছে- তা নয়। মনে হয়, একটা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এটির পূর্ণ পর্যাবৃত্ত পরবর্তীতে এখন দেখার বিষয়।”

তবে আমি আমার প্রতিটি কাব্যের উত্তরণে বিষয়-প্রকরণে স্বতন্ত্র হতে চেয়েছি। আর আমার কবিতায় মুখ্য হয়ে উঠেছেন ব্যক্তি। তার স্বকাল সঙ্কটকে ধারণ করতে চেয়েছি একজন ব্যক্তি মানসের চারিত্র্যে। তবে নস্টালজিয়া অনেক ক্ষেত্রেই আমার কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। আমি স্বীকার করছি তা অনেক সময় পাঠকের কাছে একঘেয়ে মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তি যেখানে মুখ্য, সেখানে নস্টালজিয়া সহজাত। আবার মৃত্যু-দার্শনিকতা ভর করেছে আমার কবিতায় অনেকখানি। বস্তুত এ কয়েকটি বিষয় আমার কবিতার স্বাতন্ত্রিকতা প্রমাণ করতে যথেষ্ট। জানি না তা কতখানি ছুঁয়ে যাবে পাঠককে। অবশ্য আমি মনে করি সে দায়ভারও কবির নয়।

একথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কবিতার অধিবাস। সৃষ্টিশীল মানুষ তার মৌলিকত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কবি হিশেবে আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তাই আমার কবিতার পশ্চাতেও কাজ করেছে মৌলিকত্ব। সুতরাং প্রচলিত রীতিনীতি, আচার-প্রথা, বিশ্বাসকে অস্বীকার করে নয় বরং এগুলোর হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সাক্ষী করেই গড়ে উঠেছে আমার কবিতা। সর্বোপরি ব্যক্তি আবেগ, উত্তাপ, অনুভূতি-বোধ থেকে কবিতা জন্ম নিলেও সৃষ্টিশীল কবিতা চিরকাল মুক্ত মানবতার সপক্ষে, আমি মনে করি আমার কবিতাও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। এ এক আরোগ্য হাসপাতাল। আমার কবিতা নিয়ে এই আমার জবানবন্দি।