কলেজ রোডের জার্নাল-৩ ॥ মামুন মুস্তাফা


আমার প্রথম রচিত সাহিত্যকৃতি ‘চলো দরগায় যাই’। কিন্তু নাটকের প্রতি ঝোঁক কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল বলা মুশকিল। তবে আমার পিতার বিমল মিত্র আর মায়ের আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বইয়ের ভিড়ে এবং সেসবের চলচ্চিত্রায়নের খবর বাবা-মায়ের মুখে শুনে নাটকনামক সাহিত্যের চরিত্রগুলোর সংলাপ আমাকে আকৃষ্ট করে। সেই ছেলেবেলাতেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার একক অভিনয় করেছি বহুবার। ‘সাজাহান’ নাটকের মুখ্য চরিত্র তথা শাহজাহান আজও আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। গত শতাব্দীর সাতের দশকের শেষ ধাপ, তখনও আমাদের বাড়িতে বইয়ের আলমিরা হয়নি। আট-দশটি ট্রাঙ্কের ভেতরে বাবা-মায়ের বিমল আর আশুতোষ মুখোমুখি বসে। আমার ওই বালক বয়সে সেসব সাবাড় করেছি অন্ধের মতো। প্রথম পড়ি ক্লাস ফাইভে বিমল মিত্রের ‘কেউ নায়ক কেউ নায়িকা’। আজ তার কিছুই মনে নেই, শুধু বইয়ের নামটি ধারণ করেছি মনেপ্রাণে। আর এসব পড়তে পড়তেই নারী চরিত্র বর্জিত নাটক লিখে বন্ধুদের নিয়ে তা মঞ্চস্থ করা নেশায় পরিণত হয়েছিল। বাড়ির বারান্দার এক কোণে চৌকি ফেলে, কখনো মায়ের শাড়ি দিয়ে আবার কখনো বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা বানিয়ে চলতো অনুষ্ঠান- কৌতুক, আবৃত্তি, সংবাদ পাঠ এবং নাটক। একবার এক সংবাদ পাঠ লিখে দিলেন পি সি কলেজের মুসলিম হোস্টেলের ছাত্র সম্ভবত ‘বাদশা ভাই’ (নামটা সঠিক করে মনে নেই) এবং সংবাদ পাঠকের নাম দিলেন ‘মোস্তফা বেন্টিঙ্ক চক্রবর্তী’। উল্লেখ্য, আমার ডাকনাম ‘বেন্টিঙ্ক’। বাবা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, তদুপরি ইতিহাস তার প্রিয় বিষয়। এই ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ছিলেন তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাই তার নাম অনুসারে আমার নাম তিনি রাখেন ‘বেন্টিঙ্ক’। এ নামেই আমার জন্মশহর বাগেরহাটের অনেকে আমাকে চেনে, জানে, ডাকে। আর তাই আমার স্মৃতির পাতায় আজও অক্ষয় হয়ে আছে ‘মোস্তফা বেন্টিংক চক্রবর্তী’।

যাহোক- ঈর্ষা, তির্যক দৃষ্টি, তাচ্ছিল্য- এসব আব্বার কোনো কোনো সহকর্মীর কাছ থেকে যে আসেনি, তা নয়। বিদ্রুপ বাক্যও কখনো কখনো আব্বাকে শুনতে হয়েছিল। ফলে কড়া শাসনে মাঝে মাঝে এসব বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু কিছুদিন পড়ে আবার রক্তে মিশ্রিত এই নেশা টগবগ করে ফুটতে থাকে। এসময় বন্ধু হিসেবে অনেককেই পেয়েছি। তবে জাকিরের নাম প্রথমেই বলতে হয়। মো. জাকির হোসেন। আমার এ বন্ধুর পিতা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী। পি সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। প্রতি রাতে বাগেরহাটের নন্দিত নদী দড়াটানা দিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি বাদোখালিতে যেতেন স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে। এমনই এক যুদ্ধের রাতে দড়াটানা নদীতে নৌকায় পেছন থেকে শত্রুপক্ষের কে বা কারা তাঁকে গুলি করে। তিনি তখন গ্রামের বাড়িসংলগ্ন ঘাটে একটি বাঁশের মাচা ধরে নৌকায় লুটিয়ে পড়েন বিধায় ভেসে যাননি। নৌকার মাঝি নদীতে ঝাঁপ দেয় আত্মরক্ষার্থে এবং পরে ক্যাম্পে এসে খবর দেয়। প্রায় ২/৩ ঘণ্টা পর ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা এসে তাঁকে উদ্ধার করে, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। সাত ভাইবোনের মধ্যে আমার বন্ধু সবার কনিষ্ঠ। সে তখন আমারই মতো একেবারেই শিশু সন্তান। পিতৃস্নেহ আর তার পাওয়া হয়নি, কিন্তু চেতনায় লালন করে পিতার আদর্শ।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ভয়াল দিনগুলোতে আমার বাবা-মাও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে ছুটে বেরিয়েছেন এদিক-সেদিক। কখনো আমার নানাবাড়ি চিতলমারীর কাঠিপাড়ায়, আবার কখনো ফিরেছেন বাগেরহাট শহরে নিজের ভাড়া করা বাসায়।
গোবরে যেমন পদ্মফুল ফোটে, তেমনি জ্ঞানীর ঘরেও জালেম জন্ম নেয়। বলছি এ কারণে যে, যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার পথে, তখন দেশের সূর্য সন্তানদের বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর- রাজাকার, আলবদর, আল শামস-এর দল। ঠিক ওই মুহূর্তে বাগেরহাটের কুখ্যাত রাজাকার রজব আলী আব্বাকে ধরে নেওয়ার জন্যে তার শকুনদের পাঠিয়েছিল পর পর দু’রাতে। কিন্তু বিষয়টি জানতো তারই দলে পরোক্ষ ভাবে যুক্ত একজন, যিনি ‘মোশাররফ মল্লিক’ নামে পরিচিত। আমরা থাকতাম বাগেরহাটের তৎকালীন মুসলিম লীগের সভাপতি ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেনের পুরাতন বাজারে অবস্থিত দোতলা বাড়িতে। ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেন নিতান্তই একজন ভদ্রলোক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুসলিম লীগের লোকজন শান্তি কমিটি গঠন করে বিরুদ্ধ মতাদর্শীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন, হত্যা করা শুরু করলে ডাক্তার মোজাম্মেল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি এ বর্বরোচিত কার্যক্রমকে মেনে নিতে পারেননি। আর তখনই ওই পদে আসীন হয় বাগেরহাটের কুখ্যাত রাজাকার হিসেবে খ্যাত রজব আলী। উল্লেখ্য ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেনের এই দোতলা বাড়িতেই আমার জন্ম। এই বাড়ির সামনে ছিল বিস্তৃত উন্মুক্ত একটি মাঠ। এই মাঠের ভেতরেই ছিল একটি গোলপাতার কুঁড়েঘর। এখানেই থাকতেন মোশাররফ মল্লিক। তিনি আব্বাকে বলেছিলন, ‘স্যার রাতে যদি কেউ আপনাকে ডাকে, তবে বলবেন আমার কথা, আমাকে ডাকার কথা বলবেন’। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর দুই রাতেই আব্বাকে নিয়ে যেতে এসেছিল। প্রথম রাতে ডাকাডাকি করে চলে যায়। আব্বা কোনো সাড়া দেননি। ১৫ ডিসেম্বর রাতে তারা ডাকাডাকির সঙ্গে ঘরে প্রবেশ করতেও চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু মল্লিক সাহেব টের পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং হাঁক দেন, ‘এই কে রে? স্যারকে ডাকে কে?’ তার সাড়া পেয়ে শকুনেরা চলে যায়। আর পরের দিনই তো পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক এক রাষ্ট্রের জন্ম হয় এদিনই রাজাকার রজব আলী আত্মহত্যা করে।

আব্বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আজীবন একটি আদর্শিক চেতনা লালন করেছেন নিজের ভেতরে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সুশাসন আর সুশিক্ষায় তিনি দেশ ও জাতিকে তৈরি করতে ব্যাপৃত ছিলেন তার ছাত্র-ছাত্রীদের আদর্শিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ভেতর দিয়ে। আর তাই তার কোনো কোনো ছাত্র জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েও চিঠি লেখেন, ‘স্যার, আপনারা যা শিখিয়েছেন, তা আজকের দিনে অচল, এই সমাজের জন্যে ভুল’। আজ তাই দেখতে পাই, মানুষ খুন করা কত সহজ বিষয়, দুর্নীতি যেন প্রতিদিনের একটি আবশ্যিক কাজ। অথচ সেই ঘোর দুর্দিনেও স্বল্পশিক্ষিত মল্লিক সাহেবের ভেতরেও কিছু মনুষ্যত্ব কাজ করেছিল। আজ তাই তাকে স্মরণ করতে কোনো দ্বিধা নেই। ওই ব্যক্তিটি অনেকদিন হয় পরলোকে যাত্রা করেছেন। তার সন্তানেরাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, আর তার কুঁড়েঘর এখন ‘মাল্টি-স্টোরিয়েড বিল্ডিং’।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক-মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হয় লাখো শহীদের আত্মদান বৃথা যায়নি তো! তারা যেভাবে চেয়েছিলেন, সেভাবে দেশকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি আমরা? আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কোনো এক বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পুত্র বলেছিলেন, ‌’আজ ভাবি, বাবা চলে গিয়ে ভালোই করেছেন, তিনি এ বাংলাদেশকে দেখলে দুঃখ পেতেন। তিনি তো এমন বাংলাদেশ চাননি।’

আমার জন্মলগ্নের বিজয় উৎসব আমি দেখিনি। কিন্তু জ্ঞান হবার পর প্রতিটি বিজয় উৎসব প্রত্যক্ষ করেছি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের প্রস্তুতিপর্ব ছিল দীর্ঘ, রক্তাক্ত আর কন্টকময়। শুধু ধর্ম দিয়ে গঠিত রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। দেশভাগের ওপর কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস ‘পূর্ব পশ্চিম’-এ আমরা দেখি, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনরত ভারতবাসীর মিছিল যাচ্ছে, স্বাধীনতার স্লোগান হচ্ছে। তা দেখে ছোট একটি বালক বাবাকে জিজ্ঞাসা করছে- “বাবা স্বাধীনতা কত দূর?” সন্তানের প্রশ্নে ওই পিতা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। সেই অক্ষমতা আজও জাজ্বল্যমান। স্বাধীনতা মানে যার যা খুশি তা করা নয়। অথচ তেমনটাই ঘটে চলেছে। তা না হলে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীকালেও মনাবসেবায় উৎসর্গীকৃত ত্রাণ কেন লুটে খাবে জননেতা ও সেবক নামের ভিক্ষুকের দল!

আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে এখন প্রয়োজন তারুণ্যের শক্তি। যে তরুণের রক্তশোণিত বেয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সেই বিজয়ধারা সমুন্নত রাখতে আজ নতুন প্রজন্মের তারুণ্যকে এগিয়ে আসতে হবে ইতিহাসের সত্য-স্মারকচিহ্নিত পথ বেয়ে। তবেই আগামীর বিজয় উৎসবে বাঙালি মুক্তচিত্তে কণ্ঠে ধারণ করবে শামসুর রাহমানের স্বাধীনতার অমোঘ কবিতা- “স্বাধীনতা তুমি/রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো/মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-/স্বাধীনতা তুমি/শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারীর উজ্জ্বল সভা/স্বাধীনতা তুমি/পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।/…স্বাধীনতা তুমি/বাগানের ঘর, কোকিলের গান,/বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,/যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।”

সেই স্বরচিত কবিতার খাতায় আমিও লিখে রেখে যেতে চাই আমার বন্ধু নির্লোভ, সৎ ও সাহসী মানুষ জাকিরের কথা। ছাত্রাবস্থাতেই প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। বামরাজনীতির একনিষ্ঠ সেবক। কলেজ থেকে যার যাত্রা শুরু। অনেক মেধাবী, রাজনীতি ও সমাজবিশ্লেষক; আবার একাধারে রুচিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। আমার এই বন্ধু জীবনে উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে কখনো পিতার মুক্তিযুদ্ধকে বিক্রি করেনি, মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেটকে অবমাননা করেনি। তাই সে আজ ছোট মফস্বল জেলা শহর বাগেরহাটে ‘কোডেক’ নামক একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। এ দেশ ও জাতির দশাশই চেহারা দেখে আমার পিতা বলেন, ‘আমরা বই পড়তে পারি, অক্ষর-জ্ঞান আছে, সার্টিফিকেট অর্জন করেছি। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত হতে পারিনি’। সেখানে আমার বন্ধু জাকির হোসেন একজন স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত মানুষ। আর এখনও এমন দু’একজন মানুষ আছেন বলেই ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’।