কলেজ রোডের জার্নাল-৪ ॥ মামুন মুস্তাফা


বাংলাদেশকে তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে প্রয়োজন আগামীর তারুণ্যকে আদর্শিক চরিত্রে ও সমাজভাবনায় গড়ে তোলা। এ কারণেই দরকার বাংলা ও বাঙালির সঠিক ইতিহাস জানা। সেই লক্ষ্যে বইবিমুখ জাতিকে বই পাঠে আগ্রহী করে তুলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রসরমানতার ভেতরেও বর্তমান প্রজন্মকে বই পাঠে উৎসাহিত করতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আর সেদিকেই নজর দেওয়া উচিত আমাদের নীতিনির্ধারকদের। জানাতে হবে একাত্তরের ডায়েরি, একাত্তরের দিনলিপি, আমি বিজয় দেখেছি, মুক্তিসংগ্রাম, বন্দী শিবির থেকে কিংবা যখন উদ্যত সঙ্গীন-এর মতো বইগুলোর কথা। যেখানে রয়েছে এই ভূ-খণ্ডের সত্যনির্যাস। যা পাঠের ভেতরে একজন তরুণ চিনবে নিজেকে, জানবে পূর্বাপর তার সময়কে। আমরা কি সেই দিকে হাঁটছি? ভাবতে হবে সমাজচিন্তকদেরও।


জিপিএ-৫-এর পেছনে দৌড়িয়ে অভিভাবকরাও ভুলে গেছেন ‘পাঠাগার’ বলে একটি বস্তু প্রায় প্রতিটি শহরেই একসময় দৃশ্যমান ছিল। আজকাল কেউ আর তার সন্তানকে লাইব্রেরির সদস্য করেন না। নিজের বাড়িতেও বই কেনার চল নেই। এখনকার স্কুলগুলোতেও লাইব্রেরিনামক বস্তুটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের ছেলেবেলায় প্রতি সপ্তাহের শেষ দিনে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে পছন্দ মতো একটি বই নিয়ে যাওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। আমার লেখকসত্তা তৈরি করার পেছনে একেও অস্বীকার করা যাবে না। আমি তখন পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণিতে বাগেরহাটের সবচেয়ে পুরনো স্কুল ‘বাগেরহাট টাউন স্কুলে’ পড়ি। মূলত এর নাম ‘বাগেরহাট বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’। ওই সময় সপ্তাহের শেষ দিন নিয়ম অনুযায়ী একটি গল্পের বই নিয়েছিলাম, পরের সপ্তাহে জমা দিলে শ্রেণি শিক্ষক (নামটা মনে নেই বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) বললেন ‘তোমরা যে যা পড়েছ তার ওপর ভিত্তি করে একটি গল্প লিখে আনবে।’ সেদিন আমিও গল্প লিখেছিলাম। যেখানে গল্পের নায়িকা গরুর দুধ বিক্রি করতো। গল্পের নাম ছিল ‘মালতী’। ওই ‘মালতী’ অলক্ষে আমাকে লেখক করে তুলেছে। তার কাছেও আজ ঋণ স্বীকার করি। আজ মনে হয় ‘মালতী’ বোধহয় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের ‘ঠাকুরঝি’র আদলে গড়ে উঠেছিল।


ক্লাস সেভেনে আমি চলে আসি বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে বলা দরকার, বাগেরহাট টাউন স্কুলের প্রতিষ্ঠা ১৮১৮ সালে। ওই স্কুলে মৌলভীর শিক্ষক হিশেবে ছিলেন আমার মায়ের দাদা কাজী নওয়াব উদ্দিন আহমেদ। তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও তিনি পার্সি ভাষা শিক্ষা দিতেন। অনেক ধর্মীয় গ্রন্থের রচয়িতাও তিনি। এমনকি তিনি পয়ার ছন্দে ‘ভাব-লাব’ নামে একটি উপন্যাসও রচনা করেন। বাগেরহাট পি সি কলেজ যখন আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করা হয়, তখন মুসলিম ধর্মের একজন পল্ডিত এবং হিন্দু একজন পুরোহিতকে আমন্ত্রণ জানানো হয় দোয়া-প্রার্থনার জন্য। তখন আমার মায়ের এই দাদা কাজী নওয়াব উদ্দিন আহমেদকে নিমন্ত্রণ জানায় কলেজ কর্তৃপক্ষ। তিনি সেদিন দোয়ার পাশাপাশি দোয়া-দরুদ লেখা একটি কাগজ একটি বোতলে ভরে কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে দেন। তারা সেটি মাটিতে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রাখেন, যেন কোনো অপশক্তি কলেজের কোনো ক্ষতিসাধন করতে না পারে। যে জায়গাটিতে ওই বোতল প্রোথিত করা হয়, ঠিক সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে কলেজ-প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের মূর্তি। এই ইতিহাসও আজ আমার গর্বের।


বাগেরহাট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাংলার শিক্ষক হিশেবে পেলাম সাহাবুদ্দিন স্যারকে। সাহাবুদ্দিন স্যারের নিরন্তর অনুপ্রেরণা আমাকে সাহিত্য রচনার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। স্যারের পরামর্শ, উপদেশ আমাকে ও আমার বন্ধু জাকিরকে দেয়াল পত্রিকা করার অনুপ্রেরণা জোগায়। জাকির আর আমি অনেক দেয়াল পত্রিকার জন্ম দিয়েছি। সাহাবুদ্দিন স্যারও আজ আর নেই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। এর পরপরই দুই বন্ধু মিলে প্রথম হাতে লেখা ছোটকাগজ ‘শালবীথি’ বের করি। যতদূর মনে পড়ে ওই সময় আমরাই প্রথম হাতে লেখা সাহিত্যপত্রিকার জন্ম দেই। সেসব আজ ইতিহাস। আমাদের ওই হাতে লেখা পত্রিকায় বাগেরহাটের বয়োজ্যেষ্ঠ সাহিত্যপুরুষ বীরেন্দ্রনাথ (চট্টোপাধ্যায়?) যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ষাটের কবি, পি সি কলেজের বাংলার শিক্ষক আবুল কাসেম স্যারও। আবুল কাসেম স্যার যে ছড়াটি আমাদের দিয়েছিলেন, আজও তার চারটি লাইন আমার বন্ধু জাকিরের মুখস্ত- “রাধাচূড়ার গাছের ছায়/সেই ছেলেটি খেলতে যায়/মেঘ এলো গো মেঘ এলো/আকাশজুড়ে মেঘ এলো”। হাতে লেখা পত্রিকা ‘শালবীথি’র অবশ্য মাত্র দুটো সংখ্যা আমরা বের করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এর পরে অনেকের সহায়তায় আমরা প্রিন্ট ভার্সনে বের করি একটি ছোটকাগজ, যার নাম ‘চোখ’। এই ‘চোখ’ লিটল ম্যাগটির কয়েকটি সংখ্যা বের হয়েছিল। আজ অনেকদিন পরে বাগেরহাট পি সি কলেজের শতবর্ষকে সামনে রেখে বাগেরহাটের আরেক কৃতিসন্তান বরেণ্য আবৃত্তিকার আমাদের অগ্রজ নাজমুল আহসান (নাজমুল ভাই) বের করেন ‘চোখ’। যেখানে পি সি কলেজ ও বাগেরহাটকেন্দ্রিক অনেক স্মৃতিকাতরতা জমা হয়েছে বিভিন্ন প্রান্তের বিদগ্ধজনদের লেখায়।


এই যে বাগেরহাট শহরের শ্যামল প্রকৃতি ও তার সংস্কৃতিমনা মানুষজনের স্পর্শে আমার সাহিত্যকৃতির ভিত রচিত হয়েছিল, তাকে পরবর্তীতে কংক্রীটের ঢাকা শহরের ধুলোবলি ওড়া বাতাসে মলিন হতে দেইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে যুক্ত হলাম ‘মুখর’ নামক একটি সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে। মান্নান মোহাম্মদ ছিলেন এর সভাপতি। তিনিও আজ লোকান্তরিত। আমি প্রথমে এর সদস্য, পরে সহ-সাহিত্য সম্পাদক থেকে সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু তখন আমার সঙ্গে যারা লেখালিখি করতেন। তাদের মধ্যে আমি ও কবি আসাদ কাজল এখনও লেখাকে সঙ্গী করে বেঁচে আছি। মনে পড়ে ‘মুখর’-এর শততম সাহিত্যসভা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে পালন করেছিলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমান এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন শিশু সাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন।


অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে কবি শামসুর রাহমান আমাকে একটি আশীর্বাদলিপি লিখে দেন। কিন্তু নিজস্ব কোনো ঘর না থাকায় বাসা বদলের হিড়িকে তা কখন, কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছি; আজ সে-জন্য দুঃখ হয়। ওই তখন থেকে শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার যোগাযোগটা ছিল তাঁর আমৃত্যু।
সাহিত্যের এই মহীরুহের সঙ্গে আমার যে খুব বেশি কথাবার্তা হয়েছে তা নয়। কিন্তু সময়ে-সময়ে প্রয়োজনার্থেই তাঁর সঙ্গে আলোচনা চলতো। বিশেষত তাঁর বন্দী শিবির থেকে এবং বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল বেশ। এই দুই কাব্যের প্রসঙ্গ তুলে লিখেছিও দৈনিক ইত্তেফাকে। ভদ্রতাবশত তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন ঠিকই কিন্তু আমার মনে হয় আরও অনেক কিছু লেখার ছিল। বিশেষত বন্দী শিবির থেকে কাব্য আমাকে নাড়া দেয় খুব। এর জন্যে প্রয়োজন দেশপ্রেম। এই দেশপ্রেমের বড় অভাব আজকের দিনে- কথিত রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে তরুণপ্রজন্মের ভেতরে। আর এর জন্যে দায়ী বিশ্বপুঁজিবাদী ভোগবিলাসিতা। বাংলাদেশের আপামর মানুষ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতার যে বীজমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করেছিল তার বিনাশ একটু একটু করে ঘটে চলেছে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।


একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম, সেই বাংলাদেশে সাধারণ গণমানুষের জীবনকে সরল একরৈখিক রেখায় বিন্যস্ত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। কেননা শতাব্দী সংক্রান্তির অস্থিরতা, বিশ্বপুঁজিবাদ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন; পাশাপাশি দেশীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অন্তর্চাপ রয়েই গেল দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। ফলে জনজীবনের বিচিত্র জটিল ও বহুভঙ্গিম আবর্ত-সংঘর্ষ, গতি ও সংগ্রামের অভিঘাতে স্বাধীনতার সার্বিক অর্জন ধুলিস্মাৎ হতে থাকে। আর তাই জনমানুষের জীবনভাবনার বৈচিত্র্য, ব্যক্তিগত অভিরুচি, আদর্শিক চিন্তাচেতনা, সমাজ ও সময়ের দ্বন্দ্বলালিত শিল্প-অন্বেষা প্রভৃতির সম্মিলন আমাদের চেতনা ও প্রকরণকে করে তুলেছে রক্তাক্ত, জটিল, দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ অথচ জীবন্ময়।


তবু আমার স্বাধীনতা মাথা নোয়াবার নয়। বীর মুক্তিযোদ্ধার শাণিত অস্ত্রে যে শত্রু-পরাজয় গাথা, তাকে স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে। আমার স্বাধীনতা জেগে থাকে প্রাণের স্পন্দনে। ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা, জারি-সারি, হাছন-লালন- এই সংস্কৃতির ভেতরে আমার স্বাধীনতা তার জায়মান সুধা খুঁজে নেয়। জাঁ জ্যাক রুশোর ভাষায়, “মানুষ জন্ম নেয় স্বাধীন ভাবে, কিন্তু সে সর্বত্র শৃঙ্খলিত”। সেই শেকল-ব্যুহ ভেদ করে আমার স্বাধীনতা এখনো প্রাণভরে পৃথিবী দেখে, ‘যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা’। তাই বুঝি ’৭১-এ রণাঙ্গন থেকে লেখা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিগুলো হয়ে ওঠে আমার কাব্যসারথি, স্বাধীনতার অমোঘ শক্তি ‘একাত্তরের এলিজি’। যেখানে আমি নির্বিদ্বিধায় বলতে পারি- “…অতঃপর অনেক প্রসব বেদনা শেষে রাত্রির খোঁড়লে জন্ম নিল ষোলোই ডিসেম্বর! বিশাল শস্যের সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আমার স্বদেশ, তখন মাটিগাঁও অধিবাসী ফিরে গেছে গেরস্থালির কাছাকাছি…অনাদিকালের ঝাউগাছ এভাবেই হয়েছিল রাজসাক্ষী মুক্তিযুদ্ধের।” এই বদ্বীপে ছড়ানো-ছিটানো যুদ্ধস্মৃতির ভেতরে আমার স্বাধীনতা আগামীর পথ খোঁজে, আর সে কথাই জানাতে হবে আমাদের উত্তর প্রজন্মকে- ‘আজ যে আঙুলগুলো আমি মাটির ভেতরে পুঁতে রেখে যাচ্ছি,/একদিন তার নেশায় মাতাল হবে ভবিষ্যতের বাংলা আমার’।