কলেজ রোডের জার্নাল-৫ ॥ মামুন মুস্তাফা


একুশের শতকের পৃথিবীতে বিশ্ব পুঁজিবাদ ও উপনিবেশিক মনমানসিকতা বিপন্ন করে তুলেছে ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্র-প্রতিটি স্তরই। তার ঢেউ এসে লাগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও। অথচ ছোট মফস্বল শহর বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের একদল সুশিক্ষিত পণ্ডিত ষাট, সত্তর, আশির দশকের প্রারম্ভে প্রকৃত মানুষসত্তা গঠনে যে নৈতিক মূল্যবোধের জন্ম দিয়েছিলেন তা আজও টের পাই। শুধু পি সি কলেজ নয়, ওই সময়পর্বে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই ধারাবাহিকতা বিরাজ করছিল বলে মনে করি। আর তাই তো আমার পিতার অবসর জীবনে সমাজে প্রতিষ্ঠিত তার ছাত্ররা আজও মাগুরায় ডিসি/এসপি হয়ে এলে অব্বার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে ওই মননচর্চার ঘাটতিও আমরা দেখতে পাই। সুতরাং পুরনো কথাই বলতে হয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্ধন, পরিমার্জনও জরুরি।

পি সি কলেজের শ্রেণিপাঠ বা শিখন-পদ্ধতিই শুধু না, তার খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাপকতা অনেক। এক্ষেত্রে কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শেখ গিয়াসউদ্দিন আহমেদের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমার মাতৃঐতিহ্যের শেকড় বাগেরহাটে হওয়ায় শেখ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে আমার মামা। ছোটকাল থেকে তাকে গিয়াস মামা বলেই ডাকতাম। তার উদ্ভাবনী ক্রীড়া শৈলীর তুলনা নেই। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এমন কোনো খেলা ছিল না যা পি সি কলেজে নেই। আমার মনে হয় তার অনেক কিছুই অনেক বড় শহরের বড় বড় কলেজগুলোতেও দেখা যেত না। আমরা ছেলেবেলায় প্রতিদিন বিকেলে দেখতাম কলেজ ছাত্ররা ভলিবল খেলছে, বাস্কেট বল খেলছে। হকি খেলা হতো, ফুটবল ও ক্রিকেট তো ছিল নিয়মিত বিষয়। এমনকি ‘ওয়াটার পোলো’ খেলা তো বিষ্ময়ের বিষয়। অনেক কলেজেই এ খেলা পাওয়া দুষ্কর হবে। ‘ওয়াটার পোলো’ সুখসরোবরেই খেলা হতো। আর এই প্রতিটি খেলার রেফারি হিশেবে গিয়াস মামা তার বাঁশির দক্ষ সুরে দর্শকদের মন মাতাতেন। কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা রীতিমতো বাগেরহাটেবাসীকে কাঁপিয়ে দিত। দু’চারদিন ধরে দর্শক গ্যালারি এবং ধারাভাষ্যের মঞ্চ সাজানো হতো। আমরা যারা কলেজের শিক্ষকদের সন্তান, আমাদেরও রাতের ঘুম স্বপ্নময় হয়ে উঠতো। ওই বালকবয়সে কলেজের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিন আমাদের উল্লাস আর আনন্দ অন্যরকম উৎসব বয়ে আনতো। মনে আছে একবার ‘যেমন খুশি সাজো’তে এক কলেজ ছাত্রীকে আমার মা সাপুড়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন এবং বাগেরহাটের কোথা থেকে যেন একজন সত্যিকারের সাপুড়েকে আনা হলো। সাপের বিষদাঁত মন্ত্র দিয়ে বশ করে বাস্তবিক সেই সাপ নাচিয়েছিল ওই ছাত্রী। যা প্রতিটি দর্শককে নাড়া দিয়েছিল। অবাক হয়েছিলেন কলেজের নিমন্ত্রিত অতিথিরা। সেই সাপুড়ে ছাত্রীটি ‘যেমন খুশি সাজো’তে প্রথম হয়েছিল। আমি যখন কলেজে পড়ি, সেশন ১৯৮৬-১৯৮৮। তখন ‘যেমন খুশি সাজো’ প্রতিযোগিতায় আমি সাংবাদিক সেজেছিলাম। আমাকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন এই গিয়াস মামার সন্তান শাকি ভাই। ধারাভাষ্যের স্টেজ থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে আমি তখন প্রতিযোগিতাবিষয়ক দু’একটি কথা বলেছিলাম। কিন্তু প্রতিযোগিতায় বিচারকদের সামনেই নাকি আমি পড়িনি! যাহোক, আগেও বলেছি কলেজের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ধারাভাষ্যে আমার পিতার ধারাভাষ্য লোকের মুখে মুখে ফিরতো। সাহিত্যের নানা উপমা, ভাষার কারুকার্য, বাচনভঙ্গি সবকিছু মিলিয়ে তার তুলনা ছিলেন তিনি নিজেই। তার সঙ্গে আরও যারা থাকতেন- তাদের মধ্যে অধিকাংশ সময় ছিলেন পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক নুরুল ইসলাম। আর আমি যখন কলেজের ছাত্র, সে সময়ে যোগ দিয়েছিলেন আমার পিতার ছাত্র আর আমার শিক্ষক কমল ঘোষ। আজ গিয়াস মামাকে স্মরণ করি। তিনিও বেশকিছুকাল হয় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। আমি হ্যামিলনের বাঁশি শুনিনি। কিন্তু পি সি কলেজের মাঠে আমার শৈশবে গিয়াস মামার যাদুকরী বাঁশির সুর তার থেকে কম কিছু ছিল না।

কলেজে ইন্টার-ইয়ার প্রতিযোগিতা চলতো। আমরা যখন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ছাত্র তখন আমাদের ব্যাচ খেলাধুলা ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আমার বন্ধু গণিতের অধ্যাপক সেখ ইব্রাহিম হোসেনের সন্তান মাহবুব। ঠিক তেমনি সাহিত্য প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম আমি। এছাড়া, ইন্টার-ইয়ার ফুটবল প্রতিযোগিতায় আমরা ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। এখানে মজার বিষয় হচ্ছে, ১১জন খেলোয়াড়ের বাইরে দ্বাদশ খেলোয়াড় ছিলাম আমি, যে কখনো মাঠে নামেনি, সাইড লাইনের পাশে বসে দলকে উৎসাহ দিয়ে গেছে। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, খেলার আগে যখন অধ্যক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, তখন আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলছেন ‘তুমিও কি খেলবে’। বরাবরই আমি ছিলাম হালকা-পাতলা, ছোট-খাট মানুষ। তাই আমাকে দেখে তার ভয়, বিষ্ময়, করুণা সবই জাগলো। সেই সময় আমাদের অধ্যক্ষ ছিলেন জনাব মুজিবর রহমান। তার মেয়ে শর্মীও তখন আমাদের সতীর্থ। পরবর্তীতে আমার বন্ধু মাহবুব এই শর্মীকেই বিয়ে করে।

পি সি কলেজের সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতার অধিকাংশ সময়েই দায়িত্বে থাকতেন আমার পিতা ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক মুহম্মদ গোলাম রসূল। ছেলেবেলায় দেখেছি সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত কলেজ ছাত্ররা (সম্ভবত ছাত্র সংসদের) প্রতিযোগিতার বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদনে আমাদের বাসায় আমার পিতার সঙ্গে রাতভর কাজ করে চলেছেন। অনেক সময় ভোর রাতে তারা চলে যেত। কিন্তু আমার স্মৃতিতে শুধু দুজন ছাত্রের নাম মনে আছে তারা হলেন সুশান্ত মজুমদার ও কমল ঘোষ। সুশান্ত মজুমদার এখন ঢাকাতেই থাকেন এবং একজন কথাশিল্পী হিশেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন একবার আব্বা এই দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে, আমি ও আমার বন্ধুরা বিশেষত আমি, জাকির ও রুমি এ কাজে আব্বাকে সহযোগিতা করেছিলাম। আমার বন্ধু রুমি তো মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে এসে প্রতিযোগিতার সনদপত্র লেখায় সহযোগিতা করেছিল। তখনই বোঝা গেল সরকারি পি সি কলেজ এবং বেসরকারি পি সি কলেজের পার্থক্য। আব্বা প্রতিযোগিতার বই কিনতেন বাগেরহাট ও খুলনার লাইব্রেরিগুলো থেকে এবং দু’তিনদিন ধরে চলতো এই বই কেনা। উল্লেখ্য আমার একমাত্র বড় বোন মাসরুরাতুল আসফিয়া (পুতুল) সেও কলেজের বার্ষিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তখন অবশ্য আব্বা বাগেরহাট পি সি কলেজে ছিলেন না। তিনি তখন খুলনা দৌলতপুর বি এল কলেজে বদলি হয়েছিলেন।

পি সি কলেজের এই বার্ষিক সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় এমন কিছু বিষয় ছিল যা সাধারণত অনেক বড় বড় কলেজেও থাকতো কিনা সন্দেহ। যেমন- গদ্য পাঠ, সংবাদ পাঠ, বৈষ্ণব কবিতা আবৃত্তি, ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি, পুঁথি পাঠ, ধারাবাহিক গল্পবলা ইত্যাদি। সংবাদ পাঠের ক্ষেত্রে দেখেছি আব্বাকে বিভিন্ন সংবাদ পত্র থেকে নানা ধরনের সংবাদ জোড়া লাগিয়ে এক একটি সংবাদ তৈরি করতে। তারপর তা খামে ভরে রাখা হতো। প্রতিযোগিতার কিছু আগে প্রতিযোগীদের এক একটি খাম তুলে নিতে বলা হতো। কেউ জানতো না ভেতরের সংবাদ কি? এরপর তারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো। তখন এক ধরনের রোমাঞ্চ কাজ করতো। তেমনি ধারাবাহিক গল্প বলাতেও ছিল থ্রিল। আমি এই প্রতিযোগিতায় বাংলা কবিতা আবৃত্তি, বৈষ্ণব কবিতা আবৃত্তি, গদ্যপাঠ, সংবাদ পাঠ- এই চারটি বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করি। এই বৈষ্ণব কবিতা বিষয়ে একটি কথা বলতে হয়, পি সি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রামপ্রসাদ দেবনাথের কন্যা বীথি আপা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগেই ভর্তি হলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদেরকে বৈষ্ণব কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। কেউ এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারলো না। শুধু বীথি আপা বৈষ্ণব কবিতা সম্পর্কে বললেন। আর এসব কারণেই আমি বলছি যে, তৎকালীন পি সি কলেজে সাহিত্য কিংবা ক্রীড়া ক্ষেত্রে যা যা অনুশীলন করানো হতো তার অনেক কিছুই অনেক কলেজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সম্ভবত সত্তরের দশকের শেষ দিকে একবার পি সি কলেজ জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিল এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া এ কলেজেরই এক ছাত্রী শ্রেষ্ঠ বক্তা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। আমরা সেই বিতর্ক প্রতিযোগিতা টেলিভিশনে দেখেছিলাম। তখন সারা কলেজে একটি টেলিভিশন ছিল, সেটি রসায়নের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ সাহেবের। অথচ কলেজে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতার অনুশীলন থেমে গেছে বহু আগেই।

আমার ছেলেবেলায় পি সি কলেজে বার্ষিক নাটক হতো দুটি। সেগুলোও আমরা রাত জেগে দেখতাম। এই যে নাটকের প্রতি আমার ঝোঁক, তাও এই কলেজের নাটক দেখে। কালের বিবর্তনে দুটি থেকে একটি নাটকে এসে দাঁড়ালো। আমি এবং আমার প্রথম বর্ষের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীরাই কলেজের বার্ষিক নাটক হিশেবে ‘ফাঁস’ নাটকে অভিনয় করেছিলাম। আর আমাদের সময় থেকেই প্রথম কলেজ-ছাত্রীরা নাটকে অভিনয় করা শুরু করলো। তার আগে অন্যত্র থেকে অভিনেত্রী আনা হতো। রাতের নাটক থেকে কালক্রমে তা গিয়ে হতো সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন, দুপুরে।

এই যে মেজাজ-মনন, মানের ক্রমাবনতি তা কলেজের বিভিন্ন পর্যায়ে পট পরিবর্তনের কারণে। কলেজের সেই মূল্যবোধ আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এরপরে আর কোনো নাটক হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।