কলেজ রোডের জার্নাল-৬ ॥ মামুন মুস্তাফা



সময় স্মৃতির বিপরীতে দাঁড়ায় এবং তা চিরকালের হয়ে। সময়ের নির্মাণ যা কিছু তা আবার সময়েই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু স্মৃতি তাকে রক্ষা করে। অথচ এই স্মৃতি সুখ-দুঃখের মিলিত নদী। সময়ে সবকিছু ডুবে গেলেও স্মৃতির ঘোলাজলে তা উছলে ওঠে। আমাদের কলেজ নিবাসে আমার অগ্রজ, অনুজ সহযাত্রী বন্ধুদের মুখ তেমনই উজ্জ্বল। রেল স্টেশনের পাশের বাসায় পাশাপাশি থাকার কারণে আমার প্রথম সখ্য হয় সুমনের সঙ্গে। রেল স্টেশনে ছুটে বেড়ানো, স্টেশনসংলগ্ন ছোট ছোট দোকানঘরগুলোতে ঘুরে বেড়ানো, খেলাধুলার নতুন নতুন পরিকল্পনা করা-এসবই ছিল আমাদের কাজ। আনাড়ি হাতে এক সময় আমরা ঘুড়িও উড়িয়েছি। আমার বোনের একটি ফুটবল ছিল, সেটি দুজনে খেলতে খেলতে পুকুরে পরে গেলে, হরিণখানা গ্রামের একটি ছেলে তা তুলে নিয়ে চলে গেল, আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম। তখনও খুব একটা উপরের ক্লাসে পড়ি না বিধায় বাড়ির আশেপাশেই ছিল আমাদের দৌরাত্ম্য। এর কিছু পরে যখন আমরা সুখসরোবরের পাশে কলেজের মূল ভবনের কাছাকাছি কোয়ার্টারে চলে এলাম তখন আমাদের বন্ধুর সংখ্যা বেড়ে গেল এবং আমাদের চিন্তার দিগন্তও প্রসারিত হলো। সুমন আর আমি এ-সময় বিভিন্ন দেশের টিকিট সংগ্রহ করতে লাগলাম। সময় মতো নিজেরাও পরস্পরের টিকিট চুরি করতাম। বয়সে সুমন আমার থেকে দু’বছরের ছোট ছিল, কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল গাঢ়। কলেজের শিক্ষকবৃন্দ যে এক পরিবারের অংশ ছিল তার নিদর্শনও ছিল আমাদের দুই পরিবার। সুমনের পিতা ইতিহাসের অধ্যাপক মুহম্মদ আনসার আলী ছিলেন যশস্বী একজন শিক্ষক। বাংলাপিডিয়া সম্পাদনায় তিনি যুক্ত ছিলেন। সুমন এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা।

সুখসরোবরের সামনের কোয়ার্টারে চলে এলে আমাদের পাশেই থাকতেন দর্শনের অধ্যাপক একরামুল হক। খুব সাধাসিধে মানুষ, বড়শি দিয়ে মাছ ধরায় পটু ছিলেন। তার বড় সন্তান মেয়ে লাজু আমার সহপাঠী ছিল। একই ভাবে আমাদের আরেক প্রতিবেশী রসায়নের দক্ষ শিক্ষক মোজাফফর হোসেন, তার মেয়ে শারমীনও ছিল আমার সহপাঠী। বলা প্রয়োজন যে, মোজাফফর হোসেন এবং আমার পিতা একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন- একজন রসায়নে, অন্যজন ইংরেজিতে। ফলে তাদের বন্ধুত্ব ছিল এবং একই ভাবে আমার মা এবং শারমীনের মা (মোজাফফর হোসেনের স্ত্রী) ছিলেন স্কুল বান্ধবী। সুতরাং এই দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশ।

লাজু ও শারমিনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এরও মূল কারণ আমরা তিনজনই একই ক্লাসে পড়তাম। বিভিন্ন সময়ে অলস দুপুর কিংবা বর্ষাস্নাত বিকেলে আমরা বারান্দায় মুড়ি খেতে খেতে গল্প করতাম। কেরাম খেলতাম, কখনো লুডু কিংবা ছয় গুটি। স্কুল জীবনে শারমীন আমার অধিকাংশ বইয়ের মলাট করে দিত। আমরা তখন স্টেশনসংলগ্ন কোয়ার্টারে থাকতাম, আর ওরা ছিল সুখসরোবরের সামনের কোয়ার্টারে; সেই তখন অনেক দুপুর আমার কেটেছে ওদের বাড়িতে। দুপুরে খেয়ে ঘুম দিয়ে সন্ধ্যার আগে আমি বাসায় ফিরতাম। আবার অনেক বিকেল শারমীনের গেছে আমাদের বাসায়, ও ছুটে আসতো আমার মায়ের কাছে নাচ শিখবে বলে। আমার মা তার ছাত্রীজীবনে স্কুল-কলেজে নাচ, আবৃত্তি এবং অভিনয় করেছেন। আমার ময়ের মৃত্যু-সংবাদে শারমীন সে কথা স্মরণ করে বিষাদগ্রস্ত হয়ে ওঠে। শারমীন এখন পুলিশ কর্মকর্তার গৃহিণী। দুই পুত্র সন্তানের জননী।

আমাদের ছেলেবেলার অব্যর্থ দিনগুলো আমরা স্মরণ করি ঠিকই, কিন্তু কি আশ্চর্য- রাজধানী ঢাকার বিষপাষ্পে আমাদের হতশ্বাস ঝরে পড়লেও দেখা হয় না কত বছর, কত যুগ!

অন্যদিকে লাজুর জীবনচাকা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরেনি। ওর স্বামীর অকাল প্রয়াণ ওকে জীবনযুদ্ধে সংগ্রামী করে তুলেছে। যা আমাদের মেনে নিতে বড় কষ্ট, বড় ব্যথা। তবু বাস্তবতা হচ্ছে- বিধির বিধান, যাকে মেনে নিতে আমরা বাধ্য। কিন্তু মেয়েদেরকে নাড়িয়ে দেয় প্রত্যক্ষ ভাবে, ভাসমান নৌকোর মাঝির মতো। ফলে একটি মেয়েকে ভূমিকা নিতে হয় তাড়াতাড়ি পুরুষের তুলনায়। লাজুকেও নিতে হয়েছে তাই। সহজেই বহন করে সে দায়িত্ব। দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে এখন তার এই নিঃসঙ্গ জীবনে আমরা কতটুকু তার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি! জীবন যেখানে যেমন। হয় তো এমনি। সাধ আছে সাধ্য নেই। বাসনা আছে, ক্ষমতা নেই। মানুষের জীবনচরিত এমন, সহসাই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ যেন মহাসৃষ্টির অপার রহস্য! আজ শুধু কর্তব্যের কাছে হার মানে রঙিন স্বপ্নগুলো। জীবনের কোনো সংজ্ঞা থাকতে নেই। আজ তার মানে খোঁজাও বৃথা। তাই কি শুধু মাতৃত্বের টানে বেঁচে থাকা আমার খেলার সঙ্গী, সহপাঠী, বন্ধু লাজুর? এইতো জীবন, জীবনেরই অংশ।

অথচ একজন ছেলের জীবনে বান্ধবী বলতে যা বোঝায়- আমার সেই বান্ধবী হয়ে উঠেছিল শারমীন ও লাজু। হয়তো সম্পর্কটা অনেক গভীর হয়েছিল এই পরিবারগুলোর সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনটাও দৃঢ় ছিল বলে। তাই আজও আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখে পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে রাখি। লাজু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়তো। আর ঢাকায় ইডেন মহিলা কলেজে জুয়োলজিতে পড়তো শারমীন। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সলিমুল্লাহ হলে থাকি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ছি।

লাজুর ইচ্ছা ছিল ওর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার যাই। ও আমার হাত ধরে সারা ক্যাম্পাস ঘুরবে। কিন্তু আমাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। বাস্তবতা হচ্ছে, আমার বাবা-মা কখনোই আমাকে একাকী কোথাও যেতে দিতেন না। যেটুকু ঘোরাঘুরি তা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে। কিন্তু তা ছিল ঢাকা জেলার সীমানার ভেতরে। শুধু দু’বার গিয়েছি কুমিল্লা আর চাঁদপুর, তাও তাদের না জানিয়ে। অন্যদিকে মাঝে-মধ্যে ইডেন কলেজে শারমীনের সঙ্গে দেখা করতাম। আমার বড় বোন তখন পড়তো ইডেন কলেজের পাশেই হোম-ইকনোমিক্স কলেজ তথা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে। ওই একই সময়ে আমার বোনের সঙ্গে দেখা করে ফিরতাম। একবার কোনো এক দিবস কিংবা শারমীনের জন্মদিন উপলক্ষে ওকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি কার্ড পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ভুলবশত ওর রুম নম্বর ২০৪-এর স্থলে ২০৫ লিখে ফেলি, যেটি ছিল ওদের বাথরুমের নম্বর। ফলশ্রুতিতে কার্ডটি চলে যায় বাথরুমের ঠিকানায়, এই মজার বিষয়টি অনেকদিন আমাদের হাস্যরসের খোরাক ছিল।

এর বাইরেও অগ্রজ-অনুজ সতীর্থদের সঙ্গে খেলাধুলা ছিল প্রতিনিয়ত। ঝগড়া, মান-অভিমান, কথা বন্ধ; কখনো হাতাহাতি-মারামারি, আবার ভাব- সবকিছুতেই ছিল আমাদের সহ-অবস্থান। কিন্তু এসব কিছু জানতেন না আমাদের বাবা-মায়েরা। তার ভেতরেই একটা সময়ে গাঢ় হলো বন্ধুত্ব মাহবুবের সঙ্গে। গণিতের অধ্যাপক শেখ ইব্রাহিম হোসেনের সন্তান। যাকে আমরা দাদা বলে সম্বোধন করতাম। কেননা আমাদের পিতা তাকে মামা বলে ডাকতেন। তিনি ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক মোজাফফর হোসেনের আত্মীয় এবং মামা। সেই সূত্রে শিক্ষকরা সবাই তাকে মামা ডাকতেন। মাহবুব আমার সহপাঠী ছিল। আমরা সকলে কলেজ মাঠে, বারান্দায় লুকোচুরি, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ছি-বুড়ি, গোল্লাছুট কত কিছুই না খেলেছি। মাহবুবের সঙ্গে কোনো এক তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বন্ধ ছিল দীর্ঘকাল। অথচ আজও বন্ধুতা একই রকম।

তবে আমার সতীর্থদের ভেতর সব থেকে মনের মিল ঘটলো জাকিরের সঙ্গে। যে কথা আগেই বলেছি। আমি বালকবয়সে যে নারীবিহীন নাটক লিখে মঞ্চস্থ করতাম, তার অন্যতম অভিনেতা ছিল আমার এই বন্ধু জাকির। সাহিত্যবিষয়ক আমাদের পড়াশোনা, কবিতাপাঠ আমাদের দুজনকে পরস্পরের কাছে এনে দিল। আজও সে বন্ধুত্ব অম্লান। অনেক পরে আমরা যখন কলেজে পড়ি তখন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন মুজিবর রহমান। তিনিও সাহিত্যমোদী মানুষ। আমাদের কাছ থেকেও তিনি বই নিয়ে পড়তেন। মনে আছে আমার কাছ থেকে তিনি নিয়েছিলেন সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’। তিনি একবার জাকির আর আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তিত আমার ছেলেকে নিয়ে। তোমাদের মতো তার কোনো বন্ধু হলো না।’ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা ‘একাত্তরের চিঠি’ অবলম্বনে আমার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতাগ্রন্থ ‘একাত্তরের এলিজি’ আমার এই বন্ধু জাকিরকে উৎসর্গ করি।

সুখসরোবরের পাশে আমাদের বাসা হওয়ায় এ পুকুরেই আমি সাঁতার শিখি। আমার এই সাঁতার শেখার পেছনে যার অবদান তিনি রবিউল ভাই। পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল ইসলামের সন্তান। এই নুরুল ইসলামও আমার পিতার ব্যাচমেট হওয়ায় আব্বাকে বন্ধু বলে সম্বোধন করতেন। আজ তিনিও লোকান্তরিত। এসব মানুষের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করা ছাড়া আজ আর আমাদের কিছুই করার নেই। রবিউল ভাইয়ের কথা বলতে হয় এ কারণে যে, তিনি আমাদের অল্প কিছু সিনিয়র হলেও ছোটদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার কারিশমা ছিল। আমাদেরকে নিয়ে রবিউল ভাই মজার মজার সব খেলা খেলতেন। বিভিন্ন ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের পরিকল্পনাও করতেন। তাকে কেন্দ্র করে আমাদের একটা গ্রুপ তৈরি হলো। তাকে পেয়ে আমরা আশ্বস্ত হতাম, নিশ্চিন্ত হতাম, ভরসা পেতাম। সেই রবিউল ভাই আজ জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে পরবাসী, শুনেছি গ্রেট ব্রিটেনে তার অধিবাস। জানি না স্বদেশের মুখ তাকে কতখানি তাড়িত করে। পি সি কলেজের রঙিন দিনগুলো তাকে স্পর্শ করে কিনা।

আজ এই ঢাকা শহরের ধুলোওড়া বাতাসে, নিয়ন বাতির নিচে যতই দিনযাপন করি না কেন, তা কতখানি সুখকর কিংবা স্বস্তির, বলা মুশকিল। অথচ শ্যামলছায়া ঘেরা বাগেরহাটের স্মৃতিপটে যে আমি হারিয়েছি আমার শৈশব তা আজও উজ্জ্বল। সেই স্মৃতিজ্বলা মুখগুলো এখনও আমাকে কাছে টানে। জাকির, রুমি, মিজান, তুহিন, মুসা- জীবনের প্রয়োজেনই যদি কোনো পরিকল্পনা করে থাকে, তবে আমি ‘বেন্টিঙ্ক’ তার অংশ হয়ে যাই। আমাকে ব্যতীত তাদের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হয় না। তেমনি আমার মা যখন মারা গেলেন, করোনার লকডাউনের প্রথম প্রহর, ২০২০ এর ৬ এপ্রিল, তখন ঢাকা থেকে আমার সপরিবারে যাওয়ার পথটুকু সুগম করতে পাশে এসে দাঁড়ায় বন্ধু সুমন (কর্নেল খসরু সাব্বির আলী), শারমীনের এসপি স্বামী আহসান হাবীব পলাশ ভাই, টুটুল ভাই (চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তারিক রেজা আলী), লাজু, ইমাম প্রমুখজন। এসব নিবিড় বন্ধন আমি খুলে যাই কেমন করে?

তবু আমাদের ছেলেবেলার মুঠোভর্তি স্বপ্নগুলো আমরা কী ছুঁতে পেরেছি? ‘অমল’ রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। আজও সেই স্বপ্নময় রোদ্দুরটুকু আমরা স্পর্শ করতে পারিনি। জলের প্রতিবিম্বের কাছে এসে আমাদের মুখশ্রীগুলো অচেনা হয়ে ওঠে। আর আমরা পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে থাকি। শৈশবের গালে যদি এসে পড়ে জোনাকির আলো! হোক না ছিপি খুলে সমুদ্র দেখা! আজ তাই বলতে হয়, “…মানুষ/ যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।/মিশে যায়- পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে”।