কলেজ রোডের জার্নাল-৭ ॥ মামুন মুস্তাফা



সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয় তথা পি সি কলেজের শ্যামল প্রকৃতির মাঝে আমাদের স্বপ্নময় দিনগুলো শেষ হয়ে আসছিল আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৯৮৪ সালে আমার বাবা বদলি হয়ে গেলেন খুলনা সরকারি দৌলতপুর বি এল কলেজে। এছাড়াও আরো অনেক শিক্ষকের সঙ্গে ইতিহাসের অধ্যাপক মুহম্মদ আনসার আলী এবং দর্শন বিভাগের অধ্যাপক একরামুল হক বদলি হলেন যথাক্রমে মানিকগঞ্জ ও নাটোরে। এ দুই পরিবারের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতার কারণে তাদের বিদায়ে ভেতরে ভেতরে চলতে থাকলো হদয়ের ক্ষরণ, আমাদের সম্পর্কও যেন স্মৃতির ধুলোয় ধূসর। কিন্তু মুছে ফেলার নয়, যায়ওনি কখনো।

এক ভোরে অধ্যাপক মুহম্মদ আনসার আলীর পরিবার বাগেরহাট ছাড়লেন। তার সন্তানেরা মনিকা আপা, টুটুল ভাইয়া, সুমন, শিবলী সবাই কান্নাভেজা মুখে বাগেরহাটের সঙ্গে সম্পর্কসূত্র ছিন্ন করে দূর থেকে দূরতর হলো। খুলনা, যশোর ছাড়িয়ে যাচ্ছে তাদের ঢাকাগামী বাস, আর একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে সম্পর্ক-বাঁধন। ওদের বাবা-মাকে আমি ও আমার বোন ডাকতাম ফুপু আর ফুপা। আমার বাবা-মাকে ওরা ডাকতো মামা-মামী। কিন্তু নিয়তির কাছে বাঁধা মানুষ। তাই বোধহয় তাদের চলে যাবার সময় আমরা কেউ দাঁড়াতে পারিনি ওই বিদায়-পথে। শূন্য পথে তারা ফিরে ফিরে চেয়েছে মামা (আমার বাবা) এলো না এখনও। আমার বাবা সেই দুঃখবোধ বয়ে বেরিয়েছেন অনেকদিন। আর আমাদের ফুপা (অধ্যাপক আনসার আলী) এক রাতে শেষ স্পর্শটুকু মুছে ফেলে বাগেরহাট থেকে ঢাকাগামী লঞ্চে চড়ে বসলেন। রাতের খাবার আমাদের বাসাতে খেয়ে আব্বা তাকে লঞ্চঘাটে বিদায় জানালেন। আমার মাকে দেখলাম চোখের পানি মুছতে। ফুপা এই ইহধাম ত্যাগ করেছেন বেশ কিছুকাল। কিন্তু তাঁর স্মৃতির পসরা নিয়ে আজও আমরা পথ চলি।

জানি না তার সেই বিদায়-পথে বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী অথচ নীরব ও মায়াবী নদী দড়াটানার স্বচ্ছ জলে তিনি কতটুকু সিক্ত হয়েছিলেন, কিংবা তার স্মৃতির পাত্রে কতটুকু উছলে উঠেছিল দড়াটানার কান্না। বিনিদ্র রজনী জেগে নতুন ভোরের আলোয় মুছে যায়নি তো বাগেরহাট, ওই চেনাজানা গলিপথ, পল্লীঘেরা হরিণখানা, বাসাবাটি, দশানী, ষাটগম্বুজ, খানজাহান আলীর দরগা, যাত্রাপুরের রথযাত্রা, আরও কত কি। সময়ের ব্যবধানে ফিকে হয়ে আসে, কিন্তু মুছে ফেলা কি যায়? তাই তো তার বড় পুত্র সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার তারিক রেজা আলী, অর্থাৎ টুটুল ভাইয়া ‘বাগেরহাট’ এই শহরের নামে আজও স্মৃতিকাতর হন, ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’ দিয়ে ওঠেন। তার মনের কোণে জমে থাকা হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কাব্যও লিখে চলেন মুক্তগদ্য রচনার ভেতরে। পোস্ট দেন মাঝে-মধ্যে বহুল জনপ্রিয় ফেসবুকে। টুটুল ভাইয়ের লেখারও আমি এক মুগ্ধ পাঠক। লেখক স্বীকৃতি তার নেই বটে (কারণ তিনি লেখক হতে চাননি), কিন্তু আজকের লেখক হতে আসা অনেক লেখকের তুলনায় তার মুক্তগদ্য আমাদের অনেক প্রথিতযশা লেখকদের স্মরণ করিয়ে দেয়। টুটুল ভাইয়ের অনেক গদ্য আমি ছাপিয়েছি আমার কর্মস্থল দৈনিক বাংলাদেশের খবরের সাহিত্যপাতা ‘অন্য রেখা’য় (যার বর্তমান নাম সাহিত্য ও সংস্কৃতির খবর)।

টুটুল ভাইয়ের আব্বা আনসার ফুপার (মুহম্মদ আনসার আলী) পর দর্শনের অধ্যাপক একরামুল হক বাগেরহাট ছাড়লেন এক দুপুরে। তিনি ও তার পরিবারও দুপুরের খাবার খেয়ে রওয়ানা করলেন আমাদের বাসা থেকেই। ট্রাকে সমস্ত মালামাল উঠে গেছে। ইমাম, শামীম আর খালাম্মা ও খালু (অধ্যাপক একরামুল হক) বিদায় নিলেন। তাদের বড় সন্তান, আমার সহপাঠী লাজু তখন রাজশাহীতে অবস্থান করছে। আব্বা তখন খুলনা দৌলতপুর বি এল কলেজে। আমি, আমার বোন, আর আমার মা তাদেরকে বিদায় দিলাম। আজ লাজুর আব্বা অধ্যাপক একরামুল হকও ইহলোক ত্যাগ করেছেন। কিন্তু আমরা আজও ভুলতে পারিনি খালু(একরামুল হক)’র ভালোবাসার স্পর্শ। তা কি ভোলা সম্ভব? আমার বাবা আজও স্মরণ করেন, ’৭৫-এর দুর্ভিক্ষে তারা দুজন কীভাবে নিত্যদিনের ভোগ্যপণ্যের আনাজপাতি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। যা শুধু একান্নবর্তী পরিবারেই সম্ভব ছিল। পি সি কলেজের ক্যাম্পাসে বসবাসকারী শিক্ষকবৃন্দের পরিবার ছিল একান্নবর্তী পরিবার। অথচ একটা সময়ে হৃদয় ভাঙা ঢেউয়ে ভেসে যেতে লাগলো ঘরদোর, প্রকৃতি, সময় আর ফেলে আসা স্মৃতিগুলো। এভাবেই সময়ের নির্মমতায় আমাদের সম্পর্কসূত্র, বাঁধনের মায়া, স্মৃতির আবাস ভেঙে যেতে থাকে। নিয়তির ক্রীড়ানক হিশেবে চেয়ে চেয়ে দেখলাম, ‘আমার বলার কিছু ছিল না’।

এইসব বিদায়ের ভেতরে পি সি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে আমার বাবাকে জানানো হলো বিদায় সম্বর্ধনা। পি সি কলেজের ইতিহাসে সে এক সাড়া জাগানো অধ্যায়। অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী এবং প্রতিটি শিক্ষক তার সম্পর্কে বলেছিলেন সেদিন তাদের মনোকথা। মানপত্র পাঠ করেছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ আনসার আলীর কন্যা মনিকা আপা। বাংলার অধ্যাপক রামপ্রসাদ দেবনাথের কন্যা বীথি আপা তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ক্লাসে স্যার যখন পড়াতেন, তখন মনে হতো সাগর সেনের রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনছি’। দর্শনের অধ্যাপক শ্রদ্ধাভাজন রেজাউল করিম বলেছিলেন, ‘রসূল সাহেব শুধু ইংরেজির পণ্ডিত নন, তিনি একাধারে বাংলা ও আরবি ভাষারও শিক্ষাবিদ। তার হাতের লেখা অনুকরণীয়’। এখানে উল্লেখ্য, কলেজে যখন আরবির শিক্ষক ছিল না বা থাকতো না, তখন আব্বা আরবি ক্লাস নিতেন এবং সে-সময় অন্যান্য ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরাও আব্বার আরবি ক্লাস দেখার জন্য ওই ক্লাসে ভিড় করতো। আব্বার এই আরবি জানার পেছনের কারণ হচ্ছে ১৯৫৫ সালে আব্বার মেট্রিক্যুলেশন (এখনকার এসএসসি) ছিল তৎকালীন মাগুরা কলেজিয়েট হাই মাদরাসা থেকে। আমার দাদা মৌলভী গোলাম মোস্তফা মিঞাও ছিলেন এই স্কুলের শিক্ষক, ধর্মীয় শাস্ত্রের সুপণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বাংলা ও ইতিহাসও পড়াতেন। ইতিহাস ছিল দাদার খুব প্রিয় একটি বিষয় এবং এ বিষয়েও তার জানাশোনার পরিধি ছিল বিস্তৃত।
আব্বার বিদায় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে এক ছাত্রী কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। এ সবই আজ ইতিহাস। আমার স্মৃতির অমলিন অধ্যায়।

এরপর পি সি কলেজের সবুজ চত্বর থেকে নির্বাসিত হলো আমাদের বসতি। প্রলম্বিত হতে থাকলো আমাদের দীর্ঘ ছায়া। রোদ-বৃষ্টির চলচ্ছায়ায় জীবনের নোঙর ফেললাম রূপঞ্জনা বাগেরহাটেরই কোথাও না কোথাও। কারণ আমার বোনের কলেজ এবং আমারও স্কুল তখন শেষ পর্যায়ে। এ অবস্থায় খুলনার দৌলতপুরে চলে যাওয়া ছিল অসম্ভব। উপরন্তু আমার মা’ও তখন একটি বিদেশী সংস্থা তথা এনজিওর বাগেরহাট প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। সংসারের সচ্ছলতার জন্যে মা তার কষ্টটুকু মেনে নিয়েছিলেন। আজ বুঝি, ওকে সচ্ছলতা বলে না, ও ছিল আব্বাকে সহযোগিতা মাত্র। কলেজ কোয়ার্টারে বসবাসরত আমাদের প্রতিটি পরিবারের জীবনচরিত ‘বাগেরহাট’ তার শ্যামল চাদরে ঢেকে দিলেও পি সি কলেজের মাহাত্ম্য, তার সজীব নিসর্গ আমাদের জীবনকে দিয়েছে অপরিমেয় সুধা। আজ তাই একুশ শতকের পি সি কলেজের গণ্ডিবদ্ধ আবহাওয়া আমাদের মনকে করে তোলে ভারাক্রান্ত, ব্যথিত।

এই ব্যথা, কষ্ট আর কান্নার জন্ম ১৯৭৯-তে। বাগেরহাটবাসীর সবার চোখেমুখে আনন্দ উচ্ছ্বাস। বিশেষত কলেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক থেকে পিয়ন, দপ্তরি, আয়া সকলেই। কেননা একটু আর্থিক সচ্ছলতা তাদের প্রয়োজন ছিল। তাই ও বছর কলেজকে সরকারি ঘোষণা করা হলে দিনে দিনে কিছু আর্থিক সচ্ছলতা হয়তো তাদের জীবনে এসেছিল, কিন্তু পি সি কলেজের গৌরব ম্লান হতে শুরু করলো ক্রমান্বয়ে। ভেঙে পড়লো ষাটের দশক থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষকদের এক-একটি পরিবার। প্রতিটি আত্মার দীপ্র দহনে জমা হতে থাকলো দীর্ঘশ্বাস। পুরনোরা ছিটকে পড়লো পদ ও পদবীর পদায়নে অন্যত্র, নতুনেরা দখল করলো সে জায়গা। ক্রমশ শিক্ষার সে মান ম্রিয়মান হতে থাকে। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিদ্যাপীঠের সে চর্চায়ও খোলনলচে পাল্টে গেল। সংবাদ পাঠ, গদ্য পাঠ, বৈষ্ণব পদাবলি, ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি হারিয়ে ফেললো তার চারিত্র। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হারালো তার দর্শক। আমার ছেলেবেলা আজ বন্দী একুশ শতকের পি সি কলেজের কংক্রীটের সীমানা প্রাচীরের চৌহদ্দির ভেতরে।