কলেজ রোডের জার্নাল-৮ ॥ মামুন মুস্তাফা


আশির দশকের মাঝামাঝিতে পি সি কলেজের সবুজ চত্বর আমাদের ছেড়ে দিতে হলো। আমলা পাড়া, হরিণখানা, হাড়িখালি, সরুই, কলেজ রোড বিভিন্ন জায়গায় আব্বা আমাদেরকে নিয়ে বাসা বাঁধলেন। আর নয়ের দশকের শেষ ভাগে তিনি চিরদিনের জন্য বাগেরহাট ছেড়ে নিজ পিতৃভূমি মাগুরা জেলা শহর সংলগ্ন পারনান্দুয়ালি গ্রামে বাপ-দাদার ভিটায় নিজের ঘর বাঁধলেন। সে গল্প অন্য দিনের, আজ নয়। কিন্তু এ তো সত্য আজ এতদিনেও আমার পিতাও তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারেননি বাগেরহাটকে। চাপা স্বভাবের, এক রোখা মানুষটি বয়ে বেড়ান স্মৃতিকাতরতা, অমলিন ব্যথা, না-বলা কষ্ট। কিছু তার হয়তো বুঝেছিলেন আমার মা। আর সেই জন্যেই তিনিও সব ঝেড়ে-মুছে দিয়ে আপন পিত্রালয়ের শেকড়চ্যুতি ঘটিয়ে প্রিয়তম স্বামীর হাত ধরে পাড়ি জমান শ্বশুরালয়ে। আব্বা আর ফিরবেন না বাগেরহাটে। বলেছিলেন, তার প্রিয় অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের উদাহরণ টেনে; সুচিত্রা সেন যেমন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গিয়েছিলেন, তিনিও বাগেরহাটবাসীর আড়ালেই থাকবেন বাকি জীবনটুকু।

কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়, বিধায় বাগেরহাট ছেড়ে আসার দীর্ঘ সময় পর আমার স্ত্রীকে নিয়ে বাগেরহাট ভ্রমণ ছিল আনন্দ-উৎসবের মতো, কৌতূহলে ভরা। তখন আমার বড় ছেলের বয়স ৩/৪ বছর। বাগেরহাটে পৌঁছে প্রথমেই আমি যাই আমার নানাবাড়ি চিতলমারি উপজেলার কাঠিপাড়া গ্রামে। আমার জীবদ্দশায় এই নিয়ে মাত্র আমি দু’বার সেখানে গিয়েছি। কেননা বাগেরহাটের মিঠাপুকুর পাড়েই আমার নানার দোতলা বাড়ি। ওই বাড়িতেই আমার মা-খালা-মামারা বড় হয়েছেন। আমার জন্মের আগেই আমার নানা মারা যান, নানী থাকতেন ছোট মামার সঙ্গে চট্টগ্রামে। ফলে কাঠিপাড়া গ্রামে যাওয়া হয়নি। কিন্তু আমার এইচএসসি পরীক্ষার পর মায়ের মেজ চাচার ছেলে ফন্টু মামার (কাজী ফকরউদ্দিন আহমেদ) সঙ্গে আমি প্রথম কাঠিপাড়া যাই। মামার একটা বাইসাইকেল ছিল। সেই সাইকেলের সামনের রডটিতে আমাকে বসিয়ে মামা দীর্ঘ পথ সাইকেল চালিয়ে আমাকে নিয়ে চললেন। চলতি পথে মাঝে-মধ্যে আমরা জিরিয়ে নিচ্ছি। যেতে যেতে মামাও অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে দরকারি কথা সেরে নিচ্ছেন। কারো কারো সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সে যাত্রাও ছিল নবীন কিশোরের চোখে নতুন প্রকৃতি দেখার আনন্দ। কাঠিপাড়া গ্রামে তখন ফন্টু মামার মা, মায়ের মেজ চাচী থাকতেন। ওই নানী আমাকে অনেক যত্ন করেছিলেন। এখনও মনে পড়ে প্রথম নানাবাড়ি গিয়েছি, তাই তিনি আসার সময় আমার হাতে টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন (কিন্তু কত টাকা তা আজ মনে নেই)।

স্ত্রীকে আমার মায়ের গ্রাম দেখানোই ছিল আমার উদ্দেশ্য। নানার কবর জিয়ারত করে ফিরে আসি শহরে। এবারও সঙ্গে ফন্টু মামা। আর আমার খালাত ভাই (আমার মেজ খালার ছেলে) এলিস ভাই, ভাবী, তার দুই মেয়ে আমাদের সফর সঙ্গী হয়। আমাদের এই বাগেরহাট ভ্রমণে আমার সহধর্মিনীর সঙ্গী হয়েছিল আমার শ্যালিকা রীতা।

ফন্টু মামা মায়ের চাচাতো ভাই হলেও আমাদের সঙ্গে তার বন্ধন ছিল দৃঢ়। আমি যখন স্কুলে পড়ি, ফন্টু মামা তখন কলেজে। সেই সূত্রেও আব্বা-মার সঙ্গে তার নিবিড় বন্ধন গড়ে ওঠে। বিশেষত আব্বাকে ফন্টু মামা খুব শ্রদ্ধা করেন, ভালোও বাসেন। আর মামা আমাদের দুই ভাইবোনের সঙ্গেও বন্ধুর মতো মিশতেন। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, মামার আদর-স্নেহ সেই ছেলেবেলায় এই ফন্টু মামার কাছ থেকেই পেয়েছি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন মামার এক কলেজ শিক্ষকের বোনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়।

দুজনের মধ্যে চিঠি দেয়া-নেয়া চলতো। মামা আমাকে দিয়ে সেই চিঠি লেখাতেন। কিন্তু কোনোবারই মামা নিজের হাতে লিখতেন না, আমার হাতের লেখার চিঠির নিচে নিজের নাম লিখে পাঠিয়ে দিতেন। আজও ফন্টু মামার সঙ্গে আমার সেই অলিখিত বন্ধন অটুট আছে। মামা এখন বাগেরহাটের মুনিগঞ্জে দোতলা বাড়ি করেছেন। মামীকে নিয়ে থাকেন। দুর্ভাগ্য, মামা-মামীর কোনো সন্তান নেই। জানি না, এটি বিধির কি বিধান। আমরা ভাবছি দুর্ভাগ্য, কিন্তু হয়তো এটিই তার সৌভাগ্য, যা একমাত্র সর্বজ্ঞ পরমকরুণাময় জানেন। আমরা তো তার হাতের ক্রীড়ানক।

বাগেরহাটে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ আমার মেজ খালার পরিবারের সঙ্গে। আমার মার মৃত্যুর পরে আব্বা মেজ খালার বড় ছেলে সঈফ ভাইকে ফোনে বলেছিলেন, ‘তোমার খালার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমার শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল বা ম্লান হয়ে গেছে, কিন্তু তোমাদের সঙ্গে হয়নি, কারণ ‘মেজ আপা’। আমাদের জীবনে আমার মেজ খালার অবদান অনস্বীকার্য। তার ঋণ শোধ করার নয়। আমার বাবা-মার সংসার-জীবনে আমার এই খালার অবদান কম নয়। আমাদের শৈশব কিংবা ছেলেবেলায় আমার আর আমার বোনের শত আবদার আমার মেজ খালা নীরবে সয়েছেন। আমাদেরকে আগলে রেখেছেন। তার বাড়ির ভাল কোনো রান্না আমাদের বাদ দিয়ে তার মুখে ওঠেনি। আমরা যে যা খেতে ভালবাসতাম তিনি তাই রান্না করে দিতেন কিংবা বাজার থেকে আনিয়ে দিতেন। আমাদের রোগ-শোক, জরা-দুঃখে তিনি একান্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের আনন্দে তিনি হেসেছেন। বাঙালি কুলবধূ নারীর মতো তিনি স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির সংসার আগলে রেখেছিলেন। পরম যত্নে সেবা করে গেছেন স্বামীসহ শ্বশুর-শাশুড়িকে। তার হাতের ওপরেই একে একে সবাই বিদায় নিয়েছেন।

সবাইকে ঘুম পারিয়ে সবশেষে তিনি ঘুমিয়ে গেছেন। আমার ছেলেবেলায় মেজ খালার পায়ে কি এক চর্মরোগ দেখা দিল, তিনি কোনো জুতা-স্যান্ডেল পরতে পারতেন না। অবশেষে খুলনায় চিকিৎসা শেষে যখন তিনি ভালো হলেন এবং বাগেরহাটে ফিরছেন, তখন আব্বা একজোড়া নতুন স্যান্ডেল কিনে রূপসা ঘাটে গেলেন এবং খালার পায়ে পরিয়ে দিলেন। এ গল্পও অনেকবার শুনেছি সঈফ ভাইয়ের মুখে। আমার খালা নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন আমার আব্বাকে। আমার দুর্ভাগ্য আমার খালার জীবদ্দশায় আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বাগেরহাটে যেতে পারিনি। সেই সীমাহীন অপরাধ আজও আমি বয়ে বেড়াই। মনে মনে ক্ষমা চাই খালার কাছে।

এই সূত্র ধরেই সঈফ ভাই এবং এলিস ভাইও নিজের ছোট ভাইবোনের মতো আমাদেরকে দেখেছেন। অনেক গল্প, অনেক আড্ডা, অনেক সময় কেটেছে আমার এই দুই ভাইয়ের সঙ্গে। আমলাপাড়া, পুরাতন বাজার আর কলেজ রোডের ত্রিমোহনায় আমার এই খালার দোতলা দুই-দুটি বাড়ি। যে বাড়িটিতে খালা থাকতেন, সেই বাড়ির দোতলায় পাশাপাশি দুটি রুমে সইফ ভাই আর এলিস ভাই থাকতো। সঈফ ভাইয়ার রুমটা বেশ বড় ও গোছানো ছিল। তার রুমের ড্রেসিং টেবিলের ওপর অনেক খুচরো পাঁচ-দশ-পঞ্চাশ পয়সা পড়ে থাকতো। আমার ছোট দুই ভাইবোন মুঠো ভরে সেগুলো নিয়ে আসতাম। আমার এই ভাই বিয়ে করেনি। অথচ আমরা কেউ জানি না কি তার কারণ। কেউ জানার চেষ্টাও করিনি। বয়সের প্রৌঢ়ত্বে এখন তারও বাস। যখন কলেজ-বিশ্বদ্যিালয়ে পড়ি তখন এলিস ভাইয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো। কারণ এলিস ভাই সংস্কৃতমনা ছিলেন। তিনি ভাল গান করতেন, বেহালা বাজাতেন। বিশেষত বাংলাদেশের আব্দুল জব্বার আর কলকাতার মান্না দে এবং হেমন্ত মুখার্জীর গান তার গলায় সুন্দর লাগতো। হেমন্তর ‘তুমি কি যে বল বুঝি না’, মান্না দের ‘আমার না যদি থাকে সুর’ অথবা আব্দুল জব্বারের ‘আমার এ চোখ দুটো আয়না করে’ ইত্যাদি গানগুলো আজও আমার কানে ভাসে। তার সেই সুন্দর দিনগুলো জীবনরথের পিঠে চড়ে কোথায় হারিয়ে গেছে? আজ সে দুই কন্যা সন্তানের জনক।

এলিস ভাই যখন বিয়ে করে তখন আমি পি সি কলেজে আই.এ পড়ি। আর তামান্না ভাবী (এলিস ভাইয়ের বউ) ওই একই কলেজে বি.এ ক্লাসের ছাত্রী। এমনও অনেক দিন গেছে- ভাবী আর আমি একই সঙ্গে কলেজে যেতাম আর ফিরতাম। ভাবীও আমার বন্ধু হয়ে উঠলো। দীর্ঘ সময় মা আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন বিধায় মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারতাম না। সেই মাছের কাঁটা বেছে তামান্না ভাবীও আমাকে খাইয়েছেন। খেয়ে তার আঁচলে মুখ মোছা ছিল আমার অভ্যেস। পরবর্তীতে বউয়ের আঁচলে মুখ মুছি। আমার স্ত্রী রত্না, আজও দোষ দেয় ভাবীদের। তারাই আমাকে এমনটি বানিয়েছে।

কিন্তু জীবনের নির্মমতা এমনি- সেই যে প্রীতির বন্ধন, দীর্ঘদিনের অদেখায় শিথিল হতে থাকে। কথা হয় না হয়তো অনেক দিন। কিন্তু মুছে ফেলা তো যায় না? আমার মেজ খালা স্বামী, শ্বশুরের পাশে মুনিগঞ্জে দড়াটানা নদীর পাশে নিজস্ব ভূমিতে সমাহিত। তিনি কি জানেন তার আদরের ছোট বোন দিলু, আমার মা সেও আজ তারই ‘লোকে’? আমার সঙ্গে সঈফ ভাই, এলিস ভাই, তামান্না ভাবীর যে হৃদসম্পর্ক সেও কি খুলে খুলে যাচ্ছে, সময়ের চাকায় পিষ্ট হয়ে? কি করে সম্ভব? তাই তো স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে বাগেরহাট ভ্রমণে আমার ঠিকানা হয়ে ওঠে আমার মেজখালার পুরাতন বাজারের বাসাটি। আগামী ভোরের আলোয় দেখ নেব আমার সেই শ্যাওলা জমা সোনালী অতীত।