কলেজ রোডের জার্নাল-৯ ॥ মামুন মুস্তাফা




২০০৬ সালে বাগেরহাট ভ্রমণের উদ্দেশ্যই তো ছিল আমার স্ত্রীকে আমার শৈশবের স্থানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখানো। কলেজ ক্যাম্পাস তো বটেই, সেই সঙ্গে আমার জন্মবাড়ি সেই পুরাতন বাজারের গলিপথ দিয়ে গিয়ে ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেনের দোতলা বাড়িটি। যে বাড়িতে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষলগ্নে আমার বাবাকে ধরতে এসেছিল রাজাকাররা। মোশাররফ মল্লিক সাহেবের জন্যে আব্বা সেদিন রক্ষা পান। যার কথা আমি আগেই বলেছি। বড় হয়ে তাকে দেখেছি বাগেরহাটের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল টাউন হলের টিকেট বিক্রেতা হিশেবে। আর ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেন? যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির অবৈধ কাজগুলোকে সমর্থন দিতে পারেননি বলে মুসলিম লীগের সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন, তাকে কোনোদিন আমি চোখে দেখিনি।
আব্বার কাছে শুনেছি, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ের ওই নয় মাস কলেজের বেতন বন্ধ ছিল। তারপরও অনিয়মিত বেতন। এরপর যখন আব্বা তার বাড়ির ভাড়া একসঙ্গে দিতে গেলেন, ততদিনে বাড়ির ভাড়া বেড়ে গেছে। আব্বা বর্ধিত ভাড়ার হিশেবে ডাক্তার মোজাম্মেলকে ভাড়া দিতে গেলে তিনি পুরনো ভাড়ার হিশেবেই বাড়িভাড়া নিয়েছেন এবং বললেন, ‘আপনি আমাদের বাগেরহাটের জামাই, আপনার কাছ থেকে আমি বর্ধিত ভাড়ার হিশেবে বাড়িভাড়া নিতে পারি না’। এর বিপরীতে আজকের ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালাদের দেখলে করুণা ছাড়া আর কিছুই জন্মে না।

আমার ওই জন্মবাড়িটি দেখতে আমি প্রথমেই মোশাররফ মল্লিকের বাড়িতে যাই। তিনি আজ মৃত। এখন সেই কুঁড়েঘর দোতলা বাড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে সামনে আসেন তার স্ত্রী। চিন্তে পারলেন না আমাকে। না চেনারই কথা। সময় তো কম নয়। পেরিয়ে গেছে এক যুগেরও অধিক সময়। আমি তাকে দেখে এসেছি যুবতী, আজ তিনি প্রৌঢ়। আমার মাকে তিনি ডাকতেন দিলু আপা বলে। পরিচয় দিতেই তিনি জড়িয়ে ধরলেন। বললাম, খালাম্মা আমি ওই দোতলা বাড়িটিতে যেতে চাই। আমার জন্মবাড়ি। নিয়ে গেলেন তিনি। এখন সেখানে অন্য সংসার। অন্য বাসনকোসন। বিছানাপত্র। ’৭০ দশকের প্রথমপর্বের সেই সংসার, আর একুশ শতকের প্রথম দশকের এই সংসারের মধ্যে পার্থক্য আছে কি? প্রতিদিনের সূর্য উদয় আর অস্তের ভেতরে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু দিনযাপনের ভেতরে, দৃষ্টির ভেতরে, অনুধাবনের ভেতরে।

এই বাড়িতেই আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন তৎকালীন খুলনা জেলা বোর্ডের সাব-অ্যাসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী হায়দার। তার স্ত্রী আমাকে ডাকতেন ‘জামাই’ বলে। তার প্রথম সন্তান মেয়ে, বলা যায় আমারই সমবয়সী, নাম ‘সুইটি’। ছেলেবেলা থেকেই আমি খেতে চাইতাম না। মা প্রত্যেক সময় সুইটিকে নিয়ে এসে আমাদের দুজনকে খাওয়াতেন, এই ভেবে, যদি আমি একটু খাই। এই সুইটি বলা যায় আমার প্রথম খেলার সঙ্গী। এই পরিবারের সঙ্গেও আমাদের ঘনিষ্ঠতা এতটাই ছিল যে, আমরা যখন কলেজ ক্যাম্পাসে চলে আসি, স্কুলে ভর্তি হই, তখন অনেক সময় স্কুল থেকে সুইটি আমাদের বাড়িতে আশেপাশে থাকা তার কোনো বান্ধবীর সঙ্গে চলে আসতো আমাদের বাড়িতে। ওর বাবা-মা জানতেও পারতেন না। খোঁজ করতে করতেই তারা আসতেন আমাদের বাড়িতে। মনে আছে একবার লুকোচুরি খেলতে খেলতে সুইটি কোথায় লুকালো, ডাকলেও সাড়া দেয় না। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমার মা, সুইটির মা (খালাম্মা) এবং আমরা ছোটরা ঘর তালা দিয়ে সুইটিকে ডাকতে ডাকতে পি সি কলেজের প্রবেশমুখের ব্রিজ পর্যন্ত চলে এলাম। আবার ফিরে এলাম বাসায়। দরজা খুলতেই দেখি সুইটি ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও ঘরেই লুকিয়ে ছিল। হতভম্ব আমরা সবাই। সুইটিকে জড়িয়ে ধরলেন খালাম্মা, ও কেঁদে ফেললো।

সুইটিদের মূল বাড়ি সম্ভবত নওগাঁয়। ওরা বহু আগেই রাজশাহী চলে যায়। সুইটির আব্বা রাজশাহী প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের ইঞ্জনিয়ার হয়েই রাজশাহীতে চলে যান। তখন বেশ ছোট ছিলাম বলে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অনেক আগেই শুনেছি সুইটির বিয়ে হয়েছে। শ্বশুর বাড়ি কিনা জানি না, তবে একসময় থাকতো চট্টগ্রামে।
আমি যখন বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি)-এ কাজ করতাম। তখন কাজের প্রয়োজনে অনেক জেলা ঘুরতে হতো। একবার অফিসের কাজে রাজশাহী গেলে, আব্বা সুইটিদের খোঁজ নিতে বলেন। বর্তমান রাজশাহীর উপশহরের কোথাও তাদের বাসা ছিল। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাইনি। হয়ত তারা নওগাঁতেই ফেরত গেছে। জানি না সুইটির বাবা-মা এখন কোথায়, কেমন আছেন। তারাও জানতে পারলেন না আমার মাও আজ আর আমাদের মাঝে নেই। অন্য লোকে, অন্য কোনোখানে তাঁর বাস। আর সুইটি? ওর বড় বেলা আমার জানা নেই, আমি শুধু ধরে রেখেছি বাগেরহাট পিটিআই স্কুলে বড়জোর তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ফ্রক পরা ফুটফুটে সুন্দর মুখের ছোট বালিকা সুইটিকে।

এই দোতলা বাড়িতেই দেখতাম আমার বাবা-মাকে দাবা খেলতে। এক একটা উজির-নাজির, সৈন্য-সামন্ত তাঁরা মারছেন, আর আমি সেই মৃত সৈনিকদের টেনে নিয়ে সমাধিস্থ করছি দোতলার বারান্দা থেকে নিচে ফেলে দিয়ে। ওই দোতলা বাড়ির নিচেও দুইদিকে দুইটি পরিবার বাস করতো। আমাদের বাড়ির ঠিক নিচে যে পরিবারটি, শুনেছি সেই ভদ্রমহিলা ছিলেন রাগী, রগচটা মানুষ। অথচ তিনি নাকি আমাকে খুব ভালবাসতেন। তিনিই ডেকে ডেকে আমার ফেলা দেয়া জিনিসগুলো বাড়িতে পৌঁছে দিতেন, বাবু ফেলে দিয়েছে, এই বলে। আর অপর পাশে যে পরিবারটি বাস করতো। সেখানে খুব একটা যাতায়াত ছিল বলে মনে পড়ে না। তবু এক শীতের সকালে মাকে খোঁজ করতে করতে সে বাড়িতে চলে গেলাম। একটি ছোট মেয়েকে মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই তার হাতে ধরা রান্নাবাটি খেলার চাড়া দিয়ে আমার নাকে বসিয়ে দিল। নাক কেটে গিয়ে গর্ত হলো। আমার কান্না শুনে মা বেরিয়ে এলেন। ওই নাক নিয়ে আমাকে ভুগতে হয়েছে অনেক দিন। পরে মায়ের কাছেই জেনেছি, মেয়েটি ওই বাড়ির কোনো আত্মীয়র মেয়ে, উত্তরবঙ্গের কোনো জেলায় তাদের বাস। তারা বেড়াতে এসেছিল কিছুদিনের জন্য। আজ মনের আরশীতে নাম না জানা সেই ছোট শিশু মেয়েটিও ধরা পড়ে। এ সবই আমার জন্মবাড়ির স্মৃতি।

আমার এক বছর বয়সের মধ্যে এমন কোনো অসুখ হয়নি যা বলা যাবে না। প্রবীণ ডাক্তারদের বোর্ড গঠন হয়েছিল এই বাড়ির সিঁড়ি-গোড়ায়। কারণ একজন বয়স্ক হিন্দু ডাক্তার ছিলেন যিনি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারবেন না। ডাক্তারদের পরামর্শ ছিল, ছেলে যদি বেঁচেও যায় তবু তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটবে। আব্বা বলেন, আমার সেই সন্তান লেখক হবে, কে জানতো। আমার লেখক-সত্তা গড়ে দিয়েছিল বোধহয় আমার জন্মের ক্রান্তিকাল। সেই ক্রান্তিকালে একজন মধ্যবয়সী মহিলাকে কাছে পেয়েছিলেন আমার বাবা-মা। যাকে আমি আজও স্মরণ করি, তিনি ‘সেকেন্দারের মা’। এ নামেই পরিচিত ছিলেন। আমাদের বাড়িতে কাজের সূত্রে থাকতেন। মাকে সান্ত্বনা দিতেন, ‘বু, দেখেন, এই ছেলের গায়ে একদিন মাংস লাগবে’। তার কোলে আমি মল-মূত্র ত্যাগ করলে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাথরুমে গিয়ে কাপড় পরিষ্কার করে কাপড়ের শুকনো অংশ সামনে পেঁচিয়ে ওই শাড়িই পরে আসতেন। এসবই মায়ের কাছ থেকে জানা। এতটাই অসুস্থ ছিলাম যে, আমার ১৪ মাসের বড় বোন আমাকে দেখে ভয় পেত, কাছে আসতো না। অথচ এই সেকেন্দারের মা নিজের পয়সায় লজেন্স কিনে এনে আমার বালিশের নিচে রেখে আপাকে বলতেন, ‘দেখ, আসো, তোমার ‘ভাইয়া’ তোমার জন্যে লজেন্স কিনে এনেছে’। এভাবেই তিনি আমার বোনের ভয় ভাঙিয়ে দিলেন। আর আমার বোনও সেকেন্দারের মার ‘ভাইয়া’ শুনে শুনে আজও আমাকে ভাইয়া বলেই ডাকে, কখনো নাম ধরে ডাকেনি। অফুরন্ত মায়ের ভালবাসা নিয়ে যে মহিলা, ‘সেকেন্দারের মা’কে আমি দেখেছি লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতে। কোনো দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে তিনি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারতেন না। তার সেকেন্দারকে কখনো দেখিনি, দেখলেও মনে নেই। কিন্তু আমার কিংবা আমার বাবা-মার জীবন থেকে এই মহিলাকে ছেঁটে ফেলা সম্ভব নয়। শেষবার তাকে দেখেছি কলেজ ক্যাম্পাসে রেল স্টেশন সংলগ্ন আমাদের বাসায়। সারাদিন ছিলেন। এরপর ও বাড়িতে থাকতেই একদিন তার মৃত্যুসংবাদ এলো। শুনেছি তিনি খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ.)-এর পূণ্যভূমি আজমীর শরীফে গিয়ে ইন্তেকাল করেছেন। দেখলাম আমার বাবা-মার চোখে পানি। দীর্ঘদেহী শক্তসামর্থ্য মানুষ হিশেবে আমার বাবাও সেদিন কান্না ধরে রাখতে পারেননি। আমার মায়ের পাশে ‘সেকেন্দারের মা’ও আজ আমার স্মৃতিতে চিরজাগরুক।

রোগাক্রান্ত আমি সেই অনতিক্রম্য দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে এই বাড়িতেই প্রতিদিন একটি পথশিশুকে আমি আমার পরনের জামা দিয়ে দিতাম। আর মা প্রতিদিন দেখতেন একটি একটি করে আমার জামা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটিকে বলা ছিল ঠিক দুপুরে আসতে। যখন সবাই ঘুমে থাকবে। মা একদিন ঘুমের ভান ধরেছিলেন। ওই ছেলেটি এসে কড়া নাড়তেই আমি চেয়ার টেনে টেনে নিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে দরজার খিল খুলে যখন ছেলেটিকে জামা দিব, তখনই মা এসে ধরে ফেলেন। সেই থেকে আমার দাতা হাজী মহসীন সাজা শেষ। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই মানুষকে সহসাই গ্রহণ করে নেয়ার শক্তি আমার ছিল। মানুষের সঙ্গে মিশে যেতাম খুব সহজেই। বিশ্বাস করি, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। তাই তো আজও কোনো কোনো সময় ঠকে যেতে হয়। তবুও ভাবি, মানুষ তো আমাকে ভালবাসে। সেই ভালবাসার প্রেরণায় স্ত্রী-পুত্র সহকারে এই বাগেরহাট ভ্রমণ।
আমার জন্মবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব কথাই মনে পড়ে যায়। সামনের সেই বিস্তৃত খোলা মাঠ আর নেই। অনেক মাল্টি স্টোরিয়েড বিল্ডিংয়ে ভরা। মোশাররফ মল্লিকের কুঁড়েঘর চোখে ভাসে। আষাঢ়-শ্রাবণের একটানা বর্ষণে ওই মাঠ ভরে গেছে। অবিরাম ডেকে চলেছে ব্যাঙ। আমি আর পুতুল (আমার বড় বোন) বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্যাঙের একটানা ঘ্যাঙর ঘ্যাং উপভোগ করছি।

সুইটি কি করছে তখন? ঘুমচ্ছে? মনে পড়ে না। ওই পথশিশুকে তো আর খুঁজিনি। সেকেন্দারের মা পরবাসে কেমন ঘর তুলেছেন? আমার মায়ের সঙ্গে কি তার দেখা হয়? আমার জন্মবাড়িতেই তো এসব অক্ষয় মানুষদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাকে ভুলি কি করে? জন্মবাড়ির গলিপথ পেরিয়ে এসে আমলাপাড়ার বড় সড়কে উঠেছি। আমার তিন বছরের ছেলে ওয়াসিল ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে জিজ্ঞেস করে, বাবা তোমার জন্মবাড়ি কই? কি করে বলি, তাকে হারিয়ে এসেছি বিসর্জনের জলে।