কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রাম ॥ সাইফুল ইসলাম


কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের প্রাচীন গ্রাম তেতুলিয়া। সিরাজগঞ্জ শহর গড়ে ওঠার আগে থেকে ইতিহাসের পাতায় এ গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশে গণিত সম্রাট হিসেবে খ্যাতি লাভকারী যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী। এ গ্রামেই জন্মেছিলেন সিরাজগঞ্জ শহরের বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ডা. জিতেন্দ্রনাথ নিয়োগী। জমিদার হিরেণ সাহা, লেবু সাহাদের বাড়ি এ গ্রামেই।
সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৮ কি.মি. দূরে অবস্থিত তেতুলিয়া গ্রামটি পূর্ব ও পশ্চিম- দুটি পাড়ায় বিভক্ত। হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি বাস। ১৯৭১ সালে গ্রামের লোকসংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার যাদের অধিকাংশই সনাতন ধর্মাবলম্বী। গ্রামের পশ্চিম পাড়ার স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হিন্দু পাড়া আর পূর্ব পাশে মুসলমান পাড়া। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে একটি কাঁচা সড়ক আর রেলযোগাযোগ। লোকাল ট্রেন থামতো গ্রামের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কালিয়াহরিপুর স্টেশনে। শিক্ষার জন্য ছিল একটি প্রাইমারি স্কুল যেখানে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতো। পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর কোনও কোনও ছেলে উচ্চ শিক্ষার জন্য শহরের স্কুলে ভর্তি হতো, কিন্তু মেয়েদের লেখাপড়ায় ইতি টানতে হতো পঞ্চম শ্রেণীর পরেই। ছেলেরা স্কুল-কলেজে যেত ট্রেনে, সাইকেলে অথবা পায়ে হেঁটে। সেখানেই তারা রাজনীতির সংস্পর্শে আসে। তার প্রভাব এসে পড়ে গ্রামেও।

১৯৭১-এর মার্চের শুরুতেই স্বাধীনতার ঢেউ এসে লাগে এ গ্রামে। গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা দু’টি গাদা বন্দুক নিয়ে কালিয়াহরিপুর স্টেশন প্লাটফর্মে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। গ্রামের যুবকরা তাতে যুক্ত হয়। ২৬ মার্চের পর গ্রামের কোনও কোনও যুবক থ্রিনটথ্রি রাইফেলও জোগাড় করে ফেলে। ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নেয় পাক-বাহিনী। ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে তেতুলিয়াবাসী। গুটি কয়েক হিন্দু পরিবার, যাদের সঙ্গতি আছে তারা ভারতে চলে যায়, তবে অধিকাংশ হিন্দু পরিবার গ্রামেই অবস্থান করে। শহরে পাক-বাহিনী আসার পর মানুষ লুকিয়ে পালিয়ে, কখনো পালিয়ে রাত জেগে বাড়ি পাহারা দিয়ে আত্মরক্ষার পথ বেছে নেয়। আর আশা করতে থাকে, গ্রাম পালানো তরুণেরা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে অস্ত্র নিয়ে গ্রামে ফিরে এসে তাদের রক্ষা করবে। তখন মাঝেমধ্যেই গ্রামে গুজব ছড়াতো মিলিটারি আসার, সঙ্গে সঙ্গে সবাই আড়াজঙ্গলে পালিয়ে যেত। মিলিটারি আসার গুজব ছড়াতো প্রধানত ওই সময়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কিছু ডাকাত শ্রেণীর লোকজন। মিলিটারি না আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গ্রামবাসী আবার ফিরে আসতো নিজ বাড়িতে।

১১ মে দুপুরের দিকে ট্রেন এসে থামে কালিয়াহরিপুর স্টেশনে। ট্রেন থেকে নামে পাক-সেনারা। সেদিন তাদের সঙ্গে ছিল ঈশ্বরদী থেকে আসা এবং স্থানীয় অবাঙালিরা। তারা ঢুকে পড়ে গ্রামের ভেতরে। স্টেশনের কাছাকাছি হিন্দু পাড়ার প্রায় সকল বাড়িই আগুন দিয়ে ছাই করে দেয় পাক-বাহিনী। হত্যা করে ঝড়ু মণ্ডল ও প্রিয় শংকর নিয়োগী ওরফে সুধা নিয়োগীকে। পরে পশ্চিম পাড়ায় আসে এবং সেখানেও হত্যা করে হোসেন সিদ্দিকী, আনসার আলী, আমিনুল ইসলাম ও আব্দুল হামিদকে। এদিন পাক-সেনাদের গুলিতে আহত হন হায়দার আলী, মোকসেদ আলী ও ময়েজ সরকার। আগস্টের মাঝামাঝি আরো একদিন গ্রামে আসে পাক-সেনারা। সেদিন ধরে নিয়ে যায় অভয়চরণ পাল, রাসুতোষ পাল ও সুধীরচন্দ্র পালকে। তারা আর গ্রামে ফেরেনি। মুক্তিযুদ্ধে তেতুলিয়া গ্রামের শহীদ হন মোট ৯ জন।

গ্রামের কেউ স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতায় অংশ নেননি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন রবি নিয়োগী, সজল নিয়োগী ও আব্দুল হামিদ ওরফে ওয়াহেদ আলী। মুক্তিযুদ্ধ শেষে সবাই অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে আসার কিছুদিন পরই গুপ্ত ঘাতকেরা আব্দুল হামিদ ওরফে ওয়াহেদ আলীকে হত্যা করে। গ্রামবাসীর ধারণা, যুদ্ধ চলাকালে এলাকায় তৎপর থাকা ডাকাত দল তাকে হত্যা করেছে।

তথ্য : সাজেদুল ইসলাম পান্না, বয়স-৫৮, স্কুল শিক্ষক, তেতুলিয়া