কয়েকটি কবিতা॥ অলোক সেন


নিমন্ত্রণ

মৃদু শব্দ, সংগীত চিত্ত হরণ,
রাঙা চরণে নূপুর
গ্লাসে গ্লাসে ঢেউ, আবহ
রোম্যান্টিক।

দূরে সুরপুর, ঝালা দ্রুত
ক্রমশ বাতাস হালকা,
বসন্ত রাত্রিও।

পা ফেলবার আগে
হে টলায়মান, দ্যাখো,
দণ্ডটি কোনদিকে স্থির।

কবিতার নতুন টাউনশিপ,
নিমন্ত্রণ,
পা ফেললেই অনুমতি
তাঁবুটি ফেলুন।


গল্পপাঠ

যে কথা বলব আজ
তার একটা গল্প আছে,
আছে ঘর ও সংসার।

প্রসাধন ঢাকতে নয়,
নিজেরই রক্ষায়
নিজেকেই তা দেখাতে হয়।

যে মুখ বলবে কথা
ধোয়ামোছা চাই—
কিছু তো তার বলার কথাই।

প্রতিদিনের এই যে মুখ
তারও আছে দুঃখ শোক,
আনন্দ, সে কি নিরন্তর।

জীবন মানে…
মৃত্যু মানেও তাই—
তাদেরও ইচ্ছা জাগে ছুটির।

মুখের কাছে বাড়ানো মুখ,
ও পাঠক, গল্প জমুক।


ভাষণ

কথা গুনগুন
কলকল করছেন শব্দ সমুদয়,
অদূরে আঙ্গুর ক্ষেত।

টক না মিষ্টি
মিষ্টি না টক—
সহসা বজ্রধ্বনি;

মিছিলে যে মেঘ ঝরছে, বৃষ্টি!

ঠমকে চমকে পথ দিশাহারা যেই
ঘন ঘন বাইট ভাঙল,
আলো যেন অনলে ইন্ধন।

কী উল্লাস,
ফাটোফাটো বসন্ত গুণ্ঠন
আনন্দ! আনন্দ!
কবন্ধ লাঞ্ছিত তপোবন।

চেয়ারে ওই ঝরে খ পুষ্প
অলৌকিক।


অন্ধ হতে হতে

কাকে বলো লোকচক্ষু,
কেন মিথ্যেটি মহীয়ান!
আমি বসলাম।

গুমটি ঘর নয়,
হাসপাতাল চত্বরেও নয়,
নন্দন চাতালে, অন্ধ হব বলে।

চক্ষুস্মান যারা চলেফেরে
বাগ্মী বলে কথা,
যাহারা কলমচারি—
ধারহীন তরবারি হাতে
অহংকার ফেটে পড়ে।

অন্ধ হতে হতে ভাবি
কী করে সামাল দেব যদি—
জ্বলে ত্রিনয়ন।

ক্ষুধা

আগানবাগান ঘুরে, এই তো
এনেছি অক্ষর,

জ্বলন্ত উনুন, মৃদু ফুট
রন্ধন নৈপুণ্য খোলে
ক্ষুধার দুয়ার।

রাজার প্রসাদ, উপহার
চেয়েছে তোমারই অস্ত্রে
তোমার সংহার।

সে তো অক্ষর কাঙ্গাল
শান দেয়, ধায়
বিবেচনাহীন

নির্বোধ,
অর্গলহীন ক্ষুধার দুয়ার।



শিকার

গুঢ় ও নিবিড় চক্র
আমার লাঞ্ছনা জানে
পাতার আড়াল।

ধ্বংস আর সৃষ্টি
এ ওকে ঠেলেছে—
ক্ষুধা অনুপম।

যাপনের সাহসী শিকার

আমি তো চেতন্ নই, নর;
ধরিত্রীর কার্নিশে পোষ্য
প্রকৃতির মায়া,
আনাচে কানাচে সেই ছায়া

রৌদ্র হাসে, পাখিদের গান—
ক্ষুধা স্বাগতম।



সে কথা আবার

স্বর্গচ্যুত,
আড়ালে যে ছায়ালোক
পথিক গন্ধর্ব আমি
খুঁজি স্বরলিপি, হারানো নূপুর।

পুঁথি পাঠ চাতালে
না জানি সে কবেকার,
সাক্ষী কলম বেচারা
অমৃত ভেবে, বিষে যে ডুবিয়েছে মুখ।

ছারখার সে গন্ধর্বনগর
তবু আত্ম সম্মোহন,
পথেও পাঁচালি পাঠ।

দুজনে রেখেছে হাত
ফুলমালা, ধুপধুনো, ধোঁয়াময় সিঁড়িপথ

পাঠান্তে কে ফেরে? ফেরা যায়!



লুকোচুরি

বিষাদও মিশেছে স্রোতে—
যেতে হবে তাই
থামিনি গঞ্জে।

তুমি তো বন্ধু,
জোয়ারে সে যদি ফেরে
ঘাটে চোখ রেখে
দাঁড়িও।

চিনতে পারিনি,
জেনেছি অনেক পরে
নৌকো তখন গঞ্জের পারে।



ইশারা

কথা
সামান্য বৃষ্টির ফোঁটা

তরল ব্যাঞ্জনা তার
উপনিবেশের—

কুয়াশার মতো রাতের জ্যোৎস্নায়
আলেয়ার খেলা
যেন মায়া তরণীর

দিশাহারা,
কিঞ্চিৎ বাষ্পের খুঁটিনাটি,

রয়ে যায়—
শুধু রয়ে যায়


কথোপকথন

জদুবাবুর বাগানে আজ ধানাইপানাই
গঙ্গা যদি উতল— চিত্ত তবে শান্ত কেন!

হা হা হেসেই হাওয়া
ঝরিয়ে গেল পাতা

কিছুই বলনি, এক শিখা
নিষ্কম্প ও শাদা পৃষ্ঠা, একা…