কয়েকটি কবিতা ॥ মাহফুজা অনন্যা



গায়কপাখি

তোমার নিঃশ্বাস পাওয়ার জন্য একটি নলখাগড়ার বাঁশি হয়ে আছি,
বহুদিন তাতে সুর তোলোনি হে গায়কপাখি,
বহুদিন তোমার ঠোঁটের স্পর্শ নেই বাঁশিটিতে…

মহামারি করোনাকাল ফিরিয়ে দিয়েছে যার যার মাতৃগর্ভ
আলোহীন জরায়ুর ভিতর কাটছে কোয়ারেন্টাইন জীবন।

সময়ের দ্রাবক যদি তোমার সময় হয় আমাকে দ্রবীভূত করো
অথবা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মৃত্যু কার্যকর করার মতো আচমকা মৃত্যুদণ্ড দাও

চুম্বনহীন পৃথিবীতে মৃত্যুর জন্য এর চেয়ে আর কীভাবে প্রস্তুত হতে পারি…


ধুয়ে নিচ্ছি হাত

জীবন থেকে ধুয়ে নিচ্ছি হাত, যেন আমি অস্বীকার করি, অস্বীকার করি
জমাট রক্তের ভেতর প্রজন্ম, কাল এবং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ

সময়কে রুটির মতো ভিজিয়ে খামির বানাই এবং তা খেয়ে নিচ্ছি যেন পোড়া মাংস
ইতিহাস ও বাক্যের মরীচিকা থেকে ধুয়ে নিচ্ছি তালতাল সময়কে
যখন মরে যাচ্ছে সভ্যতা
ছেঁয়ে যাচ্ছে বিভ্রান্তির সুবর্ণ মাছি

আমি মাতৃভূমির মতো অসহায়
আমার মাথা নেই, মাথার নিচে বালিশ নেই
বিদ্যা-বীরত্ব লাশের মতো ঘুমায়

কিংবা আমি একটি ছোট নদী
কীভাবে ধরে রাখি সব কূল?

দুর্ভাগ্যের গণক গুনছে
কাকের নাড়িভুঁড়ি, ছাইপাঁশে সমুদয় সম্ভাবনা
পাগলের ফুসফুসের ভেতর শতাব্দীর দীর্ঘশ্বাস

কী-ই বা করার আছে ছোট্ট একটি জীবন,
জীবন থেকে ধুয়ে নিচ্ছি হাত, ধুয়ে নিচ্ছি জামা
রক্তে বসে আরাম করছেন শকুন, সিংহ-মামা


অদ্ভুত একপাল কুকুর

সবুজের মশাল জ্বেলে গাছগুলো নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে
জ্বলছে রাস্তা, জ্বলছে যান, জ্বলছে জীবন।
এরকম দৃশ্যে আহত হয়ে আমিও পড়ে আছি বহুদিন
বাইরে বেসামাল আগুন।

এই শহরের বাতাসে ছোঁয়াচে আগুন দাউদাউ জ্বলছে
নাক, মুখ, চোখ বেয়ে বুকের গভীরে ঢুকে ধ্বংস করছে নিঃশ্বাস-যন্ত্র-ফুসফুস

ও নিয়ন্ত্রণহীন আগুন তোমাকে বলি, এই শহরে
বড় বড় পাপের সাক্ষী ঐ রাতের তারা,
তারাদের জিগ্যেস করো, সূর্যের মুখোমুখি হও,
শুনবে, পাপ দেখতে দেখতে ক্লান্ত জোৎস্নামাখা চাঁদও।

অথচ এই শহরেই এতদিন সব পাপ বৈধ ছিল,
মদ, জুয়া, ক্যাসিনো, মন্ত্রী, নারী সবাই স্বাধীন ছিল যে যার মতো।

আমিও দেখেছি, সন্ধ্যে হলে এ শহরে জুলফির মতো ভালোবাসা উড়তো,
যেভাবে বাজেয়াপ্ত তরমুজ হাতে হাতে ভাগ হয়ে যায়, তেমনি ভালোবাসাও টুকরো টুকরো হয়ে ভাগ হয়ে যেতো নিমেষপাতেই।

আহা! আগুন এসেছে এক, অদৃশ্য আগুন।
আমিও ব্যর্থ মানুষ আগুনকে বড্ড ভয় পেয়ে বহুদিন
একটি ছাদের নিচে একই দৃশ্যে পড়ে আছি,
শুধু বুঝতে পারি মগজের রিড টিপে টিপে দুরন্ত
একটি পেরেক দারুণ ঠুকে ঠুকে উপরে উঠে যাচ্ছে,
উঠে যাচ্ছে, উঠে যাচ্ছে…
শহরে
গ্রামে
লোকালয়ে…

বিরামে
ভ্রমনে
আয়োজনে…
গভীর থেকে গভীরে ক্ষত করে চলেছে।

বুকের ভেতর কুকিয়ে ওঠে অতি জাগরিত অদ্ভুত একপাল কুকুর।