কয়েকটি কবিতা ॥ শামস আল মমীন




ভালো ছেলে

মায়েদের বাবাদের আদরের ছেলেগুলা
ভালো আছে,
শহরে শহরে থাকে ওরা
ঘড়ি ধরে হাওয়া খায়
কথা বলে কম, মেয়েদের সাথে আরও কম
ওরা রাত জেগে ইংলিশফিংলিশ পড়ে
ভারি ভারি ডিগ্রী লয়
ওরা ডাক্তার হয়, ওরা ইঞ্জিনিয়ার হয়
ওরা মহকুমা থেকে মহানগরে যায়
ওরা থাকে ঝাড়বাতিঅলা ফ্লাটে, ওদের বিষণ্ন ছাদে
গোলাপ আর চন্দ্র মল্লিকা হাসে

ওদের বউগুলো ক্যান জানি টাকাওয়ালা হয়
ওরা চকলেট খায়, ক্যাপুসিনো খায়
ওরা পুসি বেড়ালের মতো পাশেপাশে থাকে
বউদের কথা মন দিয়ে শোনে

ওদের মায়েরা বারান্দা উঠান পাক-সাফ করে
মোয়া দিয়ে, নাড়ু দিয়ে, পিঠা দিয়ে কৌটাগুলো ভরে,
আকাশে ঈদের চাঁদ ..

মানুষ বোঝাই রেলগাড়ি আসে বাস আসে টেম্পু আসে
কিন্তু, ভালো ছেলেগুলো আসে না
শিশিরের মতো টলোমলো ভোরে
ফেসবুকে বার্তা আসে
ঈদ মোবারক,
মায়েদের বুকভারীহয়েআসে
চোখগুলো ভেজা ভেজা..
লাল..



দেশে দেশে

নিউইয়র্কের আইল্যান্ডগুলো সারারাত
নিভে জ্বলে, কিন্তু
বহু বহু দেশে
এবং বাংলাদেশে,
এইক্ষণে, চারিদিক ফর্সা হয়ে আসে..
টেবিলে টেবিলে উষ্ণ রুটি, কমলার রস,
মেলামাইনের মায়াবী প্লেটে গোল গোল সব
ডিমের কুসুম
স্বাগত জানায়..
সুপ্রভাত, হে সুসময়। কিন্তু

ফেরিঘাটে,
স্টেশনের প্লাটফর্মে
কুলিদের লাল লাল জামার ভেতর থেকে
সকালের সুশোভিত আলো
নদীভাঙা উদ্বাস্তুর
ম্লাণমুখ থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসা
বিড়ির ধোঁয়ার মতো
আস্তে আস্তে
মিশে যায় গ্রাম ও শহরে।

টাইম স্কয়ারে ছটফট করা আলোর ঝলক দেখতে দেখতে
কখন যে একটি বালক
হঠাৎ পিছলে পড়ে মিরপুরে, সাভারের
রপ্তানিমুখি পোশাক তৈরি কারখানার ফটকে;
মালিবাগ মগবাজারে
রেললাইনের ওপর
হাঁটু গেরে বসে থাকা বৃদ্ধের বিষণ্ন চোখে।

বিদেশ ফেরত দম্পতির স্ফীত অনুদানে
উলিপুর, তিস্তা, কুড়িগ্রামে
চকচক করে ওঠে মাদ্রাসার ঢেউটিন।
বস্তির অস্থির শীতে জড়সড় শিবু কাকা
রিলিফের কম্বল হাতে
ফোকলা দাতের বিষন্ন হাসিতে আনন্দ ছড়ায়
মঙ্গাপিড়িত উলিপুরে..

এইসব দুপুররাত্রি এবং
নিরব সকাল
ঘুরে ফিরে আসে;
আমরা জানালা খুলে দেখি
কল তলে ভিড়,
ঝাড়ু হাতের ঘুনাথ ফুঁ দেয় গরম চায়ে,
আর
স্টেশনের প্লাটফর্মে
পাগলিটা…
তখনো গভীর ঘুমে।


পাগলি-৩

ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮। শিবচর (মাদারিপুর) হাতিরবাগান মাঠে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারী, চার যুবকের সহায়তায় একটি শিশু জন্ম দেয়ার খবরটি চ্যানেল ২৪ টেলিভিশনে দেখে/শুনে..

কাঁপতে কাঁপতে শেষ কুপিটিও নিভে গেছে
শিবচর হাটে, থেমে গেছে পাখিদের
হই চই আর গ্রাম্য হাটের রুগ্ন কোলাহল।
অন্ধকারে ভেসে আসে সেই আদিম চিৎকার।
কেউ কি জানে,
কি কি ফুল ফুটেছে আজ পৃথিবীতে?

খোলা আকাশের নিচে ফিসফাস কথা হয়
পাগলিটা..‘ মা হইছে, পাগলিটা মা হইছে’ ;
গ্রাম্য টাউটের চায়ের ধোঁওয়ায়
সভ্যতার ইতিহাস ঝাপসা হয়ে আসে।

খবরের কাগজে, ফেসবুকে, টুইটারে
টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে খবর আসে
‘পাগলিটা মা হইছে, কিন্তু
বাবা হয় নাই কেউ’…