খণ্ড খণ্ড ঘটনা ও পরিবেশে আমার একাকিত্ব ॥ গোলাম কিবরিয়া পিনু


মানুষ তো মানুষের মাঝে ও প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকার পরও একান্তে একা! নির্জনতায় একা, নিঃসঙ্গতায় একা, লোকচক্ষুর আড়ালে একা, অন্তর্মুখী হয়ে একা। একক জগৎ নিয়ে সে একা নিঃসীম! আমিও একাকিত্ব নিয়ে জীবনযাপন করি প্রতিনিয়ত।

একাকিত্ব আছে বলেই প্রতিটি মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে স্বয়ম্ভু ও একক! আর আমি তো একাকিত্ব প্রতিদিন অনুভব করি, কাছে টানি ও সংরক্ষণ করি। একাকিত্ব জরুরি ও প্রয়োজনীয় বলে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এই একাকিত্বের ভেতর আমি আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি। এই একাকিত্বের মধ্যে কত আকারে ও কতভাবে খুঁজে পাই আমাকে-কখনো অসহায় ও করুণ, কখনো দীর্ণ ও অশ্রুলোচনের ভেতর, কখনো রাগী ও একগুঁয়ে, কখনো সমব্যথী ও মানবিক, কখনো ঈর্ষাকাতর ও হিংসালু, কখনো দুর্ভাগ্য ও পরাজয় নিয়ে নুব্জ, কখনো যুক্তি ও প্রজ্ঞা নিয়ে স্থির, কখনো বিবেকতাড়িত হয়ে অনুশোচনা ও বোধে চঞ্চল, কখনো নিজের শক্তিতে নিজের ভরসাস্থল ও দিকচিহ্ন, কখনো কল্পনা ও ভাবনার দিগন্তপ্রসারী অঞ্চল-ইত্যাদি।

এখন-জীবনের এই সময়ে-ঢাকা নগরের কোনো এক ফ্লাটে থাকি। প্রতিদিন তো ঘরে দরোজা বন্ধ করে কখনো দীর্ঘ সময়, কখনো অল্প সময় কাটাতে হয়। একপাশে থাকে ল্যাপটপ, আর এক পাশে থাকে স্মার্টফোন, পড়ে থাকে পুরনো ডেকস্টপ টেবিল আর বইয়ের র‌্যাগ, বিছানায় ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বই-এমন পরিবেশ হয়তো বলা যায় সামাজিকতা থেকে দূরবর্তী, নির্জনতায় একাকী। এই একাকিত্ব নিজের মত সাজানো ও উপভোগ্য। এমন পরিবেশ আমার সবসময়ে একাকিত্বের নিরিখে প্রিয়।

আমি দীর্ঘদিন যে অফিসে কাজ করেছি-সেখানেও এক রুমে এককভাবে বসে কাজ করেছি-ফোন-কম্পিউটার ও অন্যান্য সুযোগ নিয়ে। কখনো কখনো বেশ কর্মব্যস্ততা ছিল বা কখনো কম, কাজের ফাঁকে কখনো কখনো একা জানালা দিয়ে তাকিয়ে গাছ-গাছালি দেখে একাকিত্বজনিত সময় উপভোগ করেছি, কখনো চেয়ারে বসে মনকে একাকিত্বের মাঠে ছেড়ে দিয়েছি। দুপুরে খাবারের সময়টা একান্তভাবে নিজের কাছে সংরক্ষণ করার জন্য ক্যান্টিনে গিয়ে দুপুরে খাইনি-একান্ত সময় পাবো না বলে-বাসা থেকে খাবার নিয়ে এসে দুপুরের খাবার খেতাম। দুপুরে অফিস রুমের দরোজা বন্ধ করে রাখতাম নিজের ভেতর নিজেকে ডুবিয়ে রাখার জন্য। এভাবে অফিসেও একাকিত্ব লালন করেছি।

গাইবান্ধা শহরে বেড়ে উঠেছি-সেখানে কতভাবে যে একাকিত্ব বিভিন্ন পরিবেশে অনুভব করেছি। তখন এই ছোট শহরটি ছিল বেশ নিরিবিলি। নির্জনতা নিয়ে শহরটি ছিল বিভিন্ন অংশে নীরব ও অচঞ্চল! এর মাঝে অন্তর্মুখিতা নিয়ে নিজেকে কতভাবে যে আবিষ্কার করা যেত। তারই কিছু কিছু খণ্ড খণ্ড চিত্র তুলে ধরি অতীতের পর্দা থেকে।

মুন্সিপাড়ায় শৈশবের ক’বছর কেটেছে ভাড়া বাসায়। গাছগাছালি ছায়ানিবিড় এলাকা, বাসার পূবদিকে বিস্তৃীর্ণ ফসলের মাঠ। শীতকালে ঘুড়ি ওড়ানোর সময় থাকলেও-সেই শৈশবে কামরাঙা গাছের নিচে বসে থাকা, পুকুরজলে মাছ ধরার একাকী সময় কাটানো। শহরের অদূরবর্তী দোকান থেকে বাবার হাতে কেনা জিনিসপত্র নিয়ে আলোআঁধারের রাতবেলায় চালতে গাছের ভয় জড়ানো পরিপার্শ্বের মধ্যে দিয়ে একা বাসায় ফেরার সময়-একাকিত্ব কখনো কখনো বেশ স্পর্শ করেছিল।
গাইবান্ধা শহরে ডেভিড কোম্পানি পাড়ায় আদমজী জুট মিলের কোয়ার্টারে কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে বেশ ক’বছর। বাবার চাকরি সূত্রে। বাসার পূব পাশেই ধানের ক্ষেত আর তার পাশ দিয়ে রেললাইন। আর উত্তরে ঘাঘট নদী প্রবহমান। কতদিন যে একাকী রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে উত্তরে ভেড়ামারা ব্রিজ পর্যন্ত গিয়েছি। এতেও এক ধরনের একাকিত্বের প্ররোচনা ছিল! ডেভিড কোং পাড়ার ঘাঘট নদীর ধারে নির্জন জায়গায় বসে সন্ধ্যা পার করে দিয়েছি একা ও সঙ্গবিমুখ অবস্থায়। তখন হাইস্কুলে পড়ি-ভোরবেলায় ওঠার অভ্যেস, এক ভোর সকালে আদমজী জুট মিল অফিসের বারান্দায় পোষাপাখি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, তখন দেখি রেল ইঞ্জিনের হুইসেল বেজে চলছে-কয়লার ইঞ্জিনে একজন মানুষ পেঁচিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে গেল। তিনি ছিলেন এই শহরের একজন নামকরা আইনজীবী। তিনি ভোর-সকালে রেল লাইন ধরে অনেকের মত নিয়মিত হাঁটতেন। এই করুণ স্মৃতি নিয়ে বেশ কিছুদিন ঘুমাতে পারিনি। একা ছটফট করতাম, ঘুম ভেঙে যেত, ভয়-বিহ্বল অবস্থায় রাত্রির সময়গুলো যন্ত্রণায় কাটতো। মা আমাকে আগলে রাখতেন। এই একাকী যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো বেশ মনে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়, আগে ও পরে বিচ্ছিন্নভাবে গাইবান্ধা শহরের মোমেনান রোড়ে নানার বাড়িতে আমরা ছিলাম, আমি একাও ছিলাম কোনো কোনো সময়। বিশেষ করে বাবার চাকরির সূত্রে মুক্তিযুদ্ধের পরের বছরগুলোতে ভাইবোনসহ গাইবান্ধার বাইরে ছিল বাবা-মা, আমি তখন নানার বাড়িতে থাকতাম ও কলেজে পড়তাম। এই মোমেনান রোড আমার স্মৃতির বহুবর্ণিল বিস্তৃত এলাকা নিয়ে আছে। শুধু একাকিত্বের আড়ালে থাকা চিত্র টেনে এনে বলি-নানার বাসার সাথেই ছিল গণেশ নানাদের বড় এলাকা নিয়ে বাড়ি। বাড়ির উত্তর পাশের বেশ ক’টি বিল্ডিং ছিল পরিত্যক্ত তখন। সেখানে জঙ্গল হয়েছিল বিল্ডিংয়ের ছাদে ও অন্যান্য জায়গায়। ব্রিটিশ আমলে এটা নাকি ছিল চিনি-মিছরির ফ্যাক্টরি। তো আমার মন খারাপ হলে বা একা হয়ে সময় কাটানোর জন্য এই পরিত্যক্ত দেওয়ালের ভাঙা জানালার পাদদেশে বসে থেকে তার পশ্চিমে বেশ দীর্ঘ অপরিষ্কার পানাভর্তি ঝোপজঙ্গলময় পুকুরের পানে তাকিয়ে থাকতাম। সাপ ও অন্যান্য পোকামাকড়ের ভয়ও ছিল, তবু শুধু নিজের একাকিত্বকে আরও গভীরভাবে অনুভবের জন্য এই ভূতুড়ে পরিবেশকে আলিঙ্গন করে কত যে একা সময় কাটিয়েছি। নানার বাড়ির পাশেই ছিল ব্রিটিশ আমলে তৈরী ‘বার্মা ব্যাংক’ খ্যাত বিরাট আকারের বড় একটি বিল্ডিং, প্রশস্ত বড় বড় বারান্দা তার, এমন বড় বিল্ডিং-সেসময়ে চোখে পড়েনি এই শহরে। এর সামনে ছিল মাঠ। আমরা খেলতাম। এর বারান্দায় খোলা বাতাসে কতদিন একা বসে সময় কাটিয়েছি। এর ছাদে উঠেছি, ভয় কাটিয়ে একা। এই একা হয়ে এমন পরিবেশে থাকবার নিঃসঙ্গতা তখন কী এক টানে কিশোর বয়সে যে টেনেছিল।

সম্ভবত ১৯৭৪-এ মা কী এক জেদে গাইবান্ধা কলেজের পাশে কিনে রাখা জমিতে কোনো রকম ঘর তুলে নিয়ে ভাইবোন নিয়ে থাকা শুরু করলেন। বাবা তখনও চাকরির কারণে গাইবান্ধার বাইরে। এই বাসার পূবদিকে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের জমি আর জলভূমি। বর্ষার সময় তা হয়ে ওঠে জলের আধার! এখন আর সে-চিত্র নেই-চারদিকে বাড়িঘর দখল নিয়েছে। কাটতে থাকল নতুন এক পরিবেশে আমারও জীবন। একা হেঁটে কোনোদিন চলে যেতাম ফসলি জমিতে বা জলাভূমির কাছে। কোনো কোনো দিন দূরে গিয়ে একা গাছে চড়ে নিভৃতে সময়ও কাটিয়েছি। গরমদিনে বাসার পেছনে গাইবান্ধা কলেজের বারান্দায় শুয়ে-বসে কত সময় কাটিয়েছি।

আমাদের শৈশব-কৈশোর ও তরুণ বেলার শুরুতে গাইবান্ধা পার্ক ছিল বেশ নিরিবিলি। গাইবান্ধায় থেকেছি অথচ পার্কে সেদিন বসিনি-তা কখনো হয়নি। এই পার্কে বসে আমরা যেমন আড্ডা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিকল্পনায় মেতেছি, পাশাপাশি-একা পার্কের বেঞ্চে বসে বেশ রাত পর্যন্ত সময় কাটিয়েছি কত শতবার! এই পার্কে একাকীত্বের একক স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করেছি একান্তে। তা ভোলা যাবে না।

উল্লিখিত পার্কের পাশেই ডিবি রোড, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই আমরা খেলাঘরের অফিস নিয়েছিলাম, অফিসটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের হাতে ছিল, পরে এই অফিসের দখল চলে যায় বিরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে অন্যের হাতে। এই অফিসে একা আমি সময় কাটিয়েছি কত দিন-কখনো বা রাতও। একা একা সেখানে থেকেছি বলেই নিঃসীমশূন্যতা নিয়ে একাকিত্ব অনুভব করতে পেরেছিলাম।

গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়, যেখানে আমি পড়েছি-যেখান থেকে আমি এসএসসি পাশ করেছি, এই স্কুলটি বেশ ঐতিহ্যবাহী। বিরাট মাঠ নিয়ে এর অবকাঠামো সুন্দর! আমাদের সময়ে ছাত্রদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু ছাত্র তখন বেশি সেখানে থাকতো না। কেউ হয়তো জানতো না-আমি একা সেখানে দোতলায় উঠৈ বেঞ্চে বসে-শুয়ে কত সময় একাকিত্ব নিয়ে কাটিয়েছি! তখন বন্ধু ছিল অনেক, শিশু-কিশোর থেকে ছাত্র সংগঠন, ছাত্র সংগঠন থেকে রাজনৈতিক সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন থেকে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম। তবুও এরই মাঝে নিঃসঙ্গতা নিয়ে একা নৈঃশব্দের মধ্যে ডুবে যাওযার জন্য এক ধরনের আকুলতা তৈরি হতো। এই স্কুলের পাশেই কবরস্থান-সেখানেও একা গিয়ে কবরের পাশে বসে কখনো কখনো সময় কাটিয়েছি। তার দক্ষিণে সেই সময়ের হেলালপার্কের পুকুর পাড়ে গিয়ে একাকী সময় কাটিয়েছি কত! শহরের শেষ দক্ষিণে ছিল ‘ভিএইড’ নামের স্থান-কৃষি বিষয়ক পরীক্ষামূলক সরকারি সংস্থার এলাকা, এর ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাটসহ পরিবেশ কী সাজানো-গোছানো ও সুন্দর ছিল, এখন সেরকম নেই। সেই সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন এলাকাটি ছবি হয়ে আমার মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে আছে। ভিএইডের পূব পাশে বাঁধের দুধারে নিরিবিলি গাছের ছায়ায় গিয়ে একাকী সময় কাটিয়েছি-কতদিন। মনে পড়ে বর্ষার সময় বাঁধের পূবদিকে শুধু জল আর জল, কী এক প্রাকৃতিক আবহ, সেই আবহ-এর মাঝে একাকী একাকার হয়ে ধ্যানমগ্ন বসে থাকতাম। তখন দেশে রাশিয়ান বাইসাইকেল আমদানী হয়েছিল-তা ছিল আকর্ষণীয়, কিশোর-তরুণদের কাছে তা ছিল লোভনীয়। তা বাবা-মা’র কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলাম, তা চালিয়ে ভিএইডসহ বিভিন্ন জায়গায় একাকী চলে গিয়ে একা সময় কাটিয়েছি কত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিন্নভিন্ন হয়ে একা ঘুরেছি। সে এক বড় অধ্যায়। যুদ্ধের শুরুতে কলেজ মাঠে ট্রেনিং নিয়েছি, পরবর্তিতে কালাসোনা চর-মোল্লার চর ও অন্যান্য জায়গায়ও ছিলাম। কান্না আর কষ্ট নিয়ে কী এক অস্থির ও বিপন্ন দিনে একাকী সময় কাটিয়েছি! একবার মা-বাবারা খবর পেল আমি মারা গেছি-মিলাদও পড়া হলো বাসায়। তেমন করুণ পরিস্থিতিতে রাতের আঁধার পেরিয়ে মা-বাবার সাথে দেখা করেছিলাম, নানা ও মামারা মুক্তিযুদ্ধে একেকজন এক জায়গায়। মতি নানা (আমার নানার নিজের ভাই) মোল্লাচরের মুক্ত এলাকায় থাকতেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে, তিনি তার ঘনিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ (আনসার কমান্ডার খ্যাত মুক্তিযোদ্ধা) নানাকে দিয়ে আমকে বাবা-মা’র সাথে দেখা করার জন্য বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে পাকমিলিটারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগিয়ে দিয়েছিলেন রাতের বেলায়। একাকী অনেকটা পথ কিশোর বয়সে সেদিন হেঁটেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু, মুক্তিযুদ্ধের সময় ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে কত ঘটনার একক সাক্ষী হয়ে আছি, তা এক বিরাট আখ্যান। একাকী সময় তা তখন ছিল বিভিন্ন অনুভূতি নিয়ে চঞ্চল।

১৯৭৫-এর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর গাইবান্ধায় এক নিদারুণ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। আমরা হতবিহ্বল পরিস্থিতিতে অস্থির ও ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ি। আমাদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়, কারও কারও নামে হুলিয়া, আমিও রেহাই পাইনি। বাসায় ঘন ঘন পুলিশের ঘেরাও-পালিয়ে এক জায়গা থেকে এক জায়গায় থাকছি। যেখানে থাকছি-সেখানে আমার খবর পেয়ে পুলিশের ঘেরাও! শহর থেকে পালিয়ে গ্রামে গ্রামে থাকলাম আত্মীয়-পরিজনের বাড়িতে। থাকলাম পেয়ারপুর ও নেত্রকোনায় বেশ কিছুদিন। সে সময় পরিচিত অনেকে মনে করতেন-তাদের কাছে যেন না ভিড়ি। এভাবে পালিয়ে বিচ্ছিন্ন থেকে সেসময় একাকিত্বের অতলে হারিয়ে যেতাম। তখন তো যোগাযোগের জন্য কাছে ফোন ছিল না, ছিল না ইন্টারনেট, ছিল না কাছে টিভি। খবর ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেন এক কুঠরিতে জীবনযাপন! এই সময়ে ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর গাইবান্ধা কলেজ থেকে আমার নেতৃত্বে আমরা ক’জন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রথম প্রকাশ্য মিছিল করে শহরের পৌরপার্ক পর্যন্ত যাই-মিছিল করার সাথে সাথে দোকানপাট বন্ধ করে লোকজন সরে পড়ে-রাস্তায় রোকজন ফাঁকা হয়ে যায়। ঘটনার আকষ্মিকতায় আমাদের পেছনে পেছনে ড্রেস ছাড়া একদল পুলিশ গাড়িতে করে পিছু নেয়, তারা কী করবে বুঝে উঠতে পরেনি সেদিন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীতে সশস্ত্র প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও অন্যান্য কার্যক্রমে নিবিড়ভাবে অংশ নিই, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সিনিয়র নেতাদের সাথে যোগাযোগ রেখেও কাজ করি। ঢাকায় ছাত্র সংগঠনের গোপন সভায় অংশ নিই। ১৯৭৭ সালের ১৫ আগষ্ট গাইবান্ধায় প্রথম স্বল্প পরিসরে পলাশপাড়া প্রাইমারি স্কুলের প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু স্মরণে মিলাদ মাহফিল ও কাঙালিভোজ অনুুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে প্রথম প্রকাশ্য জনসভার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি মানুষ জানতে শুরু করে, ১৯৭৯ সালের ১৪ ফেব্রযারি বাদিয়াখালিতে এমন একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয, তাতে গাইবান্ধার রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আমিও বক্তব্য দিই। এই সময়কালে কত রকম প্রতিকূল ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমাদের জীবন হয়েছিল সঙ্কুচিত, আর আমিও অস্থির ও প্রতিকূলতা নিয়ে একাকী নিজেকে ধরে টেনে নিয়ে চলেছি, সে-জীবন তো একাই বহন করেছি-তা আর এক ইতিহাস-ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিকূলতার কারণে তা সৃষ্টি হয়েছিল।

১৯৭৭ সালের অক্টোবরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে নভেম্বরে ভর্তি হই। ভর্তি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলে গাইবান্ধার পরিচিত বন্ধুদের রুমে উঠি। গাইবান্ধায় পরিবারের লোকজন, বন্ধুবান্ধব ও বিভিন্ন সংগঠন রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা ছিল আমার জন্য বেশ কঠিন। কেঁদেছি প্রথম প্রথম। একাকী বিষণ্ন মন নিয়ে কেটেছে সময়। এরপর ধীরে ধীরে ছাত্র সংগঠন-সাংস্কৃতিক সংগঠের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। বাংলা বিভাগের বাংলা সমিতির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক সরাসরি ভোটে নির্বচিত হই। ১৯৮০ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে রাকসুর সাহিত্য সম্পাদক পদে দাঁড়িয়ে প্যানেলে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েও হেরে যাই। ছাত্র মিছিলে অংশ নিয়ে আহত হই। বিশ্ববিদ্যলয় ও রাজশাহী শহরের সাহিত্য কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় থাকি। আরও অনেক ঘটনা, যা বিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়-এখানে।

১৯৮৩ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করি। আমি প্রথম বর্ষেই মতিহার হলে ছিট পেয়ে যাই। মতিহার হল ক্যাম্পাসের কাছাকাছি একতলা টিনের বেশ বড় এলাকা নিয়ে খোলামেলা ছিল তখন। সেকারণে আমার পচ্ছন্দ হওয়ায় এসএম হল থেকে নাম কেটে এই হলে সংশ্লিষ্ট হই। এখানে আমি আমরা একাকিত্বকে স্বাধীনভাবে উপভোগ করতে পেরেছি। বৃষ্টি ও জ্যোৎস্না রাত এই হলে থেকে আমি উদারভাবে আলিঙ্গন করতে পারতাম-আহা! নিজেকে নিয়ে নিজের ভেতর হারানোর এই মাদকতা আমি পেয়েছি-এই পরিবেশে। এই হলের একেকটি ঘরের সারির পর পর ছিল সবুজ ঘাসের খণ্ড খণ্ড পরিসরের মাঠ। আমি আমার রুমের সামনের মাঠে তোষক বিছিয়ে জ্যোৎস্না রাতে কত সময় শুয়ে কাটিয়েছি, আর তখনই জ্যোৎস্নার আলোয় আমার একাকিত্ব ঝলমল করে উঠতো বিশেষভাবে। ক্যাম্পাসের হৈহল্লোড় ছাড়িয়ে-হলরুমে কুনোব্যাঙের মত থাকতে পারলেও বর্ষা ও বৃষ্টির সময় শুনতাম ব্যাঙের কোরাস সুর!

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বের না হওয়ার আগেই ঢাকায় এসে থিতু হলাম। ১৯৮৩ সালের পর থেকে ঢাকায় আছি-জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ধারাবাহিকভাবে এখানে কাটল। শান্তিবাগ হয়ে গুলবাগ, মগবাজার থেকে বাসাবো, তিলপাপাড়া থেকে শান্তিনগর। এখনো ভাড়া বাসায় দিন কাটছে। হু হু বাউরি বাতাসের মধ্যে দিয়ে যেন ঢাকায় এতটা সময় চলে গেল, টেরই পেলাম না। বিভিন্ন পেশা-চাকরি, সংগঠন, মিছিল-আন্দোলন, পারিবারিক দায়িত্বের বিভিন্ন পরিধিতে ভূমিকা ও সাহিত্যচর্চা নিয়ে জীবনের এই প্রান্তে এসেও একাকিত্ব এখনো শূন্যতায় টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে পারেনি।

পেশাগত ও অন্যান্য কারণে দেশের বৃহত্তর জেলা শহর ও অনান্য উল্লেখােগ্য স্থান ঘুরেছি। কিছু কিছু জায়গা একা গিয়েছি-ঘুরেছি, একা হোটেল বা রেস্ট হাউসে থেকেছি। কোথাও কোথাও একাকিত্ব জেগে উঠেছে-যখন সন্তানেরা ছোট ছিল-বাসায় কেউ নেই তাদের মা ছাড়া, তখন একাকিত্বের ভেতর বিভিন্ন আশঙ্কা ভর করতো। সিলেটে এক হোটেলে গিয়ে উঠলাম একবার, সেই হোটেলে আমার একজন সিনিয়র ঘনিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ফ্রেশ রুমে পড়ে গিয়ে মারা গেলেন আর আমি সেই হোটেলে থাকছি-ঘুম হয়নি রাতে আর সে কথা মনে করে। তবে, অনেক ভ্রমণে একাকী জীবনের ভেতর-জীবনের বিভিন্ন ব্যঞ্জনা খুঁজে পেয়েছি। রাঙামাটি থেকে কক্সবাজার, খুলনা-বরিশাল থেকে দিনাজপুর-পঞ্চগড়, সিলেট-হবিগঞ্জ থেকে কুষ্টিয়া-যশোর আর কত জায়গায় একাই আমার একাকিত্ব নিয়ে সময় পার করতে হয়েছে-কখনো নদী-সমুদ্রের কাছাকাছি থেকে কখনো বা বনভূমি পাহাড়-জঙ্গলে থেকে।

দেশের বাইরেও গিয়েছি বহুবার বহু দেশে-পেশাগত কারণে ও অন্যান্য প্রয়োজনে। কিছু দেশে একের অধিক বা কোনো দেশে পাঁচেরও অধিক গিয়েছি। বেশিরভাগ দেশেই পাঁচতারা-চারতারা নামী-দামী হোটেলে থেকেছি। কোনো দেশে যেতে লেগেছে রাতদিন, কোথাও বা তিন-চার দিন। ধরি-আমেরিকার ওয়াশিংটনে গেলাম, দীর্ঘ প্লেনযাত্রা, একা রওনা দিয়েছিলাম ২০১০ সালে, তখন আমেরিকানরা যেভাবে বিমান বন্দরে বেশ চেকিং ও জেরা করতো বলে শুনেছি, তাতে এক ধরনের ভীতি মনে কাজ করছিল। আসলেও তাই-বিমান বন্দরে যেভাবে শরীরের পোশাক খুলে একজনকে চেকিং করছিল, তা দেখে ভয় লাগল, কিন্তু আমি এমন কোনো চেকিং-এর মুখোমুখি হলাম না। কোনো দেশে পৌঁছেই আমার প্রথম কাজ-পরিবারকে পৌঁছানোর খবর জানানো। যে হোটেলে উঠলাম, সেখান থেকে পয়সা দিয়ে যোগাযোগ করলাম। বড় হোটেল-থাকার ব্যবস্থা ভালো, দিনরাতের ব্যবধানের কারণে ঘুম ঠিকমত হলো না। এমন হয়েছে অন্যদেশে গিয়েও অনেকবার। রাতে একা বিছানায় এপাশ-ওপাশ করা আর এক ধরনের একাকিত্ব নিয়ে ঘুম না আসার অভিজ্ঞতা কম নয়। বলিভিয়া যাওয়া আসা ছিল ৪০ ঘণ্টার উপরে। প্লেনে তিনবার যাত্রা বিরতি-অপেক্ষা-আবারও একনাগাড়ে প্লেনযাত্রা, তখন এক ধরনের ক্লান্তি ভর করে একাকিত্ব গ্রাস করে ফেলে। দ্বিতীয়বার নেদারল্যান্ড থেকে আসার সময় আমার পাসপোর্ট শুধু নিরাপত্তা কর্মীরা নিল না, একটা আলাদা জায়গায় নিয়ে গিয়ে আমাকে বেশক্ষণ বসিয়ে রাখল, পাসপোর্ট নিয়ে কী সব পরীক্ষা করলো, সে সময়টা ছিল হলি আর্টিজানে হামলার পরবর্তী সময়, সম্ভবত। আমি বেশ টেনশন অনুভব করছিলাম, কী হয়। একাকী যাত্রায় এমন অবস্থা হলে তা একা মনের ওপর বেশ চাপ পড়ে। আর হ্যাঁ, বলিভিয়ায় যাওয়ার সময় ও আসার সময় পেরুতে পাসপোর্ট নিয়ে বহুক্ষণ আটকিয়ে কী সব দেখছিল, আমাদের এলাকার লোক ওসব দেশে সচরাচর যায় না বলে-এমন পরিস্থিতির শিকার আমরা হয়েছিলাম কিন্তু মনের ওপর চাপ কম পড়েনি সেময়। একাকী তা সামাল দিতে হয়েছে। শ্রীলংকায় পাঁচের অধিক সময় দেশটির বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, যেখানেই থেকেছি-সেখানেই সমুদ্র পেয়েছি আর এই সমুদ্রের কণ্ঠলগ্ন হয়ে একা সমুদ্রের নির্জনতা অনুভব করেছি, আমার একাকিত্বকে সমুদ্রের একাকিত্বের সাথে একাকার করে নিয়ে সময় কাটিয়েছি। এমন সমুদ্রের নৈকট্য নিয়ে থাইল্যান্ডেও সময় কেটেছে কয়েকবার। নেদারল্যান্ডে গিয়েও দিগন্তপ্রসারি জলরাশির সাথে একাকার হয়েছি। ভারতের কথা বাদ দিয়ে নেপালের কথা বলি-কাঠমন্ডুর পূবে গিয়েছি বহুদূর, গিয়েছি পোখরাতে ও বিভিন্ন এলাকায়। কখনো পাহাড়ের বেশ উচুঁতে থেকেছি, পাহাড়ের নির্জনতায় একচারী হয়েও ঘুরেছি। পরিবারের সাথে ঘুরেছি আবার একাও। পাহাড়ের একাকিত্বের সাথে নিঃশ্বাস ফেললে জীবনের নিঃসীম শূন্যতা অনুভব করা যায়। ভ্রমণের দীর্ঘ বর্ণনার সুযোগ নেই বলে শুধু বলবো সমুদ্র ও পাহাড়ের নিকট গেলে মানুষ হিসেবে নিজের ক্ষুদ্র সত্তার এক ধরনের বোধ জেগে ওঠে, প্রজ্ঞারও বিভিন্ন দিগন্ত নড়েচড়ে ওঠে! তা শুধু একাকিত্বের মহিমায় অনুভব করা যায় গভীরভাবে।

এখন যখন একা থাকি-তখন মনে পড়ে কত আত্বীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবের মৃত মুখ ও তাদের স্মৃতি। মনে পড়ে কী এক কষ্টে কী এক অভিমানে আমার হাসু নামের বোনটির কথা-সে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। আমার প্রিয় নানা ও বাবাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারিনি-সেই অনুশোচনা এখনো কামড়ায়। নিজের স্বপ্নকে ঠিকমত বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করাতেও পারিনি-সেটাও বিবেচনায় আসে। জীবনের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-সুখ, মিলন-বিচ্ছেদের কত ঘটনা ও স্মৃতি জীবনের সাথে লেপ্টে আছে-সেসব কখনো কখনো একাকী থাকা অবস্থায় জেগে ওঠে-মনে পড়ে, তা আমার একার মধ্যে বহমান, তা একাই বহন করতে হচ্ছে। তবু যুক্তি-জ্ঞান, বুদ্ধি-বিবেক, অভিজ্ঞতা-ধারণা নিয়ে বিভিন্ন দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে এখনো একাকী বেঁচে আছি ও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি-এরই নাম জীবনের প্রবহমানতা ও সৌকর্য।