খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান ও অন্যান্য ॥ দিলারা হাফিজ


খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান

শেষবার আমি সত্য উচ্চারণ করেছি
খনার কর্তিত জিহবায়
তোমরা কী আমাকে এখন চেনো আর,
অনেক আগেই আমি ছেড়ে গেছি
তোমাদের বিস্ময়-ভার…
বলা ভালো ছাড়িয়ে গেছি আমি
পরস্পরের দ্রোহের সংসার
কে পায় আমাকে আজ?

যখন আপনা মাংসে হরিণা বৈরী
তখনো চর্যাপদের সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ-জুড়ে
আমারই কায়া-তরু-বর-পাঞ্চ-বি-ডাল
মেলে দিয়েছে চৌষট্টি পাখুড়ি…

মধ্যযুগে দেড়শত বছরের অন্ধকার বুকে নিয়ে
অন্য কেউ নয়, একা আমি মর্মতলে
ধরে আছি শূন্যপুরাণ আর
মহুয়া মদিনার আত্মপীড়নের স্মৃতিগাথা।

ভারতচন্দ্রের আদি রসের অর্গল ভেঙে
রবীন্দ্রনাথের লাবণ্য একা নয় শুধু
অরণ্যবন্দী বাতাসের চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতো
আমরা অনেকে যুথবদ্ধ বেরিয়ে পড়েছি
শেষের কবিতার জ্যোৎস্নালোকে…

নিজের নির্জনে পলায়নপর অমিত রায়
আত্মপ্রেমে ভাসিয়ে দু’কূল
তেইশ বসন্তে জেনে যায় শরীর সর্বস্ব নয়
পবিত্র এক ধর্মগ্রন্থের ন্যায়
হৃদয়ই পাঠ্য প্রথম—

গ্রহণের চাঁদের মতো শরীরের আড়াল থেকে
ছুটে বেরিয়ে এসেছে যখন হৃদয়
শাপগ্রস্ত ঋষি রাজন্যের পাপে তখন
নগরী কাঁদে প্রচণ্ড খরায়—
তখনো তপস্বী ও তরঙ্গিনীর খর ভূমিতে দাঁড়িয়ে
আমার মতো কেউ একজন
ঋষ্যমুক পর্বত থেকে ডেকে আনে বৃষ্টির দেবতা
আর্দ্র করে মহাপৃথিবীর করতল…

যুদ্ধ আর মহামারীর মতো উত্তর তিরিশের
দ্বিধা ও সন্দেহের চাকতি নিক্ষেপ শেষ হলে
মধ্য সমুদ্রের দিশেহীন হালভাঙা নাবিকের মনে
দারুচিনি দ্বীপের মতন জেগে ওঠে
নাটোরের বনলতা সেন…
দু’চোখে তার সবুজ ঘাসের দেশ, শান্তির নীড়;

আমি না ছাড়ি বিশ্বাস
আমাকে না ছাড়ে অবিশ্বাস
এ রকম মেঘকৃষ্ণ দ্বিধার কাল যখন
তখনও পিতা কিংবা পুত্র অথবা
প্রেমিক চিলপুরুষের ইচ্ছের বলয়ে কাঁদে
নামগন্ধহীন এই তুচ্ছ জীবন
না বিংশ শতাব্দী, না একুশ শতক
উত্তর-আধুনিক সময়ের সাম্পান যখন
কবিতার ঐতিহ্যেই—
ভাসমান;
তখনো আত্মপীড়নের ক্রান্তিকুলায়
ভিক্ষাপাত্র হাতে কেবলি আমি
খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান;
ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান,
ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান…॥



কবিতাই রাতের প্রফেট

কবিতা? এখনো সে এলিয়ে বসে আছে ছায়ার মতো,
তার মতোই সে নিত্য নিরঞ্জন প্রভুময়
মৃত্যুর বেদীতে এক জীবন্ত কৈলাস
হারানোর দীর্ঘ হাহাকার পার হয়ে যেতে যেতে
বহুকাল বাদে ভেসে এলো পানাফুলের বেগুনি জহরত
আজ ছিলো সেরকম একগুচ্ছ কবিতার সকাল,
পরম আত্মার রসভাষ্যে আমাকে তারা
ঠেসে ধরে রেখেছিলো অনুক্ষণ,
ভ্রাম্যমান কিছু শব্দ ও বর্ণের ধান-দূর্বা
দুহাতে তুলে নিয়ে সতীর্থ দুজন
একই অনুরাগে বেঁধেছিলো মর্মের-মূর্ছনা
দাদরা, না কাহারবা, কোনবা তাল-লয়ে
এসেছিলো,ভুলে গেছি, বেভুল পথিক—
মনে হলো, ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের
সরোদের মীড় শুনছি নিমগ্ন-সভায়,
মরমীবাদের রেশমি সুতো ছিঁড়ে কখনো বা
উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো আমাকে অসীমের হাওয়ায়
মধ্যলয়ের মাত্রা, নাকি চপল স্বর, কে গোণে সেসব?
কেবলি বিমুগ্ধ পাঠক আমি,
নই মোটে সহৃদয়হৃদয়সংবাদী, তবু তো
বিষাদের তালে তাল ঠুকে অক্ষরের শেকড়ে ঢেলেছি জল
যদিও জানি পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই আমার
কবিতার শরীরজুড়ে লাবণ্যের মাখামাখি,
কোথাও ফুটেছে যেন অলংকারের বিমূর্ত আভা,
মেঘমল্লারের বুক চিরে বিদ্যুতের ফলায় জেগেছিলো
উপচে পড়া তার সুনামীরূপ;
শুকনো হলুদগাঙের পায়েদলা পথে পথে
লুকিয়ে ছিলো শব্দালঙ্কারে মোড়ানো
খুব সাধারণ কিছু কথার ময়ান
রসের ব্যঞ্জনায় উড়ছিলো তাতে রহস্যের ধুলো
ছন্দস্পন্দের নৃত্যেও ছিলো এক বেসুমার গমক,
নিরাভরণ এই যে আমি, কী করে অঙ্গে ধরি
ব্যজস্তুতিসহ এতোসব অলংকার,
আমাকে কি সাজে এসব?
অনুপ্রাস কিংবা উপমা হলেও ভাবা যেতো,
আমি যে বৈধব্যের পিড়ান ছাড়া কিছু নই,
একথা ভাবতেই মাকড়শার একজোড়া বিষগ্রন্থি
পুনরায় বেদনার তন্তুজালে জড়িয়ে নেয় আমাকে…
আমি আরো আরো গভীরভাবে ডুবে যেতে থাকি
কবিতার পংক্তিভোজনে, ডালভাঙা সবুজে
সবুজ দীপ হয়ে জ্বলে উঠি বিরহকাতর রাতে,
অসামান্য কোনিয়াকে ঝুলে যাই যেন
নিশাচর এক অলৌকিক বাদুড়,
দেহাশ্রিত ঈশ্বরের ঠোঁটে মেলাই ঠোঁট,
আত্মায় সে ঢালে জল, দহনের বেলায়;

কবিতাই হোক তবে রাতের, প্রফেট…।

১৫/১২/২০২০
আইসবোট টেরেস, টরন্টো