গ্রাম ও জীবনাচারের নৈসর্গিক রূপ মেমোরিয়াল ক্লাব ॥ পিন্টু রহমান




‘হাসানের এই গল্পটি এমন একটা সময়ে শুরু হয় তখনো পুরোপুরি সেলফোনের যুগ শুরু হয়নি। ই-মেইল, ফেসবুক তখনো সুদূর পরাহত। বিষয়টি এখানে উল্লেখ না করলে গ্রন্থের নবীন পাঠকের যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলা গল্পের সূচনাপর্বে বঙ্কিমাদির উপন্যাস থেকে দেড়শত বছরের সমাজ-জীবনে যোগাযোগের যে পরিবর্তন সাধিত হয়নি; সম্প্রতি এক দশকে এমনকি প্রতিবছরের যোগাযোগের ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। যদিও হাসানের ঘটনাটি খুব বেশিদিন আগের নয়; আমাদের সামাজিক চলমানতার মধ্যে এখনো সে বিরাজিত; তবু নাম্বার ঘোরানো টেলিফোন সেটের ওপরে দ্রুত যোগাযোগের জন্য নির্ভরশীলতার বিকল্প ছিল না।’- পরিবেশ-প্রতিবেশ ও সময় যদি গল্প-উপন্যাসের বিশেষ প্রত্যয় হয় তবে একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, ঔপন্যাসিক মজিদ মাহমুদ ‘মেমোরিয়াল ক্লাব’ শিরোনামের উপন্যাসে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

কোনো কোনো লেখক হয়তো শেষ পর্যন্ত পাঠককে ঘোরের মধ্যে রাখতে পছন্দ করেন। কিন্তু মজিদ মাহমুদ সে পথে হাঁটেননি- অন্তত আলোচিত উপন্যাসটিতে তো নয়ই। সাংবাদিক হাসানের অফিস থেকে ফেরার মাধ্যমে যে ঘোরের সৃষ্টি হয় চল্লিশ দিন পরে হেড মৌলবি আব্দুল কাদের খুন হওয়ার মধ্যে সে ঘোরের অবসান হয়। পাঠকের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি কি ঘটেছিল, কেনো ঘটেছিল, কে ঘটিয়েছিল? নিঃসন্দেহে হাসান কেন্দ্রীয় চরিত্র। মৌলবি আব্দুল কাদের, ইয়াছিন, মর্জিনা, হাকিম প্রামাণিক, ঢুলি সর্দার মোবারক, ধীরেন নাপিত, রওশনসহ উপন্যাসটিতে অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। তথাপি ‘মেমোরিয়াল ক্লাব’ এর গায়ে চরিত্রনির্ভর উপন্যাসের তকমা লাগেনি। বরং চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জীবনাচার ও প্রচলিত প্রথা পাঠকের মনে রেখাপাত করেছে।
উপন্যাসে সংঘঠিত প্রধান তিনটি ঘটনা হলো- ক. হাসানের কারাবাস, খ. ইয়াসিনের আত্মহত্যা এবং গ. মর্জিনার আত্মহত্যা। অন্য ঘটনাসমূহ মূল বিষয়ের অনুষঙ্গ। হাসানের হাজতবাস ঘটমান বর্তমান। ইয়াসিন ও মর্জিনার আত্মহত্যা অতীত ইতিহাস। অসামান্য দক্ষতায় লেখক আমাদের অতীতের পথে-প্রান্তরে নিয়ে গেছেন। ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি, কৃষিনীতির মুখোমুখি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

উপন্যাসে অসংখ্য প্রথার কথা উল্লেখ আছে। কিছু কিছু প্রথা আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির সঙ্গে এখনো লেপ্টে আছে। কিছু প্রথা বিলুপ্তির পথে। অন্ধকার রাতে মুখে কালো কাপড় বেধে বিধবা চাচির ঘরে যাওয়ার কারণে ইয়াসিন অভিযুক্ত। সমাজ তার বিচার প্রত্যাশা করে। নতুবা একই মসজিদে নামাজ পড়বে না। সাজার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। মধ্যযুগের বিচারে সংঘটিত অপরাধের চেয়ে বেশি শাস্তির বিধান ছিল না। চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত। শরিয়ত অনুসারে ইয়াসিনের সাজা, কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুতে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করতে হবে। কেউ কেউ দোররা মারার প্রস্তাব দেয়। প্রয়োজনে দশটা বেত একত্রিত করে মারতে হবে। তাতে জীবনও বাঁচবে সামাজও বাঁচবে। সমাজ বাঁচলেও ইয়াসিনকে বাঁচানো সম্ভব হয় নি। তেঁতুলগাছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। সমাজপতিরা ইয়াসিনকে শাস্তি দিয়েছিল ভিন্ন উপায়ে- মাথা নেড়া করে ঘোল ঢেলে তাকে সারা এলাকা ঘোরানো হয়। এ সময় কাগজের মালা দিয়ে ইয়াসিনকে যেমন সাজানো হয়, তেমনিভাবে বহনকারী মহিষকেও সাজানো হয়। গ্রামে উৎসবের আমেজ বিরাজিত।

ইয়াসিনের দূর্দিনে কোনো মানুষ না কাঁদলেও পশু কেদেছে। মহিষের চোখ দিয়ে অঝরে জল ঝরেছে। এই জলের মাধ্যমে লেখক সম্ভবত মানবিকতার জয়গান গেয়েছেন। বস্তুত ইয়াসিন নির্দোষ। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। শুধু ইয়াসিন না, মর্জিনা ও হাসানও নির্দোষ। বিনা দোষে হাসান এক মাস দশ দিন জেলে খেটেছে।

মর্জিনা প্রসঙ্গে লেখক বর্ণনা করেছেন, ‘আব্দুল কাদেরই মর্জিনার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল; কারণ কোনো একদিন একা পেয়ে মর্জিনাকে তার সঙ্গে শুতে বাধ্য করেছিল। এতেই মর্জিনা হামেলা হয়ে পড়েছিল। আর এই অপবাদ থেকে বাঁচার জন্য সে এই মহাঅপকর্ম করে বসে। এই ঘটনা মর্জিনার বড়চাচার ছেলে আলমগীর দেখে ফেলে। বোনের এই মৃত্য সে সহ্য করতে পারিনি। পাপ বাপকে ছাড়ে না। এ কথা যারা বিশ্বাস করেছিল তারা আলমীরের এই হত্যাকাণ্ডকে বাহবা দিয়েছিল।’
সচল গদ্যভাষা এবং বক্তব্যের কারণে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী। বক্তব্যের স্বপক্ষে লেখক অসংখ্য উপমা-উদাহরণ দাঁড় করিয়েছেন। চমকপ্রদ তথ্য উপস্থাপন করেছেন। লেখকের কাজই হচ্ছে বিশেষ কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া। মজিদ মাহমুদ সার্থকভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশ বর্ণনা করেছেন। পরিবেশ নির্মাণে কাহিনির ভূমিকা মুখ্য। ‘মেমোরিয়াল ক্লাব’র সূচনা নাগরিক প্রেক্ষাপটে। কিন্তু সম্মুখে এগিয়ে দৃশ্যপট বদলে গেছে। গ্রামজীবন ও যাপিত জীবনাচার নৈসর্গিক রূপে রুপায়িত হয়েছে। ওই রূপে আমি অবিভূত। চেনা-জানা দৃশ্যকল্পের ফাঁদে আটকে গেছি। জীবন বিষয়ক ভাবনা প্রবল হয়েছে। তখন মনে হয়েছে এ গল্প আমার¬ আমার মতো অসংখ্য পাঠকের।


মেমোরিয়াল ক্লাব : মজিদ মাহমুদ ॥ প্রচ্ছদ : পীযূষ দস্তিদার ॥ ভোরের কাগজ প্রকাশন ॥ মূল্য: ৩০০ টাকা