গ্রীষ্মের উপনিবেশ ॥ অলোক সেন




শুখা এই গ্রাম
ভেজা তার মন
পথ প্রান্তে একা বনফুল
লুকিয়ে রেখেছে হেম

গ্রীষ্মক্লান্ত,
কোথায় সে ধারাজল?

স্রোতবতী, দ্যাখো-
ওপারে সেই ছামতীগ্রাম
ক্ষীণ কটি তোমাকেই চায়,
— এসো হে জলদবরণ।

ভেসে যেতে চেয়ে, জলে আগুন জ্বেলেছে
অভিমান।


প্রথম ঝাপট, জানে
পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বাতাস,
মৌসুমি দেয়ালা—

এখন সে ক্লান্ত ভূমিকাবিহীন,
এসো—
আকুল প্রার্থনা তার।

বাণিজ্য তরীটি ভাসে
মাঝদরিয়ায় ‘ধাও’
দে উড়াল, দে উড়াল—

মে ভেজাতে আসে জুন।


কদম্বের বেদীমূলে বাঁশী,
তৃষ্ণা কিভাবে যে মেটে
কি বলবে ফুটি ফাটা মাঠ
আকুল আর্তি আর

ডেস্কে বসা মেয়েটি –কী জানে?

হে নিদাঘ, কালো মেঘের ঠিকানা
নিরুদ্দেশ রামগিরি পাহাড়ের কোলে,
বিরহী যক্ষ আজও সন্ধানী
চোখ বাসনা টলমল
অপেক্ষা কখন তুমি মোহন কালোয়
বজ্র ও বিদ্যুৎ।


ওসব কিছুই নয়
এসো হে, নব জলধর শ্যাম,
ভেতরে যে আগুন, নেভাও;
এই তো দু-হাত মেলা, লেখো,
আঁকো সে ছবিটি আকুল ইজেলে
পেতে চাও যাকে।

তাই কি পুড়ছ!
পুড়তে পুড়তে রঙ হারা!
হাড়ে হাড়ে বেজে উঠেছে যখন গ্রীষ্ম বন্দনা
কালো রৌদ্র বেদনা,
চেয়েছ মেঘের কাছে ছুটি!

একলা পাগল, ধুলো ওড়া পথ,
রঙিন ছাতাটি দেবে আত্মাহুতি–
তুলি থেকে ঝরে অঝোর তা হার গান,
তুলি থেকে সৃষ্টিকথা—


গ্রীষ্মের সাফারি
বন্ধ থাকবে বর্ষাকালে,
কোলাহল থাকবেনা –
বলেছিল, ডেস্কে বসা পঁচিশের সেই মেয়ে,
তখন এখানে বিশ্রাম পাবেন
বৃষ্টিও খেলবে বাতায়নে, পাতায় পাতায়

— চোখে তার বিদ্যুৎ দ্যুতি
বুঝি, বৃষ্টি নামবে এখনই।

বর্ষা, আজও ভুলতে দেয়নি সেই স্মৃতি।


গ্রীষ্মের পালা শেষ।এবার বর্ষা।
গা-পিত্তি জ্বলছিল। বাড়ল সে জ্বালা।
আবার ভেসে পড়া, অথচ সে গুগল থইথই।
দৃশ্যত চারদিক, দশদিক নেই

ছুটতে ছুটতে আবার
শিবেরগীত, ধানভানা
মনোবাসনা গোপন রাখা

বর্ষা এলো কিনা।


সেই তো এলে, বাহার কত,
গ্রাম শহরে ঢেউয়ের মতো
পাতায় পাতায়, ম্যানহোলে।

বর্ণগন্ধ আকাশ পাতাল –
প্রতিবিম্বে দিচ্ছে টোকা
একটি ঘরের ছোট্ট ক্যুপে
বিস্ময়েরই এক্কা দোক্কা—

গ্রীষ্ম থেকে বাঁচিয়ে রাখা গেরস্থালি
জল থইথই,
স্বপ্ননীল, তোমার টানে ভাসছে ওই।


ভেঙ্গে পড়লে পাতায় পাতায়
সবুজ বনের বৃক্ষ শাখায়,
শহর জোড়া ছাদের গায়ে
টালির চালের মাথার ওপর!

অপার্থিব তোমার ধারা
বিস্ফোরণ সামলে নিল
মাঠের পাশে নবীন চারা

ছোট্ট পাতায় যেই লিখলে নাম
আস্তে করে নামিয়ে দিল
ধুলোর ইজের,
দুজনেই ভিজলে বসে তাপে, মনস্তাপে
বাঁধ ভাঙা সেই জল ভাসল সন্তাপে।


না না, অত সাবধানে কাজ নেই
ধারে কাছে, না, কেউ নেই
ওই শিহরিত বৃষ্টি ছাড়া

জানতো সে এমনই সৃষ্টি ছাড়া
পা টিপে টিপে এসে ভেজা বেই,
সমস্ত শরীর তার
সুগন্ধ ইশারা

পিচ্ছিল, ভেজাপথ
টিপে টিপে সেই যে পা ফেলা
কাদা মাখামাখি, হাঁটা আল বরাবর
আঃ, ষোল বাইশে রসে বিস্মিত অবগাহন
পড়ি মরি ছুটে আসা
দু-হাতে আঁকড়ে ধরা

খরা কেটে দুকুল ভাসান ধারা
গ্রীষ্ম তুমি ভূমিকাবিহীন –
অকারণ উঁকি দেওয়া।

১০
রঙ পুড়ে খাক
নিরুপায় ঝরে যায় রূপ
ভেতরে ভেতরে অনুতাপ-দগ্ধতাপ
স্পর্শ চায়, স্পর্শ একবার
একবার ও কালো-বরণরূপে
ডুব দেবে—
ঘর ছেড়ে নেমেছে আলপথে

আত্মহারা
দূর্বাও চিমটি কাটে বৃষ্টির সাদা পায়ে।

১১
জলদ বরণ ঘনশ্যাম, নেহারে কে রূপ তার!
ভেতরে অশনি।
বরষণ মুখরিত আগমন
যেন স্বরগম

ও মালিনী, শ্যামকে আজ ভেজাও তুমি,
শ্যামও ভিজুক তোমার ছলে –
বৃষ্টি জলে
ভূমি।

১২

মাটিও উথাল পাথাল, বীজভূমি জুড়ে আনন্দ দোল
হে বরুণ, দ্যাখো,
হলস্কন্ধ পুরুষের পাশে যে রমণী
এই শ্রাবণে সে শস্য প্রসবিনী

গোছে গোছে তার যে রোপণ,
পরিক্রমা কালে
ধরিত্রী জানে তার শতেক গোপন
মাঠে মাঠে আজ বিশুদ্ধ অবগাহন।

১৩
আনন্দ দিন, বৃষ্টির দিন
আঁচলে টুপ টুপ ধারা বরষার –

হাওয়ালাগেপালে
গর্বিতছোটডিঙ্গি, নোঙরছেঁড়া;

বৃষ্টি তুমি ঝরো
পাঁচ, সাত, দশ – সবদিন
আনন্দের দিন –
নৌকা ভেসে থাক।

১৪
একদিকে কদম্ব কেশর
তার পাশে সবুজ প্রান্তর –
বৃষ্টি এসে সতর্ক ফেলেছে তাঁবু

নতুন উপনিবেশ,
ভিজে পুড়ে ঘাস পাতা
দেখে দেখে শিখেছে নতুন ভাষা
সাংকেতিক

দিশাহারা গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতারা
আড়ালে সে একা খেই হারা,
বৃষ্টির অতল থেকে এলো আলো

তাঁবু মই হারা।

১৫
এসো হে নব জলধর, এসো,
তুমি এলেই না
ইলিশ সুঘ্রান, রূপোলী চমক
প্রখর রোদের মাঝে মোহিত ঝলক
নাবালের ধারা পথে তিরতির, আহা,
সরল পুটিদের কত্থক—
আলপথে ওই উদাসীন শ্যাম।

ঘন সবুজের সে অহংকারে তুমি এলে
ধবলীও খুশি হয়,
শৃঙ্গার নাসিকা ও ওষ্ঠ জুড়ে।

শস্যের অমেয় হাহাকার
শূন্য মাঠ –
তুমি, নব জলধর, কি করে মেলাবে
যদি না ছুঁয়েছ জ্যোৎস্না রাত্রির অবকাশ
আগ্রহী নবনীত, ভূমি তীর্থে উন্মুখ নিবেদন

রাধিকা নিলাজ নহে,
শস্যঢাকা তাহার শরীর
এসো জলধর।

কবিতা লিখবে যদি লেখো,
জলে নয় বৃষ্টির ভাষায়।