ঘোর কাটেনি আজও ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক


গল্প বলা মানুষের সহজাত প্রবণতা। মানুষ হিসেবে আমারও। ছোটবেলা চাঁদনীরাতে নানাবাড়িতে নানীর মুখে শুনেছি অসংখ্য রূপকথা-উপকথা। এসব কেচ্ছা-কাহিনি শুনতে শুনতে নিজেও হারিয়ে যেতাম রাক্ষসপুরীতে, তেপান্তরের মাঠে। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছি, কিন্তু মনের ভেতর গেঁথে যাওয়া রাজকন‌্যা, সুয়োরাণী, দুয়োরাণী, লালকমল, নীলকমলের কথা ভুলতে পারছি না। এসব রূপকথাকে আরও বেশি করে বাস্তব বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোথাও গেলে এসব চরিত্রের হয়তো দেখা পাবো। তবে যত বড় হতে থাকলাম, তত বুঝতে শুরু করলাম, এসব নিছক কল্পপ্রসূত গল্পগাঁথা। বাস্তবে এসব ঘটে না।

এই যে কল্পনার এত অপরিমেয় শক্তি, সেই শক্তি আমাকে মোহিত করে চললো। ভেতর থেকে মন বললো, বানিয়ে বানিয়ে এমন গল্প আমিও লিখতে পারি। যেই ভাবনা, সেই কাজ। খাতাকলম নিয়ে বসে গেলাম। লিখে ফেললাম পাতার পর পাতা গল্প। সেই গল্পের কোনো পাঠক নেই, নেই কোনো শ্রোতাও। নিজেই লেখক, নিজেই পাঠক, নিজেই সমালোচক। লেখক সত্তা বলছে, লিখো, অসাধারণ হচ্ছে। পাঠক বলছে, লিখো, আরও ভালো হতে হবে। যা লিখছ, এগুলো অগোছালো। গল্প নয়, গল্পের মতো কিছু হচ্ছে। আর সমালোচক বলছে, কী লিখছ? কিচ্ছু হচ্ছে না। প্রস্তুতি নাও। নিজেকে আরও প্রস্তুত করো। আরও প্রস্তুত করো। এই দোটানায় পড়ে গল্প লিখি আর ছিঁড়ে ফেলি।

নদীর স্রোতের মতো এভাবে বহে গেছে বহু বহু দিন। কোন বাঁকে কোন স্মৃতির খড়কুটো এসে ভিড়তে চেয়েছিল, কোন স্মৃতি নিজে থেকেই ভেসে যেতে চেয়েছিল তার খোঁজ রাখিনি। খোঁজ রাখার সময় পাইনি। সময় পাইনি এজন‌্য নয় যে, আমি খুব পড়াশোনায় মনোযোগী ছাত্র ছিলাম। আমি মোটেও তা ছিলাম না। ছন্নছাড়া-বাঁধনহারা বলতে যা বোঝায়, তার ষোলো আনা বৈশিষ্ট‌্যই আমার ভেতর ছিল। তাই গল্প লেখার কথা মনে এলেও আয়োজন করে আর বসা হয়ে উঠতো না। তবে, কিছুদিনের মধ‌্যেই হঠাৎ করে চিতার মতো লাফিয়ে পড়লো কবিতার ভূত, ঠিক আমার ঘাড়ে নয়, মগজে। রাত নেই, দিন নেই, কবিতা আর কবিতা। কবিতার সরোবরে ডুব দেওয়াই হয়ে উঠলো আমার প্রতিদিনের ইবাদত।

এই ইবাদতের ফল হলো এমন যে, তরতর করে লিখে ফেললাম কয়েক হাজার কবিতা। কিন্তু এগুলো আদৌ ছাপার যোগ‌্য কি না, তা ভেবে দেখিনি। যথারীতি গল্পের মতোই আমার কবিতার লেখক-পাঠক-সমালোচক আমি নিজেই। এভাবে লিখতে লিখতে একদিন মনে হলো ছাপানো দরকার। কিন্তু কোথায় ছাপাবো? ততদিন দৈনিক পত্রিকার সাহিত‌্যপাতা, মাসিক-সাপ্তাহিক পত্রিকার সাহিত‌্যবিভাগ সম্পর্কে মোটামুটি জানা হয়ে গেছে অনেক কিছু। ইতোমধ‌্যে দৈনিক পত্রিকার সাহিত‌্যপাতার সুবাদে জেনে গেছি লিটলম‌্যাগ নামের এক ধরনের পত্রিকার কথাও। যে পত্রিকা করতে কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমতি লাগে না। মোটামুটি কিছু টাকা হলেই নিজে নিজেই পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব, তাও জানা হয়ে গেলো। ব‌্যস আর পায় কে?

নিজের ও সমমানসিকতার কয়েকজনের সঙ্গে ব‌্যক্তিগতভাবে পায়ে হেঁটে ও চিঠি লিখে যোগাযোগ করে কবিতা সংগ্রহ শুরু। এভাবে শুরু হলো শিল্পসাহিত‌্যের চারটি ছোটকাগজের যাত্রা। কাগজগুলো যথারীতি, অনুপ্রাস, প্রাকপর্ব, মেঠোপথ ও চিন্তাসূত্র। বিশেষত মেঠোপথে প্রচুর কবিতা প্রকাশিত হলো। এই মেঠোপথের সূত্র ধরে পরিচয় জয়পুরহাটের কবি বিনয় সরকারের সঙ্গে। বিনয় সরকারের মাধ‌্যমে পরিচয় কবি আমিনুল ইসলামের সঙ্গে।

তখন সময় ২০০৮ সাল। কবি আমিনুল ইসলাম একদিন বললেন, ‘আপনার কবিতার বই করতে পারেন’। বলি, ‘কিভাবে করবো? আমার বই কে করবে? প্রকাশ কোথায় পাবো?’ আমিনুল ইসলাম বললেন, ‘প্রকাশকের ব‌্যবস্থা আমি করবো, আপনি পাণ্ডুলিপি রেডি করে দিন’। যেই কথা, সেই কাজ। প্রথম কবিতার বই ‘মাতাল নদীল প্রত্নবিহার’-এর পাণ্ডুলিপি রেডি করলাম। সিডিতে পাণ্ডুলিপি পাঠালাম কবি আমিনুল ইসলামের কাছে। তিনি সেই পাণ্ডুলিপি দিলেন মুক্তদেশ প্রকাশনকে। মুক্তদেশ থেকে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বই এলো মেলায়। বইমেলা থেকে আমাকে ফোন করলো কবি রজত সিকস্তি। জানালো, প্রচ্ছদ যাচ্ছেতাই হয়েছে। ভেতরে প্রচুর বানান ভুল, এক কবিতার পঙ্‌ক্তি অন‌্য কবিতায় চলে গেছে। শুনে আমার তো মন খারাপ।

ফোন করলাম আমিনুল ভাইকে। তিনি বললেন, ‘মন খারাপ করবেন না। দেখি কী করা যায়’। ঠিক একসপ্তাহ পর তিনি ফোন করলেন, ‘চলে আসুন ঢাকায়। আপনার বই দেখবেন না? এবার ভাষাচিত্র করেছে আপনার বই। প্রচ্ছদ, ছাপা সবই অসাধারণ’। ফোন পেয়ে নোয়াখালী থেকে সকালের বাসে চড়ে বসি। দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাই কবি আমিনুল ইসলামের বাসায়। তিনি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসেন। বলেন, ‘‘নিন, ‘মাতার নদীর প্রত্নবিহার’। আর চলুন বিকালে মেলায় যাই’’। বই দেখে আমি এতটাই বিমোহিত হয়ে গেলাম যে, আমিনুল ভাইকে ধন‌্যবাদটুকু দেওয়ার কথাও ভুলে গেলাম। বই কিভাবে হলো, প্রকাশক নিজের খরচে প্রকাশ করলেন, না আমিনুল ভাইয়ের অর্থে হলো, কিছুই জিজ্ঞাসা করা হলো না। আজও সেই ঘোর কাটলো না।