চিঠি লেখার দিনগুলি ॥ আমিনুল ইসলাম



ভাবতেও অবাক লাগে এই আমি গত বিশ বছরে কাউকে কোনো চিঠি লিখিনি। লিখিনি একটিও চিঠি কোন স্বজন, বন্ধু বা পরিচিত কাউকে। আসলে আমি শেষ চিঠিটা কবে কাকে লিখেছিলাম অথবা কে আমাকে লিখেছিলো তা মনে করতে পারছি না। অথচ এই আমিই কতো কতো চিঠি লিখেছি। কারণে অকারণে চিঠি লিখেছি আত্নীয়, স্বজন, বন্ধু, পরিচিত এমন কি অপরিচিত জনকেও। তবে প্রেম নিবেদন করে কাউকে চিঠি লেখার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য আমার হয়ে উঠেনি, হয়ে উঠেনি সাদা অফসেট কাগজের খামে হালকা নীল রংয়ের কাগজে প্রেমিকার কাছে চিঠি লেখা। তেমনিভাবে প্রেম নিবেদন করে কোন তরুণী বা যুবতীর পত্রের আশায় কখনও ডাক পিয়ন করিম ভাইয়ের জন্য অপেক্ষার থাকার ঘটনাও ঘটেনি।

তবুও চাতক পাখির মতো বসে থাকতাম দরজার কড়া নাড়ার শব্দের সাথে ডাকপিয়ন করিম ভাইয়ের হাক ডাক ‘চি -ঠি – ই’ শোনার জন্য। কারণ আমি স্বজন, বন্ধু ও পরিচিত জনদের প্রায়শই চিঠি লিখে খোঁজ-খবর নিতাম। তাই আমার কাছেও তারা চিঠি লিখতো আর আমার চিঠির উত্তরও দিতো। এ জন্য প্রায়ই শুনতে পেতাম করিম ভাইয়ের পরিচিত কন্ঠস্বর ‘চি-ঠি-ই’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের (এস এম হল) আবাসিক ছাত্র ছিলাম। তো সেই সময় কখন ডাক পিওন এসে বলবে ‘স্যার আপনার মানি অর্ডার’ এই কথা শোনার জন্য মাসের প্রথম দিকে সব সময় কান খাড়া করেই থাকতাম, আর ভাবতাম এই বুঝি ডাকপিওন এলো বাবার পাঠানো টাকা নিয়ে। তখন চিঠি লেখার জন্য লেটার রাইটিং প্যাড কিনতে হতো আবার ঠিকানা লেখার জন্য নানান রংয়ের কলম কিনতে হতো, কিনতাম ভিউকার্ড। আবার কোনো কোনো সময় টাকার অভাব হলে বা কম গুরুত্বপূর্ণ কথা লেখার জন্য কিনতাম পোস্ট কার্ড। কোনো কোনো সময় কিনতাম বিশেষ ধরনের খাম AIR MAIL। এটা ছিলো হালকা নীল রংয়ের অনেক পাতলা কাগজের তৈরী বিশেষ ধরনের খাম। এতে চিঠির জন্য আলাদা কোন কাগজ লাগতো না। এই খাম ছিলো আসলে বিশেষ ভাবে ভাজ করা এক টুকরো ছাপানো কাগজ। এর এক পাশে চিঠি লিখে নির্দেশনা মোতাবেক ভাঁজ করলেই ইনভেলাপ হয়ে যেতো যার এক পাশে প্রাপক আর অন্য পাশে প্রেরকের ঠিকানা লেখার জায়গা নির্ধারিত থাকতো। এয়ার মেইলও পোস্ট অফিসে পাওয়া যেতো। চিঠি লেখায় যেমন আনন্দ ছিলো, তেমনি কারো লেখা চিঠি বা চিঠির উত্তর পড়ার মাঝেও ছিলো আনন্দ। আবার কখনও কখনও কাউকে চিঠি লেখা বা উত্তর দেয়ার মাঝে কষ্ট বা বেদনাও থাকতো। আসলে চিঠি লেখা বা উত্তর দেয়ার মাঝে যে অনুভূতি কাজ করতো তা ভাষায় প্রকাশ করা এক কথায় প্রায় অসম্ভব।

গত শতকের আশির দশকে (১৯৮০) আমাদের কিশোর বা উঠতি যৌবনে চিঠি জমানোও ছিলো কারো কারো হবি। আর প্রেমিক প্রেমিকারা তো তাদের প্রেমের আদান প্রদানকৃত সমস্ত চিঠিই যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখতো অত্যন্ত গোপনে এবং সযত্নে। আবার কেউ কেউ বিশেষ বিশেষ কিছু চিঠি, বিশেষ কোন ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট চিঠি অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষণ করতো। ভালো লাগার বা মন খারাপের সাথে সংশ্লিষ্ট চিঠি বিশেষ সময়ে গোপন বা সযত্নে রাখা জায়গা থেকে বের করে পড়ে সেই ভালো লাগা বা খারাপ লাগার অনুভূতিকেই অনুভব করতো।

আজকাল অনেক সহজে অনেক দ্রুত খবর আদান প্রদান করা যায়। বলতে গেলে এজন্য কোন টাকা পয়সাও খরচ করতে হয় না। মুহূর্তেই খবর নেয়া যায় এক রকম বিনা খরচেই ইন্টারনেটে বিভিন্ন এ্যাপস ব্যবহার করে। ভিডিও কল দিলে তো এক প্রকার সামনাসামনি বসেই কথা বলা যায়। আমাদের সেই চিঠি লেখার যুগে সামান্য কিছু পয়সা বাঁচানোর জন্য আমাদেরকে পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখতে হতো। যা যে কেউ-ই বিনা বাঁধায় পড়তে পারতো। পোস্ট কার্ডে লেখা চিঠির কোন গোপনীয়তা থাকতো না। এখন মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রায় বিনা খরচে লেখা চিঠি বা সংবাদের কঠোর গোপনীয়তা ১০০% নিশ্চিত।

হাল আমলের টিন এজাররা তো পোস্ট অফিস/ডাকঘর, ডাকপিয়ন, ডাক বাক্স, রানার, চিঠি, খাম বা ইনভেলাপ, পোস্ট কার্ড, অডিনারী চিঠি, রেজিষ্টার্ড চিঠি, বেয়ারিং চিঠি, সার্টিফিকেট অব পোস্টিং, রেজিষ্টার্ড উইথ এডি-এ সকল শব্দের সাথে মোটেই পরিচিত না। আমাদের সময়ে এই সকল শব্দের সাথে ছিলো আমাদের প্রাণের সংযোগ। বেয়ারিং চিঠি ছিলো সব থেকে মজার। চিঠি লিখে কোন একটা ইনভেলাপের মাঝে ঢুকিয়ে মুখটা আঠা অথবা ভাত চটকে বন্ধ করে প্রাপক আর প্রেরকের ঠিকানা লিখে চিঠির বাক্সে রেখে দিলেই প্রেরকের দায়িত্ব শেষ। ঐ চিঠির প্রাপককে দ্বিগুণ মাসুল দিয়ে চিঠি গ্রহন করতে হতো। দুই কারণে আমরা বেয়ারিং চিঠি পাঠাতাম। প্রথম কারণ টাকা খরচ করতে অপারগ হলে বা খরচ করতে না চাইলে তখন। আর দ্বিতীয়ত হলো নিশ্চিত ভাবে চিঠি প্রাপকের হাতে পৌছানোর জন্য। কারণ সেই সময় দুই টাকা খরচ করে কোন পাগলও অন্য কারো চিঠি গ্রহন করতো না।

আমিও কয়েকটি চিঠি স্মৃতির চিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছি। আমার জীবনের একটি বিশেষ সময়ে এই চিঠিগুলির গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। তাই ভালো লাগার সেই সাথে বন্ধুর ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে চিঠিগুলো সংরক্ষণ করেছি সংগোপনে। আজকের বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের কর্নধার তারেক মোর্শেদ টটো আর দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সাংবাদিক ও সদ্য অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক হঁরে কৃষ্ণ ভৌমিকের লেখা চিঠি আমি আজও সংরক্ষণ করছি পরম যত্নের সাথে। টিটো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হল থেকে পরীক্ষার তারিখ আর ভৌমিক পাবনা থেকে আমার অনার্স পাশের সুসংবাদ জানিয়েছিল। এর পর এক সময় আমার ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম পলাশ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল লতিফ হল থেকে আমার এম কম পরীক্ষার পাশের সংবাদ পাঠিয়েছিলো। ঐ পরীক্ষায় পাশ করাটা ছিলো আমার জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর কেন্দ্র বিন্দু। ঘটনাটা ছিলো এই লেখা লিখতে বসার সময় থেকে ১২ হাজার ৫ শত ৩০ দিন আগের।