চিহ্ন কোনো সিজনাল কাগজ না ॥ শহীদ ইকবাল



লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু মতবাদ বা আদর্শ। এ এক ধরনের শিল্প বিদ্রোহ। সেই বিবেচনায় এটি পরিবর্তন ও বিবর্তনের আন্দোলন, কলমের আন্দোলন, চিন্তার আন্দোলন, ফর্ম ভাঙার আন্দোলন। বাংলাদেশেও বেশ কিছু ছোটকাগজ লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। ‘চিহ্ন’ তেমনই একটি ছোটকাগজ। ‌’চিহ্ন’ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে লিটলম্যাগাজিন আন্দোলনে সরব।

চিহ্ন সম্পাদক শহীদ ইকবালের মুখোমুখি হয়েছেন ছোটকাগজ ‘লেখমালা’ সম্পাদক কবি মামুন মুস্তাফা। কথোপকথনটি সংক্রান্তি’র পাঠকদের জন্য…


মামুন মুস্তাফা : একযুগেরও বেশি সময় ধরে আপনি চিহ্ন নামে একটি লিটল ম্যাগ সম্পাদনা করছেন। লিটল ম্যাগকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শহীদ ইকবাল : লিটলম্যাগই সৎ ও পরিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার প্রধান জায়গা। প্রকৃত সাহিত্য সৃষ্টি করতে গেলে লিটলম্যাগচর্চা আরও বাড়াতে হবে। এ কর্পোরেট যুগে সাহিত্য বাঁচাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

মা. মু. : এক সময় লিটল ম্যাগকেন্দ্রিক লেখকদের দৈনিকের সাহিত্যপাতার প্রতি অনীহা লক্ষ করা যেত, কিন্তু আজকে আর তেমনটি পরিলক্ষিত হয় না- এর কোনো বিশেষ কারণ আছে বলে কী আপনি মনে করেন?
শ. ই. : এর কারণ একটাই- পুঁজি ও প্রতিষ্ঠার প্রতি তীব্র মুগ্ধতা। প্রযুক্তির অত্যাচারও একপ্রকার বাধা।

মা. মু. : চিহ্ন (চিহ্ন পুরস্কার) যে পুরস্কার প্রবর্তন করেছে, সেখানে তার অনুসন্ধিৎসু চোখ মিডিয়ার আলোয় যারা আলোকিত, সেসব লেখকদের বাইরে নিভৃতচারী লেখকদের খুঁজে আনছে- এমন ভাবনার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কী?
শ. ই. : এটাই তো প্রকৃত কাজ বলে মনে হয়। সামাজিক দায়ও বটে। তেলে মাথায় তেল দিয়ে কী হবে?

মা. মু. : ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজের পাশাপাশি ‘চিহ্ন প্রকাশনা’ সংস্থাও গড়ে তুলেছেন। চিহ্ন প্রকাশনা নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যত ভাবনা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
শ. ই. : ‘চিহ্ন’ তো একটা স্বপ্ন-কাঠামো। লেখক-পাঠক- ‘পাগলদে’র আশ্রম। তারই অংশ হলো প্রকাশনা। এখন পর্যন্ত আমাদের চল্লিশটিরও বেশি বই প্রকাশ পেয়েছে। এবং প্রতি বছর এই রাজশাহী থেকে অন্তত তিন-চারটি বই প্রকাশিত হয়। কোনোটা সৃজনশীল কোনোটা মননশীল। তবে আমাদের কোনো বিপণন কেন্দ্র নেই।

মা. মু. : বর্তমানে অনেক ছোটকাগজই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। একুশে বইমেলাকে সামনে রেখে নিজেরাই বের করছে নানা গ্রন্থ। এর পেছনে কি ব্যবসায়িক দিকটিই প্রধান?
শ. ই. : তা হয়তো আছে। কিন্তু ‘চিহ্ন’ কোনো সিজনাল কাগজ না। সংগঠন হিসেবেও সিজনাল না। সাহিত্যই তার সার্বক্ষণিক ধ্যানজ্ঞান এবং সাধ্যমতো সেটি প্রকাশযোগ্য করে তোলাই মুখ্য কাজ।

মা. মু. : বাংলাদেশে প্রতি তিন বছর অন্তর চিহ্ন আয়োজিত লিটল ম্যাগ মেলা দুই বাংলাতেই আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। এর পেছনের শক্তি কী?
শ. ই. : ‘চিহ্ন’কর্মীদের আন্তরিকতা ও সংগঠনের একনিষ্ঠতাই এর কারণ। তবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি। এ মেলার মধ্য দিয়ে আমরা এখনও সাহিত্যের জন্য ফলপ্রসূ কিছু করার চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন ও সামর্থ্যই আমাদের মূল শক্তি।

মা. মু. : আপনার সময়ের লিটল ম্যাগ চর্চা আর বর্তমানে যারা লিটল ম্যাগ করছেন- এ দু’য়ের মধ্যে কোনো গুণগত কিংবা আদর্শগত পরিবর্তন বা পার্থক্য লক্ষ করেছেন কী?
শ. ই. : অবশ্যই পার্থক্য আছে। তবে আগের চেয়ে লিটলম্যাগের দায়িত্ব এখন বেশি। তবে সব কাজই যে পুরোপুরি ভালো হবে সেটা আশা করা যাবে না। তবে অবশ্যই ভালো কাজ হচ্ছে। বলতেই হয়, ষাট বা আশির দশকের কমিটমেন্ট তো এখন নেই। ফলে হতাশা আছে।

মা. মু. : পশ্চিমবঙ্গের লিটল ম্যাগ আর বাংলাদেশের লিটল ম্যাগের চরিত্রে কিংবা চর্চার ভেতরে মৌলিক কোনো পার্থক্য রয়েছে বলে কী আপনি মনে করেন?
শ. ই. : অবশ্যই। পশ্চিমবঙ্গে লিটলম্যাগ আন্দোলন এখনও বেশ তীব্র। ‘অনুষ্টুপ’, ‘অমৃতলোক’ ঈর্ষাজাগানিয়া কাগজ। তাদের কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা হয়তো আছে কিন্তু তারা অবশ্যই আমাদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে।

মা. মু. : দীর্ঘদিন ধরে আপনি ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ সম্পাদনা করছেন। আপনি কী মনে করেন, লিটল ম্যাগ চর্চার যে দর্শন, চিহ্ন তাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে?
শ. ই. : না তা পারেনি। এজন্যই আমরা ‘স্নান’ নামে একটি পূর্ণ লিটলম্যাগের পৃষ্ঠপোষকতা দেই, গত নয় বছর ধরে। ‘স্নানে’র সার্বভৌম শক্তি আছে। এবং এটি পূর্ণ লিটলম্যাগ- যার ছেচল্লিশটি সংখ্যা বেরিয়ে গেছে। তবে এর কোনো সংখ্যাই দুই ফর্মার বেশি হয় না কখনো।

মা. মু. : ‘চিহ্ন’ নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
শ. ই. : খুব সহজ কথা। পরিশুদ্ধ সাহিত্যের একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলা। যার কেন্দ্র কোনো ব্যক্তি নয় ‘চিহ্ন’ নামেই পরিচিত হবে।