চেনাশোনার কোন্ বাইরে ॥ সুশীল সাহা




বাঙালির বিনোদনের পালাবদল ঘটেছে নানা সময়ে নানাভাবে। যাত্রা থিয়েটার সিনেমার পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায় রাস্তা আটকে গানের অনুষ্ঠানের জায়গা দখল করেছে টেলিভিশন নামক বিশাল এক যন্ত্রদানব। এই কিছুদিন আগেও ভিসিপি ভিসিআর-এর বেশ রমরমা ছিল। এখন তো সন্ধ্যে হলেই ঘরে ঘরে নানান চ্যানেলের মেগা সিরিয়াল চালু হয়ে যায়। গল্প করতে করতে বা চা খেতে খেতে দিব্যি চলতে থাকে এইসব সিরিয়াল দেখা। ঘুরেফিরে একই বিষয়ের নানারকম মোড়ক দেখে দেখে ক্লান্ত হয়না দর্শককুল। একাধিক বিয়ে কিংবা সংসারে কুচক্রী মানুষের নানা ফন্দিফিকির চলতে থাকে। সর্ব গুণে গুণান্বিত নায়ক কিংবা নায়িকাকে নানাভাবে নাকানি চোবানি খাওয়ানো হয় নানা ঘটনায়। তারা কেউ স্মৃতি হারায়, কেউবা অবস্থাবিপাকে খলনায়ক বা নায়িকার ক্রীড়নক হয়ে কাজ করে। গল্পের শাখা উপ-শাখা বিস্তার করতে করতে কখনওবা খেই হারিয়ে যায়। দক্ষ পরিচালকেরা তাদের নিপুণ হাতে সেগুলোকে কব্জা করেন পারম্পর্যহীন ঘটনাবিন্যাসে। শুরুতেই তারা অকপটে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে স্বীকার করে নেন এই সব গল্পে চিকিৎসা কিংবা আইনী সব ব্যাপার-স্যাপারগুলো তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত, তার সঙ্গে বাস্তব জগতের কোনও মিল খুঁজতে যাওয়া তাই বৃথা।

দর্শকেরা সব জানে। নানারকম সব অসঙ্গতি দেখে হাসাহাসি করে তবু এইসব গাজাখুরি ধারাবাহিকগুলো দেখার মোহপাশ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে না। কেউ কেউ তো বাড়ির সব কাজ করতে করতে এসব শোনে বা দেখে। কোথাও কোথাও দেখেছি, সন্ধ্যেবেলায় টিভির পর্দার শুরু হয় আর তার সমাপন ঘটে অনেক রাতে অর্থাৎ শুতে যাবার আগে।
বিনোদনপ্রিয় বাঙালির রুচির নানারকম বিবর্তন ঘটেছে নানাসময়ে। বাংলা সংস্কৃতি আর নির্ভেজাল বঙ্গজ নেই, একথা নির্মম হলেও সত্যি। সেটা ভাল কি খারাপ তা নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। যা হবার তাইতো হবেই। এখন যে বিশ্বায়নের যুগ। এখন বাংলা সিরিয়ালের নায়ক নায়িকারা সাবলীলভাবে হিন্দি গান গায়। তারা বাড়িতে ভারি ভারি গয়না পড়ে থাকে। বেনারসি শাড়ি পড়ে ঘুমোতে যায়। হাই হিল পায়ে নাচতে অভ্যস্ত। নানারকম অবাঙালি পোশাকে তাদের যত্র তত্র দেখা যায়। সবটা মিলিয়ে রীতিমতো একটা জগাখিচুড়ি ব্যাপার। অথচ সত্যিকারের বাংলা ও বাঙালি এতটা পচে যায়নি। সবাই সবটা জানে, বোঝে, সিরিয়ালের সবকিছু দেখে হাসাহাসি করে। কিন্তু ওসব দেখা আদৌ কিন্তু বন্ধ করে না।

আমার খুব চেনা একজন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সন্ধ্যা হলেই স্টার জলসা খুলে দেখতে বসে যান। অনেক রাত অব্দি ওই সিরিয়ালগুলো একটার পর একটা হতেই থাকে। ওই সময় তাঁর কাছে কেউ এলে তাঁরাও ওঁর পাশে বসে যান। উচ্চনাদে টিভির আওয়াজের মধ্যেই কাজের কথা সংক্ষেপে সেরে তাঁরা চলে যান। পারতপক্ষে ওই সময়টুকুতে অনেকেই আসতে চান না। লেখক ভদ্রলোকের লেখালিখি কিন্তু থামেনি, লেখার মানও নেমে যায় নি। অনেকে মনে করেন অবাঞ্ছিত মানুষের ভিড় এড়াতে লেখক এই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। সে যাই হোক ওই বাড়িতে ওই সময়ে টিভির টিআরপি চলতেই থাকে।
তবে এইসব সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে খুব ছোট করে দেখার কিছু নেই। আমরা নিজেরাই আমাদের সত্তাকে প্রায় বিকিয়ে দিয়েছি। ঝা চকচকে শপিং মল মেট্রো রেল অর্থাৎ ‘মলমূত্রে’র ভুলভুলাইয়াতে আটকে আছি একেবারে স্বেচ্ছায়। আর এইসব হয়ে চলেছে অনেকদিন ধরে। ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবিতে যে ভূতের নৃত্যের দৃশ্যায়ন করেছিলেন তা কিন্তু সত্যজিৎ ‘গুগাবাবা’র থেকে একেবারেই আলাদা, যদিও দুটি ছবিরই কোরিওগ্রাফার ছিলেন প্রয়াত শম্ভু ভট্টাচার্য।

বঙ্গ-সংস্কৃতিতে আবাহন বিসর্জনের পালা নতুন কিছু নয়। নগরায়নের ফলে এই মিশ্রন দ্রুতগতি লাভ করেছে। ভালমন্দ বিচার করার সময়ও পাচ্ছে না মানুষ। যা কিছু চোখ ধাঁধানো তাকেই বরণ করার জন্যে সদা উন্মুখ হয়ে আছি যেন আমরা। তাই আমাদের নিজস্ব সত্তা বিলীন হতে হতে এক সংকটময় জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কবি কী চেয়েছিলেন আর কী পরিণতি হল তাঁর সাধের শান্তিনিকেতনের।

এতসব আক্ষেপের মধ্যেও স্বস্তি জাগে যখন ডাক্তার পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকারের মেধাবী সৃজন ‘গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার’ হাতে আসে আমাদের। চারদিকের এত বৈষম্য এত বৈপরীত্যের মধ্যেও তিনি যে কাজটা করেছেন তা সত্যি সত্যিই আশা জাগায় মনে। মনে হয় ‘প্রাণ আছে, প্রাণ আছে’ আর প্রাণ থাকলেই মান আছে। চারদিকের এত নিকষ কালো অন্ধকার আছে বলেই হয়ত আমরা আলোর সন্ধান করেছি হন্যে হয়ে। আর তার একটু ঝলক দেখলেই আমাদের মনের মধ্যে আশার সঞ্চার হয় এবং সেই আশাকে ভর করেই আমরা এগোতে চাই, সমুখপানে।