চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১০ ॥ সুশীল সাহা



আমার দেখা স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নেরা


ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে না, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। কতদিন থেকে যে স্বপ্ন দেখছি মনে নেই। তবে অনেক ভাল ভাল স্বপ্নের সঙ্গে দেখেছি অনেক মন খারাপ করা দুঃস্বপ্ন। সব তো আর মনে নেই। তবে একেবারে যাতে ভুলে না যাই সেজন্যে অনেক স্বপ্নের কথা একটা ডায়রিতে লিখে রেখেছিলাম। আজ এই চেনাশোনার কোন বাইরের ধারাবাহিকটা লেখার ছলে কয়েকটার কথা এখানে লিখছি।
এই স্বপ্নটা আমি দেখেছিলাম বছর কুড়ি আগে জলদাপাড়ায় বেড়াতে গিয়ে। স্বপ্নের বিষয়বস্তুর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ওই অসামান্য পর্যটন ভূমির কোনও মিল নেই। স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি যে কুরুসাওয়ার ‘ড্রিমস’ ছবির মতো আমি নিজেই যেন কালীঘাটের পটচিত্রের ছবির জগতে ঢুকে পড়েছি। আমি নিজেও যেন ওই ছবিগুলোর একটা চরিত্র। বেশ গোলগাল চেহারা। বর্ণময় সেই ছবির জগতে যখন ওই ছবির মোহান্ত এসে এলোকেশীকে বটি দিয়ে মারতে যাচ্ছে, তখনই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেছে।

এবার আর ছবির জগতে নয়। একেবারে ক্রিকেট মাঠে। কোথায় যেন ভারত পাকিস্তানের এক দিবসের ম্যাচ হচ্ছে। আমি আম্পায়ার। পাকিস্তান তখন হারতে বসেছে। বোলার আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিচ্ছে। একবার তার বলে যখন ছক্কা হাকিয়েছে শচীন তখন সে তো প্রায় আমাকে মারতে আসে। তাকিয়ে দেখি সে ব্যাটা ইমরান খান। ম্যাচ যখন মীমাংসা হবার মুখে সেই সময়ে আবার একটা ছক্কা হাঁকিয়েছে কে যেন। আমি তো ভয় পেয়ে ছুটলাম সেই বলের দিকে। কী আশ্চর্য। ক্যাচটা ধরেই ফেললাম। আম্পায়ার হয়ে কেন ক্যাচ ধরলাম, সেই অভিযোগে যখন ব্যটসম্যান নিজেই আমার দিকে তেড়ে আসছে, তখনই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।

এবারের স্বপ্ন একটা বড় হলঘরে। বলশয় ব্যালের শিল্পীরা নাচের মহড়া দিচ্ছে। আমি তাঁদের ট্রেনার। সুন্দরী নৃত্যশিল্পীদের নানারকম নৃত্যভঙ্গিমা দেখাচ্ছি। ওঁরা প্রায়শই ভুল করছে আর আমি রেগেমেগে ওঁদের কাউকে কাউকে একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে সপাং সপাং করে মারছি। ওদের সাদা গায়ে রক্তের আভা ফুটে উঠছে। ওসব দেখে আমি মাঝে মাঝেই খিলখিল করে হেসে উঠছি। নাচের মহড়া যখন তুঙ্গে, যখন চাইকোভস্কির সোয়ান লেকের বাজনা চড়া পর্দায় বাজছে তখনই হঠাৎ লক্ষ্য করলাম সিলিং থেকে একটা ঝাড় লন্ঠন বৃন্তচ্যুত হয়ে তেড়েফুড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আর তখনই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

এবারের স্বপ্নটা একেবারে মাঝ সমুদ্রে। একটা ডিঙ্গি নৌকায় যাচ্ছি সেন্টমার্টিন দ্বীপে। আমার সঙ্গে চার পাঁচজন বুড়ো বুড়ি। তারা তো ভয়ে আধমরা হয়ে আছে। আমি তাদের অভয় দিয়েই যাচ্ছি আর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আকাশে মেঘ ঘনিয়ে আসছে, সঙ্গে বজ্র বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এমন সময় কোথা থেকে একটা হাঙর এসে নৌকাটাকে টার্গেট করল। আমি তখন প্রাণপণে বৈঠা বাইছি। হঠাৎ কড়কড় করে একটা বাজ পড়ল। সোজা আমার দিকে যখন সেটা এগিয়ে আসছে তখনই ঘুমটা ভাঙল।

এতক্ষণ যে স্বপ্নগুলোর বিবরণ দিলাম তা কিছুটা সদর্থক। এবার কিছুটা অন্যরকম স্বপ্নের কথা লিখব। সেগুলোকে অবশ্য দুঃস্বপ্ন বলাই ভাল। এগুলোর অর্থ কিছু খুঁজে পাইনি আজও। সেই অর্থে দুঃস্বপ্নের স্মৃতি ভুলে যেতে চেয়েছি, ভুলে গেছিও। তবে দু’একটির ঘোর খুব সহজে কাটেনি। সেইসব সকালগুলো হয়েছে এক ধরনের বিষণ্ণতা দিয়ে। অবশ্য সকাল থেকে বেলা গড়াতেই একটু একটু করে ভুলে গেছি। তবে অনেক কষ্ট করেও সেগুলোর কার্যকারণ সূত্র খুঁজে পাইনি আজও।
দুঃস্বপ্ন ১/ আমি যেন সাদা বরফঘেরা পথ হাঁটছিলাম। কে যেন আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঠাণ্ডায় দেহমন অবসন্ন। ক্লান্ত হতে হতে যখন প্রায় জ্ঞান হারাবার উপক্রম, তখনই পা ফসকে পড়ে গেলাম এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভেঙ্গে গেল।
দুঃস্বপ্ন ২/ চারদিকে অগ্নিকুণ্ড, কারা যেন হৈ হৈ করতে করতে এগিয়ে আসছে । তাদের দেখা যাচ্ছে না, অথচ কণ্ঠস্বরের তীব্রতা বাড়ছে তো বাড়ছেই। হঠাৎ আকাশ তোলপাড় করে ঝড় উঠল, বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হল। আগুন নিভে গিয়ে শুরু হল ধোঁয়ার কুণ্ডলী। চোখ জ্বলছে, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। বাজনা বাজছে আর আমি তার মধ্যেই জ্ঞান হারালাম এবং তারপর ঘুম ভাঙল।
দুঃস্বপ্ন ৩/ এবারের পটভূমি সমুদ্র । আমি একটা ডিঙ্গি নৌকায় কোথায় যেন যাচ্ছিলাম। দূরে অনেকগুলো নৌকা। তাদেরকেই আমি অনুসরণ করছিলাম। হঠাৎই আকাশ কালো করে করে ঝড় উঠল। দূরে দেখা গেল অনেকগুলো শুশুক। তারা যেন বাজনার তালে তালে নাচছিল। এমন সময় কোথা থেকে ছুটে এলো একটা হাঙর। সেটা আমার দিকে ছুটে আসছিল তীরবেগে। একসময় সেটা আমার নৌকায় আঘাত করল কী করল না, এমন সময় আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি জানি সবাই নানাভাবে এমন সব নানারকম স্বপ্ন দেখেন, যার সেই অর্থে কোনও ব্যাখ্যা মেলে না। এবার তাই চলে আসি বাস্তবের মাটিতে। আমার দেখা কিছু স্বপ্নের বাস্তবায়নের কিছু কঠিন পরীক্ষার কথা এবার লিখব। এইসব পরীক্ষায় পাশ করেছি কিনা জানি না, তবে আমার জীবনচর্যায় এগুলোর একটা বড় ভূমিকা রয়েই গেছে।

মধ্যবয়সে আমি সংগীত শিক্ষক হবার চেষ্টা করেছিলাম। বলা যায় অবস্থা বিপাকে এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম। খুব ছোটবেলা থেকেই গানকে ভালবেসেছি। সেইভাবে গান শেখার সুযোগ পাইনি ছোটবেলায়। তবে গান শুনেছি মন দিয়ে। গ্রামোফোনে, রেডিওতে গান শুনতাম মন দিয়ে। সিনেমার পর্দার গানগুলো মাথার মধ্যে ঢুকে যেত। লাউড স্পিকারে গান বাজত তখন। সেগুলো শুনতাম মন দিয়ে। শুনে শুনেই ওগুলো মুখস্থ হয়ে যেত। আর সুর তো গলায় খেলে যেত অনায়াসে। এইভাবেই আমার গান শেখা। অবশ্য পরিণত বয়সে বর্ষীয়ান শিল্পী মায়া সেনের কাছে কিছুদিন নাড়া বেঁধে গান শিখেছিলাম। সব মিলিয়ে গান রয়ে গেল আমার জীবন জুড়ে।

সেটা গত শতাব্দীর নব্বই দশকের প্রথম দিক। চাঁদপাড়ার বেঙ্গল ফাইন আর্টস কলেজের কিছু কর্মযজ্ঞে প্রবলভাবে ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। ওরা অনেক কষ্ট করে কেন্দ্রিয় সরকারের কিছু অনুদান সংগ্রহ করেছিল। শুরু করে করেছিল ‘সামার স্কুল’, সে অভিনব কর্মকাণ্ড। গরমের ছুটিতে ছোট ছোট বাচ্চাদের শেখানো হত নাচ গান ছবি আঁকা নাটক ইত্যাদি। স্কুল পাঠ্য সিলেবাস বহির্ভূত এইসব কাজে পাওয়া গেল ছাত্রদের অভূতপূর্ব সাড়া। আমাকে দেওয়া হল প্রতিদিনের সূচনা সংগীত শেখানোর। সে এক কঠিন পরীক্ষা। শুরু করলাম গান শেখানো। প্রথম প্রথম সারা ঘরময় ছড়িয়ে যেত বেসুরো কণ্ঠের বিচিত্র সব চিৎকার। আস্তে আস্তে সেগুলোই সুরে বাঁধা পড়ল একটু একটু করে। সেই প্রথম পেলাম সাফল্যের স্বাদ। সেই আনন্দের রেশ আজও আমার মনে লেপ্টে আছে। একমাস ধরে নিত্য গান শিখিয়ে যখন শেষদিনে ওই সমস্ত ছেলেমেয়েরা খোলা গলায় গান গাইত, আমার মনটা তখন সাফল্যের আনন্দের ভরে যেত।

পরপর বেশ কয়েকটা সামার স্কুলের অভিজ্ঞতা আমাকে অনেকটাই এগিয়ে দিল। বুঝলাম আমি এইসব কাদামাটি দিয়েই মূর্তি গড়ার ক্ষমতা রাখি। প্রথাসিদ্ধ পথে না গিয়ে আমি গান শিখিয়ে হাতে হাতে ফল পেলাম আর এতে আমার আত্মবিশ্বাসও অনেকটা যেন বেড়ে গেল। সেই অভিজ্ঞতা আমি প্রয়োগ করলাম আমার নিজের বাড়িতে ওই নব্বই দশকেরই মাঝামাঝি সময়।
আমরা হৃদয়পুরে একটা বাড়ি কিনে থিতু হয়েছিলাম চুরানব্বই সালের মে মাসে। বলা যায় ওই সময় থেকেই বাড়ির চারপাশের ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে একটা দল গড়ে ফেললাম। নাম দিলাম ‘আনন্দধারা’। টানা বারো বছর ধরে বেশ কয়েকটা শিশু কিশোরদের নিয়ে এই কাজটা আমি করেছিলাম। গান নাচ ছবি আঁকা নাটক ইত্যাদি নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিলাম। শেখাতে শেখাতে আমি নিজে শিখে ফেললাম অনেক কিছু। তারমধ্যে প্রধান হল নিয়মানুবর্তিতা, ধৈর্য ধরে সবার মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধকে জাগিয়ে তোলা। সবার মধ্যেই যে কমবেশি ওটা আছে, সেটাও টের পেলাম ধীরে ধীরে। বাচ্চাদের নিয়ে আমার ওই সময়টা কী আনন্দেই না কেটেছে।

১৯৯৪ থেকে ২০০৬, খুব কম সময় নয়। তবে একটা সময়ে ও থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। বাচ্চারা তখন অনেক বড় হয়ে গেছে। আমার নিজের মধ্যেও একটু একটু করে ক্লান্তি জমেছিল। তাই একটা সময়ে ওই আনন্দধারার কর্মকাণ্ডে পূর্ণচ্ছেদ পড়ল। এতে আমি খুব নিশ্চিন্ত হয়ে দিনযাপন করছিলাম, তা নয়। ভিতরে ভিতরে তখন নতুন করে আবার কিছু একটা করার জন্যে মন আনচান করে উঠছে। কিন্তু কী করব, কীভাবে করব ইত্যাদি ভাবতে ভাবতেই বছর দশেক কেটে গেল। এমন সময় প্রস্তাব এলো বন্ধু তানভীর মোকাম্মেলের প্রথা বহির্ভূত স্কুলে যোগ দেবার। নাম মানবরতন শিশু কেন্দ্র। স্থান খুলনার অদূরে বসুরাবাদ গ্রাম। সে এক অন্যরকমের অভিজ্ঞতা। তল্পিতল্পা নিয়ে একদিন রওনা হলাম ভিনদেশে, আমার জন্মভূমিতে। সেটা ২০১৬ সাল।

পাশপোর্ট ভিসার ঝক্কি মাথায় করেই ওখানে গেলাম বেশ কয়েকবার। অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সুখের। ততদিনে আমি অনেকটাই অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছি যে। তাই ওদের শেখাতে আমাকে একেবারেই বেগ পেতে হয়নি। ওদের শুধু গানই শেখালাম না, নাটক আর আবৃত্তিও ছিল। করলাম বেশ কয়েকটা ছোট বড় অনুষ্ঠান। গানের সঙ্গে নৃত্য দৃশ্যায়নও হল কয়েকবার। বসুরাবাদের ওই কাজেও একসময় ছেদ পড়ল অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই। বুঝলাম এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে এই কাজ করা খুব একটা সহজসাধ্য নয়। তাছাড়া সারাদিনের শেষে রাত্রিযাপন করার মধ্যেও ছিল এক ধরনের ক্লান্তি। আরো কিছুদিন পরে দক্ষিণ ২৪ পরগানার একটা স্কুলে কয়েকদিন গিয়েছিলাম বন্ধু জয়কৃষ্ণ কয়ালের অনুরোধে। কিন্তু দূরত্বের কারণে তাতেও একসময় ছেদ পড়ল। বুঝলাম এবার আমাকে সত্যি অবসর নিতে হবে।

বয়স যখন চুয়াত্তর (২০২১) পেরিয়ে পঁচাত্তরে পড়ল তখন একটু পিছন ফিরে তাকাতেই চোখের সামনে প্রতিভাত হল এইসব স্বপ্নেরা। আমি জানি দুঃস্বপ্নের বাতাবরণ পেরিয়ে আমার এই স্বপ্ন দেখা সেইভাবে মিথ্যে হয়ে যায়নি। নদীর বাঁকবদলের মতো ঘাটে ঘাটে তরী ভিড়িয়েছি। ইচ্ছেমতো সওদা করেছি। আবার পাড়ি জমিয়েছি ভিনদেশে। ঘাটে ঘাটে কতনা অজানা অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করেছে আমার জন্যে। কোনওকিছুই আমি ফেলে দিইনি। মনের মণিকোঠায় রেখে দিয়েছি সবকিছু অতিযত্নে।
‘এমনি করেই যায় যদি দিন, যাক না’।