চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১১ ॥ সুশীল সাহা


স্মৃতির পাখিরা উড়ে যায় আদিগন্ত বিষণ্ণ আকাশে


প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। তবু ঝাপসা হয়ে যায়নি স্মৃতি। চোখ বুঝলেই যেন দেখতে পাই ফেলে আসা সেই সময়টাকে। আমার স্মৃতিতে ১৯৭১ যেন এক নীল ধ্রূবতারা, জ্বলজ্বল করছে সেই কবে থেকে। ঠিক এক বছর আগে জন্মভূমির মায়া কাটিয়ে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছি খানিকটা স্বেচ্ছায় বাকিটা পরম অনিচ্ছায়, প্রায় বাধ্য হয়ে। যে দেশটায় জন্মালাম, বড় হলাম তাকেই ছেড়ে আসতে হল ’৭০-এর মার্চে, যার ঠিক বছর বাদে ঘটল ওই দেশের এক মহা বিপর্যয়, বাংলাদেশের আত্মমুক্তির লড়াই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। দেশান্তরী হলেও প্রাণমন জুড়ে ছিল আমার স্বদেশ। তেইশ বছর বয়সে দেশত্যাগ করে আসাটা তেমন করে মেনে নিতে পারিনি বলেই হয়ত তখনও সত্তায় জাগ্রত ছিল জন্মভূমির স্মৃতি।
ঊনসত্তরে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের গণ অভ্যুত্থান নিজের চোখে দেখেছি, দেখেছি কীভাবে একটি মুক্তিকামী জাতি জেগে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ডাকে। আমি তখন খুলনায়। মিটিং মিছিলে সারা পূর্ব বাংলা জুড়ে তখন এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা। ছয় দফা আন্দোলনের ঝোড়ো বাতাসে হয়ে উঠেছে উত্তাল, সমগ্র দেশটা। ওই টালমাটাল সময়ে ’৭০-এর মার্চ মাসে আমরা ওই দেশ ছেড়ে আসি। দু’বছর আগে বাবার অকালমৃত্যু না ঘটলে হয়ত ওই সময়ে আমরা দেশত্যাগের কথা ভাবতামই না।

নতুন দেশের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল আমাকে। ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ইতোমধ্যে কীভাবে যেন কেটে গেছে এক বছর। শুরু হয়েছে নতুন বছর ১৯৭১। সেই একাত্তরের উত্তর বসন্তের দুঃসহ দিনে ঘটল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সূচনা। এখানকার সংবাদপত্রে তখন নিত্য প্রকাশিত হচ্ছে ওখানকার রোমহর্ষক সব খবর আর সেইসঙ্গে আকাশবাণী কলকাতা প্রচার করছে মুক্তিকামী একটি দেশ, একটি জাতির সংগ্রামের নানা তথ্যসমৃদ্ধ গল্পগাথা। আর দশজনের মতো আমিও তখন নানাভাবে মেতে আছি ফেলে আসা দেশটার ঐতিহাসিক এক যুদ্ধযাত্রায়। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের সেই দিনগুলোয় ফিরে যেতে যেতে খুলে দেখছি আমার সমস্ত ছেঁড়া ডায়েরির পাতা আর যত ঘুমিয়ে পড়া স্মৃতির পাখিদের যাত্রাপথের ছায়াছবি।

মনে আছে সেটা ছিল এপ্রিলের এক রৌদ্রদগ্ধ সময়। খবর পেলাম সীমান্ত দিয়ে দলে দলে চলে আসছে শরণার্থীরা। আমরা তখন হাবড়ায় থাকি। শুনতে পেলাম বনগাঁ, বাগদা, ভোমরা সীমান্ত দিয়ে প্রাণ হাতে করে কোনওরকমে চলে আসছেন হাজার হাজার মানুষ। প্রাণটা কেমন যেন কেঁদে উঠল। আমার কত প্রিয়জন তখন ওপার বাংলায়। তাঁরা কেমন আছে কে জানে! বেঁচে আছে তো! ছুটে গেলাম একদিন বনগাঁতে। ট্রেন থেকে নেমে একটু এগোতেই যশোর রোডের দু’পাশে দেখলাম অস্থায়ী সব শিবির। আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য মানুষ। শুনতে পেলাম সরকারি উদ্যোগে নানা জায়গায় শরণার্থীদের আশ্রয় দেবার জন্যে ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। ওইসব অস্থায়ী শিবির থেকে মানুষদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কয়েকটি পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তখন কথা বলেছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে তাঁরা বলছিলেন তাঁদের দুর্দশার কথা। মানবতার সেই অপমানের সেইসব বিবরণ শুনতে শুনতে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। দেখলাম একটা জায়গায় শরণার্থী স্লিপ দেওয়া হচ্ছে মানুষদের। একটা টেবিলে গিয়ে কিছু সময় স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করলাম। পরে বুঝলাম, ওটা সরকারি কর্মীদের কাজ। আমাকে সরে আসতে হল। অনেকটা সময় সেদিন ওখানে থেকে বাড়ি চলে এলাম। বাড়িতে এসে দেখি আমাদের পরিচিত একটি পরিবার খুলনা থেকে সেদিনই এসে পৌঁছেছে আমাদের বাড়িতে। ওঁদেরকে রেখে আসতে হবে বারাসাতের অশ্বিনী পল্লিতে। বছর কয়েক আগে ওখানে একটা ছোট বাড়ি কিনে রেখেছিলেন বাবা। জায়গাটা তখনও তেমন জমজমাট হয়নি। আজকের অশ্বিনী পল্লির সঙ্গে তার বেশ তফাৎ। পরদিন সেখানেই ওই পরিবারটিকে রেখে এলাম আমি। সরকারি রেশনে তাঁরা কোনওরকমে দিন গুজরান করবে। আমার তখন নিজেরই টালমাটাল অবস্থা। দাদার আয়ে চলেছে আমাদের ছয় জনের সংসার। আমি যে কবে খুঁজে পাব কাজ, কে জানে! চেষ্টা তো করে যাচ্ছি! যাহোক সামান্য সদিচ্ছা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লাম তখনকার সেই অস্থির সময়ের মধ্যে। খুঁজে ফিরতে থাকলাম আমার প্রিয় জন্মভূমি থেকে উৎখাত হয়ে চলে আসা মানুষদের। অনেক চেনা মানুষদের দেখা পেলাম। কীভাবে রিক্ত নিঃস্ব হয়ে তারা চলে এসেছেন সেইসব বর্ণনা শুনে প্রবলভাবে আলোড়িত হয়েছিলাম তখন। হাবড়ায় তখন ঘরে ঘরে ওই দেশ থেকে আসা শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে। যে বাড়িতেই যাই সেখানেই ওই ছবি। তবে সবকিছু হারিয়ে এলেও তারা নিজেদের আত্মমর্যাদা হারান নি। তাই কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম অনেকেই নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিয়েছেন। ব্যবস্থা বলতে কোনওরকমে টিকে থাকা, আরকি!

হাবড়ায় আমাদের সবাই থাকলেও আমি থাকতাম ছোটমামার আশ্রয়ে উল্টোডাঙ্গার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে। ওঁদের তখনও সন্তানাদি হয়নি। আমি তখন প্রাণপণে চাকরি খুঁজছি। সাহিত্য শিল্পের পোকা তখনই মাথার মধ্যে কিলবল করতে শুরু করেছে। স্বদেশে যা ছিল নিতান্ত সুসুপ্ত অবস্থায়, এই বাংলায় এসে তা যেন ক্রমশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল একটু একটু করে। নির্ভেজাল একটা বেকার জীবন কাটাচ্ছি যখন তখনই ঘটেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। লোকমুখে খবর পেলাম আমার খুলনার অনেক বন্ধু তখন এসে গেছে কলকাতায়। খুঁজে খুঁজে অনেকের সঙ্গে দেখা করলাম। সবাই যেন কেমন বিষণ্ণ ক্লান্ত হতোদ্যম। কেউ কেউ ছোটখাট কাজ জুটিয়ে নিয়েছেন ইতমধ্যে। কেউ কেউ সরকারি সাহায্যের ডোল নিতে লাইন দিচ্ছে শিবিরে শিবিরে। এমন সময় এক শিল্পীবন্ধুর মাধ্যমে খবর পেলাম লেনিন সরনির এক বাড়িতে নিয়মিত নাকি জমায়েত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আসা শিল্পী কবি সাহিত্যিকরা। একদিন গেলাম সেখানে। দেখলাম ওখানে তখন বেশ একটা জমজমাট গানের মহড়া চলছে। সেদিনই প্রথম দেখলাম সনজিদা খাতুনকে। তিনি হারমোনিয়াম ধরেছেন। নির্দেশ দিচ্ছেন একটি গানের। বেশ মনে আছে, নজরুলের ‘একী অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লিজননী’ গানটা সমবেত কণ্ঠে গীত হচ্ছিল। আমিও সেই সেদিন সেই শিল্পীদের দলে ভিড়ে গেলাম। তারস্বরে গলা মেলালাম। বেশ একটা উন্মাদনা অনুভব করছিলাম। সেদিন অনেকের সঙ্গে পরিচয় হল ওখানে। এক একজনের এক একরকম অভিজ্ঞতা। পাকিস্তানী সেনা আর রাজাকারদের কুকীর্তি শুনতে শুনতে মনের মধ্যে এক ধরনের প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠল যেন। জন্ম থেকে যে দেশে ২৩টা বছর ছিলাম সেখানকার অবাঙালি মানুষজনের ব্যবহারে সব সময়েই নানারকম অসঙ্গতি দেখেছি। তাদের চালচলনে ফুটে উঠত উদ্ধত প্রভুসুলভ অহংকার। সীমান্তের এপারে বসে সেই সময়ে আরো অনুভব করলাম, তারা আমাদের বন্ধু কখনও ছিল না। যদি বন্ধুই হত তাহলে হয়ত এঁদেরকে এইভাবে দেশ ছাড়তেই হত না। আজ যে এত লোক সহায় সম্বলহীন হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে, সেও তো ওদেরই এক অপকীর্তির ফলশ্রুতি। আরো দুঃখজনক হল, ওদের সঙ্গে জুটেছে সুযোগসন্ধানী কিছু ওই দেশেরই মানুষ, যাদের নাম রাজাকার যা শেষ পর্যন্ত একটা ঘৃণাসূচক গালাগাল হয়েই থাকল ইতিহাসের পাতায়, আসল অর্থ যাইই হোক না কেন! লেনিন সরনির ওই বাড়িতে পরপর কয়েকদিন গিয়ে গানের মহড়ায় অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানাকারণে রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের শিল্পীদের ‘রূপান্তরের গান’ শীর্ষক গীতি আলেখ্যতে অংশ নিতে পারিনি। সেটা আমারই গাফিলতি। তাছাড়া আমার নিজের ভেতরেও নানা দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব ছিল। তখন আমাকে সবাই সদ্য পূর্ব বাংলা থেকে আসা শরণার্থী ভাবলেও আসলে আমি তো তখন ভারত রষ্ট্রের নাগরিক। ’৭০-এ এইদেশে এসেই রীতিমতো আবেদন করে আমাদের সবাই এই দেশের বৈধ নাগরিকতা পেয়েছি। তাই হয়ত ভেতরে ভেতরে এক ধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। তাই শত আকর্ষণ থাকা সত্বেও একসময় লেনিন সরনির ওই বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করলাম। আমার ভেতরকার অস্থিরতার অন্য আরেক রূপ এটা।

আমার তখন এক টালমাটাল অবস্থা। জীবিকার সন্ধানে এখানে ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছি। আর সুযোগ পেলেই যাই কফি হাউসে। সাহিত্যের পোকা যে তখন কিলবিল করছে মাথায়। একটা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে সেই পত্রিকার হয়ে জন-সংযোগের কাজ করতেও যেতে হত কফি হাউসে। নিত্য নতুন লোকের সঙ্গে দেখা হত। একসময় দেখলাম ওখানেও এক এক করে আসছেন পূর্ব বাংলার কবি সাহিত্যিকেরা। আলাপ হল মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী আর আল মাহমুদের সঙ্গে। আমার নিজের দেশ ওই বাংলায় বলে হয়ত একটু আলাদা গুরুত্ব পেতাম ওঁদের কাছে। তাছাড়া আমি তো খুব বেশিদিন আগে আসিনি ওই দেশ ছেড়ে! একদিন অনেকক্ষণ কথা হল আল মাহমুদের সঙ্গে। তাঁর সোনালি কাবিন পড়েছি অনেক আগেই। আলাপ হতে দেখলাম মানুষটা খুব সহজ সরল। কবিসুলভ কোনও ভান ভনিতা নেই, বরং তিনি যে স্বদেশ থেকে উৎখাত হয়ে ভিনদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন,এমন এক বিপন্নতা তাঁর সেদিনের কথায় বারবার উঠে আসছিল। একদিন স্কটিশচার্চ কলেজের অগিলভি হোস্টেলে গেলাম মহাদেব সাহার সঙ্গে দেখা করতে। ওঁকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। ’৬৮ সালে রাজশাহীতে এম এ পড়তে গিয়েছিলাম। ওই বছরেই তিনি ওখান থেকেই পাশ করেন। সেদিন ওঁর মুখে অধ্যাপক তরুণ সান্যালের খুব প্রশংসা শুনেছিলাম। আসলে তরুণবাবু ওই হোস্টেলের সুপার ছিলেন। তখন নকশাল আন্দোলনের অন্তিম পর্ব চলছে। যেসব ছাত্ররা হোস্টেলে থাকত, তারা তরুণবাবুর খুব বাধ্য ছিল। তারা ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক মানুষকে তাদের ঘরে থাকতে দিয়েছে, ভাগাভাগি করে খেয়েছে। তরুণবাবুর মতো অনেক মানুষ ওই সময়ে বহু মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন, খাইয়েছেন এমনকি অনেকে ছোটখাট জীবিকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। অনেকদিন পরে তরুণবাবুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হলে জানতে পারি ওই দুঃসময়কালে কীভাবে তিনি শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সাহায্য করেছেন। এমন মানুষেরা ছিলেন বলেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অতিদ্রুত সফল হয়েছিল। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নয় মাসের ত্যাগ ও তিতিক্ষার অবসান হয়েছিল। জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। কফি হাউসেই আলাপ হয়েছিল গোলাম সাবদার সিদ্দিকী বলে এক সাহিত্যরসিক তরুণের সঙ্গে। তার চোখে তখন পত্রিকা প্রকাশ করা আর লেখালিখি নিয়ে অনেক স্বপ্ন। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে একটা চিঠিই তার পেয়েছিলাম। তারপর সে কোথায় যে হারিয়ে গেল কে জানে! আলাপ হয়েছিল আরো অনেকের সঙ্গে। পরে অনেক খোঁজ করে অনেকের হদিস পাই নি।

তখনকার একটি জনপ্রিয় গান হল, ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’। গেয়েছিলেন শিল্পী অংশুমান রায়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এই গানটি সবার মুখে মুখে ফিরছিল। অনতিবিলম্বেই গানটা শিখে নিয়ে শেখাতে শুরু করি উল্টোডাঙ্গার ইউনাইটেড ক্লাবের ছেলেমেয়েদের। মামাবাড়ির হাউজিং চত্বরেই ওই ক্লাবটা ছিল। ওদের আমি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটাও শিখিয়েছিলাম। অংশুমান রায়ের গানটা ইংরেজিতে রেকর্ড করেন তখনকার বিখ্যাত গিটারবাদক সুজিত নাথের মেয়ে করবী নাথ। শুনেছি সেই গানটা বিদেশিদে্রা খুব পছন্দ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশিদের অবদানের কথা মনে থাকবে চিরকাল। মনে আছে আমাদের ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর সেদিনের সেই ওজস্বী ভাষণের কথা আজও কানে লেগে আছে। ভাষণও যে কত হৃদয়গ্রাহী হতে পারে, সেদিন বুঝেছিলাম। আজকের অশিক্ষিত বক্তাদের অশ্রাব্য বাগাড়ম্বর যখন শুনি তখনই বুঝতে পারি দুটি সময়ের তফাৎ কতটা!

যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ক্রমশই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যাচ্ছিল। শুনলাম যশোর রোড দিয়ে সারা রাত ধরে ভারি ভারি ট্যাঙ্ক যাচ্ছে বনগাঁ সীমান্তে। একদিন হাবড়ায় গিয়ে দেখলাম পিচ ঢালা রাস্তায় সেইসব ট্যাঙ্কের চাকার দাগ। বুঝলাম যুদ্ধে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে আমাদের দেশ। খবরের কাগজে তখন নিত্য ছাপা হচ্ছে যুদ্ধের খবর। আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হচ্ছে যুদ্ধের নানা খবর। পাল্লা দিয়ে চলছে আকাশবাণী কলকাতায় হচ্ছে নানারকম অনুষ্ঠান। তখন আমাদের চারপাশ ঘিরে কেবল বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ সেইসঙ্গে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। এই ধ্বনি যে কতটা জনপ্রিয় হয়েছিল তার একটা পাথুরে প্রমাণ হল, তখন শিবিরে শিবিরে এক ধরনের চোখের রোগ দেখা দিয়েছিল। শিবির থেকে সেটা ছড়িয়ে পড়েছিল বাইরেও। সেই রোগের নাম হয়ে যায় ‘জয় বাংলা’।

মনে আছে সেইসময় মৃণাল সেনের কলকাতা ’৭১ ছবিতে সুভাষ দত্তকে অভিনয় করতে দেখে কতটাই না পুলকিত হয়েছিলাম। আই এস জোহর করেছিলেন ‘জয় বাংলাদেশ’ নামে একটি হিন্দি ছবি। তাতে অভিনয় করেছিলেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী কবরী। ঋত্বিক ঘটক অভিনেতা বিশ্বজিতের প্রযোজনায় ‘দুর্বার গতি পদ্মা’ নামে একটি ডকু-ফিচার ছবি করেন। বিশ্বজিৎ সেই ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন। ছেড়ে আসা দেশ সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটকের আবেগ সুবিদিত। ছবিতে তারই এক ঝলক লক্ষ করেছিলাম। একদিন এসপ্লানেডে দেখলাম বাংলাদেশ থেকে আগত শিল্পী কবি সাহিত্যিকদের একটি মিছিল। অনেককেই চিনতে পারলাম। সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল সেদিনের গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, যার নেতৃত্বে ছিলেন অভিনেত্রী সুমিতা দেবী। তাঁর সেই চিৎকৃত ধ্বনির স্মৃতি আজও মন থেকে মোছেনি।
যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই যাচ্ছিল। বিশ্ববিবেকের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল এই যুদ্ধ। খুব তাড়াতাড়ি তাই এর সমাপ্তিও ঘটল। সবাইকে আনন্দে মাতোয়ারা করে এল ষোলই ডিসেম্বর। বাংলাদেশের বিজয় দিবস। আমরা সবাই অধীর আগ্রহে এই দিনটারই অপেক্ষাতেই ছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হল পাকিস্তান। তিনি ফিরে গেলেন ঢাকায়। চারদিকে সে কী উন্মাদনা! ১৯৭২ সালের প্রথম দিকেই ছুটে গেলাম নিজের ফেলে আসা দেশে। দু’চোখে তখন নানা স্বপ্ন। কিন্তু যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশটায় নানা অস্থিরতা। সেই অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা সত্যিই বুক বাজিয়ে বলার মতো। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের স্মৃতিময় সেই দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে অনেকানেক পাওয়া না পাওয়া, পেয়ে হারানোর বেদনা হৃদয় মথিত করে। সব কিছুর উর্ধ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানো। এই সেই দেশ যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা, যে দেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।