চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১২ ॥ সুশীল সাহা



বাংলা সিনেমায় আত্মপরিচয়ের সংকট


সব মানুষেরই একটা স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় আছে। কিন্তু তার স্বরূপ কি? এই সরল প্রশ্নের জবাব খুব সহজে দেওয়া সম্ভব না। একজন মানুষ তার সমাজে পরিচিত হন নির্দিষ্ট একটি নামে। তার স্বভাবজাত কিছু পরিচয়ের মূল্যায়ন করেন তার চারপাশের মানুষজন এবং তাতেই তার একটা পরিচিতি ঘটে তার সমাজে। কিন্তু সামান্য একটু অদল বদল ঘটলেই সেই পরিচয়ের একটা সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একজন মানুষ যদি কোনও ভাবে হারিয়ে ফেলেন তার মানসিক ভারসাম্য, কিংবা তার পরিচয়বাহী কিছু কাগজপত্র, তাহলেই ঘটে যেতে পারে এক সমূহ আত্মপরিচয়ের সংকট। বাংলা সিনেমায় তার ভুরি ভুরি উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মাত্র পাঁচটি বাংলা সিনেমার আলোকে এই সংকটের স্বরূপ সন্ধান করব এই নিবন্ধে।

এই ছবিগুলোর নাম অপরিচিত, ইচ্ছাপূরণ, ভ্রান্তিবিলাস, সন্ন্যাসী রাজা ও লালন। ছবিগুলোর পরিচালক যথাক্রমে সলিল দত্ত, মৃণাল সেন, মানু সেন, পীযূষ বসু ও তানভীর মোকাম্মেল। এই সিনেমাগুলির প্রথম তিনটি তৈরি হয়েছে প্রখ্যাত কয়েকজন সাহিত্যিকের আখ্যানের ভিত্তিতে। অপরিচিত’র লেখক সমরেশ বসু। তবে এই আখ্যানে দস্তয়ভস্কির বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি ইডিয়ট’-এর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। যদিও লেখক সে কথা কোথাও কোনওভাবে স্বীকার করেন নি। ইচ্ছাপূরণ গল্পটির লেখক রবীন্দ্রনাথ। অত্যন্ত হাল্কা মেজাজে একটি গভীর সংকটের স্বরূপ সন্ধান করেছেন তিনি। ভ্রান্তিবিলাস ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটি চমৎকার অনুবাদকর্ম । আদতে এই লেখা শেক্সপিয়রের ‘কমেডি অফ এরর্স’ অনুপ্রাণিত । সেই দিক থেকে বলা যায় এই তিনটি বিশ্বমানের লেখার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবিগুলো। বাকি দুটি ছবির মধ্যে সন্ন্যাসী রাজার লেখক ছবির প্রযোজক অসীম সরকার নিজেই। আসলে আখ্যানটি রচিত চল্লিশ দশকের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে, যদিও এর কাহিনির আদল রচিত হয়েছে মুখে মুখে। এই ধরনের মুখরোচক আখ্যান যা এক বহূ আলোচিত মামলার ঘটনাবিন্যাসের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে তা তো মানুষের মুখে একটু মশলাদার হয়ে উঠবেই। আর লালনের গল্পও কিছুটা মুখে মুখে ছড়ানো, অনেকটা ‘ওরাল হিস্ট্রি’র আদলে এর কাহিনি। গবেষকদের মধ্যেও এ নিয়ে নানারকম মতবিভেদ আছে। তবুও লালন বাঙালি মন ও মননে এক পরম শ্রদ্ধাবোধে আকীর্ণ হয়ে আছেন। এই ছবিগুলো নিয়েই আমার এই নিবিড় অবলোকন।

‘অপরিচিত’ ছবিটি শুরুই হয়েছে উচ্চবিত্ত সমাজের ঝাঁ চক চকে বাড়ি গাড়ি ক্লাব স্যুটেড বুটেড মানুষজনদের নিয়ে। একজন মক্ষিরাণি অবশ্যই আছে। অপর্ণা সেন সেই ভূমিকায়, যাঁর পোশাকি নাম সুমিতা। সে বড় স্বাধীনা হলেও কোথায় যেন তাঁর গাঁটছড়া বাঁধা। তাই তাঁকে নিয়ে প্রায় স্বয়ংবরা সভা হয় যেন। সে যেন একটা বিক্রির সামগ্রী। এরমধ্যে কোথা থেকে রঞ্জন (উত্তমকুমার) এসে হাজির। সে তাঁর টাকার জোরে অধিকার করে নিতে চায় সুমিতাকে। কিন্তু সুমিতার মন উদাস হয় আরেকজনের জন্যে। সে হল সুজিত (সৌমিত্র)। এই নিয়েই টানাপোড়েন। সংসার উদাসীন সুজিত বোঝে না আধুনিক সমাজের কূটকৌশল। তাঁর সারল্যে মুগ্ধ সুমিতা। কিন্তু তাঁকে যে প্রায় জোর করেই অধিকার করতে চায় রঞ্জন। তাঁর ভালবাসা অন্ধ। তাই সে সুমিতার ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই তাঁকে বিয়ে করে। কিন্তু সুমিতা এই বন্ধন মানে না। সে ছূটে যায় সুজিতের কাছে একটুখানি আশ্রয় পাবার আশায়। ফলে রঞ্জনের লেলিহান ঈর্ষার রোষে পড়ে সুমিতা। তাঁকে অন্যের হাতে দেবার আগে নিজের হাতে খুন করে রঞ্জন। সবকিছু দেখে প্রায় সুস্থ হয়ে ওঠা সুজিত আবার হারিয়ে ফেলে মানসিক ভারসাম্য। সে ফিরে যায় চিকিৎসালয়ে। এই আধুনিক নগরজীবন তাঁর জন্যে নয়। এই আলো এই অন্ধকার এইসব মানসিক দৈন্যের উর্ধ্বে তাঁর মন। এই সমাজে তাই সে একান্তই বেমানান।

এই কাহিনি কাঠামোয় সুজিতের আত্মপরিচয়ের সংকট এতটাই প্রকট যে রঞ্জনের অতীত ভুলতে না পারা মনের জ্বালা যন্ত্রণা যে আধুনিক নগর জীবনের এক অবিসম্বাদিত পরিণতি সে কথা স্পষ্ট করেই বলেছেন পরিচালক। বস্তুত পরিচালকের হয়ে লেখক সমরেশ বসু এবং আরেকটু বিস্তৃত করে বললে বলতে হয় দস্তয়ভস্কি। আধুনিক ভোগবাদি সমাজের এই ক্লিন্ন চেহারার উন্মোচনই এই ছবির মুখ্য উদ্দেশ্য এবং তাতে পরিচালক সফল।

ইচ্ছাপূরণ অন্য এক সংকটের আবর্তে রচিত। ১৩০২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ এই শিশুতোষ গল্পটি লিখেছিলেন। গল্পটি নিছক শিশুতোষ কিনা, এ নিয়ে স্বয়ং লেখকও কোনও ধন্ধ রাখেন নি এতে। এই গল্প নিয়েই এই ছবি নির্মিত হয়েছে ‘শিশু চলচ্চিত্র সংসদে’র ব্যানারে। তাই আমরা ধরেই নিই মৃণাল সেন অত্যন্ত সচেতনভাবেই শিশুদের জন্যে একটি ছবি তৈরিতে ব্রতী হয়েই রবীন্দ্রনাথের এই গল্পকে বেছে নিয়েছেন। গল্পটি আদ্যন্ত মজার। রবীন্দ্রনাথ এই গল্পটা শুরুই করেছেন বেশ একটা কৌতুকের আবহে – ‘সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। কিন্তু সকল সময়ে নামের মতো মানুষটি হয় না। সেইজন্যই সুবলচন্দ্র কিছু দুর্বল ছিলেন এবং সুশীলচন্দ্র বড়ো শান্ত ছিলেন না।’ বস্তুত মৃণাল সেন আদ্যন্ত রবীন্দ্রনাথকেই অনুসরণ করেছেন অর্থাৎ ছবিটিকে শিশুদের উপযোগী করে তুলতে সচেতনভাবেই সক্রিয় ছিলেন। পিতাপুত্রের এই আপাত বিড়ম্বনা এবং তা থেকে মুক্তির জন্যে তাদের আকুল প্রার্থনা ইচ্ছাপূরণের দেবী ইচ্ছাঠাকুরণের কাছে। তারপরই শুরু হল আসল সংকট। দুজনার গলার স্বর পালটে দিয়ে পরিচালক বুঝিয়ে দিলেন আসলে যিনি পিতা তিনি এখন পুত্র এবং পুত্র যথারীতি পিতা বনে গিয়েছেন। শুরু হয়েছে নানা বিপত্তি। এই বিপত্তিতে যখন দুজনেই ক্লান্ত, তখনই কাহিনির পালাবদল, পুনর্বার তাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবার ইচ্ছাকে পূর্ণ করলেন ইচ্ছাঠাকুরণ। দুজনেই ততক্ষণে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নাজেহাল হয়েছে। দুজনেই তখন তাদের পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার জন্যে আকুল হয়ে উঠেছে।
ছবির আগাগোড়া জুড়ে অসাধারণ এক টানাপোড়েনের আবহে পিতাপুত্র দু’জনেরই আত্মোপলব্ধির পরিণতি দেখানোই ছিল পরিচালকের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে তিনি সফলও হয়েছেন। দুই বয়সের দু’জনার ইচ্ছাপূরণের পরে যে পদে পদে বিড়ম্বনা তাইই পিতাপুত্রের আত্মপরিচয়ের সমুহ সংকটকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে এবং তা থেকে রেহাই পাবার জন্যে উভয়ের ব্যকুলতা ও শেষে দু’জনকে আগের জায়গায় নিয়ে আসার মধ্যেই গল্প এবং ছবিটির প্রকৃত মন্ত্রগুপ্তি।

ভ্রান্তিবিলাস আদ্যন্ত একটি কমেডি ছবি। শেক্সপিয়রের এই নাটকটিকে আপন দক্ষতায় বিদ্যাসাগর বঙ্গীকরণ করেছিলেন এবং সেটিকে চলচ্চিত্রের উপযোগী করে চিত্রনাট্য করে দিয়েছিলেন স্বনামখ্যাত নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্য। মানু সেনের পরিচালনায় উত্তমকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় আর সন্ধ্যা রায়ের অভিনয়ের উৎকর্ষে ছবিটি একটি চমৎকার হাস্যরসাত্মক কমেডি হয়ে ওঠে। একই চেহারার দু’জোড়া মানুষ, মনিব আর ভৃত্য – তাদের নিয়েই গল্প। ঘটনাক্রমে একজন মনিব আর একজন ভৃত্য একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ছোটবেলাতেই। তারপর বড় হয়ে নানা ঘটনাবিন্যাসে ওরা এসে পড়ে খুব কাছাকাছি একই জায়গায়। তারপরই শুরু হয় যত বিপত্তি। যথারীতি একই রকম চেহারা হবার কারণে নানারকম ঘটনা ও দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় চারজনকেই। নানা মানুষের নানা প্রশ্ন ও বিস্ময়ের ঘনঘটা শুরু হয়ে যায়। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে এসে পড়ার মত এইসব ঘটনা বিন্যাস। এবং অবশেষে নির্মল হাস্যরসের মধ্য দিয়ে মিলনাত্মক সমাপ্তি ঘটে গল্পের। কিন্তু ঘটনার ঘনঘটায় যে বিপত্তিগুলো ঘটে তা কিন্তু ওইসব মানুষের আত্মপরিচয়ের এক মহাসংকট তৈরি করে। দশচক্রে ভগবানকে ভূত বানাবার মতোই এই সংকট।

সত্তর দশকের একটি জনপ্রিয় ছবি ‘সন্ন্যাসী রাজা’। উত্তমকুমার সুপ্রিয়া দেবী অভিনীত পীযূষ বসুর এই ছবিটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল বলে সবাই জানে। চল্লিশ দশকের ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার এটি একটি অন্যতম ফসল। তবে এই একই আখ্যান অবলম্বনে বাংলাদেশেও একাধিক সিনেমা তৈরি হয়েছে। এমনকি কলকাতাতেও অতি সম্প্রতি টিভি সিরিয়াল তৈরি হয়েছে। এছাড়া একই ঘটনা অবলম্বনে প্রচুর বই প্রকাশিত হয়েছে। মুশকিল হচ্ছে যতই এই বিষয় নিয়ে চর্চা হয়েছে ততই কাহিনিবিন্যাসে লেগেছে কল্পনার রঙ। যতদূর জানা যায়, মামলাটির তেমন কোনও নিষ্পত্তি হয় নি। তখনকার মিডিয়া আজকের মত এত শক্তিধর ছিল না। তাই সর্বশেষ পরিণতি কী ঘটেছিল তা নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা আছে। আখ্যান লিখতে গিয়ে তাই রচয়িতারা ইচ্ছেমত স্বাধীনতা নিয়েছেন। তাই তো সব আখ্যানের মূল সুর এক থাকলেও এর বিন্যাসে ঘটেছে নানারকম কল্পনা। ভাওয়াল রাজার আকস্মিক মৃত্যু এবং শ্মশান থেকে তার দেহ উধাও এবং দীর্ঘকাল পরে সন্ন্যাসীর বেশে তাঁর ফিরে আসা নিয়েই কাহিনির ঘূর্ণাবর্ত। যে মানুষটি একদিন এই রাজ্যের রাজা ছিলেন সেই তাঁকেই নানা উপাত্ত দিয়ে নিজের আত্মপরিচয়ের প্রমাণ দিতে হয়েছিল। সেই প্রমাণ ক্রমশ এতই অকাট্য ছিল যে, সবাই ধরেই নিয়েছিলেন এই সন্ন্যাসীই হলেন আসল রাজা। কিন্তু এখানে খলনায়ক হিসেবে ডাক্তার এবং তার সহযোগী হিসেবে রাণীকে দোষী বানাতে এতই কোণঠাসা করা হয়েছিল যে প্রচলিত কাহিনিতেও অনেক জট জড়িয়েছিল। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে রাজার যে আত্মপরিচয়ের সংকট, সেটি প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। এই সিনেমার কাঠামোতে নানা রহস্যের মোড়ক দেয়া হলেও সন্ন্যাসী হিসেবে রাজার আত্মপ্রকাশ বহু বিতর্কের উর্ধ্বে একটি নিটোল কাহিনির জন্ম দিয়েছে, যা এ যুগের মানুষকেও সমানভাবে আকর্ষণ করে। লোভ লালসা পরকীয়া ইত্যাদি মিলিয়ে বেশ জমজমাট একটা গল্পের ব্যাপার যে আছে।

লালন নিয়ে আমাদের কৌতুহলের শেষ নেই। তাঁকে ঘিরে নানা কাহিনি উপ-কাহিনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উনবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি নানা কারণেই আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর মানবধর্মের যে সরল ব্যাখ্যা এবং সকলের সঙ্গে মিলনের যে আহবান, তা আমজনতাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। তাঁর গান রবীন্দ্রনাথকেও তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাই প্রায় দুশো বছর আগে জন্মেও লালন এখনও প্রাসঙ্গিক। তাঁর জন্ম এবং রোগগ্রস্ত হয়ে এক মুসলমান দম্পতির সেবায় নিরাময়ের যে ঘটনা তাইই তাঁকে মানবধর্মে উদ্দীপ্ত করে। অনেক বছর বাদে তাঁর নিজের গ্রামে ফিরে আসা এবং সংসার বিবাগী এক সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নেওয়ার মধ্যে আত্মপরিচয়ের নানা ঘাত সংঘাতের ঘটনা জড়িয়ে আছে। এই লালন আর আগের লালনের মধ্যে তাই অনেক ফারাক। এমনকি তাঁর স্ত্রীও তাঁকে সংসারে ফিরিয়ে আনতে অক্ষম হন। তাই লালন যেন সবকিছু ছাড়িয়ে এক মহৎ দৃষ্টান্ত হয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে। তিনি সামান্য মানুষ হয়েও সকলের প্রণম্য। তাঁর গানের বাণী আমাদের অন্তর স্পর্শ করে। মানুষে মানুষে এই যে ভেদাভেদ , হিংসা– তার মধ্যে লালনের এই মিলনের গান অন্য এক বার্তা বহন করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লালনের গানের বাণী ও সুরারোপে মুগ্ধ হয়ে যান। তাঁর সৃষ্ট গানে তাই তাই লালনের প্রভাব পড়েছে সরাসরি। এমনকি লালনের গানের সুরের হুবহু অনুসরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই লালনের আত্মপরিয়ের সংকট আমাদের ব্যথিত করে। কিন্তু সংসার বিবাগী লালন এই সবে একান্তই উদাসীন। কেননা তিনি জানেন, মানুষ যেদিন সত্যি সত্যি মানবধর্মে দীক্ষিত হবে সেদিনই তার নবজন্ম হবে। তাই অতীতের লালন আর পরবর্তীকালের লালনের মধ্যে যে ফারাক তা যতই অন্যরকম হোক না কেন, এই লালনই আমাদের পরম আদরনীয়। তাই তো তাঁর গান এখনও আমাদের মুখে মুখে। তাঁর এই অবদান তাই চিরস্মরণীয়।

মানুষের যে সামাজিক পরিচয় তার আসল ভিত্তি কি? তা তো গড়ে উঠেছে চারপাশের মানুষের এক সরল স্বীকৃতিতে। তার পরিচিতি ঘটে কতকগুলো পরিচয়পত্র ইত্যাদি দিয়ে। কোনওভাবে যদি মানুষটি হঠাৎ অন্য কোনও অচেনা জায়গায় চলে যান, যদি হারিয়ে যায় তার পরিচয়বাহী কাগজপত্র, তবে তাকে প্রকৃতভাবে শনাক্ত করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কেননা আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রিয় কাঠামোর বিশ্বাস প্রমাণপত্রে, তার আস্থা উপযুক্ত নথিপত্রে। তাই কোনওভাবে তা হারিয়ে গেলে সেই মানুষের নিজেকে সমাজে পুনপ্রতিষ্ঠিত করতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়। আমাদের চারপাশের সমাজ আমাদেরই তৈরি। সেই সমাজ কিছু মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। সেই মানুষই মানুষকে চিহ্নিত করে ক খ গ ঘ ইত্যাদি নামে। এই পরিচয় যে কোনও সময় উলটে যেতে পারে, এবং একবার উলটে গেলে তাকে পালটানো খুব সহজ কাজ নয়।