চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১৩ ॥ সুশীল সাহা



বলির পাঁঠা


সরকারি চাকরির অজস্র সুখ সুবিধার মধ্যে একটি বড় অস্বস্তির ব্যাপার হল ‘ইলেকশন ডিউটি’। নারী পুরুষ বয়ষ্ক অসুস্থ ইচ্ছুক অনিচ্ছুক নির্বিশেষে এই দায়িত্বপালন করতেই হয়। দু’একটি ক্ষেত্রে কারো কারো ছাড় মেলে কখনও কখনও। আর কী এক মন্ত্রবলে ছাড় পেয়ে যান অফিসের কর্তাভজা কেউ কেউ। আমি অবশ্য একবার সহকর্মী এক সদাশয় ওএম অর্থাৎ অফিস ম্যানেজারের সৌজন্যে ছাড় পেয়েছিলাম। তখন আমার কর্মক্ষেত্র কৃষ্ণনগর। ধর্মেকর্মে মন না থাকলেও সেবার মাকে নিয়ে এক তীর্থে যাব বলে অনেক আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছিলাম। ওএম সাহেব আমার গুণগ্রাহী ছিলেন। তিনিই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তাই ফিরে এসে সেবার ইলেকশন ডিউটির ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা সহকর্মীদের মুখে পরে যখন শুনলাম, তখন নিজের সৌভাগ্যে বড়ই প্রীত হয়েছিলাম। কিন্তু সে তো ওই একবারই। কিন্তু আমার সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের কর্মজীবনে তিন তিনবার ওই দুরূহ দায়িত্বপালন করতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেই তিনবারের মধ্যে শুধুমাত্র একবারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করব এখানে। সেটাই ছিল আমার প্রথমবার। কমবেশি সবাইই হয়ত আমার মতোই ভুক্তভোগী, তবু আমার সেই প্রায় ভুলে যাওয়া ভয়াবহ একটি দিনের কথা এখানে বিবৃত করতে চাই।

সবাই জানেন, ভোটের আগে ট্রেনিং হয় সব ভোটকর্মীদের। বিপুল সমাবেশে ওজস্বী গলায় ট্রেনাররা নানারকম কথা বলে যান মঞ্চে উঠে। মাইক বাহিত সেইসব কথা সকলের কানে ঢুকলেও অন্তরে কতটা ঢোকে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাছাড়া গোড়া থেকেই অনিচ্ছুক মন নিয়ে এইসব ‘বটিকা’ গেলা আর যাই হোক সহজপাচ্য নয় মোটেই। যা হোক, অফিসের কাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ট্রেনিং পর্ব শেষ করে নির্দিষ্ট দিনে আমি রওনা হলাম সোনারপুর অভিমুখে। নাটকপাগল বন্ধু সংগ্রামজিৎ সেনগুপ্ত ওখানেই থাকেন। ওঁকে আগে থেকে জানালাম। ও আমাকে বুথের লোকেশনটা জানাতে বলল। সেটা তো জানতাম না। ওখানে পৌঁছেই জানা গেল আমার জন্যে নির্ধারিত বুথের লোকেশন। নিজের লটবহরের সঙ্গে ভোটের জন্যে দেওয়া সব কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে চললাম ওই অখ্যাত গ্রামের উদ্দেশ্যে। আমার সঙ্গে আরো অনেকজন, যে যার উদ্দিষ্ট জায়গায় যাচ্ছেন। অনেকেরই এতটাই মন খারাপ যেন তিনি দ্বীপান্তরে যাচ্ছেন। বেশিরভাগ ভোটকর্মীর মুখ ব্যাজার দেখে আমি খানিকটা স্বস্তিবোধ করলাম। যাক, তাহলে একটা নতুন কিছু অপেক্ষা করে আছে আমার জন্যে তাহলে! অবশ্য ঠিক তখনও জানতাম না, আমার জন্যে কী কী অপেক্ষা করে আছে। সংগ্রামকে যা জানাবার জানালাম। ও আমাকে আশ্বস্ত করল। ঠিক সময় ও এসে পড়বে জানাল। মনে রাখা দরকার সেটা ছিল ‘বাম আমল’।

অবশেষে পৌঁছালাম সেই সুদূর মফস্বলের এক অখ্যাত গ্রামে। আমাদের বুথটা একটা ছোট্ট প্রাইমারি স্কুলে। ওখানে পৌঁছে দেখি আমার সহকর্মী তিনজন আগেই ওখানে পৌঁছে গেছেন। আমি প্রিসাইডিং অফিসার। অতএব আমার যেন কন্যাদায়! ওদের মধ্যে কোনওরকম উদবেগের লেশমাত্র দেখলাম না। যা হোক তিনজনকে একত্র করে পরের দিনের মহাযুদ্ধের ব্যাপারে একটু আলোচনা করলাম। দেখলাম দু’জন নবাগত হলেও একজন বেশ অভিজ্ঞ। আগে তিন তিনটে নির্বাচনে ভোটের কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি আমাকে অভয়মূদ্রা দেখিয়ে আশ্বস্ত করলেন। স্কুলের তিনটে ঘরের একটাকে বুথ হিসেবে তৈরি করা হল। অন্য দুটো ঘরে আমরা চারজন রাতে থাকব। রাতের খাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে, এইসব নিয়ে যখন ভাবছি এমন সময় কয়েকজন দাদাগোছের যুবক এল। তাদের কারো রঙ লাল, কারো বা নীল, না তখনও গেরুয়া রঙ-এর উপদ্রব শুরু হয়নি। ওরা সবাই আমাদের খাওয়ার দায়িত্ব নিতে চায়। এমন সময় আমার সেই অভিজ্ঞ মানুষটির সৌজন্যে আশেপাশের কয়েকজন এলেন। উপযাজক হয়ে তাঁরা আমাদের রাত ও পরদিনের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে চান। আমি তাঁদের কিছু টাকা দিতে চাইলাম। তাঁরা তো কিছুতেই নেবে না। প্রায় জোর করেই কিছু টাকা দিলাম। এ ব্যাপারে আমার সহকর্মীরা মুখে কুলুপ এঁটে রইলেন। বুঝলাম আমার পকেট থেকেই সব দিতে হবে। আর যাই হোক, বুথের সব দায়িত্ব তো আমার। আর কিছু না ভেবে বুথের সব কাজগুলো শেষ করতে মনোযোগ দিলাম। সবকিছু গোছাতে গোছাতে বেশ রাত হয়ে গেল। ইতঃমধ্যে রাতের খাবার এসে গেছে। খানকয়েক রুটি আর ডাল তরকারি। সবাই মিলে তার সদব্যবহার করে রাতের শোবার আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। টের পেলাম জায়গাটায় প্রচুর মশা। মশারি এনেছিলাম বটে, কিন্তু তাতে তেমন কাজ হবে বলে মনে হল না। কেননা দুটো বেঞ্চের মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁক রয়েছে। যা হোক আলো নিভিয়ে শুতে গেলাম। আমার অন্য সহকর্মী আলো নেভাতে দেবেন না কিছুতেই। রাতের দিকে নাকি সাপ-খোপের আগমন হতে পারে, এই তার আশঙ্কা। কী আর করা। আলো নেভানো গেল না। ঘুমের বারোটা বাজল। বুঝলাম কপালে আরো অনেক দুঃখ লেখা আছে। সেই রাতটা যে কী করে কেটেছিল তা আমিই জানি। তীব্র আলোর সঙ্গে মশা, সেইসঙ্গে একটু দূরে শোয়া ভদ্রলোকের তীব্র নাসিকা গর্জনে এক অন্যরকম আবহাওয়া তৈরি হল। এপাশ ওপাশ করে আমি কোনওরকমে রাতটা কাটিয়ে দিলাম। সেই রাতে আশপাশের গ্রাম থেকে ভেসে আসা প্রচুর শেয়ালের ডাকও শুনেছিলাম। একবার বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ কাটিয়ে এলাম। মশার উপদ্রবে আমার ঘরে ফিরে আসতে হল।

ভোরবেলাতেই প্রাতকৃত্য ইত্যাদি সেরে এসে দেখি আমার সহকর্মীদের তখনও ঘুম ভাঙ্গেনি। ওদের ডেকে তুললাম। স্নান খাওয়া সারতে সারতেই দেখি বুথের সামনে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। দ্রুত আমরা ভোটপর্ব শুরু করলাম। হাজার খানেক ভোটদাতা। সবাই ঠিকমতো এলে সবকিছু ঠিকমতোই হয়ে যাবে। কিন্তু প্রথম দু’তিন ঘন্টা বেশ চাপের মধ্যেই কাটল। অবশ্য এজন্যে আমার অনভিজ্ঞতাই দায়ী অনেকটা। বেলা বাড়তে ভিড় একটু কমে এল। গরমের দিন, তাই একটু ক্লান্তই লাগছিল। দুপুরের খাবার এসে গেছে ইতঃমধ্যে। দু’জন একসঙ্গে খেয়ে এলে আমি আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে খেতে গেলাম। খাওয়া শেষ হবার আগেই একটা গোলমালের আভাস পেলাম। এসে দেখি একজন জাল ভোটারকে আবিষ্কার করেছে ওখানকার একজন পোলিং এজেন্ট। তাই নিয়ে এই অশান্তি। যা হোক অনেক কথা খরচ করে কোনওরকমে ব্যাপারটা সামাল দিলাম। নিয়মমতো ছেলেটিকে পুলিশের হাতে তুলে দেবার কথা। তার আগেই দেখি লম্বা ছুট লাগিয়েছে ও। এক দৌড়ে সে চলে গেল নাগালের বাইরে। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম হতভম্ব হয়ে। কী আর করা যাবে। খাওয়া মাথায় উঠল। কোনওরকমে জনতার ভিড়কে সামাল দিয়ে আবার ভোটপর্ব শুরু করলাম। দুপুরের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ভোট হয়ে গেল। বেলা তিনটের পরে আবার দেখি আবার লম্বা লাইন পড়েছে। শুরু হল আমাদের ব্যস্ততা। বেলা বাড়তেই ভিড় আরো বাড়ল। ইতমধ্যে প্রায় আশি শতাংশ ভোটদান হয়ে গেছে। আমরা স্বস্তিবোধ করছি যখন তখন আবার ভিড়, আবার ভোটপর্ব। এরমধ্যেই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রাম এসে ঘুরে গেল। সে আমার জন্যে একটা শুকনো খাবারের প্যাকেট দিয়ে গেল। সংগ্রামের সেই হাসি হাসি মুখটা আজও মনে পড়ে। ওই বন্ধুবিহীন বিজন প্রান্তরে ও যেন আমার জন্যে নিয়ে এসেছিল এক অভয়বার্তা। সদ্য প্রয়াত এই মানুষটাকে আমি কোনওদিনও ভুলব না। এইসব করতে করতে ভোটপর্ব বন্ধ করার সময় ঘনিয়ে এল। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাবার পরেও মিনিট দশেক খোলা রেখে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের দরজা বন্ধ করে দিয়ে সবকিছু গোটাতে যখন মন দিয়েছি, এমন সময় দরজায় জোরে জোরে করাঘাত শুরু হল। বুঝলাম, এক উন্মত্ত জনতা কয়েকজন ভোটারকে নিয়ে এসেছে। দরজা খোলার উদ্যোগ নেবার আগেই বাইরের ঠেলাঠেলিতে ওটা খুলে গেল। আরেকটু হলেই ওটা ছিটকে এসে আমার আমার মাথায় লাগত। যা হোক, কিছু বলার আগেই জনতার রোষের মুখে পড়তে হল। তিনজন ভোটার কলকাতা থেকে সদ্য ফিরেছেন। হাসপাতালে গিয়েছিলেন। অতএব ওদের ভোট দেবার ব্যবস্থা করতেই হবে। আমার সহকর্মীরা অনিচ্ছুক। ওদের বিরুদ্ধে গিয়েই আমি তিনজন ভোটারকে স্বাগতম জানালাম। উন্মত্ত জনতা শান্ত হল। শেষ হল আমার জীবনের প্রথম ভোটগ্রহণ পর্ব। বাকি কাজটা সারবার জন্যে মন দিলাম। নির্বিঘ্ন সারাটা দিন কাটাবার পরে ওইটুকু অশান্তির ঘটনাটা মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।

এবার অপেক্ষা সবকিছু ঠিকমতো জমা দিয়ে গৃহাভিমুখে রওনা হওয়া। গাড়ি এল অনেক দেরিতে। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম সহকর্মীরা কখন যেন যে যার মতো কেটে পড়েছে। কী আর করব। যথাস্থানে পৌঁছে লাইন দিয়ে সবকিছু জমা দিয়ে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে রওনা হলাম সোনারপুর স্টেশনের দিকে। তখনও বুঝতে পারছি না শিয়ালদা এসে হৃদয়পুর ফেরার শেষ ট্রেনটাও পাব কিনা। এমন সময় দেখি একটা ট্রেন এসে দাঁড়াল স্টেশনে। তাতে উঠে শিয়ালদা পৌঁছে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ধরলাম শেষ ট্রেনটা। তখন মধ্যরাত। হৃদয়পুরে যখন ট্রেনটা ঢুকল, তখন যেন প্রাণে জল এল। রাস্তার কুকুরের উপদ্রব ইত্যদি কাটিয়ে বাড়িতে যখন ঢুকলাম রাত একটা। তারপর বাথরুমে ঢুকে ঠাণ্ডা জল গায়ে ঢালতে ঢালতে মনে হল যেন ‘পেরিয়ে এলাম অন্তবিহীন পথ’।

এতকিছুর মধ্যে সংগ্রামের সেই হাসি হাসি মুখে বুথে আসার মুহূর্তগুলো মনের মধ্যে উঁকি দিতে থাকল। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, তা আর আজ মনে নেই।