চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১৪ ॥ সুশীল সাহা



‘…কত কী রয়েছে লেখা কাজলে কাজলে’


আবৃত্তির জগতে কাজল সুর একটি সুপরিচিত নাম। তবে শুধু আবৃত্তিই নয়, ওঁর দক্ষতা অভিনয়ে, গান ও লেখালিখিতেও। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে বিনোদনের জগতে তাঁর এই পদচারণা সত্যিই মনে রাখার মতো। ছোটখাট চেহারার মানুষটা যখন স্পিকারের সামনে এসে দাঁড়ান, মন্ত্রমুগ্ধের এক আবহাওয়া চারপাশে তৈরি হয়ে যায়। গানে গল্পে কবিতার অমোঘ উচ্চারণে তাঁর কণ্ঠস্বর মন্দ্রিত হয়ে ওঠে, উপস্থিত শোতৃবর্গের হৃদয়ে প্রাণস্পন্দন জাগাতে জাগাতে তিনি সবাইকে নিয়ে যান এক অলৌকিক জগতে। সেই কাজল সুরের আত্ম-স্মৃতিমূলক একটি গ্রন্থ ‘কাজল কথা’ হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে এক অপরিমেয় কৌতূহল নিয়ে তার প্রতিটি পৃষ্ঠায় চোখ বোলাতে থাকি।

আটত্রিশটা ছোট ছোট লেখায় বিন্যস্ত এই গ্রন্থের প্রথম ও শেষ লেখাদুটো আমাদের নিয়ে যায় এক অনন্য অনুভূতির ভুবনে। প্রথমটি কিংবদন্তী শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর শেষ লেখাটি অপর এক কিন্নরকণ্ঠ প্রদীপ ঘোষকে নিয়ে। অতি সাম্প্রতিককালে বাংলা ও বাঙালিকে নিঃস্ব করে এই দু’জন মহান শিল্পী প্রয়াত হয়েছেন। লেখক তাঁর সংবেদনশীল কলম দিয়ে রচনা করেছেন এক অসামান্য প্রয়াণলেখ। এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় একজন দুর্গম যাত্রাপথের অনন্য অভিযাত্রীর মন ও মানসিকতা। কেমন করে এবং কীভাবে সম্মান জানাতে হয় অগ্রপথিকদের, তা আমাদেরে সামনে দিনের আলোর মতো প্রতিভাত হয়ে যায়। তাঁর এই বিনম্র নিবেদনের গভীরতার লুকোনো আছে শিল্পের জগতে পদচারণার নানা ইতিহাস। অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আমি নাতিকৃশ এই গ্রন্থটির পাতা ওল্টাতে থাকি। লেখাগুলোর ছত্রে ছত্রে ছড়ানো আনন্দ বেদনা কৌতুক আর আত্মোপলব্ধির নানা অভিজ্ঞতা। অত্যন্ত আগ্রহভরে বইটির ছোট ছোট লেখাগুলোর মধ্যে ডুবে যেতে যেতে পেয়ে যাই নানান রসে সিক্ত ভাল লাগা আর ভালবাসার টুকরো টুকরো ছবি।

লেখক কাজল সুর জীবনরসিক মানুষ। ভালমন্দ যাই ঘটুক না কেন, তাকে সমানভাবে গ্রহণ করতে পারেন তিনি। শিলিগুড়ির সুবীর ভট্টাচার্য, লেখকের ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু, অতিমারীর সময়ে অনলাইনে এক ভার্চুয়াল আয়োজন করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছেন। তাঁর সেই আয়োজনে উঠে এসেছে আবৃত্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আর সমূহ লোকসানের নানাদিক। সেই আয়োজনের বক্তারা যে যাঁর বিষয়ে নানারকম যুক্তি দিয়ে এর পক্ষে বিপক্ষে নানাকথা বলেছেন। তবে বাস্তবের মাটিতে পা রেখে লেখক নিজে তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া নানারকম প্রতারণার কথা একটু অন্যরকম কিছু অভিজ্ঞতার কথা। তিনি খুব জোরের সঙ্গেই বলেছেন, সাফল্য এক মায়াময় স্বপ্নের মতো। দু’চারজনের সাফল্য তো দু’চারজনই পায়। বাকিরা চোখে মায়াঞ্জন লাগিয়ে নানারকম স্বপ্ন দেখলে স্বপ্ন তো স্বপ্নই থেকে যায়। বাস্তব বড় কঠিন। সেই কঠিন বাস্তবের মাটিতে পা রেখে লেখক বিবৃত করেন তাঁর নানান অভিজ্ঞতা। তিন/চারশো টাকা খরচ করে অনুষ্ঠান করে বাড়ি এসে পাওয়া খাম খুলে দেখেন প্রাপ্তি হয়েছে মাত্র একশো টাকা। এই অভাবিত ঘটনাকেও পরম কৌতুকের মোড়কে লিখতে জানেন তিনি। জীবনের ধন যে কিছুই উপেক্ষনীয় নয়। অগ্রিম না নিয়ে কত অনুষ্ঠান করে বাড়ি ফিরেছেন খালি হাতে। ব্যাংকে টাকা ট্রান্সফার করে দেবার অঙ্গীকার অনেকেই যে রাখে না শেষ পর্যন্ত, সে কথাও তিনি জানান। তাই তো আবৃত্তির আপাত মোহময় টানে যারা আসেন তাদের জন্যে সতর্কবার্তা দিয়ে দেন কথাচ্ছলে। এই শিল্পে আনন্দ আছে, অর্থ নেই। তাই যারা লোভের বশবর্তী হয়ে এই জগতে আসেন তাদের জন্যে অত্যন্ত সংযত ভাষায় লেখক দিয়ে দেন সাবধানতার অমোঘ বাণী, ‘হতাশার কথা নয়, অভিভাবক হিসেবে আগাম সতর্কবাণী’। শিল্পের কোনও জগতটাই যে কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বিশেষ করে আবৃত্তি, যার সম্বল কেবল গলাই। অথচ অনেক মানুষ অন্য কোনও কিছুতে ঠাঁই না পেয়ে আবৃত্তির জগতে আসে প্রতিষ্ঠা পাবার আশায়। সেটা যে এক ধরনের মরীচিকা সন্দর্শন সেটাও এই লেখাতেই বলেছেন তিনি। সংসার জীবনে ক্লান্ত বিষণ্ণ একদল মধ্যবয়ষ্ক মহিলা সাধারণত এই শিল্পে আসেন। কাজলবাবু কি তাদের উদ্দেশ্যেই কথাগুলো বলেছেন। জানি না।
রবীন্দ্রনাথের একটি সুন্দর বাক্য উপহার দিয়ে লেখক পরের লেখাটি শুরু করেছেন, ‘কবিতা– আবৃত্তিতে ভালো আবৃত্তিকারের সম্বন্ধে শ্রোতার মনে একটা বিশেষ মোহ উৎপন্ন করে। সেই কবিতার ভাবটি তাহার পাঠককে মহিমা দান করে- সেটা যেন তাহার কণ্ঠস্বর, তাহার মুখশ্রী, তাহার চরিত্রের সঙ্গে জড়িত হইয়া দেখা দেয়। ফুল যেমন গাছের শাখায় তেমনি কবিতাটাও আবৃত্তিকারের মধ্যে উঠিয়া তাহাকে বিশেষ সম্পদ দান করে’। আবৃত্তিকারের মুখনিঃসৃত কবিতার পংক্তিগুলো যখন সত্যিকারের প্রাণ পায় তখন সেই শিল্পী ও স্রষ্টার অবয়ব যেন একাকার হয়ে যায়। তবে সেই দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জনের জন্যে চাই কবিতার বোধ এবং তার গ্রহণযোগ্য উচ্চারণের ক্ষমতা। সেটা একমাত্র সম্ভব পরিশীলিত বাচনভঙ্গি দিয়ে কবিতার প্রকৃত চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা। নিজের কণ্ঠের প্রতিটি স্বরস্থানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে আবৃত্তি করতে হয়। তাছাড়া কবিতা বুঝে পড়ার পাশাপাশি মুখস্থ করার ক্ষমতাও একজন সফল আবৃত্তিকারের সম্পদ। এই সব কথা আমার নয়, কাজল সুরের। কবিতা শেখানোর আগে তিনি এই কথাগুলো বলে থাকেন শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে। এইসব কথা তিনি লিখেছেন ঝাড়গ্রামের উদ্যোগী পুরুষ মহাদেব চক্রবর্তী আয়োজনের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে। অত্যন্ত আন্তরিক ও সশ্রদ্ধ সেই নিবেদনে মহাদেববাবুর মতো মানুষদের অবদানের কথা তিনি লিখে জানান অকাতরে।

ছোট ছোট এমন আটত্রিশটা লেখা দিয়ে সাজানো হয়েছে স্মৃতিমেদুর গ্রন্থটি। তাঁর এই আবৃত্তির জগতে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় যেমন জয় গোস্বামীর মতো মানুষ আসেন, তেমনি আসেন জগন্নাথ বসু ও উর্মিমালা বসু। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও প্রদীপ ঘোষের কথা দিয়ে তো শুরু করেছি এই লেখা। সংস্কৃতি জগতে হঠাৎ করে অমল সাহা নামের এক আগন্তুকের প্রবেশ ও প্রস্থানের কথাও তিনি লিখেছেন অত্যন্ত আবেগদীপ্ত ভাষায়। কীভাবে নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়ে একেবারে মর্ত্যলোক ছেড়ে গিয়েছিলেন, কীভাবে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বঙ্গসংস্কৃতির সেবা করতে চেয়েছিলেন, তার এক ঝলক আমরা পেয়ে যাই এই লেখায়। তার কথা তো অনেকেই মনে রাখেন নি, কিন্তু দুর্দিনে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো সৎ সাহস দেখানোর কথা অকপটে জানান লেখক। তবে তাঁর এই লেখাগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে বেশ কিছু অনামি মানুষ, যাদের সেই অর্থে পাদপ্রদীপের আলোয় সেইভাবে দেখা যায় না। অথচ তাঁরা অন্তরাল থেকেই এমন সব কাজ করেন যা অন্য মানুষকে আলোকিত করে। এইভাবেই তাঁদের কথা বিবৃত করতে করতে কাজলবাবু নিয়ে আসেন কাঁচড়াপাড়ার বাবলু দাশগুপ্ত আর কল্যাণীর তমালকান্তি সাহার কথা। আদ্যন্ত নাট্যামোদী বাবলু একজন মঞ্চের নেপথ্যের মানুষ, লেখকের জীবনে তাঁর অনুপ্রেরণা অপরিসীম। অন্যদিকে তমালের কবিতা নিয়ে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়ান কাজল। তাঁর ওজস্বী গলায় সেই কবিতাগুলো প্রাণ পায়। শ্রোতৃহৃদয়ে আলোড়ন তুলতে তুলতে লেখক তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেন কখনও রবীন্দ্রনাথ আবার কখনও বা নজরুল। তাঁর কাছে কবিতা এবং কবিতাই শেষ কথা। বহুশ্রুত কবিতার পাশাপাশি অজানা অচেনা অনেক কবির কবিতাকে তিনি পৌঁছে দেন শ্রোতাদের দরবারে। কালের কষ্টিপাথরে সেগুলো যাচাই হতে হতে যোগ্য মর্যাদা পেয়েই যায়, যার একশভাগ কৃতিত্ব তাঁর।

এইভাবেই তিনি আমাদের শোনান বন্ধু লোকনাথের ছোটমাসি, কমলাদি, মীরাদি, মানুদি, বাচ্চু আর বুকুর কথা। সেইসঙ্গে অশেষ গুণে গুণান্বিত বন্ধু তপন রায়প্রধানের কথাও কৃতজ্ঞচিত্তে উল্লেখ করেন। তার পাশেই ফুটে ওঠে অখ্যাত কবি আত্রেয়ীর কথা, তাঁর সঙ্গে এক সময়ের আবৃত্তি আর শ্রুতিনাটকের কথাও তিনি বিবৃত করেন। লেখকের ঔদার্যের প্রকৃত সদব্যবহার করার যোগ্যতা আত্রেয়ীর ছিল, কিন্তু সংসারের পাকচক্রে তাঁর সেই জীবনের ইতি হয়, তিনি যেন তাঁর অবদমিত জীবনের কথা বলতে চান কবিতায়। তাঁর সঙ্গে বহু বছর বাদে দেখা হবার কথাও আন্তরিকতার সঙ্গে জানান লেখক। কিন্তু পুরনো দিনকে তো ফেরানো যায় না। বিষণ্ণতার এক অনুপম অনুভব তিনি আমাদের হৃদয়ে ছড়িয়ে দেন। তাই তাঁর আবৃত্তি জীবনের অসংখ্য সেলিব্রিটিদের পাশে সমানভাবে জায়গা করে নেন আত্রেয়ী। এই ঔদার্য এই লেখাকে পৌঁছে দেয় এক উচ্চকোটির আসনে।

গ্রন্থের প্রচ্ছদে কাজল সুর বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আবৃত্তির পথে বিচিত্র তাঁর পথচলা’। সত্যিই বিচিত্র তাঁর পথচলা। এক সময় দারিদ্রের মধ্যে মানুষ হওয়া লেখক জীবনের পাঠ নিয়েছেন জীবন থেকেই। কীভাবে যেন মনের মধ্যে বাসা বুনেছিল সাম্যবাদী চেতনা, যাকে তিনি কোনওদিন পরিত্যাগ করতে পারেননি। তাইতো আলো ঝলমল পাদপ্রদীপের পথ ধরে একটু একটু করে উপরে উঠেও ভুলে যাননি ফেলে আসা জীবনকে। কর্মজীবনের কারখানার শ্রমিক থেকে ব্যাংককর্মী হয়েও ভুলে যাননি নিজের অতীতকে একটুও। তাইতো তাঁর মনোজগত জুড়ে থাকে অসহায় দুঃস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা। তাইতো দুর্গোৎসবের শিরোপা দেবার বিচারক হয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার সেরে কাজে নামতে নামতে তাঁর মনে পড়ে যায় অন্ধ রিঙ্কুর কথা, যার চারপাশের জগৎ ঘিরে কেবল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, সেই তার সঙ্গে নবমী নিশির খুশি ভাগ করতে তাঁর মন আনচান করে ওঠে। আমাদের মনে পড়ে যায়, এই সেই মানুষটা যিনি তাঁর উপার্জনের অনেকটাই দিয়ে দেন অসুস্থ অক্ষম মানুষদের চিকিৎসার জন্যে। গণনাট্যের আদর্শে জীবনকে গড়েছেন, অসহায় মানুষদের কখনওই তাই ভুলে যান না। এই বইয়ের অনেকটা অংশ জুড়ে সেইসব অখ্যাত মানুষদের কথা।

কাজল সুরকে আমরা অনেকটাই জানতে পারি এই বইয়ের মধ্য দিয়েই। এতে গ্রন্থিত লেখাগুলো পড়তে পড়তে কেন জানি না অতি পরিচিত একটি গানের কলি মনের মধ্যে উঁকি দেয়,
‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে
কত কী রয়েছে লেখা কাজলে কাজলে’।
যদিও সংসারে এক সন্নাসীর জীবন যাপনের এই একক মানুষটা আমাদের অধরাই থেকে যান। কেননা তিনি তো নিজেকে আড়াল করেই নিরালা নিভৃত এক একক জীবন কাটাতে চান। তাঁর সেই চাওয়াকে সম্মান জানাতে জানাতে আমরা আরো কিছু জানতে চাই। আমরা চাই, তিনি আরো লিখুন, আরো আরো।
আশাকরি তিনি আমাদের বিমুখ করবেন না।