চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১৫ ॥ সুশীল সাহা



বোকা বানানোর ফন্দিফিকির



রেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ বয়স্ক নাগরিকদের জন্যে কিছু আসন সংরক্ষণ করে দিয়েছেন। তবে মহিলাদের মতো দুটো আলাদা কামরা নয়, প্রথম ও শেষদিকের দুটি কামরায় আট দু’গুণে ষোলটি সিট। প্রায়শই সেই সিটগুলো অল্পবয়েসীরা দখল করে থাকে। তাদের সঙ্গে রীতিমতো ঝগড়া করে সেগুলোর দখল নিতে হয়। তবে এ ব্যাপারে অন্য যাত্রীদের সোচ্চার সহযোগিতা পাওয়া যায়। আমি সাধারণত ওই সংরক্ষিত সিটেই যাতায়াত করতে পছন্দ করি। যাত্রীবোঝাই কামরাতেও সিটের নিশ্চয়তা ছাড়াও সমবয়েসী কিছু মানুষের সাহচর্য তো পাই। তবে সেই সাহচর্য সব সময় সুখের হয় না। তবু কলকাতায় আসা-যাওয়ার ওই সময়টুকুতে বসার আসন পাওয়ার লোভটুকু ছাড়তে চাই না কিছুতেই। কামরা উপচানো ভিড়, হকারদের চিৎকার ইত্যাদির মধ্যেও ওইটুকু স্বস্তি ‘বসার সিট’।

সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত মানুষেরাই ওই সিটে বসে। অনেকেই অবসর নিয়েও নানারকম ছোটখাট কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। তাঁদের কথাবার্তায় ফুটে ওঠে অতীত দিনের নানা গৌরবগাথা। অনেকেই চুপ করে থাকতে ভালবাসেন। অনেকেই ঝিমোন, আবার অনেকেই চোখ বুজে ঘুমোনোর ভান করেন। নির্দিষ্ট স্টেশন এসে গেলেই তড়াক করে সিট ছেড়ে নামার জন্যে তোড়জোর শুরু করে দেন। আমাদের এই বনগাঁ লাইনের ট্রেন অনেক কুখ্যাতি অনেকের মুখে শুনতে পাই। অনেকে একটু বাড়িয়েই বলেন। কী আর করা, এই ট্রেন লাইনেই যে আমাদের আস্তানা। সারাজীবন ধরে এমনতরো নানান কথা তো শুনতেই হবে।
আমি সাধারণত ট্রেনে কারো সঙ্গে যেচে আলাপ করি না। কেউ উপযাজক হয়ে কথা বললে খুব সংক্ষেপে তার উত্তর দিই। ট্রেনের মধ্যে নানা বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনার পক্ষপাতী আমি নই। তাই হয়ত কেউ কেউ কথাচ্ছলে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলেও আমার আপাত গম্ভীর ব্যবহারে তাঁরা পিছিয়ে যান। তবু একেবারে নিস্পৃহ হয়ে তো থাকা যায় না। শিয়ালদা থেকে হৃদয়পুরে আসার ওই মিনিট চল্লিশেক সময় দাঁতে দাঁতে চেপে সবরকম অসঙ্গতি মেনে নিয়ে সময়টুকু পার করে দিতে চাই। সেই সময়টুকুতেই যে ঘটে যেতে পারে নানা ঘটনা বা দুর্ঘটনা। আজ আমার এই লেখায় নিয়ে আসব একদিনের একটি ঘটনা। তাকে দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করাই সঙ্গত হবে। কেননা অনেক কিছুই আমাদের ‘চেনাশোনার বাইরে’ থাকে।
সেদিন শিয়ালদা থেকে আপ দত্তপুকুর লোকাল ধরেছি। যথারীতি বয়স্ক লোকেদের বসবার জায়গায় একটা যুৎসই জায়গাও পেয়ে গেছি আর সেটা পেয়েই মন দিয়েছি মোবাইলে। আজকাল তো হরেক মজা ওই ছোট্ট মুঠোফোনে। তাছাড়া নতুন একটা আন্ড্রয়েড সেট কিনেছি সদ্য। তাই চারপাশের হৈ হট্টগোলের ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও গভীর মনোনিবেশ করেছি ফেসবুকে। কিন্তু সেই অর্থে তো চলন্ত ট্রেনে কোনওকিছুতে সেইভাবে মনোনিবেশ করা যায় না। অন্তত আমি তো পারি না। তাই একসময় মাথা থেকে টুপিটা খুলে তার মধ্যে মোবাইল সেটটা রেখে চোখ বুজে থাকতে চাইলাম। এমন সময় পাশের ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ওই দামি মোবাইল সেটটা সাবধানে রাখতে। কখন কী হয়ে যায়, কিছু বলা যায়। আমি একটু কৌতূহলভরে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। একটু শুষ্ক হেসে ধন্যবাদ দিলাম ওকে। টুপির মধ্যে রাখা মোবাইল সেটটা একটু নাড়াচাড়া করে রুমালঢাকা দিই। টুপির মধ্যে ওই সেটটার পাশাপাশি জায়গা করে নেয় রুমাল আর চশমার খাপ। একটু পরেই আবার চোখ বুজে ‘মটকা’ মেরে পড়ে থাকতে চাইলাম। নতুন করে ওই আমার সেই পরমাশ্রয় রবিঠাকুরের গান আওড়াই মনে মনে।
ট্রেন চলছে দ্রুতগতিতে। এক একটা স্টেশন আসে, কিছু মানুষ নামে, কিছু মানুষ ওঠে। ভিড় কিছুতেই কমে না। এক অপার অসীম সহ্যশক্তির পরীক্ষা দিতে দিতে আমরা এগিয়ে চলি। মনে মনে রবিঠাকুরে গান গাই, ‘আরো কত দূরে’? গান তো মনে মনে গাই। কিন্তু বেশিদূর এগোনো যায় না। চারপাশের ভিড়, হকারের চিৎকার সমানভাবে চলতে থাকে। এমন সময় হঠাৎ করে কম্পার্টমেন্টের সব আলো নিভে যায়। কেউ কেউ অবাক হয়ে গেলেও আমি অবাক হই না। এ তো নিত্যদিনের ব্যাপার। বিরাটির পথে দুর্গানগর স্টেশন পেরোবার পর পরই এই ঘটনাটা ঘটে। আমরা ডেইলি প্যাসেঞ্জারেরা জানি কয়েক সেকেন্ড পরে ট্রেনের আলো জ্বলে উঠবে। কিন্তু ওই সময়টাতে চারপাশের যাত্রীদের অনেকের মধ্যে একটু তৎপরতা দেখা যায়, বিশেষ করে যাঁরা নামবেন, তাদের খালি সিটে যারা বসবেন তাদের মধ্যেও চলে ঠেলাঠেলি এবং একটু গুঁতোগুঁতিও। আমরা যারা ওই স্টেশনে নামব না, তাদের অবস্থা বেশ কাহিল হয়ে যায় ওই সময়টুকুতে। কোনওরকমে মুখ বুজে থাকা ছাড়া তো গত্যন্তর নেই জানি, তাই চুপ করেই থাকি। এও জানি একটু পরেই ফিরে পাব পূর্বাবস্থা।

সেদিন যথাসময়ে আলো নেভে এবং একটু আলো জ্বলেও ওঠে। বিরাটিতে বেশ কয়েকজন নেমে যান, তাদের খালি সিটে অন্যেরা বসে পড়ে। মিনিটখানেক চলে এক অভূতপূর্ব অবস্থা। তারপর যথারীতি ট্রেন চলা শুরু করে। এমন সময় আমি আবিষ্কার করি আমার টুপিতে রাখা মোবাইল সেটটা নেই। পাশে তাকিয়ে দেখি, সেই ভদ্রলোকও উধাও। আমি একেবারে বোকা বনে যাই।
তারপর থেকে আর ওই ভদ্রলোকের দেখা আমি আর আর পাই নি। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে তাকে খোঁজাটাও ছেড়ে দিয়েছি। তাছাড়া পুরনো সেটের মায়া ত্যাগ করে নতুন একটা সেট কিনতে না কিনতে ভুলে যেতে থাকি ওই ঘটনাটা। বৃদ্ধবয়সে এমন পোড় খাওয়া এই জীবনে এমন ঘটনার কথা কি সহজে ভোলা যায়। থেকে থেকে হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় আর নীরবে নিভৃতে হাত কামড়াই। আমাদের চারপাশে পেতে রাখা নানারকম বোকা বানানোর ফন্দিফিকিরে কখন যে আমরা ধরা পড়ব, কে জানে।
আচ্ছা, এই ঘটনাটাকে কি ‘কেপমারি’ বলা যায়।