চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১৬ ॥ সুশীল সাহা




আজও মনে পড়ে সেই মানুষটাকে


শৈলেন দাসকে আমরা ভুলে গেছি। সত্যি সত্যি ভুলে গেছি আদ্যন্ত রবীন্দ্রনাথে নিবেদিত অমন একজন মানুষকে। অথচ কেন জানি না, এই মানুষটাকে আমার মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে। খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম তাঁর, এ কথা বলতে পারব না। তেমন করে মেশারও সুযোগ পাইনি। তবু তিনি আছেন মনের মণিকোঠায়। কেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব নয়, কেন আজও থেকে মনে পড়ে পদ্মাপাড়ের স্মৃতি, হঠাৎ করে পঞ্চাশ বছর পরে আমার দেশের বাড়ি যাবার কথা, আমার পরের বোন মুকুর অকালমৃত্যুর কথা, শৈশবকালের সেই হারিয়ে যাওয়া খুলনার দিনগুলোর কথা। –এইসব ঘটনার কার্যকারণসূত্র খুঁজে বের করা কঠিন। তবু এরা বাস করে আমার মনের মধ্যে। মনের মধ্যে কার যে কখন কীভাবে বসত তৈরি হয়, কে জানে।

আমরা তখন খুলনায়। রেডিওতে আকাশবাণীর সম্প্রচারে রবীন্দ্রসংগীত শুনে সবে কানটা একটু একটু করে তৈরি করছি। কত শিল্পী– কত বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা। পঙ্কজকুমার মল্লিক, শান্তিদেব ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রাজেশ্বরী দত্ত, সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুমিত্রা সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ঘ্য সেন এবং আরো অনেকের সঙ্গে শৈলেন দাস। কেন জানিনা, একটু অন্যরকম লাগত তাঁর গান। প্রচারের আলোকবৃত্তে খুব যে আসতে পেরেছিলেন, তা নয়। তবু তিনি হলেন আমার প্রিয় শিল্পীদের একজন। খুব বেশি রেকর্ড করেন নি। তাঁকে নিয়ে খুব বেশি লেখলিখিও হয়নি, তবু তাঁর গান খুব ভাল লাগত। সেই থেকে তিনি আমার মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেন। দেখা হল অবশ্য অনেক অনেক পরে।

গত শতাব্দীর সত্তরের গোড়ার দিকে এই বঙ্গে এসে উপরোক্ত অনেক শিল্পীর মুখোমুখি হবার সৌভাগ্য হল। অনেকের গান শুনলাম প্রাণভরে। কিন্তু শৈলেন দাস থেকে গেলেন আমার একেবারেই অধরা। মাঝে মাঝে রেকর্ডে শুনি তাঁর গান। খোলা গলায় তাঁর ওই উচ্চারণগুলি মনে দাগ কেটে মিলিয়ে যায়। ‘আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে’। রবীন্দ্রগানের এই অমোঘ কথাগুলি দিয়ে কিছুই হয়ত বোঝানো গেল না। কিন্তু আমার চিত্তপটে তিনি রয়ে গেলেন তাঁর খোলা গলায় গাওয়া গানগুলি নিয়ে। তাঁর গাওয়া রেকর্ডের গান, একী আকুলতা ভুবনে, আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, কখন দিলে পরায়ে– নিয়ত আমার কানে বাজত।

অনেক অনেক বছর পরে গত শতাব্দীর শেষের দিকে তাঁর একটু কাছাকাছি আসার সুযোগ হল। আমরা তখন হৃদয়পুরে থিতু হয়েছি। পরিচয় হয়েছে অধ্যাপক সঞ্জয় মজুমদারের সঙ্গে। সঞ্জয়বাবু বারাসাত সরকারি মহাবিদ্যালয়ের কৃতবিদ্য অধ্যাপক। খুব ভাল গান করেন। গান শিখেছেন সুবিনয় রায়ের কাছে। তাঁর মুখেই নতুন করে শুনলাম শৈলেনবাবুর কথা। আসলে সঞ্জয়বাবু তখন যুক্ত ছিলেন শৈলেনবাবুরই সংগঠন ‘বাতায়নিক’-এর সঙ্গে। দমদম ক্যান্টনমেন্টে ওই সংস্থার কাজে সঞ্জয়বাবু প্রায়শই যান। তিনি ওই সংস্থার সহ সভাপতি। শৈলেনবাবু সভাপতি। মূলত রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায়তন হলেও শৈলেনবাবু বাতায়নিককে গড়েছেন শুদ্ধ রবীন্দ্র –চর্চার এক পীঠস্থান হিসেবে। অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের নিজস্ব ভবন হবে। অজস্র ছাত্র ছাত্রীরা পাবে তাদের নিজস্ব প্রচ্ছায়া। এসব কথা সঞ্জয়বাবুর মুখে শুনি আর মনে মনে উদ্দীপ্ত হই। আমার স্বপ্নের মানুষটিকে দেখার জন্যে ভেতরে ভেতরে একটু আকুলও হয়ে পড়ি। একদিন এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শৈলেনবাবু এলেন সঞ্জয়বাবুদের বাড়িতে। আগে থেকেই আমি সেখানে উপস্থিত। আমাদের দেখা হল। তাঁকে প্রণাম করলাম। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন তিনি। সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন। ক্লান্তকণ্ঠে সেদিন কিছু গানও শুনিয়েছিলেন। বুঝলাম আমার সম্পর্কে কিছু কথা আগেই বলে রেখেছেন সঞ্জয়দা। সেদিন শৈলেনবাবু অনেক কথার মধ্যে একটি জরুরি কথা বলেছিলেন। সেটা হল, ‘সুশীল, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি বাতায়নিকের জন্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে চাই’। কী সেই কাজ, সেটা তিনি সেদিন বলেননি। পরে সঞ্জয়দা বলেছিলেন, ওই সংস্থার সদস্যরা মূলত গান শিখতে আসে, গান শিখে চলে যায়, অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। সংগঠনের দায়দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না। হয়ত শৈলেনবাবু আমাকে বাতায়নিকের সাংগঠনিক কিছু কাজের দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। এসব কথা ভেবে সেদিন খুব গরিমা হয়েছিল। মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম, কবে শৈলেনবাবু আমাকে দেবেন কিছু কাজের ভার। দুঃখের কথা মনের বাসনা মনেই থেকে গেল, তা আর পূরণ হল না। নির্মম হলেও এ কথা সত্যি যে, শৈলেনবাবুর সেই আরব্ধ কাজের দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য আমার হয়নি শেষ পর্যন্ত।

ইতমধ্যে বাতায়নিকের বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান দেখা বা শোনার অভিজ্ঞতা আমার হয়ে গেল। সবগুলো অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সঞ্জয়বাবু। গানের আগে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই কথা শুনি আর তারপরে সুচয়িত সেইসব গান। শৈলেন দাসের দক্ষ পরিচালনায় তাঁর ছাত্র ছাত্রীরা রবীন্দ্রগানের উপস্থাপনা করে। শৈলেনবাবু নিজেও গান করেন। সবটা মিলিয়ে সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। তবে তাঁর চেহারায় তখন এক বিষণ্ণতা লক্ষ্য করেছি। এ ব্যাপারে সঞ্জয়দাকে জিজ্ঞেস করে কোনও সদুত্তর পাইনি। আজও আমার কানে বাজে রবীন্দ্র সদনে বাতায়নিকের এক অনুষ্ঠানে তাঁর গাওয়া ‘ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী একা একা করি খেলা’।

শৈলেনবাবু ছিলেন আদ্যন্ত বাম মনষ্ক। একসময় সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। ষাটের দশকে প্রথম যুক্তফ্রন্টের আমলে বিধায়কও হয়েছিলেন। অনেকের মুখে শুনেছি, তিনি নাকি বিধানসভার বাইরে খালিগলায় গানও গেয়েছেন। তাঁর ওজস্বী কণ্ঠের ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও’ গানটি সেইসময়ের প্রেক্ষিতে এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। আজও সেই ঘটনার কথা অনেকের মুখে মুখে ফেরে। জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে আবার তাঁকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল ওই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। সংগঠনের স্বার্থে তিনি হয়েছিলেন তাঁর পুর এলাকার চেয়ারম্যান। দীর্ঘকাল রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে এনে যে অন্যরকম কর্মযজ্ঞে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, হঠাৎ করেই তাতে ছেদ পড়ল। হয়ত তিনি ভেবেছিলেন পার্টির দেওয়া এই দায়িত্বভার অচিরেই ঘাড় থেকে নামিয়ে আবার নতুন করে শুরু করবেন বাতায়নিকের কাজ। বাতায়নিকের নিজস্ব ভবনের জন্যে তখন তিনি উঠেপড়ে লাগেন। বলেছিলেন, পুরসভার দায়িত্ব তিনি অচিরেই ছেড়ে দেবেন। ওখানকার ভেতরের কিছু সমস্যা মিটিয়েই তিনি পূর্ণোদ্যমে যোগ দেবেন তাঁর প্রাণপ্রিয় সংগঠনের কাজে। কিন্তু তা আর হল না। একদিন এক অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে তাঁকে প্রাণ দিতে হল নিজের বাড়ির সামনেই। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়লেই এখনও আমার গা শিউরে ওঠে।

এই মানুষটাকে নতুন করে মনে পড়ল বেশ কয়েক বছর পরে। আমার ডান চোখের ছানি অপারেশন করতে গিয়েছিলাম ডাক্তার এ দাস অর্থাৎ অনন্যব্রত দাসের কাছে। তিনি শৈলেন দাসের ছেলে। ভাল গান করেন। একসময় বাতায়নিকের নানা অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনেছি। খুব খোলা গলায় গান করেন। পরে জেনেছি, তিনি বড় মাপের একজন চোখের ডাক্তার হয়েছেন। মধ্যমগ্রামের চৌমাথায় তাঁর বিশাল প্রতিষ্ঠান ‘স্পেকট্রা’। চোখের যাবতীয় চিকিৎসার এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। শুনতে পাই নিজের শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি বাতায়নিকের হাল ধরেছেন। নিজে গান করেন, গান শেখান। বাবার আরব্ধ কাজের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন। মনে মনে ভাবি, একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করব তাঁর বর্তমান কর্মযজ্ঞের কথা, এত ব্যস্ততার মধ্যেও কীভাবে তিনি দুই বিপরীতমুখী কাজের দায়িত্ব পালন করেন। কয়েকবার তাঁর মুখোমুখি হয়েও কিছু বলতে পারি না। ২০১৭-তে বাঁ চোখের পরে ২০২১-এ হয়ে গেল আমার ডান চোখের অপারেশন। অনন্যব্রত ওরফে ডাক্তার এ দাসই করলেন। এই সুবাদে বেশ কয়েকবার তাঁর মুখোমুখি হলাম। ভেবেছিলাম তাঁকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করব। বাতায়নিকে এখন আর কে আছে, তাঁর মা কেমন আছেন, শৈলেনবাবুর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে তাঁরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন কিনা? কিন্তু তাঁকে আমার কোনও কথাই জিজ্ঞেস করা হয় না। আমি চলে আসি।
শৈলেন দাস আমার মনের মণিকোঠায় যেমন ছিলেন, তেমনই থেকে যান।