চেনাশোনার কোন্ বাইরে-১৮ ॥ সুশীল সাহা



শান্তিনিকেতনের বাইশে শ্রাবণ


আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগে অর্থাৎ ১২৪৮ বঙ্গাব্দের বাইশে শ্রাবণ (ইংরেজি ৭ অগাস্ট, ১৯৪১ সাল) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রয়াত হন। আশি বছর বয়সে তাঁর এই প্রয়াণকে হয়ত অকালমৃত্যু বলা যাবে না। কিন্তু বাংলা ও বাঙালির এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতি বছর তাঁর জন্মদিন ২৫শে বৈশাখ আমরা মহাসমারোহে উদযাপন করি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুদিন আসে ধীর পায়ে, এক অতি অনাড়ম্বর গতি নিয়ে। কেননা মৃত্যু মানেই আমাদের কাছে শোক, আর শোক মানেই কান্না, হাহাকার আর বিচ্ছেদ বেদনার কাতরতা। কিন্তু শান্তিনিকেতনে বাইশে শ্রাবণ পালিত হয় এক অসাধারণ এক ভাবগম্ভীর পরিবেশে, কবির লেখা গানে কবিতায়, বৃক্ষরোপণ, উপাসনা আর হলকর্ষণের মধ্য দিয়ে, মৃত্যুশোক নয় মৃত্যুত্তীর্ণ এক অনাবিল জীবনের জয়গানে।

জীবন আর মৃত্যু যেন একই সুতোর দুই প্রান্ত। কবি লিখেছেন, ‘নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে’, আবার তিনিই লিখেছেন ‘আমি মৃত্যু চেয়ে বড়’। লিখেছেন, ‘পঁচিশে বৈশাখ চলেছে/ জন্মদিনের ধারাকে বহন করে/ মৃত্যুদিনের দিকে’। অর্থাৎ কবির ভাষাতেই বলা যায়,
‘দিক হতে ওই দিগন্তেরে কোল রয়েছে পাতা
জন্মমরণ ওরই হাতে অলখ সুতোয় গাঁথা’।

এই অসামান্য জীবনদর্শনের বাণীকে দৃশ্যরূপ দিয়েছেন কবির উত্তরাধিকার তথা শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকেরা যা সম্ভবত সমস্ত পৃথিবীতে ‘একমেব দ্বিতীয়ম’ অর্থাৎ অনন্য। এভাবেও একজন প্রয়াত মহাপ্রাণকে স্মরণ করা যায়। কবির মৃত্যুর পরের বছর (১৯৪২) যখন তাঁর মৃত্যুদিন সমাগত তখন কবিগুরুর সচিব অমিয় চক্রবর্তী প্রস্তাব করেন বাইশে শ্রাবণ পালিত হবে শোকের আচ্ছন্নতায় নয়, জীবনের জয়গানে। কেননা কবি তো সারাজীবন জীবনের স্বপক্ষে কথা বলেছেন, তাঁর লেখা গানে, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ বা নাটকে তিনি জরাকে জয় করে নতুন জীবনের বাণীকে মূর্ত করেছেন। সকল আশ্রমিকেরা একমত হলেন। সেই থেকে শুরু হল বৃক্ষরোপণ উৎসব। কবির মৃত্যুদিনে নতুন জীবনের জয়ধ্বনি। প্রতি বছর এইভাবেই চলছে কবির প্রতি শ্রদ্ধাতর্পণ।

একবার সেই শ্রদ্ধাতর্পণে যোগ দেবার দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। নানাসময়ে শান্তিনিকেতনে গিয়েছি। বসন্তোৎসবে, পৌষমেলায়, পঁচিশে বৈশাখে। কোনও উৎসব নয়, এমনিই গেছি ওখানে কতবার। কিন্তু বাইশে শ্রাবণ উদযাপনে গিয়েছি মাত্র একবার। সেই একবারমাত্র যাবার এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতার এক ঝলক এই ছোট্ট লেখায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা মাত্র।

একবার এক বন্ধু আমাকে অনুরোধ করল, শান্তিনিকেতনে বাইশে শ্রাবণ উদযাপনে যোগ দেবার আয়োজন করতে। তাঁর অনুরোধকে আমি আদেশ বলেই মান্য করে যাবার আয়োজনে মেতে উঠলাম। তিন দিনের জন্যে থাকার আয়োজন করা গেল ওখানকার ‘আন্তর্জাতিক অতিথিশালা’য়। যাওয়া আসার টিকিট কাটা হল। এক শুভক্ষণে আমরা রওনা হলাম। আমরা ওখানে পৌঁছালাম আগের দিন অর্থাৎ একুশে শ্রাবণ রাতে। পরের দিন শুরু হবে আমাদের উদযাপন।

বাইশে শ্রাবণ ভোর পাঁচটায় শুরু হল বৈতালিক। সাদা পোশাক পরিহিত আশ্রমিকেরা ধীরপদে সারিবদ্ধভাবে হাঁটতে হাঁটতে গাইছিলেন, ‘এবার দুঃখ আমার অসীম পাথার পার হল যে পার হল’। সে এক অসামান্য ভাবগম্ভীর পরিবেশ। সকলে মিলিত হলেন গৌরপ্রাঙ্গনে। সেই গান তখনও চলছে। আমরাও গলা মেলালাম। এক অপরূপ সৌম্য শান্ত শ্রদ্ধানত বৈতালিকের অসামান্য নিবেদনে শুরু হল কবির সেবারের সেই প্রয়াণবার্ষিকী (২০১৯)। সেই সমবেত শ্রদ্ধানিবেদনের ধারা চলে আসছে বহুদিন ধরে। আশ্চর্য সেই শ্রদ্ধানত সমবেত নিবেদন। আমরাও নতশিরে জানালাম আমাদের শ্রদ্ধা।

এরপর সকাল ঠিক সাতটায় মন্দিরে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশে শুরু হল উপাসনাপর্ব। বাইরে তখন চলছে শ্রাবণের অঝোর ধারাবর্ষণ, ভেতরে সমবেত কণ্ঠে শুরু হল গান, ‘শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে’। উপাসনা গৃহের অঙ্গন ছাড়িয়ে সেই গান আমাদের অন্তর ভিজিয়ে দিল। কাচঘরে উপস্থিত কারো চোখে দেখিনি কোনও অশ্রুধারা, অথচ আমরা যেন আমাদের চারপাশে অনুভব করলাম কবির কবোষ্ণ এক উপস্থিতি। একটার পর একটা গান হয়ে যাচ্ছিল আর আমরা সেই গানের সুরের ধারায় অবগাহন করে যাচ্ছিলাম অনায়াসে। গান, মন্ত্রপাঠ আর সংক্ষিপ্ত ভাষণমালায় সেই শ্রদ্ধানত আনন্দ-বেদনায় নিবেদিত উতরোল পরিবেশ শেষ হল ‘সমুখে শান্তিপারাবার’ গান দিয়ে।

বিকেল ৪টের সময় সন্তোষালয় প্রাঙ্গনে শুরু হল বৃক্ষরোপণ উৎসব। প্রথমেই বরণ, সমবেতকণ্ঠে ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও’ গানের সঙ্গে নৃত্যরত আশ্রম বালক বালিকাদের শোভাযাত্রা, সবার সামনে ও পেছনে ধ্বজা বহন করে আনছে আশ্রমিকেরা আর মাঝখানে পত্রপুষ্প শোভিত দোলায় আনা হল এক বৃক্ষচারাকে। অসামান্য সেই দৃশ্য। পঞ্চভূতের আহবান শেষে আলপনা দেয়া বেদিতে রোপণ করা হল বৃক্ষ। করা হল জলসিঞ্চন, দেয়া হল পাখার বাতাস ও ধুপকাঠির সুরভি। সামান্য কয়েকটি কথায় অতিথিরা এই বৃক্ষরোপণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন। অনুষ্ঠান শেষ হল ‘কোন পুরাতন প্রাণের টানে’ গান দিয়ে। সন্ধ্যা সাতটায় লিপিকা সভাঘরে স্মরণ অনুষ্ঠানে কবির ১৪টি গান গীত হল সমবেত, একক ও দ্বৈতকণ্ঠে। সেই গানগুলিও সুচয়িত, কবির মহাপ্রয়াণের স্মরণ এইভাবে আমাদের হৃদয়ে গ্রথিত হল একটু একটু করে। পরদিন অর্থাৎ তেইশে শ্রাবণ ভোর পাঁচটায় শ্রীনিকেতন পাকুড়তলায় হল বৈতালিক আর সাড়ে পাঁচটায় শ্রীনিকেতন ফ্রেস্কোগৃহে হল সানাই বাদন। সকাল সাড়ে আটটায় শ্রীনিকেতন মেলাপ্রাঙ্গনে শুরু হল হলকর্ষণ উৎসব।

রবীন্দ্রনাথ কৃষিকর্মকে এক অনন্যমাত্রায় মর্যাদাদান করেছিলেন। কৃষিকর্ম যে মোটেই অবহেলার ব্যাপার নয়, সেটা মাথায় রেখে রবীন্দ্রনাথ একদা এই হলকর্ষণ উৎসবের সূচনা করে নিজেই লাঙল চালিয়েছিলেন। তারই পরম্পরায় ওইদিন আমরা প্রত্যক্ষ করলাম সেই উৎসব। সমবেতকণ্ঠে পুনর্বার ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও’ গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নৃত্যরত বালক বালিকা আর গুণীজনদের নিঃশব্দ পদচারণা শোভাযাত্রার শোভাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। শোভাযাত্রার পেছনে দুটি বলদ এবং তারও পেছনে চিত্রিত লাঙল আনা হল। কর্ষণের জায়গাটি ঘিরে ‘কোন পুরাতন প্রাণের টানে’ গানের সঙ্গে আশ্রমিকদের নৃত্য সমস্ত পরিবেশটিকে আনন্দময় করে তুলল। অবশেষে সমবেতকণ্ঠে সেই রবীন্দ্রগান ‘ফিরে চল মাটির টানে’ আর তার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হল হলকর্ষণ। প্রাণ যেন কথা কয়ে উঠল আমাদের চোখের সামনে।

মৃত্যুদিনের স্মরণ অনুষ্ঠানও যে কত মহিমময় ও প্রাণস্পর্শী হতে পারে তার প্রমাণ শান্তিনিকেতনের এই বাইশ শ্রাবণ উদযাপন যা প্রত্যক্ষ করা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমাদের তিন দিনের অবকাশযাপন শেষ হল। আমরা বাড়ি ফিরে এলাম এক অসাধারণ অভিজ্ঞতাকে মনের মধ্যে ধারণ করে।
কিছু কিছু স্মৃতি মনের মধ্যে থেকে যায় সারাজীবন। শান্তিনিকেতনের বাইশে শ্রাবণ এমনই এক চিরকালীন স্মৃতি।