চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২২ ॥ সুশীল সাহা



আকাশের চেয়ে বড়ো


বড় বেশি আধুনিক তাঁর কবিতাগুলো। কবিতা লেখেন মগজ ও হৃদয় দিয়ে। কবিতার প্রতি আভূমি নিবেদিত এই কবির নাম জলধি হালদার। দীর্ঘকাল নাবিক জীবনে অভ্যস্ত এই কবি কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে এখন পাকাপাকিভাবে ডাঙ্গায় নোঙর করেছেন। কিন্তু সমস্ত সত্তা জুড়ে যেন নিরন্তর সমুদ্রের কল্লোল। তাঁর চোখ মুখ আর হৃদয় জুড়ে কেবল নীল জলরাশির উত্তাল তরঙ্গের ধ্বনি, আদিগন্ত নীল শুধু নীলের জয়ধ্বজা ওড়াতে ওড়াতে তিনি মেতে ওঠেন অক্ষরের সহজ বিন্যাসে। অবশ্য তাঁর কাছে যা সহজ, পাঠকের মেধা আর মননের কাছে তা অত্যন্ত এক জটিল অঙ্কের ধাঁধা। অবশ্য সেই ধাঁধার ঘোর কাটিয়ে যদি পৌঁছানো যায় একজন রণক্লান্ত মানুষের চৈতন্য বিভায়, তাহলে পাঠক নিশ্চয়ই আলোকিত হবেন। সেই বিভা কেবল কিছু কুসুমিত আল্পনা নয়, কল্পনার ডানামেলা কিছু স্বপ্নচয়নও নয়, তার মধ্যে মিশে থাকে জীবন নামক এক বিচিত্র যাপনের নানান দর্শন ও বীক্ষা।

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফৌজদার হাঁস মেরেছে’ (১৯৮১) থেকেই তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত এক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে কবি সময় নিয়েছেন আরো দশ বছর। তাঁর ‘সত্যিমানুষ মিথ্যেমানুষ’ (১৯৯২) গ্রন্থে তিনি এক অন্য পরিচয়ে উপস্থিত হন। যে পরিচয় একজন পূর্ণাঙ্গ কবির। পাঁচ বছর পরে প্রকাশিত ‘সম্পূর্ণ বৃক্ষের বাসনা’ (১৯৯৭) গ্রন্থে কবি আরো অনেক বেশি পরিণত। এর পরের কাব্যগ্রন্থে (সমুদ্রতান্ত্রিক) তাঁর নাবিক জীবনের প্রত্যক্ষ আভাষ পাই আমরা। ২০০০ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের পরেও আমরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি ‘বিষকরবী’ (২০০৪), ‘নুড়ি পাথরের শব্দ’ (২০০৮) এবং ‘নোনাজলের কবিতা (২০১৩) এবং অবশেষে এই সদ্যজাত ‘মোরানো গ্লাসের বাইসন’ (২০১৮)। আটখানি মৌলিক কাব্যগ্রন্থের জনক কবি জলধি হালদার মনোজগত জুড়ে এখন কেবল কবিতা আর কবিতা। তাঁর কলমের ডগা ‘এখন জীবাশ্মের স্পন্দনে খলবল করছে’ তিনি এখন তার মধ্যে আবিষ্কার করেছেন ‘অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন।’ তিনি যেন তার মধ্যে তাঁরই কবিতা লেখা ‘ছেঁড়া ছেঁড়া প্যাপিরাসের কিছু পঙক্তি দিয়ে লিখতে চাইছেন তাঁর পূর্বজন্মের কথা। হাজার হাজার বছর আগেকার ইতিহাসের পথ বেয়ে তিনি যেন লিখতে চান তাঁর ‘আগামী কাব্যগ্রন্থের প্রবেশক।’
‘আমার ভেতর চার মিনিট বারো সেকেন্ডের একটি ভক্তিগীতি আছে।
তিন মিনিট পয়ত্রিশ সেকেন্ডের একটি প্রেমের গান আছে।
সাত মিনিটের লয়ে একটি বিরহের গান আছে।
বন্ধ না করা অবধি বাজে এমন জীবনমুখী আছে।’ (ইমেজ)
এমনতরো গানপাগল মানুষের সমস্ত সত্তায় একই সঙ্গে মিশে আছে তাঁর চারপাশের প্রকৃতি, আকাশ নদী আদিগন্ত সবুজাভ মাঠ এবং স্পন্দিত জীবনের গাথা। অতি শৈশবের দিনগুলোতেই ‘ইছামতীর বামতট একটি পালতোলা নৌকা নিয়ে রক্তে ঢুকে গিয়েছিল।’ এখনও যেন তিনি তাঁর সেই নৌকো বেয়েই চলেছেন।

এমন মানুষের চারপাশে যখন ভাঙনের উচ্চণ্ড তাণ্ডব, তখন তিনি যেন অসহায়ের মত দেখতে পান, ‘ঘরের মধ্যে একদলা কাদায় জোনাকির মাথা গুঁজে আলো জ্বালবার নৃশংস উল্লাস।’ তাঁর স্বরলিপিতে এখন কেবল দু’মুখো অক্ষরের খেলা, যেখানে ‘জয় বললে ক্ষয় শোনা যায়।’ কবি যেন অসহায়। তিনি যেন নির্বাক দর্শকের মত কেবল দেখেই যাচ্ছেন। তাঁর চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে নানারকম সব অবাঞ্ছিত ঘটনা।
‘আজ একটা পুকুর ভরাট হয়ে গেল পাড়া ভরতি লোক বোবা। মাটির নীচে চাপা পড়ে গেল আমাদের সাঁতার আমাদের ঘড়া।’ (স্বরলিপি)
মূলত কবিতাই লেখেন জলধি হালদার। সত্তর দশক থেকে নিরন্তর লিখে চলেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত আটটি কাব্যগ্রন্থের জনক তিনি। তাঁর গদ্যের হাতটিও বেশ ভাল। কিন্তু কবিতা লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। একান্ত একটি সাক্ষাৎকারে ‘কবিতা লেখার মধ্যে আপনি কোন মুক্তির স্বাদ পান?’ আমার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বেশ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন,
‘যা আমাকে আঘাত করে, সেটা বাইরের হোক কিংবা ভেতরের, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক, তার অনুরণন হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে বাজতে থাকে। অতি সাধারণ বেঁচে থাকার মধ্যে অদ্ভুত এক বন্দিত্ব ছাড়া আর কিছু পাই না। ভেঙ্গে বেরোনোর যে প্রচেষ্টা, হয়তো সকলেরই এই ইচ্ছেটা থাকে – কিন্তু ছোটো ছোটো ঘেরাটোপে আটকে যায়। সে কারণে কবিতার মধ্যে ডানা খুঁজে পাই। সে ডানা অসীম সাহসী। সমস্ত রকম দুরবস্থার মধ্যেও অস্তিত্বের জানান দিয়ে মুখ তুলে তাকানো। মেরুদণ্ডের কোথাও চিড় ধরে গেলে ঝালাই করে নিই। কলাকৈবল্যবাদে বিশ্বাসী নই। সবসময় চোখ মাথা পরিষ্কার রাখি। এভাবেই আমার চৈতন্যের ও কবিতার ভেতর মুক্তি খুঁজে নিই। তবে সব আঘাত থেকে কবিতা আসবে এমন কোনো শর্ত নেই।’ নিজের লেখালিখির ব্যাপারে এতটাই অকপট তিনি।
এই হল জলধি হালদার, যাঁর মগ্নচেতনায় কবিতা, শয়নে স্বপনে নিশি জাগরণে কবিতাই তাঁর জীবনের আলো,তাঁর সমস্ত ভুবন। কবিতাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে, কবিতার মধ্য দিয়েই তিনি খুঁজে ফেরেন আত্মমুক্তি।

(২)
জলধি হালদারের মানসভুবন জুড়ে নানারকম কল্পকাহিনির বীজ উপ্ত হয়ে আছে। সেই বীজ থেকে অংকুরিত হয় বিবিধ আখ্যানের মায়াময় জাদুবাস্তবতা। অদ্ভুত সেইসব আখ্যানের দোলাচল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিনকে সামনে রেখে তিনি যে সুন্দর একটি মায়াবী আখ্যায়িকা রচনা করেছেন, তার নাম ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জেনে যেতে পারেন নি’। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে প্রেমের কল্পকাহিনি মনে হলেও এটি আসলে সুনীলের প্রতি কবির এক শ্রদ্ধাতর্পণ। সুদূর এক ভিন গ্রহ থেকে এসেছিল ‘কসমিকা’। স্বল্পমেয়াদী তার সেই অবস্থানকালে সে কবিকে প্রেমের এক মায়াবী বাঁধনে বেঁধে ফেলল। মাত্র ছ’মাসের মেয়াদ শেষে সে আবার ফিরে গেল তার নিজ আবাস– চৌদ্দ শ’ আলোকবর্ষ দূরের এক ভিন গ্রহে। নিয়ে গেল পৃথিবীর নানা স্মৃতি এবং শরীরময় এক মানবসন্তানের চিহ্ন। তারপর সেই গ্রহের নিয়মানুসারে বারো বছর বাদে সেই সন্তানের শরীরে যখন স্ত্রী চিহ্ন ফুটে উঠল তখন কসমিকা তার কী নাম রাখবে জানতে চায় কবির কাছে। ঠিক সেদিনই (২৩ অক্টোবর ২০১২) মধ্যরাতে সুনীলবাবু মহাপ্রস্থানের পথে রওনা হয়েছেন। কবি তার নাম রাখলেন নীরা। সেই মানব-কন্যা পৃথিবীর সব চিহ্ন বুকে নিয়ে রয়ে গেল সেই সুদূর ভিন গ্রহে। চিরন্তন প্রেমের এক চমৎকার রূপক এইভাবেই সৃষ্টি হল জলধির কলমে। সেইসঙ্গে তিনি সুন্দর এক জাদুবাস্তবতার আড়ালে তিনি তাঁর প্রিয় কবিকে জানালেন অন্তরের শ্রদ্ধা।
‘জীবন চটকে চটকে আর কোনো ছিরিছাঁদ নেই
হারমোনিয়াম বাজাচ্ছি একটি মাত্র রিড চেপে।
রাষ্ট্র এরকমই চায়
তুমি অদৃশ্য বকলেস-পরা রাষ্ট্রপালিত হও
কিংবা অদৃশ্যভাবে ক্ষমতাপালিত।
তোমার কোনও স্বাতন্ত্র্য থাকবে না
আপ্রাণ চেষ্টা করেও তুমি জঙ্গমতা খুঁজে না পাও।’ (আমার আগুনদোষ আমি দানা বুঝি)
আবার সেই প্রেমিক মানুষটির সত্তায় দেখা রাষ্ট্রযন্ত্রের পীড়ণে নিষ্পিষ্ট এক নামগোত্রহীনকে। সে কেবল রাষ্ট্রপালিত এবং অদৃশ্যভাবে ক্ষমতাপালিত। তাই সেই ‘থোর বড়ি খাড়া’মার্কা জীবনে যে কোনও জঙ্গমতা নেই, সে কথা জানাতে ভুলে যান না। আবার এই কবির চিন্তাচেতনায় মাঝে মাঝে উঁকি মারে জীবনানন্দ, কিন্তু সে যে একবিংশ শতাব্দীর ‘ক্লান্ত প্রাণ এক’।
‘জ্যোৎস্নায় ভিজে ভিজে আমসত্ত্ব সীমান্তের হেলমেট
বেহেড চাঁদের চোখে ঝেঁপে আসে ঘুম
তখন জোনাকিরা কাঁটাতার ওফোঁড় ওফোঁড় করে।’ (লুঙ্গিপরা চাঁদ ও সীমান্তের হেলমেট)

জীবিকাসূত্রে দীর্ঘকাল নাবিক ছিলেন বলেই হয়ত এখনও তাঁর এই অবসর জীবনে মাঝে মাঝেই উঁকি দেয় সেই নীল জলরাশির মধ্যে দিনের পর দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা। এখনও যেন তিনি সেই নীল জলরাশির মধ্যে একা একা সাঁতার কাটেন। অলস মন্থর জীবনে পিছন ফিরে দেখতে দেখতে মাঝে মাঝেই ফিরে আসে তাঁর সেই জলজীবনের ইতিকথা।
‘সমুদ্র থেকে সাইন-অফ করে আসার সময়
আমার ওভারঅলে একটি চিপিং মারতুল চলে এসেছে।’
‘…এতদিন জীবনের আশেপাশে গাছ পাইনি
এখন বটবৃক্ষের ছায়ায় আমার যৌনতা চিপিং করি।’ (চিপিং)
‘গভীর রাতে ফেলে আসা বন্দরগুলিতে আমার
সাইন-অফ করা জাহাজের দল ফিরে আসে।
কোনও ফ্ল্যাগ নেই, ফানেলে রঙ নেই
তারা কোন সমুদ্র থেকে ভেসে আসছে
কোনও লগবুক নেই।’ (মিডশিপ)
এই মানুষটা আসলে একজন স্বভাবকবি। তাই দিনান্তের আলো নিভে গেলে তিনি তাঁর ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন একটি গানের। সেই গান, যা কবির অন্তর থেকে উৎসারিত এক মহাসংগীত, যার স্পর্শে ধন্য হয় জীবন। মরণ হতে জেগে ওঠে প্রাণ। আর সেই প্রাণের স্পর্শে জেগে ওঠে আদিগন্ত।
‘…অনন্তের মাঠে জানু পেতে প্রতিদিন প্রার্থনা করি
নমো নমো হে পৃথিবী
নমো নমো হে আকাশ বাতাস নদী পাহাড়।’

(৩)
আমাকে একটি নির্ভয় গান দাও-
কোনও আঠাকাঠির ফাঁদে আটকে না যায় তার ডানা
যেন মধুর বাজে স্বপ্নের ধ্রূপদ ধামার। (প্রার্থনা সংগীত)
তাঁর কবিসত্তায় মিশে আছে নিজের সঙ্গে কথা বলার এক চিরন্তন প্রক্রিয়া। তারই কিছু আভাষ মেলে তাঁর এইসব কবিতায়। এ সম্পর্কে তিনি ওই একই সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে বলেন, ‘আমার চারপাশে কিছু আনদ্ধ পরিবেশ থাকেই, যা কবিতার ব্যঞ্জক ও অলংকারসমূহকে অবশ্যম্ভাবী করে। আমার কবিতায় হঠাৎ হঠাৎ সলিলকি’র অনুপ্রবেশ ঘটে। এই অনুপ্রবেশ দোষ না গুণ, জানি না। বরং আমি নানা শব্দবহে ছড়িয়ে পড়তে ভালোবাসি।’
‘…আমার স্মৃতিতে কোনও মিথ্যে নেই কখনও লগ-আউট হয় না
যখন ইচ্ছে মা বাবার সঙ্গে কথা বলি
আমাকে পার হয়ে যাওয়া আসঙ্গ কিংবা অনেক ব্যর্থ মিছিল
স্পেডকে স্পেড বলতে শিখেছি।’ (আমার আগুনদোষ আমি দানা বুঝি)
তাঁর লেখা একটি দীর্ঘ কবিতার মাত্র চারটি পংক্তি ওপরে রইল এই কবির সামাজিক মনোভাবের একটা পরিচয় বুঝে নেবার জন্যে। সমস্ত দিনের অবসানে ক্লান্ত মানুষের ঘরে ফেরার মত তিনিও আপন মনে কিছু হিসেব নিকেশ দাখিল করেন। তাই তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে নিজস্ব শিল্পের নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি অকপটে বলেন, ‘যেহেতু আমি আত্মীয় স্বজনসহ অনেক মানুষের সঙ্গে করি, সমাজ বলতে এমন একটি ধারণা আছে, যা কখনও সক্রিয় কখনও নিষ্ক্রিয়। তবু আমি সামাজিক– একথা মান্য করি। অতএব তার দায় থাকেই। সভ্যতার বিকাশ থেকে পাওয়া একটি রাষ্ট্র একটি দেশ একটি জাতিসত্তার অবলম্বনে এই জৈবিকতা। দায়গুলো আমার জন্মের আগে থেকে তৈরি। বেঁচে থাকার সুন্দরম কিংবা শৈল্পিক আত্মজ্ঞানের নারী ও নক্ষত্রের বাতাবরণে বাস্তবের জীবন ও যৌনতার রঙ ও রেখা নিয়ে নতজানু হতে হয়। নির্মাণের একটি পাথর সরে গেলে ধ্বংস হতে পারি। তখন কোনও নতুন আরোহণ চাই।’
পরিশেষে সেই ক্লান্ত নাবিকের কাছেই আবার ফিরে আসতে হয়। কেননা তাঁর অন্তরে ঢেউ তোলে কবিতার নানান ছন্দ, জীবিকার তাড়ণা তাঁকে সমুদ্রের সমীপবর্তী করলেও তাঁর জীবনে সমুদ্র এক ক্লান্তকর নিঃসঙ্গতা। তাই তো তিনি লিখেছেন,
‘…সমুদ্র মানে হাঙর ও হ্যারিকেন শেষে নিঃসঙ্গ বাতিঘর
সমুদ্র মানে নির্জন অন্ধকার মহাজাগতিক নক্ষত্রের ভিড়
সমুদ্র মানে জলের নিশ্বাস আন্ডারওয়াটার কারেন্ট
শঙ্খচিলের ঠুকরে দেওয়া চোখ।’ (নিখোঁজ দ্বিপের মতো)
সমুদ্রের সঙ্গে আবাল্যসখ্য কাটিয়ে কবি একদিন ফিরে আসেন তাঁর নিজভূমিতে, সেখানে এখন তিনি অতীতচারী এক মানবসন্তানের মত মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে দেখেন আর বর্তমানের অলঙ্ঘ্য বাস্তবতার মধ্যে খুঁজে নেন তাঁর নিজস্ব ঠাঁই। এই যাপন এখন তাঁর কাছে কবিতার মায়াবী অবকাশ হয়ে দেখা দেয়। এবং তাই কেমন যেন এক অনায়াস ভঙ্গিতে তিনি লিখে ফেলেন,
‘যে রাতে আকাশগঙ্গায় সাঁতার কাটি, ফুল্ল কুসুমের গন্ধ ভাসে
অখণ্ড আকাশ আমার শিয়রে নেমে আসে–
তার নীরব জমিতে লতাপাতা না বুনলে আমি বাঁচতাম না।’
এই হল কবি জলধি হালদার, যাঁর কাছে আকাশের চেয়ে বড়ো আর কিছু নেই। এমনকি তাঁর কখনও ঈশ্বরের শরণাগত হতে হলে খোলা আকাশের দিকেই তাকাতে হয়। গভীর ব্যাপ্ত এক আকাশ যেন তার কাছে মহা রহস্যে বাঁধা এক অনন্য প্রাণস্পন্দন। তাঁর এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতেও তাই অনন্য রহস্যঘেরা এক ব্যপ্ত চরাচর আর তার ওপরেই বিরাজ করে অনন্ত আকাশ। আমরা তাই তাঁর কবিতা ভুবনে বিচরণ করতে করতে ঘুরে আসি এক অচেনা অভিজ্ঞতার অর্জনে।
যে অর্জনের মায়াবী রেশ সহসা অপসৃত হয় না।