চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২৪॥ সুশীল সাহা




একটি নির্মাণের নেপথ্যকথা


বছর চল্লিশেক আগে বিজ্ঞাপন পর্ব পত্রিকার পক্ষ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম হাসান আজিজুল হক বিশেষ সংখ্যা করব। এই সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে বলাবাহুল্য আমার একটি সক্রিয় ভূমিকা ছিল। কেননা আমাদের সম্পাদকমণ্ডলীর অপর দু’জন অর্থাৎ রবিন ঘোষ এবং সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায় জানত আমার সঙ্গে হাসানভাইয়ের সুদীর্ঘকালের সম্পর্কের কথা। তাই ওঁদের অনুরোধে পত্রিকার তরফে প্রস্তাবটা আমিই ওঁকে দিই। মনে আছে ১৯৮২ সালের শীতের এক অপরাহ্ণে পিঠে রোদ লাগিয়ে রাজশাহী শিক্ষক আবাসের বারান্দায় বসা মানুষটি আমার প্রস্তাবটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করেই ছিলেন। সম্ভবত আমার এই প্রস্তাব পাবার জন্যে তিনি আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। তখন সবেমাত্র আমরা সমর সেনকে নিয়ে একটি সংখ্যা করেছিলাম। কৃশকায় সেই সংখ্যাটি তখন তাঁর হাতে ধরা। সেটা উলটে পালটে দেখলেন তিনি। তারপর আস্তে আস্তে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় কয়েকটি কথা বলেছিলেন। অনেক আগের হলেও সেই কথাগুলো আজও আমার মনে আছে। তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘আমাকে নিয়ে সংখ্যা তোমরা একটা করতেই পারো, তাতে আমার পূর্ণ সাহায্য ও সহযোগিতা পাবে। কিন্তু আমার লেখাগুলো কি সেই উচ্চতায় পৌঁছেছে যাকে ভিত্তি করে এমন একটা সংখ্যা করা যায়? ব্যক্তিমানুষ নয়, তাঁর কাজ যদি দেশ ও সমাজের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয় তবেই তাঁকে নিয়ে কিছু করা সঙ্গত যেমন তোমরা সমর সেনকে নিয়ে এই কাজটা করেছ। তাই আমার কাজের মধ্যে যদি তেমন কিছু খুঁজে পান আলোচকরা, তাহলেই এই কাজটার একটা মানে দাঁড়াবে।’ জানতাম তাঁকে রাজি করানো খুব সহজ কাজ হবে না। শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিকল্পনা যখন তাঁকে বিস্তারিতভাবে বলার সুযোগ পেলাম, তখন দেখলাম তিনি কিছুটা নরম হয়েছেন। ঠিক হল তাঁর লেখা নিয়ে লিখবেন দুই বাংলার কয়েকজন, লিখিত সাক্ষাৎকার দেবেন তিনি, পুনর্মুদ্রণ করা হবে তাঁর কিছু নির্বাচিত গল্প প্রবন্ধ, সংক্ষিপ্ত জীবনী ও রচনাপঞ্জীর সঙ্গে ছাপা হবে তাঁর একটি নতুন গল্প।

কাজটা যে তেমন সহজসাধ্য ছিল না, সেটা ভাল করেই জানতাম। নানাকারণে প্রায় ছ’বছর লেগে গিয়েছিল সংখ্যাটা বের করতে। কোথায় কলকাতা আর কোথায় রাজশাহী। ডাকযোগের চিঠিপত্রই ছিল একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। এখনকার দিনের মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যাপারটা আমরা তখন কল্পনাও করতে পারতাম না। একটা চিঠি লিখে তার উত্তর পেতে প্রায় একমাস সময় লেগে যেত। সেইভাবেই কাজ শুরু করলাম। পত্রিকার পক্ষ থেকে রবিন ঘোষ এবং সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায় আলাদা আলাদাভাবে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন পাঠিয়ে দিল। লেখার জন্যে অনেককেই বললাম। কেউ কেউ আগ্রহ দেখালেও অনেকেই অত্যন্ত নিস্পৃহভাব দেখালেন। এক্ষণ আর অনুষ্টুপ এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের কল্যাণে হাসান আজিজুল হক তখন পশ্চিমবঙ্গে সুপরিচিত। ১৯৭৫ সালে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চমৎকার ভূমিকা সম্বলিত হাসান আজিজুল হকের গল্প সংগ্রহ বিপুল পাঠকধন্য হয়েছিল। সবটা মিলিয়ে আমাদের ওই উদ্যোগ ছিল সময়োচিত। কিন্তু কাজ শুরু করে বুঝলাম ব্যাপারটা তেমন সহজসাধ্য নয়। অনেক হাঁটাহাঁটির পরে লেখা দিলেন শিবনারায়ণ রায়, নিত্যপ্রিয় ঘোষ, সব্যসাচী দেব এবং বাসুদেব দাশগুপ্ত। বাংলাদেশের সনৎকুমার সাহা একটি লেখা দিলেন প্রায় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে। অনেক চেষ্টা করেও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা পেলাম না। আমার অনুরোধে কবি মোহাম্মদ কামাল হাসান আজিজুল হকের একটি গ্রন্থপঞ্জী করে দিয়েছিলেন। আমাকে লেখা তাঁর কয়েকটি চিঠিকে অবলম্বন করে ‘সেই সুরে বাজে মনে অকারণে’ এই শিরোনামে একটি বড় লেখা তৈরি করলাম। চিঠিগুলোর টীকা লিখতে গিয়ে অনেক ব্যক্তিগত কথাও উঠে এল প্রসঙ্গক্রমে। লেখাটা তৈরি করে ওঁকে পাঠিয়েছিলাম। নানারকম মন্তব্যসহ লেখাটা ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর লিখিত দুটো সাক্ষাৎকারই এসে গেল আমাদের হাতে। ইতোমধ্যে বছর পাঁচেক সময়ও চলে গেছে। এদিকে পত্রিকার অন্যান্য কাজ যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে, তখনও তাঁর গল্প এসে পৌঁছাল না দেখে আমরা বেশ খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়লাম। ওই সংখ্যায় তাঁর বেশ কয়েকটি লেখা পুনর্মুদ্রণ করলেও নতুন গল্প ছাড়া এই সংখ্যা প্রকাশিত হবে না, এমন একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম। সে কথা তাঁকে বারবার জানিয়েও কোনও ফল হল না দেখে আমরা খানিকটা হতাশ বোধ করছিলাম। দুটো ভিন্ন আঙ্গিকে দু’জন দুটো লেখা দিয়েছিলেন। একজন হলেন ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় আর অপরজন আমার তখনকার সহকর্মী দিলীপ ভট্টাচার্য। প্রায় গায়ের জোরে লেখাদুটো ছাপতে দিলেন না রবিন ঘোষ।

ল্যাডলীর প্রতিক্রিয়া জানা হয়নি, তবে দিলীপদা প্রচুর আক্ষেপ করেছিলেন। দেখা হলেই বলতেন কথাটা। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে ওই লেখা ছাপতে না পারার গ্লানিতে আচ্ছন্ন হই আজও। যৌথভাবে কাজ করার এই এক পরম বিপদ। কিছুতেই যে আমরা একমত হতে পারি না। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন বন্ধু জীবন মিত্র। অফসেট মুদ্রণে সেটি তেমনভাবে খুলল না বিধায় নতুন করে একটা সাদামাঠা প্রচ্ছদ করতে হয়েছিল। ছোট কাগজের পক্ষে এমন অপব্যয় দুর্বহ। এজন্যে আমাকে নানা কথাও শুনতে হয়েছিল। সমস্ত মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করেও এমন নানা অসঙ্গতি নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয় যে। তবে নিজের পকেট থেকে নানা কারণে অকাতরে ব্যয় করার হিসেব রাখিনি কখনও, কেউ সেটা দেখতেও চায়নি।
অনেক অপেক্ষার পরে ’৮৮ সালের মে/জুন মাসে হাসানভাইয়ের নতুন গল্প ‘পাব্লিক সারভেন্ট’ এসে আমাদের হাতে পৌঁছাল। পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে আমরা যখন প্রায় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তখন এই লেখার প্রাপ্তি আমাদেরকে সত্যি নতুনভাবে প্রাণিত করল। অবশেষে পত্রিকা প্রকাশিত হল ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে। মূল্য মাত্র কুড়ি টাকা। প্রাণখুলে সেদিন গেয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের গান ‘হৃদয় বাসনা পূর্ণ হল’। পত্রিকা হাতে পেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত মতামত জানালেন হাসান আজিজুল হক। নানাজনের নানা মতামতে যখন প্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি, তখন হঠাৎ করেই পেলাম সনৎকুমার সাহার একটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী চিঠি। আমাদের এই উদ্যোগকে যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন তার কথা আজও মনে আছে। ভাবতে খুব শ্লাঘা বোধ করি যে ওঁকে নিয়ে দুই বঙ্গে আমরাই প্রথম এমন একটি সংখ্যা করেছিলাম।

বিজ্ঞাপন পর্ব পত্রিকার ওই সংখ্যার কথা নানা জায়গায় নানাভাবে উল্লিখিত হতে দেখে খুবই আনন্দ অনুভব করি। ১৯৮৮ সালের হাসান আজিজুল হক আর আজকের তাঁর মধ্যে অনেক তফাৎ। ইতঃমধ্যে তিনি আনন্দসহ নানা পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন দেশে বিদেশে। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘আগুনপাখি’ ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’-এর মতো উপন্যাস। ১৯৮২ সালে যে পরিকল্পনা আমরা করেছিলাম, তার যে একটা সুদূরপ্রসারী রেশ থেকে যাবে সেটা তখন ভাবিনি।
দুঃখের কথা ওই সংখ্যা থেকেই বিজ্ঞাপন পর্ব পত্রিকার সঙ্গে আমার সংশ্রব বন্ধ হয়ে যায়। কী সেই কারণ, অথবা কী কী, সে কথা এখানে অবান্তর। তবে ওই ’৮৮ থেকেই শুরু হল আমার আঠারো বছরের ‘অনুষ্টুপ’ পর্ব।
জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা।