চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২৭ ॥ সুশীল সাহা





ইশারা অবিরত


শঙ্খ ঘোষের গদ্য মানেই এক ঝলক মুক্ত বাতাস। যেন দক্ষিণের খোলা বারান্দা দিয়ে সটান চলে আসা জ্যা মুক্ত তীরের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের এক হঠাৎ আলোর ঝলকানি। কবি হিসেবে যিনি অবিসম্বাদিত, তাঁর গদ্যও যে কত স্বাদু ও মধুর, সে কথা জানেন নিবেদিত পাঠক। কবিতা নিয়ে আলোচনা কেবল নয়, তাঁর স্মৃতিকথা, ভ্রমণবৃত্তান্ত, কিশোর উপন্যাস, অনুবাদ অত্যন্ত মনোগ্রাহী, এমনকি গান, নাটক, সিনেমা থিয়েটার নিয়েও তিনি লিখেছেন। সংখ্যায় খুব অল্প হলেও সেইসব লেখার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। লেখক হিসেবে শ্রী ঘোষের উচ্চতাও যে কত উচ্চ মার্গের তা আমরা এইসব লেখা পড়েই বুঝতে পারি। এমনি বই ‘ইশারা অবিরত’- সিনেমা, থিয়েটার, সঙ্গীত, নৃত্য এবং চিত্রকলা নিয়ে তাঁর নিজস্ব অনুভূতির এক অসামান্য দলিল।

গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘ইশারা অবিরত’ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘আমার নিজের লেখায় অন্য শিল্পের স্পর্শ ছিল কি না, এ-রকম একটা সরাসরি জিজ্ঞাসার উত্তরে লিখতে হয়েছিল সংকলনের প্রথম প্রবন্ধটি। সেই কারণে এই বিশেষ লেখাটি যে একটু বেশিমাত্রায় আত্মকথনমূলক হয়ে উঠেছে মনে হতে পারে, সসংকোচে সেকথাও জানিয়ে রাখি।’ তাঁর মতো অনুপম সুভদ্র মানুষের পক্ষে এমন কৈফিয়তমূলক আত্মবয়ান দেওয়াই সঙ্গত, কিন্তু পাঠক হিসেবে আমাদের প্রাপ্তির ঝুলি কী পরিমাণ সমৃদ্ধ হল, সে আমরাই বুঝি। মনে পড়ে যায় তাঁর লেখা আরেকটা অসামান্য বইয়ের কথা। সেটি হল ‘কবিতার মুহূর্ত’ (অনুষ্টুপ)। তাঁরই লেখা কয়েকটি কবিতার জন্ম মুহূর্তের কথা তিনি জানিয়েছিলেন সেই গ্রন্থে। আমরা বুঝতে পারি সেই নির্মাণ ও সৃষ্টির কিছু অবিস্মরণীয় শিল্পগাথা, যার পিছনে রয়েছে বোধ ও অনুভবের এক অনপনেয় মিশেল।

আমাদের চারপাশে অজস্র ঘটমান দৃশ্যাবলীর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য সৃজন সম্ভাবনা। দেখবার চোখ আর ব্যক্ত করার শিল্প কুশলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর উৎকর্ষতা। শান্তিনিকেতনে রামকিংকরের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে এক একজন যখন এক একরকম ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন তখনই শিল্পী ওইখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে সবাই ছুটে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রকৃত অর্থটি জানতে চেয়েছিলেন। শিল্পী ‘সকলেই ঠিক বলছেন’ বলে ওখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। লেখকের এই বয়ানের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে দৃষ্টি ও বোধের ভিন্নতার একটি স্পষ্ট আভাস। অর্থাৎ ব্যক্তিবিশেষে অর্থের তারতম্যের কথা। পরমপুরুষ রামকৃষ্ণ যেমন একদা বলেছিলেন, ‘যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ’। একইভাবে ‘জলপাইগুড়ির বন্য্যয় অনেক দুর্যোগের মধ্যে একটা ছিল হাত-বাড়িয়ে দেওয়া এক মুমূর্ষু মানুষের অসহায় ভেসে-যাওয়া, স্রোতের টানে রক্ষার্থীর আঙ্গুল ছুঁয়েও ছুঁতে পারছে না’- এই ছবির বিপ্রতীপে কবির চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিস্টিন চ্যাপেলের ছবি ‘আদমের জন্ম’- ‘প্রসারিত দুই বিপরীতমুখী হাতের মধ্যবর্তী ক্ষীণ ব্যবধানের অপরিমেয় বিস্তার যেন ভেসে ওঠে একবার। ‘তিনি তাই কেমন অনায়াসে লিখে ফেলেন সেই ‘আদমের জন্ম নয়’ কবিতার সেই অমোঘ পংক্তি – ‘আমার দক্ষিণ হাতে ওর হাত মেলে না ঈশ্বর’! কীভাবে বিষ্ণু দের কবিতায় মিশে থাকে ছবি, গান কিংবা ভাস্কর্য – নানারকম উদাহরণ দিয়ে দেখান তিনি। ‘তাই তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে প্রত্যক্ষেই আমাদের একটা পুণ্যস্নান ঘটে যায় বহুশিল্পসংগমে’।

এভাবেই লেখক একটার পর একটা উপমা উৎপ্রেক্ষার মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পসমূহের বিকাশের বিচিত্র ধারা, সৃষ্টির নানা মুহূর্ত। প্রসঙ্গত আলেক্স আরনসনের শান্তিনিকেতন বাসের একটি স্মৃতিকথার উল্লেখ করেছেন লেখক। এক সন্ধ্যায় তিনি তাঁর বাসগৃহে আপনমনে পিয়ানোয় সুর তুলছিলেন। সেই সময় তিনি সেই ঘরে একজনের নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পেয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে আছেন। কোনও কথা হয় না। আরনসন যেমন বাজাচ্ছিলেন তেমনই বাজিয়ে যান। একটু পরে তিনি দেখেন যেমন নিঃশব্দে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তেমনই কোনও কথা না বলে বেরিয়ে গেলেন। এখানেই লেখকের একটি সঙ্গত জিজ্ঞাসা আমদের আলোড়িত করে, “হতে কি পারে যে নিজের ঘরে ফিরে সেই সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ওরই আবহ নিয়ে লিখে উঠেছিলেন আমাদের পরিচিত কোনো কবিতা বা গান?” এই হল শঙ্খ ঘোষ! সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিষয়গুলো যাঁর নজর এড়ায় না। আপাততুচ্ছ উপেক্ষণীয় বিষয়ের মধ্যেও তিনি খুঁজে পান সম্ভাবনার বিরাটত্ব, “স্বপ্নের মধ্যে কোনো একবার হয়তো ভেসে ওঠে আকাশ, নক্ষত্রলোক, যেন মৃত্যুপরপারের, কোনো বিশালতায় দাঁড়িয়ে সুরের চালনা করছেন কোনো মহাকায় পুরুষ, দেখতে পাচ্ছি তাঁর দীর্ঘ হাতের ওঠানামা, আর সেই জাদুদণ্ড, তারাগুলি ঝলমল করছে আকাশে যেন বহু সুরের সংগতিতে, জীবনমৃত্যু একাকার হয়ে গিয়ে ফুটে উঠতে থাকে কিছু শব্দ, তৈরি হয়ে যায় কোনো কবিতা। এ-অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে ভিন্ন আরেক রকমের অর্কেষ্ট্রা, যেন বহু শিল্পের ইশারাভরা বহু সুরের কোনো সংগতি।‘

শঙ্খ ঘোষের মতো একজন বিদগ্ধ মানুষের কলম থেকে যে কোনও বিষয়ের অনুষঙ্গ একটা অন্যরকম মাত্রা পেয়ে যায়। তাই এই গ্রন্থের দ্বিতীয় লেখা ‘রেখানাট্যের নটী’র মধ্যে ছবি আর নাচ নিয়ে কিছু জরুরি সন্দর্ভের আভাস আমরা পেয়ে যাই। আভাস এই কারণে যে লেখক তাঁর অনুভূতিকে আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিতে চান আভাসে ইঙ্গিতে, তাত্ত্বিক আলোচকের মতো বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তাঁর অনীহা – হয়ত কবির গদ্য এমনই হয়, কিছুটা ইঙ্গিতময়, কিছুটা আলো আধারীর সংগোপন উদ্ভাসে মোড়া। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের দুটি সৃজনশীল কর্মকাণ্ড অর্থাৎ চিত্রকলা ও নৃত্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লেখক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত গ্রন্থের ছোট্ট একটি অধ্যায় যার শিরোনাম ’ছবি আর নাচ’ নিয়ে আমাদের অনেক জরুরি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। প্রসঙ্গত প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ইসাডোরা ডানকানের একটি নৃত্যনির্মিতির (দি ডান্স অফ দি ফিউচার) জন্মবৃত্তান্তের আভাস তিনি দিতে চান- “বতিচেল্লির একটি ছবির সামনে দিনের পর দিন বসে থাকতেন ইসাডোরা ডানকান। তাঁর মনে হতো সে-ছবির ফুলগুলি যেন প্রাণ পেয়ে জেগে উঠছে, নৃত্যপর হয়ে উঠছে শরীর, যেন এক আনন্দের খবর বয়ে আনছে ছবিটি। মনে হলো একদিন, এই ছবির রহস্য যদি ঠিকমতো তিনি বুঝতে পারেন, জীবনের ঐশ্চর্য আর মাধুর্য তবে তিনি ভরে পারেন তাঁর নিজের নাচের মধ্যে।“

প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথের ‘ছবি আর নাচ’ শীর্ষক একটি ছোট্ট অধ্যায়ের উল্লেখ করেছেন লেখক। জীবনের শেষ পর্বে কবি এই দুই শিল্পকর্মে নিজেকে খুব বেশি রকমের নিয়োজনে ব্যস্ত ছিলেন, তাই ছবি আর নাচের মধ্যে এক সূক্ষ্ম অন্তঃসম্পর্কের সম্ভাবনার ইঙ্গিত তিনি দিতে চান। এই হল শঙ্খ ঘোষ, নিজের ভাবনাকে অপরের ওপর তিনি কখনোই চাপিয়ে দিতে চান না। কেবলমাত্র একটু ইঙ্গিত বা ইশারার মধ্যেই থাকতে চান তিনি, সবটাই ছেড়ে দিতে চান পাঠকের বিবেচনার ওপর, অবশ্য নিজের বিশ্বাস থেকে তিনি কখনোই সরে আসেন না। সেই কারণেই হয়ত তিনি কবিগুরুকে উদ্ধৃত করে লেখেন, “যে-কোনো দৃশ্যরূপের সঙ্গে সুরকে এইভাবে মিলিয়ে দেখা বা তার মধ্যে একটা ছন্দপ্রবাহ লক্ষ্য করা রবীন্দ্রনাথের এটা অনেকদিনের অভ্যাস। প্রকৃতির দিকে তাকাতে গিয়ে তার রঙের ঐশ্বর্য যখন দেখেন, তার বর্ণনা করেন এই ভাষায়: ‘রঙের তান উঠেছে, তানের উপর তান।‘ জলের উপর রঙ ছড়িয়ে পড়লে তাঁর মনে হয়: ‘রঙের আভায় আভায় জল যে কত বিচিত্র কথাই বলতে পারে তা কেমন করে বর্ণনা করব। সে তার জলতরঙ্গে রঙের যে গৎ বাজাতে থাকে, তাতে সুরের চেয়ে শ্রুতি অসংখ্য ।‘ আবার অন্যদিকে বৈশাখের রুদ্রদাহে তিনি দেখেন ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন– আকাশে / নিঃশব্দ প্রখর / ছায়ামূর্তি তব অনুচর’। এখানে নর্তন আছে কিন্তু নর্তক নেই, এখানে ‘নৃত্যের ভঙ্গি দেখি, ভাব দেখি, কিন্তু নটী কোথায়? কেবল একটা আভাস মাঠের উপর দিয়ে ঘুরে যায়। নাচ আর ছবিকে মিলিয়ে নেবার এ এক অসামান্য বিবেচনা, ঠিক ‘বতিচেল্লির ছবি থেকে যেমন এক রেখায় ছন্দকে শরীরে তুলে নিয়েছিলেন ইসাডোরা ডানকান।‘

‘সুর বনাম সুরবিহার’ প্রবন্ধটিতে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গীত ভাবনার এক সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথের গানের রকমফের নিয়ে তিনি প্রভূত উদাহরণ সহযোগে নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করেছেন। গানের বাণীতে স্রষ্টা যে সুরারোপ করেন, সেই কাঠামোর বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা কতখানি নিতে পারেন শিল্পী তা নিয়েও মন্তব্য করেছেন লেখক। বর্তমানকালে, বিশেষ করে কপিরাইট উঠে যাবার পরে গায়নরীতি এবং যন্ত্রানুষঙ্গে যে অবাধ স্বাধীনতা নিচ্ছেন শিল্পীরা, এর স্রষ্টারা- সেখানে এই আলোচনাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লেখক জানান, “নিছক সুরটাই তাঁর গান নয়, নিছক কবিতাটাও নয় তার গান, তাঁর গান এ-দুয়ের ওতপ্রোত সম্মিলন। ভিন্ন সুরের যোজনায় কিংবা সুরবিহারের বিস্তারে, সে হয়ে ওঠে ভিন্ন এক গান, তাকে রবীন্দ্রনাথের গান বলা যাবে কেমন করে?” প্রসঙ্গত লেখক সবিনয়ে জানান সুরবিহার শব্দটি ইংরেজি ইম্প্রোভিজেশন-এর বঙ্গানুবাদ।

এই গ্রন্থের সবচেয়ে অবাক করা দু’টি নিবন্ধ চলচ্চিত্র বিষয়ক। ‘কল্পনির্ঝর’ এবং ‘চলচ্চিত্র ও কবিতা’ শীর্ষক দুটি নিবন্ধ চলচ্চিত্র সম্পর্কে লেখকের গভীর জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের পরিচায়ক। আশির দশকের গোড়ায় সন্দীপ রায় সম্পাদিত ‘কল্পনির্ঝর’ নামে চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি চমৎকার পত্রিকা প্রকশিত হয়। প্রথম সংখ্যাতেই ‘কল্পনির্ঝর’ শিরোনামে শঙ্খ ঘোষ একটি অসাধারণ নিবন্ধ লেখেন। প্রসঙ্গত জানাই যে এই পত্রিকার নামকরণ তিনিই করে দেন। নিবন্ধের শুরুতেই সুইডিস চলচ্চিত্রকার বার্গম্যানের কালজয়ী চারিটি ছবি ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’, ‘সায়লেন্স’, ‘সেভেন্থ শীল’ ও ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ সম্পর্কিত তাঁর নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছন। অতি সংক্ষেপে ব্যক্ত হলেও চলচ্চিত্র সম্পর্কে লেখকের গভীর অনুভবের পরিচয় আমরা এতে পেয়ে যাই। ‘কল্পনির্ঝর’ শিরোনামে পরের লেখাটিতে আমরা অন্য আর এক শঙ্খ ঘোষকে পাই। ১৯৩৫ সালে সবাক চলচ্চিত্রের যুগে এডোয়ার্ড টমসন যে রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে ছবি করার ভেবেছিলেন, এ নিয়ে কবির সঙ্গে তাঁর কথাও হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন যে যুগের নামি চলচ্চিত্রকার আলেক্সজান্ডার কোর্ডা ও ফ্লাহার্টির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে। তাঁর মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে ছবি হলে ভারতবর্ষের একটা সঠিক চেহারা পাওয়া যাবে। তাঁদের বিবেচনায় ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘গোরা’ ইত্যাদি উঠে এসেছিল। উদ্যোগ সফল হয়নি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লেখার জোর সম্পর্কে আমরা একটা আভাস আমরা এ থেকেই পেয়ে যাই। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকেই সবচেয়ে বেশি ছবি নির্মিত হয় ভারতে। যদিও তুল্যমূল্যের বিচারে সত্যজিৎ রায় এবং তপন সিংহকে কেউই অতিক্রম করতে পারেননি। এইসব তথ্য অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় লেখক ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় নির্মিত ‘নাগরিক’, ‘পথের পাঁচালী’ এবং ‘নিম অন্নপূর্ণা’ সম্পর্কে লেখকের গভীর অনুধ্যানের পরিচয় আমরা পেয়ে যাই। এভাবেই তিনি চলে আসেন সিনেমার কথা ভেবে লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘শিশুতীর্থ’র প্রসঙ্গে । সেই না হওয়া ছবির ইতিহাস আজ সর্বজনবিদিত। এরপরই তিনি লেখেন অপর্ণা সেনের ‘যুগান্ত’ ছবি নিয়ে। এই ছবি যেন আগাগোড়া কবিতায় মোড়া। শঙ্খ ঘোষের কবিসত্তা এই ছবিতে খুঁজে পান কবিতার চমৎকার ব্যবহার। একটির পর একটি দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে তিনি ছবির মধ্যকার কবিতার লক্ষণগুলোকে স্পষ্ট করেন। কবির চোখ দিয়ে দেখা এ এক অপরূপ অভিজ্ঞতা। উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি তাই লেখেন “… বিশ্বচরাচরকে সামনে নিয়ে এসে, অতিকথায় লোককথায় ভরপুর করে রেখে, প্রকৃতি-মানুষকে মেলানো এমন এক আতুর ছবি হয়ে ওঠে ‘যুগান্ত’, যা আমাদের সম্পূর্ণতই টেনে নিয়ে নেয় কোনো কবিতার অভিজ্ঞতার দিকে। অপর্ণা সেনের ‘যুগান্ত’ চলচ্চিত্রের কবিতা। ‘প্রতিটি দৃশ্যের চিত্ররূপ চোখের দেখাকে অতিক্রম করে পৌঁছে যায় চেতনার উদ্ভাসে’ এমন এক ছবির স্বপ্নের কথা বলেছিলেন অপর্ণা বলেছিলেন কিছুদিন আগে তাঁর এক প্রবন্ধে। ‘যুগান্ত দেখে মনে হয়, তাঁর সেই স্বপ্নেরই যেন এই কল্পনির্ঝর’।

এই গ্রন্থের চলচ্চিত্র বিষয়ক আরেকটি অনবদ্য গদ্য হল ‘চলচ্চিত্র ও কবিতা’। কবিতা তো আসলে চিত্ররূপময় এক কল্পনা, আর সেই চিত্ররূপের এক বিস্তার যখন দেখি চোখের সামনে, তখন চলচ্চিত্রের স্রষ্টাকেও মনে হয় এক অসামান্য কবি। আসলে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বাস করে একজন কবি। কেউ কেউ তাঁর সেই অনুভবের দ্যোতনা ফুটিয়ে তুলতে পারেন কলমের আঁচড়ে, আর চলচ্চিত্রকারেরা ক্যামেরার চোখ দিয়ে মাঝে মাঝেই আবিস্কার করেন দৃশ্যরূপের কাব্যময়তা, তার সঙ্গে ধ্বনি ও রঙের প্রলেপ এক মায়াজাল বিস্তার করে, আর তখনই তা হয়ে ওঠে একেকটি অনন্য কবিতা। চার্লি চ্যাপলিনের ‘লাইমলাইট’ ছবিটি দেখার পরে লেখকের কাছে এক বন্ধুর অকপট অভিব্যক্তি, ‘এ একেবারে কবিতার মতো’। বন্ধুর নামটি জানান নি তিনি, তাই আমরা ধরেই নিই, এই সিদ্ধান্ত লেখকের নিজেরও। তাঁর নিজের ভাষায়, “ যা-কিছু আমাদের আচ্ছন্ন করে দেয়, তার সঙ্গে কবিতা বা গানের তুলনা করবার একটা অনায়াস অভ্যাস আমাদের আছে । কোনো কোনো গদ্যলেখা পরেও আমরা বলে উঠি অনেক সময়ে- ‘কবিতার মতো’। কোনো বক্তৃতা শুনেও হয়তো-বা বলি তা, এমনকি কারো কথা-বলা শুনেও । কবিতার জন্যে অন্য অর্থে কিছুমাত্র যোগ না থাকলেও, কেন এমন বলি? বলি, সাময়িকভাবে আমাদের যুক্তিবুদ্ধিটা সরে যায় বলে।‘
এই লেখার দ্বিতীয় অংশে বিভিন্ন ছবির অংশবিশেষ উল্লেখ করে লেখক আমাদের নিয়ে যান কবিতার অনন্ত জগতে । চার্লি চ্যাপলিন নির্বাক ছবির পক্ষে ছিলেন। তাঁর অবিস্মরণীয় বেশ কিছু ছবি নির্মিত হয়েছিল নির্বাক পদ্ধতিতে। ঠিক একইভাবে নির্মিত হয়েছিল আইজেন্সটাইনের বিশ্ববিখ্যাত ছবি ‘ব্যাটলশিপ পটেমকিন’। ওইসব ছবির ছবিই সব কথা বলে দিত। চ্যাপলিন ভাবতেন ছবিতে সংলাপ জুড়লেই তা হয়ে যাবে ‘থিয়েট্রিক্যাল’। তবে সময়ের দাবি মেনে ছবিতে সংলাপ এসে গেল। চ্যাপলিনকেও তাঁর পরবর্তী ছবিগুলোতে সংলাপ জুড়তে হয়েছিল। কিন্তু কবিতার অনুভবের জন্যে

ছবির বিশেষ বিশেষ অংশ হয়ে থাকল সংলাপবিহীন। প্রসঙ্গত ‘পথের পাঁচালী’ ছবির বিভিন্ন অংশের কথা উল্লেখ করে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে দৃশ্যের পর দৃশ্যের অনুপম সজ্জায় দর্শকদের মনের মধ্যে কতভাবে কবিতার অনুভব সঞ্চারিত করা যায়।

একইভাবে সত্যজিৎ রায়ের রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ বিভিন্ন দৃশ্যের উদাহরণ দিয়ে চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন সিনেমায় কীভাবে ধ্বনি আর দৃশ্যের সহযোগে কবিতার অনুভব সঞ্চারিত করা যায়। আগাগোড়া ছবিতে আছে পাহাড় আর কুয়াশার পটভূমি। মানুষের মনের নানান অনুভূতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে কুয়াশার ব্যবহার করেছেন পরিচালক, একইভাবে ফেলিনির ‘লা দোলচে ভিতা’ ছবিতে আছে দৃশ্য পরম্পরায় জলের অনুষঙ্গ। আসলে কবিতা বোঝার জন্যে যেমন চাই অনুভূতির সূক্ষ্মতা, তেমনি চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত দৃশ্যাবলীতে ছড়িয়ে থাকা কবিতার উপকরণের স্বাদ অনুভব করার জন্যে চাই দেখার চোখ। লেখক পাঠকের সেই তৃতীয় চোখের উন্মীলন ঘটিয়েছেন। সত্যজিতের অন্য আরেকটি ছবি ‘আগন্তুক’-এ এবং ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবিতে যেভাবে নাচের ব্যবহার করেছেন, তাও লেখকের মরমী কলমে মূর্ত হয়েছে। একইভাবে কুরোসাওয়ার ‘ডোডেসকাডেন’ ছবির প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “বস্তির নানা দিকে নানা ঘরে চলছে নানারকমের সমস্যাভরা উদ্ভট জীবন, মধ্যবর্তী এই কলতলায় পাঁচ-ছ’টি নারী তা নিয়ে গুঞ্জন করে মাঝে মাঝে, কখনো কোন্দল। এইখানে কুরোসাওয়া তাঁর এই মেয়েদের বসার কিংবা দাঁড়াবার ভঙ্গিমায়, ঘুরে দাঁড়ানোর বা হাত-পা নেড়ে কথা বলার চালে এনে এন বেশ একটা ছন্দ। তদের শরীরে লাগে হিল্লোল, দু-এক সময়ে মনে হতে পারে যেন এসে যাচ্ছে কোনো ব্যালেরই ইশারা।‘ এইভাবে লেখক নিয়ে এসেছেন ফেলিনির ‘আমারকর্ড’, ককতোর ‘ব্লাড অফ এ পোয়েট’ কিংবা বুনুয়েলের ‘দি এজ অফ গোল্ড’-এর প্রসঙ্গ এবং একই সঙ্গে ঋত্বিকের ‘নাগরিক-এর নানা দৃশ্যের কথা। এই ছবিতে দু’মিনিটের একটি নিঃশব্দ দৃশ্যও বাঙময় হয়ে ওঠে দৃশ্যায়নের গুণে। লেখক এইভাবেই নানা উপমা উৎপ্রেক্ষার মধ্য দিয়ে মাত্র দু’টি প্রবন্ধেই পরিচয় দিয়েছেন তাঁর গভীর চলচ্চিত্রবোধ ও প্রজ্ঞা।

এর পরের দুটি প্রবন্ধ ‘নাটমঞ্চের দিশা’, এবং ‘অভিনেতার চোখ অভিনয়” মূলত নাটক নিয়ে। পরিশিষ্টে যুক্ত ‘গিরিশচন্দ্রের বিচার’ অভিনব আঙ্গিকে লেখা হলেও এটিও নাটক সংক্রান্ত। একটি গ্রন্থকে কেন্দ্র করে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলে এসেছেন এক অমীমাংসীত সিদ্ধান্তে।
আধুনিক বাংলা নাটকের ইতিহাসে ‘বহুরূপী’ নাট্যগোষ্ঠীর অবদান অনস্বীকার্য । সত্তর বছরের অধিক সময় ধরে বাংলা তথা এই উপ-মহাদেশে এঁরা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। এই দলের প্রাণপুরুষ শম্ভু মিত্রের প্রতি সপ্রশংস শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন লেখক তাঁর প্রথম লেখার শুরুতেই। বহুরূপীর প্রথম দিককার প্রযোজনা ‘ছেঁড়া তার’ ও ‘উলুখাগড়া’ দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন লেখক অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়। তাঁর এই ভাষা আরোপিত মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন নয়, বরং একজন বোদ্ধা দর্শকের চুলচেরা বিশ্লেষণে ভরা। শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র যে কতখানি নাটকে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তা লেখক তাঁর অল্প কয়েকটি কথায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এই লেখারই অন্য অংশে আমরা পাই বহুরূপীর বহু নাটকের মঞ্চস্থাপত্য নির্মাতা খালেদ চৌধুরী সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল লেখা। নাটক তো শুধুমাত্র একজন পরিচালকের একক কীর্তি নয়। অভিনেতারা ছাড়াও মঞ্চের নেপথ্যের কারিগরেরা যে পরিশ্রম করেন, তার ওপরেই নির্ভর করে নাটকের সাফল্য অসাফল্য। তাই খালেদ চৌধুরীর অবদান সমৃদ্ধ নাটকগুলির প্রসঙ্গে অসাধারণ এই প্রতিবেদন। ভাল লাগে তাঁর অসংখ্য নির্মাণের মধ্য থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে তিনি যেভাবে দেখিয়েছেন খালেদ চৌধুরীর অনন্যতা। একইভাবে আলোর জাদুকর তাপস সেন সম্পর্কেও চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন লেখক ‘প্রচ্ছন্ন এক প্রকাশ্যতা’এই অধ্যায়ে। বহুরূপীর প্রযোজনা কেবল নয়, বাংলা নাটকের ইতিহাসে তাঁর আলো প্রক্ষেপনের নানা কৃৎকৌশল রীতিমতো বিস্ময়কর। অতি সাধারণ জিনিসপত্র দিয়ে তিনি বাংলা মঞ্চে যা দেখিয়েছেন তাকে বৈপ্লবিক আখ্যা দিলেও মনে হয় সব বলা হয় না। তাঁর এই আলোর জাদু কখনো কখনো মূল নাটকের আকর্ষণকেও ছাপিয়ে যায়। লেখক সেই প্রবণতাকেও ছুঁয়ে গেলেও তাপস সেনের অনন্যতা সম্পর্কে নিঃসন্দিহান তিনি। বলাবাহুল্য আমরাও তাঁর সঙ্গে একমত না হয়ে পারি না। তাপস সেনের অনন্য কাজগুলো যাঁরা দেখেছেন তাঁরা আমার সঙ্গে আশাকরি একমত হবেন।

এই গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশে যুক্ত হয়েছে একেবারে অন্য আঙ্গিকের একটি লেখা। লেখাটি আদ্যন্ত সংলাপে ভরা। মনে হয় যেন কফি হাউস বা বসন্ত কেবিনে আড্ডাচ্ছলে তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন কয়েকজন বুদ্ধিজীবী। এঁদের একজন হলেন অধ্যাপক, একজন সমালোচক, একজন তরুণ পাঠক, আরেকজন হলেন বেশ চটপটে অর্থাৎ লেখকের ভাষায় ‘লায়েক’। এঁদের প্রত্যেকের আদ্যক্ষর নিয়ে এই গোষ্ঠীর নাম দিয়েছেন তিনি, ‘অ স ম ত ল’। অসমতল এই শব্দবন্ধের মধ্যেই রয়েছে বিষয়টির আভান। আলোচনাটি মূলত উৎপল দত্তের ‘গিরিশ মানস’ বইটি নিয়ে। বইটি প্রসঙ্গে এই পাঁচজন এক ধুন্ধুমার বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন। সাধারণত এইসব ক্ষেত্রে যা হয়, সকলেই যাঁর যাঁর নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল এবং তার সপক্ষে একটার পর একটা যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন। প্রয়োজনে বই থেকে নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। লেখক থেকেছেন আড়ালে। এই ধরনের আলোচনা আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়েরই চুরচেরা বিশ্লেষণ। বিষয়টি নাটক নিয়ে হলেও গ্রন্থ সমালোচনা। তাই এর জায়গা হয়েছে পরিশিষ্টতে।

মূলত কবি অধ্যাপক হিসেবে যাঁর খ্যাতি, যাঁর লেখা কবিতা বিষয়ক নিবন্ধ, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যুক্তিসিদ্ধ আলোচনা আমাদের ঋদ্ধ করে, তাঁরই এক অন্য পরিচয় আমরা পেয়ে যাই এই গ্রন্থে। আপাত বিযুক্ত মনে হলেও কবিতার সঙ্গে সিনেমা থিয়েটার, নৃত্য গীতের যে নিবিড় সংযোগ তাকেই সামান্য কয়েকটি আঁচড়ে মূর্ত করেছেন শঙ্খ ঘোষ। একেকটি লেখা যেন একেকটি দিগন্তের আভাস দেয়। আমরা পেয়ে যাই একজন ক্রান্তদর্শী মানুষের নানা নান্দনিক বিশ্লেষণ, যা কোনোমতেই তাত্বিক সিদ্ধান্তের ভারে নুব্জ নয়। এমন সহজবোধ্য অথচ কল্পনা বিস্তারে সহায়ক গ্রন্থের জন্যে তাঁকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আরো কিছু জানবার আগ্রহ উদ্রেককারী এই নিবিড় অনুধ্যানকে আমি তাই কুর্নিশ জানাই।