চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২৮ ॥ সুশীল সাহা



কাজের লোক


বাড়িতে এক বা একাধিক কাজের লোক না হলেই তো নয়, বিশেষ করে এ দেশে। কেউবা দিদি আবার কেউবা মাসি হয়ে বাড়িতে থাকে আবার কেউবা বাড়ির মেয়ে হয়ে অনেক ছোট থেকে বড় হতে হতে বিয়ে করে চলে যায় শ্বশুরবাড়িতে। সব আয়োজন করে বাড়ির মানুষেরা এক ধরনের কৃতার্থতা বোধ করেন। কিন্তু নানাসময়ে নানারকম উলটো ব্যাপারও যে ঘটে যায়। খবরের কাগজ খুললে দেখা মেলে কত না দুর্ঘটনার খবর। বাড়ির পরিচারিকার হাতে খুন কিংবা গয়নাগাটি টাকা পয়সা সব নিয়ে উধাও হবার ঘটনাও আকছার ঘটে আজকাল। এ সবই জানা যায় ওই খবরের কাগজ থেকেই। তবু কাজের লোক না হলে যে চলে না আমাদের। অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনার পথ বেয়ে এগিয়ে চলে আমাদের জীবন। নিত্যকার যাপনের মধ্যে আর দশটা প্রয়োজনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে বাঁধা এই কাজের লোক।
যাদের বাড়িতে এই কাজের লোক লাগে না সেইসব ব্যতিক্রমী কিছু পরিবারের কথা এই লেখায় আসবে না। ব্যতিক্রম তো সবসময় ব্যতিক্রমই। সেইসব প্রসঙ্গের মধ্যে না গিয়ে চলে আসি আমার জানা কয়েকটা বাড়ির কথায়, তাদের কাজের লোকের কথায়। ভালমন্দ মেশানো সেইসব অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে আমার জানা কয়েকটি ঘটনার বিবরণ দেওয়াই আমার উদ্দিষ্ট।
শুরু করছি একটি কষ্টেভরা বীভৎস ঘটনা দিয়ে। শিউরে ওঠার মতো ঘটনাই বটে। শুনেছিলাম আমার এক বন্ধুর কাছে। তাঁর পরিচিত এক দম্পতি যারা দুটো সংস্থায় কাজ করে। থাকে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে। তাদের একসময় একটি সন্তান এলো। অনেক ভাবনাচিন্তা করে তারা তাদের সন্তানকে এই পৃথিবীতে এনেছে। সর্বক্ষণের একজন স্মার্ট শিক্ষিত মেয়েকে ওরা পেয়েছিলেন মোটা টাকার বিনিময়ে। ছুটিতে বাড়িতে থেকে ওই মেয়েটিকে সব কাজ দিতে থাকলেন তিনি। কাজের মেয়েটিও চটপট সব বুঝে নিতে থাকল। মাতৃত্বকালীন ছুটি ফুরোবার পরে মেয়েটির ওপর বাচ্চাটির দায়িত্ব দিয়ে কাজে যোগ দিতে যায় মা। সারাদিন বাচ্চাটা থাকে ওই মেয়েটির কাছে। খুব বিশ্বাসী পরিশ্রমী ওই মেয়েটির ওপর সব ছেড়ে দিয়ে ওই দম্পতি খুব খুশি। সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে ওই কাজের মেয়ে তার বাড়িতে যায়। ফিরে আসে তার গ্রামের বাড়ির কলাটা মুলোটা নিয়ে। কীভাবে সে যেন এই বাড়িরই একজন হয়ে গেছে। এইভাবেই চলতে চলতে বাচ্চাটি তখন সবে হাঁটতে শিখেছে, এমন সময় দেখা গেল তার অসুস্থতার লক্ষণ। এতদিন তো ভালই ছিল, হঠাৎ কী হল কে জানে, বাচ্চাটি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকল। ডাক্তার দেখানো হল। সমস্যা একটাই, ‘রক্তাল্পতা’। চিকিৎসা শুরু হল। ভাল ওষুধ আর পথ্যের ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু কিছুতেই ওর রোগের নিরাময় হয় না। ওই দম্পতি খুবই ভেঙ্গে পড়লেন। এমন একদিনে প্রতিবেশি এক বান্ধবী মেয়েটিকে বললেন তার দেখা একটা ঘটনার কথা। ওই দম্পতি অফিসে চলে গেলে মাঝে মাঝেই নাকি একটা গাড়ি এসে থামে ওই ফ্ল্যাটের কাছে। দু’তিনজন মানুষ নাকি কীসব নিয়ে ওখানে ঢোকে এবং বেশ কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়। উদ্বিগ্ন মা এবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তার সেই বান্ধবীর বাড়ির জানালার কাছে বসে থেকে দেখতে চাইলেন সত্যি সত্যি কেউ বা কারা ওই সময়ে আসে কিনা। মেয়েটি অবশ্য অন্যান্য দিনের মতো যথাসময়ে অফিসে যাচ্ছেন বলে বেরিয়ে ঘুরপথে ওই বান্ধবীর ফ্লাটে চলে আসতে থাকেন, কয়েকদিন ছুটি নিয়ে। তারপর অপেক্ষা এবং অপেক্ষা। তারপর সত্যি সত্যি একদিন সে দেখল একটি গাড়ি এসে থামল ওখানে এবং তা থেকে দু’জন মানুষ বেরিয়ে এসে ঢুকল তাদের ফ্লাটে। তারপর ওই মেয়েটির ক্ষিপ্র তৎপরতায় থানা পুলিশ ইত্যাদি করার পরে ধরা পড়ল ওই রক্তপাচার চক্র। আসলে বাচ্চাটির রক্ত ছিল ‘ও’ নেগেটিভ। নানাভাবে চিকিৎসা করার পর বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে উঠল। এরপরে মেয়েটি আর কাজের লোক রাখেনি। চাকরিটাই ছেড়ে দিয়েছিল বাচ্চার জন্যে। ঘটনাটি জানার পরে পুরো ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠেছি।
গ্রাম্য অশিক্ষিত মধ্যবয়স্কা লক্ষ্মীদি ছিল আমাদের এক বন্ধুর বাড়ির সর্বক্ষণের গৃহ পরিচারিকা। অতি অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে ওই বাড়িতে ওর ঠাঁই হয়েছিল। ওকে সবাই ওদের বাড়ির লোকই মনে করত। সেই ছোট্টবেলা থেকে ওই বাড়িতে থাকতে থাকতে কখন যে তার যৌবন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, কেউ জানে না। এক সময় আমার বন্ধুর বাড়ির সবাই সীমান্ত পেরিয়ে কোনওরকমে এই বঙ্গে এল। সঙ্গে লক্ষ্মীদি। চরম কষ্টের মধ্যে তখনকার দিনগুলোয় লক্ষ্মীদি ক্রমশ হয়ে উঠল ওদের পরিবারে একজন বাড়তি সদস্য। কৃচ্ছসাধনের সেই সময়ে কাজের লোকের বিলাসীতা ভুলে গিয়েছিল আমার বন্ধুর পরিবারের সবাই। কিন্তু লক্ষ্মীদিকে ওরা তাড়িয়ে দেয়নি। অনেক কষ্টের মধ্যেও কোনরকমে সবার সুখ দুঃখ ভাগ করে লক্ষ্মীদি ঘরের এককোণে নিজের ঠাঁই করে নিয়েছিল। উনিশ শ একাত্তর সালের নয় মাসের দুঃসহ সময় পেরিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শেষে অন্যান্যদের মতো বন্ধুর বাড়ির সবাই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্মীদি যায়নি, যেতে পারেনি। যুদ্ধশেষ হবার আগেই এক দূরারোগ্য রোগের শিকার হয়ে প্রায় বিনা চিকিৎসায় সে প্রয়াত হয়। আমার বন্ধুর পরিবারের সবাই তার প্রয়াণের স্মৃতি বুকে নিয়ে অত্যন্ত বিষণ্নচিত্তে দেশে ফেরে। লক্ষ্মীদি থেকে যান ওদের মনোগহনের নিভৃত কুঠুরীতে।
অরুণ সেনের বাড়িতে দেখেছি শকুন্তলাকে। সেই কবে কোন ছোট্টবেলায় ওঁদের বাড়িতে এসে ওঁদের পরিবারের একজন হয়ে যায় সে। লেখাপড়া শিখিয়ে শকুন্তলাকে অরুণদারা বিয়ে দিয়েছিল এক ভাল পরিবারে। বিয়ের সমস্ত আয়োজন ওঁরা এমনভাবে করেছিলেন যাকে কিছুতেই একজন কাজের লোকের দায় উদ্ধার বলা যাবে না। শকুন্তলা শ্বশুরবাড়িতে তার ঘর সংসার করার পাশাপাশি অরুণদার পরিবারের খোঁজখবর সব সময় নেয়। মাঝে মাঝে আসে। অরুণদা চলে যাবার পরেও তার সেই কর্তব্যে ঘাটতি পড়েনি। কাজের মেয়ে নয়, শকুন্তলা ওই তকমা উড়িয়ে কখন যে ওদের মেয়ে হয়ে গেছে, কেউ টের পায়নি। এরই বিপ্রতীপে সন্ধ্যা নামের একটি মেয়ের কথা জানি। সে এসেছিল প্রতিবেশী এক পরিবারে ওই কাজের লোক হয়েই। তাকেও ওঁরা বাড়ির মেয়ের মর্যাদা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু অতি লোভের ফাঁদে পা দিয়ে সেই সন্ধ্যা কোথায় হারিয়ে গেল। পাড়ার যুবকদের সঙ্গে তার খুব মেলামেশা ছিল। একদিন সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সে কোথায় হারিয়ে গেল। অনেক খোঁজ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পাড়ার সেই ছেলেটি একদিন ফিরে এসেছিল। নানা গালগল্প দিয়ে দিয়ে সে তার অন্তর্ধান রহস্যের ইতি টেনেছিল। সন্দেহ হয়, লোভের বশবর্তী হয়ে সন্ধ্যা হয়ত পাচার হয়ে গেছে। যদিও এই রহস্যের কোনও কিনারা হয়নি। সবাই তাকে ভুলে গেছে। প্রান্তিক মানুষের কথা কেইবা মনে রাখে।
কাজের লোকের সাতকাহন নিয়ে বেশিদূরে যেতে চাইনা। কেননা ভালমন্দ নানা অভিজ্ঞতাই আছে সবার। বিদেশে এই ব্যাপারটা প্রায় নেই-ই। ওখানে সবাইকে নিজেদের কাজ করে নিতে হয়। ওখানে কাজের লোক মানে রীতিমতো সম্মাননীয় এক মানুষ। তাকে সম্মান শুধু নয়, ভাল রকমের সম্মানীও দিতে হয়। তাই খুব উচ্চবিত্তের মানুষ ছাড়া কাজের লোক রাখার কথা ভাবতেই পারে না। কিন্তু এই তৃতীয় বিশ্বে, যেখানে কাজের লোক পাওয়া যায় অতি সস্তায় সেখানে প্রতি ঘরে ছোট বড় মাঝারি কাজের লোক চাইই চাই। আর সেই চাওয়াকে কেন্দ্র করে যত অশান্তি আর নানা দুর্ঘটনার ঘনঘটা।
কাজের লোক নিয়ে আমাদের অবশ্য কোনও মাথাব্যাথা নেই। কারণ বিন্দু মন্ডল নামের মেয়েটি আমাদের এই হৃদয়পুরে আসা থেকে কাজ করে যাচ্ছে। সে নিজেই একদিন বলেছে সব বাড়ির কাজ ছেড়ে দিলেও আমাদের কাজ সে কোনওদিন ছাড়বে না। সাতাশ বছর ধরে সে তার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছে। ইতঃমধ্যে সে স্বামীহারা হয়েছে। বয়সের ঢল নেমেছে শরীরে, তবু সে আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে আছে। এটা সম্ভব হয়েছে কোন মন্ত্রবলে, সে কথা না হয় এখানে উহ্যই থাক।
তবে আমার চেনাবৃত্তের মধ্যে সব কিছুকে ছাড়িয়ে একটা ব্যাপার। পরিশেষে সেটাই উল্লেখ করব সংক্ষেপে। আমার চেনা একটি পরিবারে এক বৃদ্ধাকে দেখেছি সেই বাড়ির কাজের লোক হিসেবে। সব কাজেই তিনি থাকতেন। অনেকদিন ধরেই তিনি সেখানে আছেন। তাঁর প্রয়োজন অতি সামান্য। খাওয়া পরা ছাড়া একটু তামাক এই আরকি। সবই যথাসময়ে ওরা করতেন। টাকা পয়সা কিছুই নিতেন না সেই বৃদ্ধা। বলতেন, ‘জমা থাক তোমাদের কাছে। আমি মরলে ওই টাকা দিয়ে ভাল করে কাঙ্গালি ভোজন করিও তোমরা’। এমনকি তিনি যে বৃদ্ধাকালীন সরকারি ভাতা পেতেন তার সবটাই তুলে দিতেন গৃহস্বামীর হাতে। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, মাসিমা তো লাখপতি, থুড়ি কোটিপতি। উত্তরে তিনি শুধু হাসতেন।
সেই মাসিমা মারা গেলে ওই বাড়িতে রীতিমতো আড়ম্বর করে শ্রাদ্ধশান্তি হয়েছিল। কয়েক হাজার কাঙ্গালিকে সাতদিন ধরে দু’বেলা পেটপুরে খাওয়ানো হয়েছিল। পড়শিরা মুখ টিপে বলত, বাব্বা কত টাকা রেখে গেছে ওই বুড়ি।
আমরা জানতাম বুড়ির রেখে যাওয়া টাকা ছাড়াও ওই বাড়ির লোকেরা প্রচুর অর্থব্যয় করেছিলেন। হয়ত এইভাবেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন ওঁরা। সারা জীবন ধরে কম তো করেন নি ওই মাসিমা।
তবে এখনকার দিনে এমন শ্রদ্ধা নিবেদন খুব একটা বেশি দেখা যায় না। অন্তত আমার চারপাশের ভুবনে।