চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২৯ ॥ সুশীল সাহা


এতটুকু বাসা


অন্ন বস্ত্র বাসস্থান এই তিনটি চাহিদাপূরণের পরে শিক্ষা স্বাস্থ্য ইত্যাদির কথা আসে। তবে একটা ঠিকমতো বাসস্থান না হলে যেন সব কেমন জোলো হয়ে যায়। একটা ঠিকঠাক বাসস্থান যে না হলেই নয়। সেই অর্থে নিরাশ্রয় আমি কোনদিনও ছিলাম না। তবু একেবারে নিজের ‘এতটুকু বাসা’, সে বড় আনন্দের অনুভব। সেই অর্থে সবাই-ই সাধ্যমতো চেষ্টা করে একটা নিরাপদ সুখের আশ্রয়। কেউ কেউ পায় অনায়াসে, কেউ কেউ সারাজীবনেও পায় না। এ এক কঠিন লড়াই। সারাজীবন এক চিলতে কুঠুরীতে বাস করে কেউ কেউ, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক বিশাল প্রাসাদে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। কেউ পায় উত্তরাধিকার সূত্রে, কেউবা বহু কষ্টে অর্জন করে আবার কেউ কেউ মনপ্রাণ ঢেলে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দেয়, জোটে না প্রার্থিত আশ্রয়। আমার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। অন্যান্য অনেককিছুর মতো আমারও নিজস্ব আশ্রয় হয়েছে অনেক বিলম্বে।

একেবারে নিজস্ব আশ্রয় নিয়ে আমার ভাবনা চিন্তা এসেছে অনেক পরে। আসলে অল্পে তুষ্ট ছিলাম বলে হয়ত সেইভাবে নিজের মতো করে কিছু ভাবিনি। তবে এসব ভাবনা আসে চাপে পড়ে, কিংবা নিতান্তই বৈষয়িক ভাবনা থেকে। আমি অবশ্য ভাবলাম অনেক পরে, খানিকটা প্রয়োজনের তাগিদে। এবং সেই ভাবনার সূত্র ধরে একদিন পেলাম সেই ধন নয়, মান নয় ‘এতটুকু বাসা’। তবে তা কিন্তু আমার জন্যে সহজপ্রাপ্য ছিল না। অনেক ঘাটের জল খেয়ে, অনেক ক্লিন্ন অভিজ্ঞতার পথ অতিক্রম করার সেই কথাগুলো মাঝে মাঝে মনের মধ্যে উঁকি দেয়। আজ এতদিন পরে আমার সেই একটু পিছন ফিরে দেখা, একটুখানি হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো।

খুলনায় আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, জন্ম থেকে তেইশটা বছর যেখানে আমার কেটেছে তাকে মনের কোনে রেখে দিয়েছি আমার মনের মণিকোঠার এক অনিদ্যসুন্দর অলিন্দে। তিন তলায় আমার সেই ঘর যার জানালা দিয়ে দেখা যেত অদূরের ভৈরব নদী। ঘরের বাইরে সেই খোলা ছাদ যেখানে শুয়ে শুয়ে কতদিন কতরাত আকাশ দেখেছি, উন্মুক্ত নীলাকাশ, তারাভরা কাজল কালো আকাশ। দেখেছি কত উল্কাপাত, সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের রঙ্গে রাঙ্গা ‘মনমোহন গহন যামিনী শেষে’র সেই বিশাল অঙ্গন, যার ব্যাপ্তি ছিল দিগন্ত জোড়া। জন্ম থেকে তেইশটা বছর যেখানে ছিলাম তার জায়গা আমার হৃদয় জুড়ে।

খুলনা থেকে দেশান্তরী হয়ে এলাম পশ্চিমবঙ্গে। ঠাঁই হল হাবরায়। দাদা যে একটা আস্তানা অনেক আগেই করে রেখেছিল। তাই আমি সেইভাবে উদবাস্তু হয়েও গৃহহীন হলাম না। যশোর রোডের পাশে সেই একতলা ছোট্ট বাড়িতে আরো তেইশটা বছর ছিলাম। মাঝে অবশ্য তিন বছর ছিলাম উল্টোডাঙ্গায়। তবে একটা ছোটখাট চাকরি জুটিয়ে পাকাপাকিভাবে হাবরাতেই থাকতে শুরু করলাম তিয়াত্তরের নভেম্বর থেকে। জীবন কাটছিল তার নিজস্ব ছন্দে। একটা ছোট্ট কামরায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজের মতো করে। তবে একেবারে অভাবিতভাবে ’৭৯ সালে দু’কাঠার এক জমির মালিক হলাম কয়েকজন বন্ধুর সৌজন্যে। আমি কিন্তু জমি কেনার জন্যে মানসিকভাবে তৈরি ছিলাম না। বন্ধুরা প্রায় জোর করেই এটাকে সম্ভব করে তুলল। কেনার আগে জমি দেখিনি, এমনকি যেদিন প্লট ভাগাভাগি হল সেদিনও ওখানে যাইনি।। টাকা দিয়েই নিশ্চিন্ত ছিলাম। তবে পরে বাগুইয়াটির ওই জমি দেখে মনের মধ্যে একটু একটু করে নিজের একটা ছোট্ট বাড়ির স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর তাকে বাস্তব করে তোলা খুব সহজ কাজ নয়। তাই জমি যেমন ছিল, তেমনই থাকল। নিজের কিছু একটা করার কথা ভাবলাম আরো অনেক অনেক পরে নব্বই দশকের গোড়ার দিকে। ততদিনে বিয়ে করেছি। কন্যাসন্তানের জন্মও হয়ে গেছে। হাবরার ওই ছোট্ট বাড়িতে আমরা তখন অনেকে মিলে থাকি। সত্যি সত্যি তখন মনের মধ্যে নিজের একটা বাসস্থানের করার কথা উঁকি দিচ্ছে। এসব ব্যাপারে শুধু ভাবলে হয় না। একটু তৎপরও যে হতে হয়। বলা যায়, কঠিন কঠোর এক বাস্তব পরিস্থিতি আমাকে নিরন্তর তাড়া করে ফিরতে থাকল সেই সময়। একটা বাড়ি করতে হবে। গড়তে হবে একটু নিজের মতো করে ছোট্ট একটা পরিসর। প্রথমে ভাবলাম হাবরাতেই পৈতৃক জায়গায় বাড়ি করি। আর কিছু না হোক, নিজের পরিজনদের সঙ্গে তো থাকা হবে। কিন্তু অচিরেই আমার সেই ভাবনায় ছেদ পড়ল। নিজের বাড়িতো একেবারে নিজস্ব একটা ব্যাপার, তা কি আর বারবার করা যায়।

আমার কর্মক্ষেত্র কলকাতায়, অন্যান্য কাজকর্মের জন্যে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ যে অনিবার্য। তখন রেলযাত্রা খুব সুখের ছিল না। উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হত। মূলত মা আমাকে কলকাতার কাছাকাছি বাড়ি করার করার জন্যে পরামর্শ দিলেন। তাছাড়া বাগুইয়াটির জমি তো পড়েই আছে। ওখানেই তো কিছু একটা করা যায়। অতএব হাবরাতে না করে বাড়ি বাগুইয়াটিতেই করার জন্যে মন আনচান করে উঠল। কিন্তু এসব কাজে আমার যে কোনও অভিজ্ঞতা নেই। তাই এক বন্ধুর সুবাদে ওখানকারই একজনের সাহায্য নিলাম। সেটা ছিল একটা ঐতিহাসিক ভুল। ছেলেটা তো ব্যবসা করতে চেয়েছিল। তাই আমার সঞ্চিত টাকা তাকে যথাসাধ্য দিয়েও প্রার্থিত ফল পেলাম না। তখন সবে বাড়ির ভিতটুকুই হয়েছে। বুঝলাম এইভাবে কাজটা হবে না। যা করার আমার নিজেকেই করতে হবে। অনেক কষ্টে ওখানকার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সৌজন্যে বাড়ির ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হল। তবে এটা খুব নির্বিঘ্নে হল, তা বলা যাবে না। সেই আগের ছেলেটি নানাভাবে উপদ্রব করা শুরু করল। এদিকে অফিস ঋণ পাবার আশায় ছাই পড়ল। একেবারে শেষ পর্বে আরো অনেকের সঙ্গে আমারও ঋণ মঞ্জুর হল না অফিসের অর্থাভাবের দোহাই দিয়ে। তখন সবে বিশ্বায়ন আর বাজার অর্থনীতির ছোবল আমাদের ঘায়েল করেছে। মন ভেঙ্গে গেল। বাড়ি তৈরি করার বাসনা তখন একটু একটু করে শুকোতে শুরু করেছে। তখন ভাবলাম যতটুকু হয়েছে, আর নয়। ওটাই বিক্রি করে যা পাওয়া যায় তাই দিয়েই একটা তৈরি বাড়ি কিনি। সেও খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয়, সেটা অচিরেই বুঝলাম। কেননা বিক্রি এবং কেনা এই দুটো প্রক্রিয়াতেই তো আমার গোটা ব্যাপারটা আটকে ছিল। খবরের কাগজে বিক্রির জন্যে বিজ্ঞাপন দিলাম, সাড়াও পেলাম প্রচুর কিন্তু বাগুইয়াটির জমিসহ অসম্পূর্ণ বাড়ি বিক্রি হল না। এদিকে অনেক তৈরি বাড়ি দেখে হৃদয়পুরের একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি কিনব বলে স্থির করে ফেলেছি। শুধু আমার সাধ্যের মধ্যেই বলে নয়, চার কাঠা জমিতে অনেক গাছপালা দেখে আমাদের খুব পছন্দ হল। অগ্রিম বাবদ ৭৫ হাজার টাকা কোনওরকমে ধারদেনা করে দিয়েছি। এদিকে বাগুইয়াটির বাড়ির ক্রেতা আর পাই না। কথা দিয়েও কয়েকজন তা রাখল না। এক মানসিক সঙ্কটাপন্ন অবস্থা আমার। এদিকে কথার খেলাপ হয়ে যাচ্ছে বলে কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন আমার বাড়িওয়ালা। এমনকি তিনি টাকা ফেরৎ নেবার কথাও একদিন বলে ফেললেন অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে। কোনওরকমে তাঁকে নিবৃত্ত করলাম সেবারের মতো। এদিকে জোর চেষ্টা করেও আমার বাগুইয়াটির জন্যে কেউ এগিয়ে এলেন না। ততদিনে প্রত্যাশিত অর্থের চেয়ে অনেক কমে বিক্রির জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।

অবশেষে অফিসের এক সহকর্মীর মধ্যস্থতায় অপেক্ষাকৃত অনেক কম মূল্যে ওটার বিক্রির একটা ব্যবস্থা হল। অগ্রিম হিসেবে এক লক্ষ টাকা নিয়ে ছুটলাম ইউ বি আইয়ের সেই অফিসে যেখানে আমার বাড়ির মালিক কাজ করেন, তাঁর কাছে। শোধ হল বড় অঙ্কের টাকা। তবে তখনও তিনি আমার কাছে আর বাষট্টি হাজার টাকা পাবেন। সেটাও শোধ করলাম একটু একটু করে। কেননা এক লক্ষ টাকা পেলেও বাকি টাকা পেয়েছিলাম গোটা দশেক কিস্তিতে। সে যেভাবেই হোক অবশেষে আমার বাড়ি হল।

বিগত সাতাশ বছর ধরে আমরা সেই বাড়িতেই আছি। গাছপালা অনেক বড় হয়েছে। বাড়িটাকে আমার সাধ্যানুযায়ী নানাভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছি। তবে এখন এখানে আমরা দু’জনই কেবল থাকি। মা চলে গেছেন সেই কবে। একমাত্র কন্যাও বিয়ে করে এখন অন্যের বাড়িতে। তাও তো হয়ে গেল দেখতে দেখতে আড়াই বছর। তবে আমাদের বাড়ি শূন্যপুরী হয়ে যায়নি। গাছে ফুল ফোটে। আম কাঁঠাল, নারকেল আর সুপুরী গাছ ফলন্ত হয় যথাসময়ে। নিজেদের জন্যে রেখে বাকিটা পড়শিদের বিলি করি।

আমাদের বাড়ির নাম রেখেছিলাম ‘আনন্দধারা’। এই নামে অজস্র বাড়ি আছে জানি। আমাদের হৃদয়পুরেই অন্তত দুটো বাড়ি তো আমি দেখেছি। অবশ্য নামে কী এসে যায়। আমাদের বাড়ি, আমাদের বাড়ি হয়েই থাকে। এখানে এখনও গাছপালার মধ্য দিয়ে উঁকি মারে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ। এখনও যে শুনতে পাই পাখির ডাক। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ ইত্যাদি ষড়ঋতুর নানা আভাস যথাসময়ে উঁকি দেয় আমাদের গৃহাঙ্গণে। যত ছোটই হোক, নিজের ‘এতটুকু বাসা’ যে আনন্দ আর শান্তির পরম আশ্রয়।