চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২ ॥ সুশীল সাহা


সেমিনারের উপরি পাওনা

চুলে পাক ধরলে নানা জায়গা থেকে ডাক আসে। ফিতে কাটা কিংবা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন বা নাট্যোৎসবের উদবোধন উপলক্ষে দু’একটি কথা বলতেই হয়। বিনিময়ে জোটে উত্তরীয়, মিষ্টির প্যাকেট ইত্যাদি। আর সেমিনারে গেলে অজস্র ছাত্র-ছাত্রীরা এসে ভিড় করে। চলতি কথায় এদের বলে স্কলার। সারাদিন বক্তাদের সারগর্ভ কথা শোনার পর সেমিনারে যোগ দেবার সার্টিফিকেট নেবার জন্যে তারা লাইন দেয়। জানি না ওসব ওদের কোনও কাজে লাগে কিনা। সারাদিন নানারকম মানুষের মুখোমুখি হয়ে অবশেষে এইসব স্কলারদের ভিড় সামলাতে হয়। তাদের কত প্রশ্ন, কত জিজ্ঞাসা, অজস্র তাদের কৌতূহল। সবটাই যে অহেতুক, তা নয়। এরা অধিকাংশই আসে গ্রাম থেকে, মফস্বলের গন্ধমাখা সেইসব ছেলেমেয়েদের আমার তো খুব ভাল লাগে। মনে পড়ে যায় আমার সুদূর অতীতের দিনগুলো। তখন অবশ্য এতশত ঠাঁটঠমক ছিল না। এমএ পাশ করে সবাই শিক্ষকতার দিকে ঝুঁকত না। আমার সতীর্থদের মধ্যে কেউ হয়েছেন সরকারি আমলা, কেউবা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি। একজন তো বিদেশে গিয়ে কীসব ম্যানেজমেন্ট ডিগ্রি করে বড় সংস্থায় কাজ করছে। আর একজন তার জীবন পাত করে দিল পরহিতে, নাট্যকর্মী হয়ে দেশ বিদেশ ঘুরেছে আমার এক ঘনিষ্ঠ সহপাঠী।

কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে। শিক্ষকরা জাতে উঠেছেন বলা যায়। তাই হয়ত এখন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেই বেশিরভাগ ছাত্র শিক্ষক হতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর সবকিছু পাওয়া যায় না। এমফিল বা পিএইচডি ডিগ্রি থাকা চাই, নিদেনপক্ষে কয়েকটা পাব্লিকেশন। তাই তো এত সেমিনার। ছাত্র ছাত্রীদের এত ভিড়। ওরাও নানারকম পেপার পড়ে, আলোচনায় অংশ নেয়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বক্তাদের কথা শোনে আর ফাঁক পেলেই ওঁদের ঘা ঘেঁষে দাঁড়ায়। একটার পর একটা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে দেয়। আমি কিন্তু মোটেই বিরক্ত হই না। অতীতের কথা মনে পড়ে যায়। নিজে যা থেকে বঞ্চিত হয়েছি তার কণামাত্র দেবার জন্যে মন আনচান করে ওঠে। এইসব জিজ্ঞাসু ছেলেমেয়েরা তাই আমার কাছে একটু বেশি রকমের প্রশ্রয় পেয়েই যায়। আমি মন দিয়ে ওদের কথা শুনি।

একবার বর্ধমানের একটি কলেজে গেছি এক সেমিনারে যোগ দিতে। অনেক সকালে রওনা দিয়েও সময়মতো পৌঁছাতে পারি নি সেদিন। উদ্যোক্তাদের উদ্বিগ্ন করে নির্দিষ্ট সময়ের আধ ঘন্টা পরে পৌঁছে কোনওরকমে সটান মঞ্চে চলে গেছি এবং পথশ্রমের ক্লান্তি অপনোদনে মুখ বুজে সেমিনারে মন দিয়েছি। হলভর্তি শ্রোতা। প্রথম সেসন শেষ হতে হতে প্রায় দুটো বাজল। যথারীতি মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতি। স্টেজ থেকে নামছি এমন সময় উদ্যোক্তাদের কে একজন এসে বলল আমার জন্যে সুদূর বাঁকুড়া থেকে একটি মেয়ে এসে নাকি বসে আছে সেই সকাল থেকে। আমি তো হতবাক। অন্যদের এড়িয়ে কোনওরকমে ওই মেয়েটির মুখোমুখি হলাম। ও এসেছে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে। এমএ পাশ করে পিএইচডি করছে হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্প নিয়ে। বইপত্র তেমন কিছু সংগ্রহ করতে পারেনি। সম্বল শুধুমাত্র আমার সম্পাদনায় আনন্দ পাবলিশার্স-এর পঞ্চাশটি গল্প (হাসান আজিজুল হক)। খানিকটা অবাক আর খানিকটা কৌতূহলী হয়ে ওর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। ওদিকে খাওয়ার ঘরে ডাক পড়েছে। মেয়েটকে আর ওর বাবাকে আমাদের সঙ্গে খাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলাম। ওদের তখন অনেক তাড়া। তখনই ফিরে যাবে বাড়িতে। অনেক সময় নাকি লাগবে। আমি আর ওদের পীড়াপীড়ি করলাম না। মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে বললাম। মেয়েটি কিন্তু কিছুদিন পরে যোগাযোগ করল। কণ্ঠস্বরের আন্তরিকতায় আমি সত্যি সত্যিই মুগ্ধ হলাম। যথাসাধ্য সাহায্য করার আশ্বাস দিলাম। মেয়েটির নাম দেবস্মিতা। ও জেঠু বলে ডাকে আমাকে। গবেষণার কাজ অনেকটাই শেষ করে ফেলেছে ইতমধ্যে। যথাসাধ্য সাহায্য করেছি ওকে। সে কথা ও সব সময় স্বীকার করে। ওর কতটা কী উপকার করেছি জানি না, কিন্তু আমি একজন সত্যিকারের জ্ঞানপিপাসু মানুষের সামান্য একটু কাজে এসেছি, এ কথা ভাবলে এখনও আমার চোখের পাতা ভিজে যায়।

ওই বর্ধমানেই দেখা হয়েছিল তরুণের সঙ্গে। তরুণ কর্মকার। একটি জুনিয়ার হাই স্কুলের শিক্ষক, এমএ পাশ করে গবেষণা করতে চাইছে কবি মনীন্দ্র গুপ্তের লেখাপত্র নিয়ে। আমার কাছে জানতে চাইল কবিপত্নীর হদিশ। তার কিছুদিন আগেই মণীন্দ্রবাবু প্রয়াত হয়েছেন। ওঁর স্ত্রী দেবারতি মিত্রের সঙ্গে আমার বহুদিনের পরিচয়। আমি তরুণকে বললাম সে কথা। ও আমার মোবাইল নম্বর নিয়ে রাখল। ভাবলাম এরকম নম্বর তো অনেকেই নেয় ! কিন্তু একদিন সত্যি সত্যিই তরুণ আমাকে ফোন করল। ওর ঐকান্তিক আগ্রহে একটা দিনে ওকে শ্রীমতী মিত্রের কাছে নিয়ে যাব বলে পুনর্বার কথা দিয়ে দিনক্ষণ জানালাম। নির্দিষ্ট একটি দিনের নির্দিষ্ট একটি সময়ে ও চলে আসবে গড়িয়া মেট্রো স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের কাছে। ওখান থেকে খুব কাছে মণীন্দ্রবাবুর ফ্ল্যাট।

পূর্ব নির্ধারিত একটি দিনে তরুণ এল হাওড়ায়। একজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। সকালে এসে ঊঠেছে হাওড়া স্টেশনের কাছে একটি হোটেলে। কাজ সেরে রাতে ওই হোটেলেই থাকবে। পরদিন ফিরে যাবে। যথারীতি আমি তরুণের কাজের প্রতি বিশ্বস্ততা ও আগ্রহ দেখে একটু অবাকই হলাম। বিকেলে যথাস্থানে দেখা হল ওদের সঙ্গে। তরুণের অপর বন্ধুর নাম শিবশঙ্কর পাল, থাকে রামপুরহাটে। স্কুলের শিক্ষক। ও নিজেও গবেষণা করছে উৎপল কুমার বসুর কবিতা নিয়ে। যা হোক গুটি গুটি পায়ে হাজির হলাম দেবারতি মিত্রের ফ্ল্যাটে। ওখানে অনেকবারই গেছি। তবে সেদিন আর তিনি নেই, একটা খা খা শূন্যতা ঘরটিকে ঘিরে। আজ আর নেই সেই মানুষটি, যাঁর সান্নিধ্যে আলোকিত হয়েছি বহুদিন ধরে।
সেদিন অনেক কথা হল ওদের। চেনা বৃত্তের বাইরে এমন আলাপনে স্বভাবতই ওরা দু’জন খুবই পুলকিত। অন্যদিকে সদ্য একক জীবনের বাধ্যতায় আবদ্ধ দেবারতি মিত্র যেন একটু মুক্ত বাতাসের স্বাদ পেয়েছেন। অনেক কথা হল ওদের। এমন উষ্ণ আপ্যায়নে তরুণ ও শিবশঙ্কর খুবই খুশি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন নিয়মের নিগড়ে তরুণের ওই কাজটা করা সম্ভব হয়নি। তার আগেই অন্য কে একজন নাকি মণীন্দ্রবাবুকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছে। অতএব তরুণের আবেদন নাকচ হয়ে গেল। ও শুরু করল প্রববেন্দু দাশগুপ্তর কবিতা নিয়ে কাজ। ওদিকে শিবশঙ্কর উৎপল কুমার বসুর কবিতা নিয়েই মগ্ন হয়ে রইল। ওরা দু’জন যথারীতি হাওড়ায় রাত কাটিয়ে পরদিন যে যার বাড়ি ফিরে গেল। বারবার করে ওদের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে গেল। যাব বলে কথাও দিলাম।

ইতমধ্যে আমার এক বন্ধুর তাগিদে রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে শান্তিনিকেতনে যাবার উদ্যোগ নিলাম। আমরা যাব শুনে তরুণ ও শিবশঙ্কর দু’জনেই ওখানে আসবে বলে জানাল। যথাসময়ে ওরা এল এবং আমরা খুব ভাল একটা সময় কাটালাম। এবার শিবশঙ্করের বাড়িতে যাব বলে তোড়জোড় শুরু করলাম। অবশেষে একদিন অরুণিমাকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে চেপে পৌঁছে গেলাম রামপুরহাট। স্টেশনে অপেক্ষা করছিল ওরা দু’জনেই। টোটোতে চেপে তারপিঠ পেরিয়ে শিবশঙ্করের বাড়ির দিকে আমরা চললাম। ওখানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল এক অনিন্দ্যসুন্দর অভিজ্ঞতা।

শিবশঙ্করদের পরিবারের সঙ্গে কয়েকটা দিন খুব ভাল কাটিয়েছিলাম আমরা। মা বাবা ছাড়া দাদা বৌদি আর ভাইপো, এই নিয়ে ওদের সংসার। যৌথ পরিবারে ওরা খুব ভালই আছে। বাবা একসময় সক্রিয় রাজনীতি করতেন। এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। তবে পুরনো অভ্যাসটা একেবারে ছাড়তে পারেন নি। তাই তো মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়েন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পৈত্রিক সম্পত্তির দেখভাল করাও একটা বড় কাজ। শিবশঙ্করের দাদা বাড়ি তৈরির করার সিমেন্ট বালি রড ইত্যাদি সরঞ্জাম বিক্রি করে। এককথায় সফল ব্যবসায়ী। বৌদি আর মা হেঁশেল সামলায়। খুব সুখী সুন্দর পরিবার। ওদের ওই কয়েকদিনের সান্নিধ্যের স্মৃতি চিরকাল মনে থাকবে। একদিন যাওয়া হল খুব কাছের মলুটিতে। জায়গাটা মন্দিরময়। কিছু কিছু জীর্ণ, কোনও কোনওটিকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে পর্যটকদের কথা ভেবে। টেরাকোটার অলঙ্করণ সমৃদ্ধ ওইসব মন্দিরগুলো আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেছি। জায়গাটা অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের খুব কাছে হলেও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। একদিন যাওয়া হল দুবরাজপুর। শহরের ছাপ সর্বত্র। এখন শহরের মধ্যিখানে সেই বিখ্যাত মামা-ভাগ্নে পাহাড়। দেখে খুব একটা আনন্দ হল না। সিনেমায় দেখা সেই পাহাড়টাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। ঠিক যেমনটা হয়েছিল নিমতিতায় সেই বিখ্যাত জমিদার বাড়িটা, যা ছিল জলসাঘর ছবির অন্যতম সেরা আকর্ষণ। সময়ের প্রলেপে জীর্ণদশা এখন ওই বাড়িটার। রামপুরহাটে এসে তারাপীঠ মন্দিরে যাব না, তা কি হয়। আমার অবশ্য দেবস্থান দেখার আগ্রহ বরাবরই কম। কয়েকটা দিন মহানন্দে ওখানে কাটিয়ে বাড়ি ফিরলাম আমরা। আগাগোড়া সময়টা তরুণ আমাদের সঙ্গে ছিল।

কিছুদিন বাদে ওরা দু’জন এল আমাদের বাড়িতে। ওদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম এদিক ওদিক। অনেক আনন্দের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ওরাও ফিরে গেল। বলাবাহুল্য এইভাবে শিবশঙ্কর আর তরুণের সঙ্গে আমাদের একটা স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। কেবল ওরা নয়, নানাসময়ে নানাভাবে অল্পবয়েসি আরো অনেকের সঙ্গে আমার এক নিবিড় সখ্য তৈরি হয়ে গেছে। সুকল্যাণী, সার্থক, অনুশ্রী, পায়েল, অর্কোপল, শৌভিক, বিবস্বান, সৃজিতা, প্রতিষ্ঠা, তথাগত আরো কতজন। এদের প্রত্যেকের জন্যে আলাদা করে লিখতে হয়। কী করে যে এমন একটি অমলিন সম্পর্ক তার ইতিবৃত্ত আলাদা করে লিখব কখনও। ওদের কথা মনে এলেই একটি আপ্তবাক্য মাথার মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে। ‘ভালবেসেছি, ভালবাসা পেয়েছি ’।