চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩২ ॥ সুশীল সাহা



কোন পুরাতন প্রাণের টানে


কিছুদিন আগে কলকাতার এক নামি প্রকাশন সংস্থা সে যুগের প্রখ্যাত গায়ক কে মল্লিককে নিয়ে একটি গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো রেকর্ডে তাঁর কয়েকটি গান শোনা। উত্তর কলকাতার এক বনেদি বাড়ির অন্দরমহলে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে যেতে পুরনো দিনের গন্ধমাখা এক দুর্নিবার টান অনুভব করেছিলাম। যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। বই প্রকাশ প্রসঙ্গে লেখক ও প্রকাশক কয়েকটি কথা বললেন। তারপর শুরু হলো সেই পুরনো রেকর্ড বাজানো। গানগুলো শুনতে শুনতে যেন ফিরে গিয়েছিলাম রেকর্ড সংগীত যুগের প্রথম পর্বে যখন অনেকের সঙ্গে আবির্ভূত হয়েছিলেন এই কে মল্লিক। জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠা এবং এক অজানিত কারণে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে যাওয়া এই মানুষটিকে নতুন করে যেন মনে পড়ল। বইটা পড়তে পড়তে নানা ভাবনার সূত্র ধরে যেন ফিরে গেলাম গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে।

কে মল্লিক ওরফে মুনশি মহম্মদ কাশেম জন্মেছিলেন বর্ধমান থানার কুসুমগ্রামে ১২৯৫ বঙ্গাব্দের ১২ জ্যৈষ্ঠ ( ১৮৮৮ খৃষ্টাব্দ)। ১৮৭৭ সালে টমাস আলভা এডিসনের ফোনোগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কারের অনতিকালের মধ্যেই তা বাজারজাত হয়। ‘কলের গানে’র জনপ্রিয়তা শুরু সেই থেকে। অন্যান্য দেশের মতো ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতাতেও রেকর্ড সংগীত নির্মাণের নানা কোম্পানি তৈরি হয়। এই সময়ে আরো অনেকের সঙ্গে এই রেকর্ড সংগীতে কে মল্লিকের জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। ১৯০১ সালেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দি গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড। প্রথম রেকর্ডিং হয় ১৯০২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। তৎকালীন নামি সংগীতশিল্পী গহরজানের সেই গান ভারতীয় কলের গানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। বাণিজ্য অভিলাষী বিদেশি ব্যবসায়ীরা ভারতীয় বাজার ধরার আশায় একে একে কলকাতায় ভিড় করতে থাকেন। ক্রমে নিকোলে, বেকা, লাইরাফোন, ওডিয়ন প্রভৃতি বিদেশি রেকর্ড কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শুরু হয় প্রতিভাধর গায়ক গায়িকার খোঁজ। অনেকের মধ্যে আপন ক্ষমতাবলে কে মল্লিক ওরই মধ্যে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় এক ‘ব্র্যান্ডনেম’। লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে তাঁর গান।

তবে তাঁর এই সাফল্যের ব্যাপারটা তেমন অনায়াসলব্ধ ছিলো না। বহু কষ্ট, কৃচ্ছ্রসাধন ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাঁকে এই প্রতিষ্ঠা পেতে হয়। তাঁর বাবার নাম মুনশি ইসমাইল ও মায়ের নাম সানিজা বিবি। আট ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। স্থানীয় এক প্রভাবশালী জমিদার এই মুনশি বংশের সঙ্গে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ থাকলেও তাদের আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিলো না। মূল জীবিকা ছিলো কৃষিকাজ। বহু কষ্টে মুনশি ইসমাইলকে তাঁর পরিবার প্রতিপালন করতে হতো। কে মল্লিকের খুড়তুত ভাই কুসুমগ্রামের জমিদার মুনশি মহম্মদ ইব্রাহিম অসাধারণ কণ্ঠমাধুর্যের জন্যে তাঁকে খুবই ভালবাসতেন। তিনিই তাঁর ডাকনাম রেখেছিলেন মানু। খুব ছোটবেলা থেকেই মানুর অগাধ সংগীতানুরাগ। তিনি খুব দ্রুত কোনও গান শুনে শুনেই আপন কণ্ঠে তুলে নিতে পারতেন। তিনি তাঁর এই প্রিয় মানুর জন্যে একজন সংগীত শিক্ষক নিয়োগ করেন। সেই শিক্ষকের নাম সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী। থাকতেন কুসুমগ্রামের পাশের গ্রাম রাউতগ্রামে। কিন্তু ইব্রাহিম সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুতে (১৩০৬ বঙ্গাব্দ) কিশোর কে মল্লিকের জীবনে নেমে আসে অমানিশার এক ঘোর অন্ধকার। অভাবের সংসারে তাঁর অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে ওঠে। এই দমবন্ধ আবহাওয়া থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে খুঁজতে তিনি ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সংগীত শিক্ষক সতীশবাবুই তাঁকে কলকাতায় যাবার জন্যে প্রেরণা দেন। তাঁরই সহায়তায় একদিন কুসুমগ্রামের নাদন ঘাটের খড়িনদীতে নৌকা করে কালনা হয়ে স্টিমারে তিনি ত্রিবেণী পৌঁছান। সেখান থেকে ট্রেনে করে একদিন কলকাতায় এসে পৌঁছান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১২/১৩ বছর।

কলকাতায় এসেই তিনি চলে যান তাঁরই গ্রামের এক পরিচিতজনের কাছে, যার নাম মুনসেফ আলি। এই মুনসেফ আলির ব্যবস্থাপনায় তুলাপট্টির এক তুলার দোকানে কাজ পেলেন কে মল্লিক। দৈনিক মজুরি সাড়ে তিন আনা। সেখান থেকে তাঁর নতুন কাজ হলো এক চামড়ার গুদামে। অবশ্য সেখানে কাজ করতে করতে দুর্গন্ধে বমি আসত তাঁর। খিদেয় প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও মাসিক ছ’টাকা বেতনের ওই কাজ তাঁকে করতে হতো বহুকষ্টে। এখান থেকে তাঁর কাজ হল র্যালি ব্রাদার্সে। মাসিক বেতন জলপানিসহ সাত টাকা। এই কোম্পানিই তাঁকে কাজের সূত্রে উত্তরপ্রদেশে পাঠিয়ে দেয় একসময়। কানপুরে আসা তাঁর জন্যে শুভ হয়। তাঁর মধ্যকার সুপ্ত বাসনা বাস্তবায়নের একটি ধাপ হিসেবে গন্য করা যায় এই কানপুরকে।

বলাবাহুল্য অফিসের কাজ করার মধ্যেও কে মল্লিকের অন্তরে তখন জেগে আছে সংগীত সাধনার কথা। সেখানেই তিনি স্থানীয় লোকজনের চেষ্টায় খুঁজে পান তাঁর সংগীতগুরু আব্দুল হাই হাকিমকে। হাই সাহেব ছিলেন একজন উচ্চাঙ্গ সংগীতের একজন শিক্ষক। ভাষা না বুঝলেও তিনি কে মল্লিকের বাংলা গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সংগীত শিক্ষাদানে সম্মত হন। তাঁর নিরলস চেষ্টায় এক বছরের মধ্যেই কানপুরের সংগীত মহলে কে মল্লিকের এক পরিচিতি ঘটে। প্রতিষ্ঠা পাওয়া তখনও অনেক দূরে। এমন সময় এক পাগলা ফকিরের নির্দেশে তিনি র্যালি ব্রাদার্সের কাজে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। ওঠেন তাঁর সেই আগের আশ্রয়দাতা মুনসেফ আলির কাছে। এবার তাঁর কাজ জোটে চিনেপাড়ার এক কারখানায়
মাসিক কুড়ি টাকা বেতনে। তবে কাজ করার পাশাপাশি সংগীত জগতের অলিগলির সন্ধান চলতেই থাকে তাঁর।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিককার কলকাতার সংগীত ভুবন ছিলো কবিগান, তরজা, আখড়াই, হাফ আখড়াই, কথকতা আর পাঁচালীর গানে ভরপুর। অন্যদিকে ছিলো ভক্তিগীতি, ঢপ কীর্তন, টপ্পা, ঠুংরি, গজল ও অন্যান্য রাগাশ্রিত গান। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত বা অতুল্প্রসাদের গান তখনও জনপ্রিয় হয়নি। এ হেন পরিবেশে তিনি কলকাতার বিখ্যাত মল্লিক পরিবারের একজন সংগীতানুরাগী গোরাচাঁদ মল্লিকের বৈঠকখানায় গিয়ে গানবাজনা করতেন। একদিন স্থানীয় ব্যবসায়ীপট্টির বন্ধুবান্ধবেরা গান শোনাবার জন্যে ধরেন। সেই তুলাপট্টি মোড়ের কাছে চিৎপুর রোডের ওপর একটি দোকানে তিনি হারমোনিয়াম বাজিয়ে একটি বাংলা গান ধরেন। শ্রোতাদের অনুরোধে পরে তিনি হিন্দি ভজন গান শোনান একটার পর একটা। ক্রমে তাঁর ওই গান শোনার জন্যে লোকজনের ভিড় জমতে থাকে। ভিড় এতটাই হয় যে একসময় ট্র্যাফিক জ্যাম হয়ে ট্রাম বাসও নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তায়। ভিড় সামলাতে পুলিশ আসে। ওই ট্রাফিক জ্যামের মধ্যেই ওখান দিয়ে গাড়ি করে যাচ্ছিলেন বেকা কোম্পানির এক সাহেব এবং ম্যানেজার শান্তি মল্লিক। তাঁরাও ওঁর গান শোনেন মন দিয়ে এবং অনুভব করেন সমবেত জনতার আবেগায়িত সংগীতপ্রেমকে। যা হোক ভিড় ঠেলে ওখানে এসে পৌঁছান শান্তিবাবু এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কে মল্লিককে রেকর্ড করার প্রস্তাব দেন। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল। তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে যান। খানিক পরে তিনি প্রায় ছুটে গিয়ে খবরটা দেন পরমবন্ধু গোরাচাঁদ মল্লিককে। বলাবাহুল্য শ্রীমল্লিক এতে খুব খুশি হন।

পরদিন বন্ধু গোরাচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের বেকা কোম্পানির স্টুডিওতে যান এবং একদিনে ১২টি গান রেকর্ড করেন। পারিশ্রমিক হিসেবে পান তিনশো টাকা। তখনকার দিনে তিনশো টাকার মূল্য অনেক। আনন্দ আর উত্তেজনায় তিনি বিহবল হয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় শান্তিবাবু জানান গোরাচাঁদবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁর নতুন নামকরণ হয়েছে ‘কে মল্লিক’। কাশেমের কে আর বন্ধু গোরাচাঁদের পদবী মল্লিক, এই দু’ইয়ে মিলে ওটা করা হয়েছিল। এই ছদ্মনামের কারণ, তাঁকে দিয়ে যেসব ভক্তিগীতি গাওয়ানো হয়েছে তার শ্রোতা প্রধানত হিন্দুরা। এদেশের পটভূমিতে এমন ছদ্মনাম নেবার অনেক সঙ্গত কারণ আজও বিদ্যমান। তবে শিল্পীর কি জাত বলে কিছু আছে! শিল্পী তো আসলে শিল্পীই। যে সামাজিক কারণে ইউসুফ খানকে দিলীপকুমার হতে হয়, তালাত মাহমুদকে তপন কুমার, তা থেকে আমরা খুব দূরে চলে এসেছি কী! অপরদিকে বহু হিন্দু গায়ক গায়িকাকে ওই সময় ইসলামি গান বা কাওয়ালি গান রেকর্ড করার জন্যে মুসলিম নামের আশ্রয় নিতে হয়েছে। কে মল্লিককে অবশ্য শ্রোতাদের রুচির কথা ভেবে নানাসময়ে নানা নামে গান রেকর্ড করতে হয়েছে। কখনও তিনি হয়েছেন কাশেম, কখনও মোহাম্মদ কাশেম, কাশেম আন্ড পার্টি, মহম্মদ কাশেম কাওয়াল। অন্যদিকে শঙ্কর মিশ্র নামে তিনি প্রচুর রাগাশ্রয়ী গান রেকর্ড করেছেন। তবে সব নামকে ছাপিয়ে তাঁর কে মল্লিক নামটাই থেকে যায়।
কে মল্লিকের প্রথম গান ‘হরি দিবানিশি ডাকি’ এবং দ্বিতীয় গান ‘তোমারই আশে বসে আছি’ একসঙ্গে বেরোতেই সকলের মন জয় করে নেয়। ক্রমে বেকা কম্পানি থেকে তাঁর পরপর ছ’টি গান বেরিয়ে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পায়। এরপর প্যাথিফোন ও ওডিয়ন এবং আর এক জার্মান কোম্পানি তাঁর কয়েকটি গান রেকর্ড করে বাজারজাত করে। কে মল্লিক তখন বাংলার সংগীত জগতে এক বহু আলোচিত নাম। একসময় তাঁর গাওয়া আগমনী ও বিজয়ার গান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। গহরজানের পাশাপাশি অন্য মহিলা শিল্পীরা যেমন কৃষ্ণভামিনী, বেদানা দাসী, মানদাসুন্দরী, আশ্চর্যময়ী, ইন্দুবালা ও আঙ্গুরবালারা ছিলেন তেমনি কে মল্লিকের পাশাপাশি অন্যান্য খ্যাতিমান পুরুষশিল্পীরা হলেন চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শশিভূষণ দে, নারায়ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বলাইচন্দ্র শীল, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী। অবশ্য এঁদের মধ্যে আপন ক্ষমতাবলে কে মল্লিক তাঁর নিজের জায়গাটি করে নেন।

১৯০৯/১০ সাল থেকে ১৯৪৮ এই দীর্ঘ সময় ছিল কে মল্লিকের সংগীতজীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এই সময়টুকুর মধ্যেই প্রভুত যশ,অর্থ ও প্রতিষ্ঠা পেয়ে খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন তিনি। গ্রামোফোন রেকর্ডের জনপ্রিয়তা গানের মজলিশেও তাঁর কদর বাড়িয়ে দেয়। ওই সব সংগীত সভা থেকে তাঁর প্রচুর অর্থপ্রাপ্তিও হতে থাকে। একসময় রেকর্ড করার চেয়ে সংগীতের আসরে গান গাইতেই তিনি পছন্দ করতেন। এত যশ, খ্যাতি ও অর্থপ্রাপ্তির মধ্যেও তিনি কিন্তু চামড়ার দোকানের কাজটি ছাড়েননি। একদিন এই কাজই যে তাঁকে দুঃসময়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল! খ্যাতির চূড়ায় উঠেও কৃতজ্ঞ কে মল্লিক সেই কথাটি ভোলেননি।
কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কে মল্লিকের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। যদিও তিনি ছিলেন নজরুলের চেয়ে এগারো বছরের বড়ো। দুজনই জন্মেছিলেন জ্যৈষ্ঠ মাসে। নজরুলের জন্মদিন ১১ তারিখে আর কে মল্লিকের ১২ তারিখে। এহ বাহ্য। তবে তাঁদের এই যুগল সম্মিলন অর্থাৎ নজরুলের গানে কে মল্লিকের কণ্ঠদান এক সত্যিকারের ঐতিহাসিক ঘটনা। নজরুলের বিখ্যাত ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ গান দিয়ে ওই যাত্রাশুরু। কে মল্লিকের গাওয়া নজরুলের ‘কে বিদেশি মন উদাসী’ একসময় মাঠ ময়দানের মানুষ থেকে শহরের উচ্চকোটির মানুষদের মুখে মুখে ফিরত। সেই আমলের বহু বিখ্যাত শিল্পীরা নজরুলের গান গেয়েছেন, তারমধ্যে কে মল্লিক ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ।

এই জনপ্রিয়তার সূত্র ধরে কে মল্লিক একসময় রবীন্দ্রনাথের ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার’ গানটি রেকর্ড করেন। গানটি তুমুল জনপ্রিয় হলেও কবিগুরু অখুশি হয়ে স্বয়ং শিল্পীকে ডেকে গানটি সম্পর্কে তাঁর আপত্তির কথা জানান এবং সঠিক সুরে গানটি পুনর্বার রেকর্ড করার পরামর্শ দেন। অবশ্য কে মল্লিক তাতে রাজি হননি। অবশেষে সেই গান দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে রেকর্ড করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সেই গান অবশ্য সেই সময় ততো জনাদৃত হয়নি। শ্রোতার রুচি বহু ভুল গানকে জনপ্রিয় করে দেয়, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ এখনও বিদ্যমান। গান যে অনেক সময় স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে শিল্পীর হয়ে যায় তার প্রমাণ কে মল্লিকের এই বিতর্কিত গানটি। আজকের যুগে অবশ্য সেই গানকে কেউ গ্রহণ করতে রাজি হবেন না। সময়ের দাবি হয়ত একেই বলে।

কীর্তন গানে কমলা ঝরিয়ার নাম একসময় সকলের মুখে মুখে ফিরেছে। এই কমলা ঝরিয়া কে মল্লিকের আবিষ্কার। একসময় তিনি ঝরিয়ার রাজবাড়ির সভাগায়ক হয়েছিলেন। সেখান থেকে চলে আসার সময় তিনি বালিকা কমলাকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। তাকে আঙ্গুরবালার কাছে সংগীত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। অশেষ ক্ষমতাময়ী কমলা প্রকৃত শিক্ষকের কাছে তালিম পেয়ে কীর্তনগানে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কে মল্লিকের জহুরী চোখ অমূল্য এই রত্নটিকে চিনতে ভুল করেনি মোটেই।
সেই আমলে কে মল্লিকের জনপ্রিয়তা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার একটা পাথুরে প্রমাণ দিচ্ছি। ১৯২০ সালের অক্টোবর মাসে এইচ এম ভি’র রেকর্ড বুলেটিনে লেখা হয়, ‘কে মল্লিক আমাদের সব্যসাচী’। তখন পর্যন্ত প্রকাশিত তাঁর রেকর্ডের সংখ্যা প্রায় একশো। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে সংখাটি অনেক। নানা ধরনের গান গেয়ে তিনি তখন শিল্পীদের মধ্যে জনপ্রিয়তম। একসময় তাঁর রেকর্ডের মূল্য অন্য শিল্পীদের থেকে এক টাকা বেশি রাখা হত। সব্যসাচী উপাধি রেকর্ড কোম্পানি তাঁকে এমনি এমনি দেয়নি।

এত জনপ্রিয়তা থাকা সত্বেও রেকর্ড কোম্পানিগুলো তাঁর প্রাপ্য রয়ালটি ঠিকমতো দেয়নি, অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন তিনি। স্বভাবসুলভ সারল্য দিয়ে তিনি এগুলোকে উপেক্ষা করেছেন। তাঁর সারল্য ও নির্বিবাদী স্বভাবকে দুর্বলতা ভেবে অনেক কোম্পানি তাঁকে নানাভাবে ঠকিয়েছে। দারিদ্রের তাড়নায় কলকাতায় এসেছিলেন একসময়। গানের প্রতি অগাধ টান ছিল বরাবর। অনেক কষ্টের মধ্যে গান শিখেছিলেন। আপন প্রতিভাবলে গানের জগতে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছিলেন। কিন্তু খ্যাতির চরম শিখরে উঠেও ১৯৪৮ সালের একদিন কলকাতার সংগীত জগতকে বিদায় জানিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যান। রেকর্ড করা, জলসা মাত করা বিমুগ্ধ শ্রোতার বাহবা ধ্বনি আর আলো ঝলমল পাদপ্রদীপের বৃত্ত থেকে অনেক দূরে ছিল এই স্বেচ্ছা নির্বাসন। তবে গান কিন্তু ছাড়েননি তিনি। বর্ধমানের নানা সংগীত আসরে তাঁকে তখন দেখা যেত। এইসময় তিনি গ্রামের চাষাভুষোদের ডেকে ডেকে গান শেখাতেন। বড় উদাসীন ছিল তখনকার তাঁর দিনযাপন। নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। সংসারে স্ত্রী ও দত্তক নেওয়া পুত্র ছিল কেবল। বড় বিষণ্ণ ক্লান্ত ছিল শেষ বেলাকার জীবন।

গ্রামে ফিরে আসার পরেও এগারো বছর বেঁচে ছিলেন তিনি (মৃত্যু ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ, ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ)। একদা যে মানুষটি সংগীত পিপাসায় আকুল হয়ে অজানার পথে পা বাড়িয়েছিলেন। বহু বিচিত্র জীবনধারার মধ্যে নিজেকে সঁপে দিয়ে সিদ্ধির চরম শিখরে উঠেছিলেন কে মল্লিক। সংগীত জগতে অসম্ভব রকমের প্রতিষ্ঠা পাবার পরে বোধহয় একরকম তৃপ্তির পাশাপাশি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ ক’টি বছর কাটিয়ে দেন একধরনের উদাসীনতার মধ্যে। ছায়াছবির জগতের একসময়ের বিখ্যাত অভিনেতা অসিতবরণ একদা যেমন সিনেমা জগতকে বিদায় জানিয়ে সমবেত কীর্তন গানের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরসাধনা করতেন, যাপন করতেন এক অতি সাধারণ জীবন, কে মল্লিকের এই স্বেচ্ছানির্বাসনও যেন খানিকটা সেই রকমই।

বাংলা সংগীত জগতে কে মল্লিক রয়ে গেছেন এক ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে। বাংলা তথা ভারতীয় সংগীতে তাঁর অবদান তাই অনস্বীকার্য। ইতিহাসের নীরস অক্ষরে নয়, কে মল্লিক ছিলেন আছেন ও থাকবেন বাঙালির অন্তরে নিরধিকাল।