চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩৩ ॥ সুশীল সাহা



‘উজান’ একটি গৃহের নাম


কুড়ি/একুশ বছর আগের কথা। একটি বাড়ির গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে একটা ছোটখাট স্মারকপুস্তিকাই করে ফেলেছিলাম। গৃহটি আর কারো নয়, আমাদের পরমাদরের কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের। বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘উজান’। তখন তাঁর কন্যা সুমন সন্তান সম্ভবা। ভেবেছিলেন, পুত্র হলে নাম রাখা হবে উজান আর ওই গৃহের নাম হবে উজানি। আর কন্যা হলে উল্টোটা হবে। যথাসময়ে সুমনের এক কন্যা হলো। তার নাম রাখা হলো ‘উজানি’ এবং যথারীতি নির্মিয়মান ওই গৃহের নাম হলো ‘উজান’। তখনও ছিলো চিঠিপত্র লেখার যুগ। কম্পিউটার/ মোবাইল ইত্যাদি এসে গেলেও আমজনতার কাছে তেমনভাবে পৌঁছায়নি। যা হোক হাসানভাই এক চিঠিতে সবিস্তারে সব জানালেন। জানালেন ২০০০ সালের শেষদিকে ওই গৃহের সম্ভাব্য উদবোধনের কথা। হাতে অনেকটা সময় ছিলো। হঠাৎ করেই মনের মধ্যে এক পরিকল্পনা উঁকি দিলো। ভাবলাম, ওই গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে গোটা একটা স্মারক পুস্তিকা করবো। এই বাংলার অসংখ্য হাসান অনুরাগীর কয়েকজনের লেখা নিয়ে নির্মিত সেই পুস্তিকা নিজের হাতে যথাসময়ে ওঁর হাতে দিয়ে একেবারে চমকে দেবো। যেমন ভাবা তেমনি কাজ শুরু করে দিলাম। প্রত্যাশিত সাড়াও পেলাম। ৩৪ জনের গদ্য পদ্য সম্বলিত তিন ফর্মার সেই পুস্তিকা যথাসময়ে তৈরি হয়ে গেল। শ’দুয়েক কপি সঙ্গে নিয়ে আমি একদিন রওনা হলাম রাজশাহীর উদ্দেশ্যে।
কি ছিল সেই পুস্তিকায়? কারা লিখেছিলেন? কে কি লিখেছিলেন? এসব প্রশ্ন স্বভাবতই এসে যাবে। নিজেও খানিকটা কৌতূহলবশত সেই পুস্তিকার পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে ঘুরে আসি অনতি অতীতের সেই দিনগুলোয়।

যাঁরা লিখেছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। আমাদের মধ্যে আজ আর নেই মহাশ্বেতাদি, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, মানবদা, মীনাক্ষী- সত্যেন, আফসার, অমিতাভ দাশগুপ্ত, অরুণ সেন, তরুণ সান্যাল, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শঙ্খ ঘোষ। একে একে নিভিছে দেউটি। তবে তাঁদের লেখাগুলো রয়ে গেছে। একুশ বছর আগে তাঁদের সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি আজও আমার মনে প্রাণে। তাই তো ‘উজান’ নামাঙ্কিত সেই স্মারক পুস্তিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ঘুরে আসি অনতি অতীতের সেই দিনগুলোয়।
মনে আছে, দু’হাজার সালের গোড়ার দিকে যখন প্রায় ত্রিশ/চল্লিশজনকে লিখবার জন্যে বললাম তখন প্রায় সবাই-ই সাগ্রহে লিখবার সম্মতি জানালেন। শেষ পর্যন্ত লেখা যা পেয়েছিলাম তা থেকে সব মিলিয়ে চৌত্রিশটা ছেপেছিলাম। তবে ছাপতে পারিনি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। যে আবেগ ও ভালবাসার অর্ঘ্য সাজাতে চেয়েছিলাম, তাতে ওই লেখাটা খানিকটা দলছুট মনে হয়েছিল। তিনি হাসানভাইয়ের এই বাড়ি নির্মাণে ততটা খুশি হননি। লেখার মধ্যে তাঁর সেই নেতিবাচক মন্তব্য থাকায় লেখাটা আমি শেষ মুহুর্তে বাতিল করি। এজন্যে সন্দীপনদা কিঞ্চিৎ রুষ্ট হয়েছিলেন। আজ এতদিন পরে মনে হচ্ছে, লেখাটা বাদ না দিলেও কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না। কুড়ি/একুশ বছর আগের আমির সঙ্গে এখনকার আমির যে অনেক তফাৎ!

শুরু করি শঙ্খ ঘোষকে দিয়ে। চার লাইনের একটি ছোট্ট ছড়া তিনি লিখে দিয়েছিলেন। লেখাটা এইরকম-
উজান নাইয়া
“এত বছর পেরিয়ে এসে আঘাতে সংঘাতে
এই হাতে সে উজান পেল উজানি ওই হাতে
এখন থেকে সমস্ত মন জানবে মন দিনে রাতে
উজান পাবে অধিক আলো উজানি সম্পাতে।”
কবিতায় শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, অমিতাভ দাশগুপ্ত, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্যসাচী দেব, কৌশিক জোয়ারদার, সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, কাবেরী বসু, নিখিলেশ্বর ভট্টাচার্য, সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, শরদিন্দু সাহা, জলধি হালদার এবং সায়ন্তন মজুমদার। বাকিরা গদ্যরচনা করেছিলেন। চিঠি লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়।
ওই চিঠির আকারেই সবচেয়ে ছোট লেখা দিয়েছিলেন মনোজ মিত্র।
“মানুষের বুকে আপনার কতো না ঘরবাড়ি। মাটির ওপরে আকাশের নীচে আপনি যে ‘উজান’ তৈরি করলেন, সেও নিশ্চয় আমাদের মনেরটির মতোই হলো।” কি চমৎকার লেখা! সকলের মনের কথার নির্যাস যেন!

সবচেয়ে বড়ো লেখাটি তৈরি করেছিল মীনাক্ষী। চার পাতার সেই লেখার ছত্রে ছত্রে উজানে দাঁড় বাওয়া এক লেখকের অভিযাত্রার কথা– স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার দেওয়া একজন মানুষের কথা। তাঁর গৃহের নাম উজান হবে শুনেই মীনাক্ষীর মনে হয়েছিল, “…এক নৌকা পালতোলা উজান বেয়ে। নীল জল। কোথায় যেন যাচ্ছে – আহা বাড়ির নামে কেউ জল আর নৌকায় ভেসে যাওয়ার অনুষঙ্গ আনতে পারে তা কে জানতো।…উজান নামে আমি স্বপ্নে দেখবো সেই জলঘর, যা আসলে এক নৌকা, রঙ্গিন পাল তুলে উজানে নদী বাইছে।”
একটি সুন্দর লেখা দিয়েছিলেন শ্যামলদা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। অসাধারণ সেই লেখাটি তিনি টেলিফোনে অনুলিখন দিয়েছিলেন। পুরোটা পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তাঁর দেখা সাঁওতাল পরগনার পরিত্যক্ত এক প্রাসাদের বর্ণনা দিয়েছিলেন। সে এক এলাহি আয়োজন। কিন্তু আজ তার ‘…সবই পড়ে আছে’। এই ছোট্ট একটি বাক্যের মধ্যে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের এইসব পার্থিব আয়োজনের অসারতার কথা। কিছুই যে আর নিজের থাকে না। একদিন সবকিছু ফেলে দিয়ে আমাদের চলে যেতে হয় যে!

মহাশ্বেতা দেবী লিখেছিলেন, “তোমার ‘উজান’ যাত্রা তো কবেই শুরু হয়েছে। এ উজানে ভাটি নেই। এ শুধু উজিয়ে চলা। যা তুমি করে চলেছ। উজানের স্রোতে চলা মানুষের বাড়ির নামো ‘উজান’ হবে, এটি খুব ভাল হয়েছে। আমি জানি, ঘরের দেওয়ালও রাতে তোমাকে উজানি স্রোতের সংগীত শোনাবে, ঘুম পাড়িয়ে দেবে। শরীর ও সময় অনুমতি দিলে হয়তো কোনদিন ‘উজান’-এর অতিথি হব।”
মহাশ্বেতাদির এই আশাপূরণ হয়নি শেষ পর্যন্ত। যেমন হয়নি অরুণ সেনের ক্ষেত্রে। তিনি নিজে এই বাড়িটাকে তাঁর নিজের বাড়ি ভেবে অনেক কথা লিখেছিলেন। সেই বাড়িতে তিনি একবার গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু যেমন ভেবেছিলেন, নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা তাঁর অন্য বাড়িগুলোর মতো এই ‘উজান’-এও তাঁর একটা নিভৃত আশ্রয় হবে একসময়। কিন্তু তিনিও আমাদের সবাইকে ছেড়ে গেলেন এই ‘করোনা’ ভয়াবহ দুঃসময়কালে। আত্মজীবনীতে রেখে গেলেন বাংলাদেশের কত না স্মৃতির সঙ্গে হাসানভাইয়ের নানা কথা।
আরো যাঁরা লিখেছিলেন, তাঁরা হলেন শান্তা সেন, অনিল আচার্য, ভগীরথ মিশ্র, কিন্নর রায়, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, আফসার আহমেদ, অমর মিত্র, আফিফ ফুয়াদ, কুন্তল মুখোপাধ্যায়, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, আবদুর রউফ, সাধন চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং শঙ্কর সেনগুপ্ত। পরম যত্নে প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করে দিয়েছিলেন কমল সাহা। বনগাঁয় বসে সব লেখাগুলোর ডিটিপি করিয়ে বানান সংশোধন করে দিয়েছিলেন জলধি হালদার। স্বেচ্ছায় সামগ্রিক সংশোধনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন পরম সুহৃদ বুলবুল আহমেদ। এই পুস্তিকার প্রথম পাতায় বেশ স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছিলাম একটি গর্বোদ্ধত বাক্য, ‘এই পুস্তিকা সুজনসকাশে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য।’
যথাসময়ে সেই পুস্তিকা হাসানভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম ‘উজান’ নামাঙ্কিত একটি কাঠের ফলক, যে আজও ওই বাড়ির বাইরে শোভা পাচ্ছে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে উত্তাল জলরাশির মধ্যে ওই নাম দেখা যাচ্ছে।

সারাজীবন ধরে এমন কত কাণ্ডকারখানাই করলাম!