চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩৫ ॥ সুশীল সাহা


একটি বই প্রকাশের আদিঅন্ত


ঝকঝকে ছাপা, সুদৃশ্য প্রচ্ছদ আর অসামান্য বিষয় নিয়ে একেকটি বই যখন আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়, আমরা কিছুতেই তার নির্মাণের নেপথ্যকথা তখন আঁচ করতে পারি না। আমার তো মনে হয় সব নির্মাণেরই নেপথ্যে থাকে নানান রকম ইতিকথা। একটি নির্মাণ শুধু স্রষ্টার একার নয়। তাকে যথার্থভাবে হাজির করার পেছনে থাকে অনেক মানুষের এক সমবেত প্রয়াস। আজ আমি লিখতে চাই এমন একটি নির্মাণের কথা।

কীভাবে যেন খ্যাতনামা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী চিত্রলেখা চৌধুরীর (১৯৪১- ) একটি লেখায় তাঁর মা প্রখ্যাত শিল্পী চিত্রনিভা চৌধুরীর (১৯১৩-৯৯) একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির কথা আমি জানতে পারি। আর সেটা জানার পর থেকেই ওটা সম্পর্কে এক অদম্য কৌতূহল মনের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকে। আগেই জানিয়ে রাখি, আমি কোন প্রকাশক নই। এমনকি কোন প্রকাশকের বেতনভুক পাণ্ডুলিপি সন্ধানী গোয়েন্দাও নই। সাহিত্যের বাংলাবাজারে অনেক প্রকাশক বন্ধু আছে আমার। তাঁদের অনেকেই আমার কাছে নানারকম বইয়ের কথা জানতে চায়। কী বই বের করলে পাঠকের চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যও হয়, জানতে চায় তাও-ও। তাঁদের অনেককে একান্তই যেচে অনেক ভালো পাণ্ডুলিপির সন্ধান দিই। অনেকে আমার কথা শুনে লাভবান হয়, অনেকেই আবার প্রবল লোকসানের মুখ দেখে। তবু ভালো বইয়ের নির্মাণের নেপথ্যে থাকতে আমার ভালো লাগে। এই ভালোলাগা থেকে অনেক বই নির্মাণের আদিঅন্তে আমার নানারকম যোগসূত্র থেকে গেছে। এই ভালোলাগার অনুভূতি থেকেই চিত্রনিভা চৌধুরীর ওই পাণ্ডুলিপি অনুসন্ধানের কাজে নেমে পড়েছিলাম বছর কয়েক আগে। সেই অনুসন্ধানের ইতিকথা এবার।

চিত্রলেখা চৌধুরীর গান আমি অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি। অত্যন্ত পরিশীলিত গলা। রবীন্দ্রগানের মর্মানুভূতি তাঁর গায়নে,পরিবেশনে। পদার্থবিদ্যায় তিনি একজন সুপরিচিত বিদ্বজ্জন। বিদেশ থেকে সম্মানের সঙ্গে ডক্টরেট অর্জন করে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন কলকাতার সিটি কলেজে। কিন্তু গান তাঁর রক্তে মিশে ছিল। তাই তিনি তাঁর স্বোপার্জিত রবীন্দ্রগীতির অনুভবে আর শৈলজারঞ্জন মজুমদার আর শান্তিদেব ঘোষের মতো রবীন্দ্রগানের শিক্ষকের প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রগানের শিল্পী হয়ে অনেকগুলো রেকর্ড করেছেন, অনেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। আপন নিষ্ঠা আর পরিশ্রম দিয়ে তৈরি করেছেন অনেক ছাত্রছাত্রী।

সেই পাণ্ডুলিপির সন্ধান করতে গিয়ে প্রথমেই চিত্রলেখা চৌধুরীর ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করলাম। সাহসে ভর করে অবশেষে একদিন ফোন করে ওঁর সঙ্গে দেখা করার অভিলাষ ব্যক্ত করলাম। ওঁর সানুগ্রহ অনুমতি পেয়ে একদিন গেলাম তাঁর বরানগরের ফ্ল্যাটে। একজন আগন্তুকের সঙ্গে মানুষ যেমন সন্দিগ্ধ ব্যবহার করে, তিনি কিন্তু তা করলেন না। বরং আমার প্রস্তাব শুনে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। আমি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বেঙ্গল প্রকাশনের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথাও বলে নিয়েছিলাম। তাঁরা আগ্রহ দেখানোয় আমার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আমার সব কথা শুনে চিত্রলেখা চৌধুরী আমাকে আরেকদিন আসার জন্যে বলেন। আরো বলেন, তাঁর প্রতিবেশী অধ্যাপিকা সোমা সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যে। শ্রীমতী সেন অশেষ পরিশ্রম করে চিত্রনিভা চৌধুরী সম্পর্কে একটি লেখা তৈরি করে রেখেছেন, যা এই বইয়ে থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

আমি শ্রীমতী সেনের সঙ্গে কথা বলি। তিনি তাঁর লেখাটি ঠিকঠাক করে রাখবেন বলেন। পরে আরেকদিন আমি ওঁদের সঙ্গে দেখা করব বলে জানিয়ে আসি। ওঁরা কিছুদিন সময় চেয়েছিলেন। আমি মাঝে মাঝে ওঁদের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। তারপর একদিন এক শুভক্ষণে আবার ওই বরানগরে যাই। তিনি আমাকে পাণ্ডুলিপিটি দেন। আমি কাছের এক ফটো কপিয়ারের কাছে গিয়ে ওগুলোর ফটোকপি করে নিয়ে আসি। এক যুদ্ধজয়ের অনুভূতি নিয়ে আমি বাড়ি ফিরে আসি। বাড়ি ফিরে ওগুলোতে চোখ বোলাতে গিয়ে অবাক হয়ে যাই। এতদিন কেন যে এটা বই হয়ে বেরোয়নি, সেটা ভাবতে ভাবতে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিই।
অবশেষে এক বইমেলায় ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’ শিরোনামে বইটি বেরোয়। লেখার সঙ্গে অনেকগুলো ছবি, যার সবগুলোই শ্রীমতী চৌধুরীর আঁকা। বলাবাহুল্য প্রকাশ হওয়ামাত্র পাঠকমহলে খুব সাড়া পড়ে যায়। এমন একটি বই এতদিন কেন প্রকাশিত হয়নি সেই আক্ষেপের কথাও শোনা যায় নানাজনের মুখে । বইটির শুরুতেই একটি ছোট্ট ভূমিকা লিখেছিলেন চিত্রলেখা চৌধুরী। তিনি লিখেছিলেন,
“আমার মা শান্তিনিকেতনের কলাভবনের প্রথম মহিলা শিল্প –অধ্যাপিকা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নির্বাচিত করেছিলেন এই পদে। রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত নিকটে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। তাঁর স্মৃতিকথায় ছড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতনের বহু মূল্যবান কথা। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে আমার চিত্রনিভা চৌধুরী কবির প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রস্মৃতিটি আমার কাছে দিয়ে বলেন, ‘এটি প্রকাশ করার দায়িত্ব তোমাকে দিলাম। নানাকারণে সেই গ্রন্থ এতদিন প্রকাশিত হয়নি।”

এমন একটি বইয়ের জন্যে তো প্রকৃত পাঠকেরা উন্মুখ হয়ে থাকে। চিত্রনিভা চৌধুরীর মতো একজন সামান্য গৃহবধূর শিল্পী হয়ে ওঠা সত্যিই খুব কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার। শুধু শিল্পী হওয়া নয়, শান্তিনিকেতনের প্রথম মহিলা শিল্প অধ্যাপিকা হবার গৌরবও তিনি অর্জন করেছিলেন। অথচ অল্প বয়সে বিয়ে হবার পরে তার তো একান্তভাবেই গৃহবধূর জীবন কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু তাঁর পরম সৌভাগ্য যে তাঁর বিয়ে হয়েছিল সত্যিকারের এক প্রগতিমনষ্ক পরিবারে, যাঁরা প্রথম থেকেই নতুন বৌয়ের শিল্পানুরাগ সম্পর্কে অবহিত ও সচেতন হন। যে জন্যে তাঁর শিল্প শিক্ষার জন্যে ওঁরা শান্তিকেতনে এক বছরের জন্যে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেন। ভাবলে অবাক হতে হয়, কোথায় পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীর এক অখ্যাত গ্রাম ‘লামচর’ আর কোথায় শান্তিনিকেতন ! আশ্চর্যের কথা মাত্র তেরো বছরে বিয়ে হওয়া গৃহবধূর স্বোপার্জিত শিল্পভাবনা আর সাহিত্যানুরাগে মুগ্ধ শ্বশুরালয়ের মানুষেরা তখনকার দিনে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে বিয়ের এক বছর পরে মাত্র এক বছরের জন্যে শিল্পশিক্ষার জন্যে যাওয়া এই মানুষটা ওখানে থেকে গেলেন পাঁচ বছর। শিক্ষা সমাপ্ত হবার পরে রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে তাঁকে শিল্প অধ্যাপিকার পদে বহাল করা হল। সেই কাজও তিনি সাফল্যের সঙ্গে করলেন আরো পাঁচ বছর।
পিতৃদত্ত নাম ছিল নিভাননী। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর নতুন নামকরণ করেন ‘চিত্রনিভা’। তবে নিভাননী থেকে ওই চিত্রনিভায় সার্থকনামা হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত সত্যিই বিচিত্র। একদিকে তাঁর নিজের ভিতরকার শিল্পসত্তা, যার প্রকৃত বিকাশের ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য তাঁকে সত্যি সত্যি সমৃদ্ধ করেছিল। সেই অনুভবের কথা তিনি একটু একটু করে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই তো গ্রন্থের নামকরণ করেছেন ‘রবীন্দ্র সান্নিধ্যস্মৃতি’। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে দেরিতে হলেও এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে তিনি কিন্তু নিজের কথা কিছুই সেইভাবে লেখেননি। হয়ত লিখতে চানওনি। শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক পরিবেশ তথা রবীন্দ্রনাথসহ আরো অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্য তাঁকে প্রকৃত অর্থেই আলোকিত করেছিল। সেই আলোরই বিবরণ গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে।

এমন একটি গ্রন্থনির্মাণের নেপথ্যকর্মী হিসেবে আমার নিজেরও গর্ব অনেকখানি। এই ছোট্ট জীবনে অন্তত কিছু সুকৃতির সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বলাবাহুল্য এই কাজটিকে আমি রাখতে চাই সেই তালিকার শীর্ষে।