চেনাশোনার কোন্ বাইরে-৩৬ ॥ সুশীল সাহা


শিশুতোষ এক অসামান্য গ্রন্থ ‘লালকালো’


বাংলা ভাষায় লেখা যে-ক’টি শিশুতোষ গ্রন্থ ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে তারমধ্যে গিরীন্দ্রশেখর বসুর ‘লালকালো’ অন্যতম। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থের জনক কে এই গিরীন্দ্রশেখর? এই মানুষটি অজ্ঞাতকুলশীল কেউ নন। রাজশেখর বসু যিনি পরশুরাম ছদ্মনামে লেখক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত, গিরীন্দ্রশেখর হলো তাঁরই ছোটভাই। রাজশেখর বসু নানারকম রম্য লেখালিখির পাশাপাশি চলন্তিকার মতো একটি অসাধারণ অভিধান সম্পাদনা করেছিলেন, যা বাঙালির ঘরে ঘরে আজও সমাদৃত। পিতা চন্দ্রশেখর বসু বিহারের দ্বারভাঙ্গা মহারাজের দেওয়ান ছিলেন। নিজে সামান্য চাকুরিজীবী হলেও তাঁর চার ছেলেই ছিল সমান কৃতি পুরুষ। এঁদের আদি নিবাস নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের কাছাকাছি উলা বীরনগরে। বড় ছেলে শশিশেখর প্রথম জীবনে ইংরেজিতে লেখালিখি শুরু করলেও পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় লিখে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। মেজো রাজশেখর, ব্যক্তিগত জীবনে রসায়নবিদ হলেও তাঁর খ্যাতি লেখক ও সম্পাদক হিসেবে। সেজো কৃষ্ণশেখর সেকালে পল্লী উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োগ ক’রে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। সর্বকনিষ্ঠ গিরীন্দ্রশেখর ছিলেন একাধারে মনোবিজ্ঞানী ও মানবপ্রেমিক। বাংলায় মনোচিকিৎক হিসেবে তাঁর অগ্রগণ্য ভূমিকার কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জন্ম পিতার কর্মস্থল দ্বারভাঙ্গায় ১৮৮৭ সালের ৩০ জানুয়ারি। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তিনি কিছুদিন জাদুবিদ্যা রপ্ত করেছিলেন। ১৯০৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এস-সি পাশ করেন এবং ১৯১০ সালে মেডিক্যাল কলেজ এম.বি পাশ করেন। ওই সময় ভারতে মনোচিকিৎসার তেমন পরিকাঠামো ছিল না। গিরীন্দ্রশেখর অসীম আগ্রহ নিয়ে ওই বিষয়ে নিবিড় অধ্যয়ন শুরু করেন এবং অচিরেই ওই মহতী কর্মযজ্ঞে আন্তরিকভাবে ব্রতী হন। ফ্রয়েড উদ্ভাবিত মনোসমীক্ষা-পদ্ধতির সঙ্গে এদেশের তখনো কোন পরিচয় ঘটেনি। এমনকি জার্মান ভাষার রচিত তাঁর ওই বিষয়ক গ্রন্থের অনুবাদও তখন এদেশে আসেনি। গিরীন্দ্রশেখর উদ্ভাবিত মনোরোগ চিকিৎসার সঙ্গে ফ্রয়েডীয় পদ্ধতির অনেক মিল ছিলো। অনেক ক্ষেত্রে ফ্রয়েড উদ্ভাবিত পদ্ধতিকে গিরীন্দ্রশেখর মেনে নিলেও ফ্রয়েডের অবদমন ক্রিয়ার সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না। এ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত মতবাদ ‘থিয়োরি অফ অপোজিট উইশ’ নাকে পরিচিত, যদিও ফ্রয়েড তাঁর এই মতবাদকে মেনে নেননি। তবে এ-নিয়ে বিস্তারিতভাবে পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার ক’রে নেন।

উভয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পত্রালাপ অব্যহত ছিলো, যা জ্ঞানচর্চার এক অসামান্য এক দিগন্তকে উন্মোচিত করেছে। গিরীন্দ্রশেখর ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস-সি পাশ করেন এবং ১৯২১ সালে ওখান থেকেই ডি.এস-সি উপাধি প্রাপ্ত হন। ওই ১৯২১ সাল থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মানসিক রোগ চিকিৎসায় নিয়োজিত করেন। ১৯২২ সালে কলকাতার পার্শিবাগান লেনে নিজের বাড়িতে ‘ভারতীয় মনোসমীক্ষা সমিতি (১৯২২) স্থাপন করেন, যা অল্পদিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সংঘের অনুমোদন লাভ করে। ১৯৪০ সালে মেজো ভাই রাজশেখর বসুর দান করা তিন বিঘা জমি সম্বলিত বাড়িতে তিন শয্যাবিশিষ্ট মনোচিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন যা ‘লুম্বিনী পার্ক’ নামে পরিচিত। ১৯১১ সাল থেকে ১৯১৫ অব্দি মেডিক্যাল কলেজের শারীরবিদ্যার অধ্যাপক এবং ১৯১৭ থেকে ১৯৪৯ সাল অব্দি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাবনর্মাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। শারীরিক কারণে তিনি ওই কাজে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। তিনি বাংলায় ও ইংরেজিতে অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেন। তারমধ্যে বাংলায় লেখা ‘স্বপ্ন’ এবং ইংরেজিতে লেখা ‘এভরি ডে সাইকো আনালিসিস’ এবং ‘কনসেপ্ট অফ রিপ্রেশন’ বিশেষ উল্লেখ্য। ভারতীয় দর্শন তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে কতটা প্রভাবিত করেছিল তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে তাঁর লেখা ‘নিউ থিয়োরি অফ মেন্টাল লাইফ ও অন্যান্য প্রবন্ধে। তাঁর লেখা ‘পুরাণ প্রবেশ’ ও ‘ভগবদ্গীতা’ এবং সঙ্কলিত ‘মনোবিদ্যার পরিভাষা’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। শিশুদের জন্যে লেখা তাঁর ‘লালকালো’ গ্রন্থটি নানাকারণে বাংলা কিশোর সাহিত্যে এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। এ ব্যাপারে তাঁকে সুকুমার রায়ের উত্তরসূরী বলা যায়। এই শিশুদের জন্যে এই একটিমাত্র গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন। কাহিনিবিন্যাসে ও স্বছন্দ ভাষার প্রয়োগে গ্রন্থটি ইতিহাসের পাতায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

‘লালকালো’ গ্রন্থটি বাংলার কিশোর সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেনি, দেখিয়েছে এক আলোকসামান্য পথ। যে পথের দিশায় পরবর্তীকালে রচিত হয়েছে আরো অনেক শিশু-কিশোর সাহিত্য। পেশাগত কারণে মনোবিদ ছিলেন বলেই তিনি তাঁর এই গ্রন্থে এমন কিছু দৃশ্যের অবতারণা করেছেন যা আপাতভাবে শিশুদের মনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেই অনেকে আগে ভাবতেন। আসলে এই আখ্যানে এমন কিছু অংশ আছে যা কেবল আগে বড়দের জন্যে লেখাতেই দেখা যেত। গিরীন্দ্রশেখর মনে করতেন শিশুদের সেইভাবে ‘আতুপুতু’ করে রাখার কোন মানে হয় না। তারাও নানারকম হিংসা বিদ্বেষ এবং হত্যকাণ্ডের মুখোমুখি হয় জন্মাবার পর থেকেই। এইসব অভিজ্ঞতা তাদের মনোগঠনে বিশেষভাবে সাহায্য করে। তাই তাঁদের মানসিক উৎকর্ষ বিধানে বাস্তবের সামনে দাঁড় করানো প্রত্যেক বাবা মায়ের কর্তব্য। আজকের শিশুদের কথা ভাবলে গিরীন্দ্রশেখরের এই চিন্তাভাবনা যে কতখানি আধুনিক ছিল, তা অনুমান করা যায়। তাই ‘লালকালো’ গ্রন্থ রচনাকালে লেখক যুদ্ধ বিগ্রহ এবং মৃত্যুর বর্ণনায় অনেক বাস্তবানুগ এবং অনেক বেশি দুঃসাহসী। তবে এই আখ্যান কল্পনা এবং যুক্তির মিশেলে রূপকথার আমেজটাকে গোড়া থেকেই ধরে রাখে। তাই এই গ্রন্থ আগাগোড়াই সুখপাঠ্য।
এবার মূল আখ্যানে আমরা প্রবেশ করি।

ঘোষেদের পুরনো ভিটের ধারে যে ডোবা আছে, তার একদিকে কালো পিপীলিদের রাজ্য, আর একদিকে লাল পিঁপড়েদের রাজত্ব। দুই সম্প্রদায়ে বিশেষ বনিবনা নেই, বরং একটু অসদ্ভাবই বেশি। সামান্য কারণেই ওদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। সেদিন বড়ই গুমোট গরম। পিপীলিদের কালো এক বউ ডোবার ধারে জল নিতে এসেছে। তার আবার রূপের দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না, অন্যদিকে সে আবার কালো রানির পেয়ারের সখী। এই ঘাটে যখন সে জল নিচ্ছে, অন্য ঘাটে লাল পিঁপড়েদের একটি দল কুচকাওয়াজ করছিল। ওই দলেরই এক ফাজিল ছোকরা কালো বউয়ের উদ্দেশে নানারকম ঠাট্টা তামাশা জুড়ে দিলো। কালো বউ ঘড় বেঁকিয়ে, ঘাট থেকে উঠে গালাগালি দিতে দিতে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। সেই লাল ছোকরা ছড়া কেটে তাকে আরো উত্যক্ত করল :
‘কালো বউ কালো কোলো। জলে ঢেউ সামলে চোলো।’
এতে কালো বউয়ের রাগ আর বেড়ে গেল। সে একেবারে রানির কাছে গিয়ে আছড়ে পড়ে বলল,
‘রাঙ্গামুখো বজ্জাতে করে অপমান গরল ভখিব আমি তেজিব পরাণ।’

অনেক বড় বড় যুদ্ধ বিগ্রহের পিছনে থাকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণ। মহাভারতের ওই অতবড় একটি যুদ্ধের পিছনে রয়েছে দুর্যোধনকে দ্রৌপদীর ‘অন্ধ’ বলে অপমান করা। ওই যুদ্ধ হয়তো অন্য কারণেও লাগতো। কিন্তু নানা গুণে গুণান্বিতা দ্রৌপদীর সামান্য ওইটুকু ভুলের খেসারতের কথা মহাভারতে সেইভাবেই উল্লিখিত আছে। এই ‘লালকালো’ আখ্যানের সূচনাপর্বে এই সামান্য ঘটনাই যুযুধান দুই দলের আত্মধ্বংসী যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে দিয়েছিল। এই সামান্য দুই লাইনের সংলাপের মধ্যে লেখকের শব্দবন্ধ রচনার এক চমৎকার নমুনা পাওয়া যায়। কী অনায়াসে তিনি ‘ভক্ষণ করিব’ শব্দবন্ধকে ‘ভখিব’ এই একটিমাত্র শব্দে প্রকাশ করেছেন।অবশ্য লেখকের ছড়া রচনার মুন্সিয়ানার পরিচয় গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে। যথারীতি রানি কালো বউয়ের এই সামান্য কথাকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে রানি এর প্রতিকারের জন্যে রাজাকে চিঠি লিখলেন। রাজা মন্ত্রীর পরামর্শ চাইলেন। এই সামান্য কারণে যুদ্ধ বাঁধানোর ব্যাপারটা মন্ত্রীও চাইলেন না। যথাবিহিত সম্মান জানিয়ে রানিকে বোঝাতে প্রতিহারী নিয়ে গেল রাজার ফরমান। কিন্তু অভিমানী রানি এতে আরো অবুঝ হয়ে উঠলেন।
‘এহেন বাণী, শুনি কানে কানে,
রাজার রানি মরে অভিমানে।’
রানি গোসাঘরে গিয়ে রইলেন। সবাই তাঁকে বোঝালেন। সাতদিন সাতরাত অন্নজল ছেড়ে তিনি উপবাসী রইলেন। ‘অনাহারে অনিদ্রা ও কষ্টে রানির রঙ কষ্টিপাথরের মত হয়ে গেল। সখীরা রাজাকে গিয়ে বলল, ‘আমরা অনেক সাধলাম, রানি তার সিদ্ধান্তে অবিচল। কিছুই তিনি স্পর্শ করছেন না।
খেলে না চিনি
খেলে না গুড়
খেলে না মধু
মাছের মুড়।
গুড়ের সঙ্গে ছন্দে মেলাতে গিয়ে মাছের মুড়োকে ‘মুড়’ শব্দের প্রয়োগ লেখকের এক অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
এর পরে কেলে কোটাল মহারাজার আদেশে ফৌজ পাঠিয়ে লালমুখোকে ধরে এনে মুণ্ড কাটল। রানি অন্নজল গ্রহণ করলেন। ওদিকে লাল চর গিয়ে লাল রাজাকে জানাল এই প্রাণবধের কথা। লাল মহারাজ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন-
ক্রোধে গরগর কম্পিত মুণ্ড,
লোহিত চক্ষু ঘূর্ণিত শুণ্ড,
কড়মড়ি দন্ত মহারাজ লাল,
হুঙ্কার ছাড়ে – অন্তক কাল,
পাত্রমিত্র সভাসদ জন
ত্রাসে জড়সড় শঙ্কিত মন।

যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল।
‘সাজে সাজে সাজে রে রঙ্গিলা পিঁপিড়ি,
বাজে কাড়া-নাকাড়া দা ড়া ড়া,ডি ড়ী ড়ী;’
‘সার বেঁধে লাল পিঁপড়ের দল ডোবার ধারে পৌঁছালো। ওদিকে কালো সৈন্যরাও তৈরি। ডেয়ে জল্লাদ ঘাঁটি আগলে বসলো। আর এক ডেয়ে সৈন্যদের চর হয়ে গেলো। কিন্তু ডোবার ধারে পৌঁছাতে-না-পৌঁছাতে তাকে লাল সৈন্য ঘিরে ধরলো। রাজার হুকুমে তাকে মেরে ফেলা হলো। এদিকে এক গিরগিটি বাস করত ওখানকার এক ভেরেণ্ডা গাছে।। সে নীচে নামতেই লাল পিঁপড়েরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো। লাল পিঁপড়ের কামড়ে সে অস্থির হয়ে উঠলো। ওদের কামড়ের জ্বালায় গিরগিটি কোনরকমে পালিয়ে বাঁচলো। প্রতিজ্ঞা করল যে রকমে হোক লাল পিঁপড়েদের সে জব্দ করবেই। লালেরা কালোদের থেকে বেশি শক্তিশালী ছিলো। তবে কালোরা ছিল বন্ধুবৎসল। তারা তাদের দলে অনেক ভালদের পেলো। ডেয়া জল্লাদ, গিরগিটি ছাড়াও পেল উচ্চিংড়ে আর কটকটি ব্যাঙকে। ওদিকে লালেরাও পেল গড়গড়ি সাপকে। তারপর শুরু হল বিষম যুদ্ধ।
পিঁপিড়া কাঠ ভরিল মাঠ,
দেখিয়া ডেয়ে আসিল ধেয়ে,
ডেয়ের দল অতি প্রবল
নাড়িয়া শুণ্ড হাঁ করি মুণ্ড
বিকটাঘাতে শত্রুনিপাতে।
বিষম ক্রুদ্ধ বাধিল যুদ্ধ।

এই যুদ্ধ অনেকদূর গড়াল। যুযুধান দুই পক্ষে শুধু লাল পিঁপড়ে আর কালো পিঁপড়ে নয়, একপক্ষে হাড়গিলে অন্যপক্ষে গড়গড়ি সাপ যোগ দেওয়ায় যুদ্ধের চেহারা ভয়ঙ্কর রূপ নিলো। কিন্তু যুদ্ধ তো কেবল বল দিয়ে হয় না। বলের চেয়ে বড় হল কৌশল। আর সেই কৌশলের জোরেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল কালো পিঁপড়ের দল এই যুদ্ধে জয়ী হলো। কালো রানির মুখে হাসি ফুটলো। কালো পিঁপড়েদের রাজ্যে আনন্দের বান এল যেন।
এই আনন্দের অভিব্যক্তি এই লেখায় ঘটেছে বিচিত্রভাবে। মানুষেরা যেমন অতি দুঃখে বা পরমানন্দে বিজাতীয় ভাষায় কথা বলে থাকে তেমনি পিঁপড়ে দলের এই বিজয়ের আনন্দে প্রকাশিত হয়েছে ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দি আর দেহাতি ভাষায়।
ঝম ঝম ঝম
ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুরি
রিরি রি
রাজা আইলন রাণী আইলন ভুট্টা দেলন আগমে,
শাগ পাকাকে রোটি খাইলন এক ঝঝ ঝর তাড়ি রে,
রি রি রি
আইগন লোটে বাইগন লোটে খিরা লোটে রে
লাল পালং পর বেঙবা লোটে লম্বা এসনদার।
রি রি রি
কাঁহা গেইলই বেঙবা কাঁহা গেইলই হো
এহন সুন্নর বেঙ কাঁহা পাইবই হো,
ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুরি
রি রি রি
আরে ফুদ্দি চিড়ইয়াঁ বোল মোরে কো
লে গইল বেঙবা কাঁহা গেইলই হো
রি রি রি ঝুমুর ঝুমুর ঝুমুরি
ঝম ঝম ঝম

আনন্দের বন্যা কীভাবে গানে রূপান্তরিত হয়ে কালো পিঁপড়েদের মনের ভাষাকে মূর্ত করল, সেটা বোঝাতেই পুরো গানটাই এখানে উল্লিখিত হলো। কিন্তু এই জয় তো পিঁপড়েদের নয়, এই জয়-তো উচ্চিংড়ে, গিরগিটি আর কটকটি ব্যাঙেরও। তাই সকলের মধ্যে আনন্দের ধূম পড়ে গেলো। প্রতিহারী এসে বললো, রানিমা এবং তাঁর সখীরা ব্যাঙের গান শুনবে। সবাই তাই ব্যাঙকে গান গাওয়ার জন্যে ধরলো। ব্যাঙ তার গানের সঙ্গে সবাইকে যোগ দিতে অনুরোধ করলো। তারপর তার পুরনো কলমী ডাঁটার সারং বার করে তারে মোচড় দিয়ে সুর বার করে গান ধরল,
ব্যাঙ – ‘ও না মাসি ঢং গুরুজি চিতং
মেরা সারংমে বাজিয়ে ক্যাসা ভালা রং
উচ্চিংড়ে – ঝাঁ ঝাঁ ঝাঁ
ইচ কিচ কিচ কিচ কিচ
পিপীলিগণ – কোঁ কোঁ কোঁ
মেরা সারংমে বাজিয়ে নয়া নয়া ঢং
গিরগিটি – চিঁ চিঁ চিঁ
ব্যাঙ – শুনো জি শুনো জি নয়া নয়া ঢং
মেরা সারংমে বাজিছে ক্যাসা ভালা রং’
‘মহানন্দে রাত্রি কেটে গেল’ এই বাক্যটি দিয়ে পালা শেষ হচ্ছে।
গিরীন্দ্রশেখর বসুর এই ছোট্ট পালাটি কেবল শিশুতোষ নাকি এতে অন্যতর বার্তা দিতে চেয়েছিলেন তিনি! এটি নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই। কেননা এটি সত্যিকারের একটি শিশুতোষ গ্রন্থ। তবে বড়রাও এরমধ্যে অনেক মনের খোরাক পাবেন। এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ হল যতীন্দ্রকুমার সেনের আঁকা কয়েকটি রঙিন ছবি। একটি গা ছম ছম করা ভূতের একটি সাদাকালো ছবি এঁকেছিলেন লেখক নিজেই। ছবিগুলো অবশ্যই এই গ্রন্থের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।

তবে এই যুদ্ধে কেন লালেরা বিজয়ী হল না, তা নিয়ে আমার মনে হয় প্রায় সব পাঠকেদের মধ্যে সাধারণত দুর্বল পক্ষের দিকেই সমর্থনে একটা ঝোঁক লক্ষ করা যায়। শিশু কিংবা বৃদ্ধ, মাঝবয়েসী কিংবা তরুণ, সবারই মধ্যে এমন একটি প্রবণতা আছে। এতে লড়াইওটা জমে ভালো আর যুদ্ধশেষে বিজয়ের উল্লাস সংক্রামিত হয় সবার মধ্যে। মনে রাখা দরকার সবসময় কেবল শক্তি নয়, কৌশলটাও একটা বড় ব্যাপার। আখ্যান যেভাবে এগিয়েছে তাতে শান্তিপ্রিয় কালো পিঁপড়েরা তাই অতি সহজেই বাচ্চা বুড়ো সব পাঠকেরই মন জয় করে নেয়। তাই যুদ্ধকালে পাঠক সাধারণ কালো পিঁপড়েদেরকেই সমর্থন করে। যুদ্ধশেষে ওদের জয় যেন আমাদেরই জয়। আমরাও যেন ওদের সঙ্গে ওই বিজাতীয় ভাষাতে গান গেয়ে উঠি।
শুনো জি শুনো জি নয়া নয়া ঢং
মেরা সারংমে বাজিছে ক্যাসা ভালা রং